পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

উর্দু থেকে অনুবাদ : সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০২০ ইং ০০:১১:৪৮ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

সংবাদপত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। রাজনৈতিক সংবাদগুলো প্রকাশ হচ্ছিলো না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কথা খুবই প্রচার হয়ে গিয়েছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে নিয়ে চকবাজার পর্যন্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকে ভাবছেন। ধীরে ধীরে অনেকের বক্তব্য পাল্টে যেতে থাকে। আতাউর রহমান খান ও নুরুল আমিন এব্যাপারে খুবই দ্বন্দ্বে ছিলেন। তারা এই বিষয়ে দ্বি-মত প্রকাশ করে আবার বলতেন, ‘যদি দেশের একচুল পরিমাণ ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয় তবে আমরা পল্টন ময়দানে পৌঁছে যাবো এবং প্রয়োজনে প্রাণ দেবো।’ খাজা নাজিম উদ্দিন এব্যাপারে নিরব ছিলেন। এর একটি কারণ তিনি অসুস্থ্য ছিলেন। ডাক্তার তাঁকে এসব থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। দ্বিতীয় কারণ তারা দুজন কঠিন আর্থিক জটিলতায় আটকে ছিলেন। তাঁর ছেলে খাজা মহিউদ্দিনকে এক দু কোম্পানিতে সংযুক্ত করা হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে এটাই তাঁর আপোসের কারণ ছিলো বলে অনেকে বলে থাকেন। খাজা খায়ের উদ্দিনের সহানুভূতি ছিলো খাজা নাজিম উদ্দিনের সাথে যখন নবাব হোসেন আসগরী তাঁর সহানুভূতির দফতর পাল্টিয়ে নিতে তৈরি হচ্ছিলেন। তবে মাওলানা ভাসানীর অবস্থা ছিলো চিত্তাকর্ষক। মাওলানার সাথে আমার হোটেল শাহবাগে যাদুমিয়ার রোমে দেখা হয়। তিনি খুব খুশি হন যখন আমি জানতে চাইলাম; এখন তিনি কি করবেন? মাওলানা বলেন; ‘আরে মিয়া গরমে যদি কেউ করম স্যুট গায়ে দেয় তবে তাকে আপনি কি বলবেন? সাথে সাথে যাদুমিয়া উত্তর দিলেন; পাগল। মাওলানা যেন এই উত্তরের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, হ্যাঁ, পাগলই বলা হবে। আমি মৌসুমের মতো পাগলই বলবো। এখন ইচ্ছে হলে তুমি চা পান করো, বিস্কুট খাও এবং বিদায় হও।’ আমি যখন শেখ মুজিবের কাছে মাওলানার বক্তব্য উপস্থাপন করি তখন হাসতে হাসতে বলেন, ‘হ্যাঁ বড়মিয়া, পোশাকি নির্বাচনে তিনি তো দক্ষ।’ পূর্ব পাকিস্তানে নভেম্বর ডিসেম্বর মৌসুম হয় আনন্দদায়ক। সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠাদি অনেক বেশি হয়। এ বছর জলসা-জালুস তেমন ছিলো না। ফলে বিষয়গুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঢাকা শহরে বিয়ে-শাদির অবস্থা এমন যে প্রতিদিন কোন না কোন গলি থেকে হয়তো বর নতুবা কনে বের হয়ে যাচ্ছে। মূলত বিয়ে উপলক্ষে সবাই একত্রিত হতেন এবং দুনিয়ার সকল বিষয়ে আলোচনা করতেন। এই আলোচনায় তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে অনেকের চিন্তারও পরিবর্তন হতো। বাঙালির চরিত্রটাই এমন যে তারা একে অন্যের সাথে দেখা না করে থাকতে পারতেন না। যখন সরকার কর্তৃক মিটিং-মিছিল বন্ধ করা হয় তখন বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানাদি রাজনৈতিক আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় এবং বিয়ে থেকে রাজনীতিবীদদের বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার হতে থাকে। শেখ মুজিবের কারণে বাঙালীদের বিয়ে-শাদীতে আমারও যাওয়ার সুযোগ হয়। আশ্চর্যের বিষয় যে, এই সব বিয়েতে বর-কনে কিংবা অলংকারাদির কথা খুব কম আলোচিত হতো। বেশির ভাগ আলোচনাই থাকতো রাজনৈতিক। আমি যখন করাচি ফিরে আসি এবং দৈনিক আঞ্জামের জন্য রিপোট লিখতে শুরু করি তখন নিষেধাজ্ঞার আইনে আটকে যাই। আমি বিভিন্ন লেখায় ননিবাবুর সেই কথা উল্লেখ করি যে, বাঙালী রাজনীতি ছাড়া বাঁচতে পারে না যেমন মাছ পানি ছাড়া বাঁচে না। ডিসেম্বরে জানা যায় ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার আট মাসের মধ্যে ছাত্ররা রাজনীতির মাঠে চলে আসে। বটতলায় প্রতিদিন মিটিং-মিছিল হতে থাকে। বক্তব্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী উঠে। শেখ মুজিবের দিক থেকে জানতে পারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে আবার তৎপর করতে চেষ্টা করছেন। তিনি তাঁর সিনিয়রদের দোয়া ও ভালোবাসা লাভ করেছিলেন। এদিকে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর বিরুদ্ধে নিয়ে আসা সকল অভিযোগ আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন। এই মামলা কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড দীর্ঘদিন চলে। সভা-সমাবেশ নিষেধ থাকার কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন নেতাদের বক্তব্য শোনা থেকে বঞ্চিত থাকে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে সামরিক আদালতে সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে মামলার কারণে পূর্ব-পশ্চিম দুই অংশের মধ্যে সম্পর্ক নাজুক হয়ে যায়। পত্রিকাগুলোও এই মামলা নিয়ে কিছু অতিরিক্ত কথা লিখতে থাকে। সাধারণ মানুষও এই বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। নিজেরা এই সবের কারণ হওয়ার কারণে সামরিক সরকার এই বিষয়গুলোকে বন্ধ করতে পারছিলো না। তথ্যমন্ত্রী তখন নিজের পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ দিয়ে বললেন, সাংবাদিকরা যেন এই বিষয়ে আরেকটু সাবধানতা অবলম্বন করেন। সাথে সাথে কিছু পত্রিকা পিছু যায় এই বিষয়াদি লিখার ক্ষেত্রে। তখনও ‘নেওয়া-এ ওয়াক্ত’ পত্রিকা নিয়মিত এই মামলা নিয়ে লিখতে থাকে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমাকে দায়িত্ব দিলেন ইত্তেফাকে বিস্তারিত লেখার জন্য। সোহরাওয়াদী সাহেব তাঁর অভ্যাস অনুযায়ি আদালতের বাইরের মতো ভেতরেও আয়ূব খানের সমালোচনা শুরু করেন। আদালত থেকে বাইরে এলে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেন; আপনি কি আদালতের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট? তিনি বলেন; যে আদালতের বিচারক চেঙিস খান আমি তার উপর সন্তুষ্ট হবো কীভাবে? সাথে সাথে অট্টহাসি শুরু হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে এই আদালতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন মিস্টার আই আর চেঙ্গিস। সরকারি উকিল ছিলেন চৌধুরী নজির আহমদ। বিচারক একবার বললেন, মিস্টার সোহরাওয়ার্দী আপনার ফাজিল বন্ধু চৌধুরী নজির আহমদ বলেছেন...। তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব উত্তর দিলেন; চৌধুরী সাহেব যেমন ফাজিল নয়, তেমনি আমার বন্ধুও নয়। এই সময় চৌধুরী বেশ অসস্তিতে ছিলেন। তবে তার থেকে কোন উত্তর আসেনি। এই মামলায় সোহরাওয়ার্দীর উপর সাতটি অভিযোগ করা হয়েছিলো। যখন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করা হয় তখন তিনি দাঁড়িয়ে বলেন; জনাব, আট নম্বার অভিযোগ এখানে সংযুক্ত করা হোক। আদালত জানতে চাইলো; তা কি? তিনি বলেন, আমি আয়ূব খানের নির্দেশে অভিযুগে অভিযুক্ত হচ্ছি। সরকারি উকিল মিস্টার চৌধুরী প্রশ্ন করেন; আপনি কি প্রেসিডেন্ট আয়ূব খানের কথা বলছেন? সোহরাওয়াদী বলেন; অবশ্যই আমি যখন তাঁর কারণে অভিযুক্ত তবে তিনিও আমার মতো অপরাধী। এই উত্তরে আদালত নিরব হয়ে যায়। আয়ূব খানের নারাজি ছাড়াও কেউ কেউ তার ক্ষোধের শিকার হওয়ার ভয়ে কাঁপতে থাকেন। এই সময় আয়ূব খানের মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো বলেন, ‘সরকার আদালতকে রাজনৈতিক প্লাটফরম বানানোর সুযোগ দেবে না।’ তার এই বক্তব্যকে বুদ্ধিমানেরা আয়ূব খানের চরম চামচামী বলে সমালোচনা করতে থাকে। সবাই বলতে থাকেন, যতদিন আদালতে রাজনীতিবীদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে ততদিন রাজনৈতিক বক্তব্যও আদালতে চলবে। এই সময় শেখ মুজিবুর রহমান আদালতের কার্যক্রম শোনার জন্য কয়েকবার লাহোর আসেন। তাঁর অবস্থান হোটেল প্যালিটিস-এ ছিলো। সেখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেবও থাকতেন। লাহোরে থাকাকালিন সময় শেখ মুজিব মামলার কার্যক্রম আমার কাছ থেকে উর্দুতে শোনতেন। তা তিনি বাংলায় অনুবাদ করে পরবর্তি ফ্লাইটে ইত্তেফাকের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। লাহোরে অনেক হাউস এবং চাইনিজ পখহোম ছিলো যেখানে রাজনীতিবীদ, সাহিত্যিক, কবিরা বসতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করতেন। সেখানেও এই সময় মামলার কার্যক্রম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিলো। লাহোরের রাজনৈতিক মহল এই মামলা চলাকালিন সময় কোন না কোনভাবে কোন না কোন সময় এসে এখানে শ্বাস নিচ্ছিলেন। কফি হাউসে একবার খাজা রফিক প্রশ্ন করলেন; পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা কেমন? শেখ মুজিব উত্তর দিলেন; যদি এই মামলার কার্যক্রম ঢাকায় চলতো তা হলে বিপ্লব হয়ে যেত। আব্দুল্লাহ বাট প্রশ্ন করলেন; কি রকম বিপ্লব? মুজিব উত্তর দিলেন; গণতান্ত্রিক বিপ্লব। মামলার কার্যক্রম কিছুদিনের জন্য স্থগিত করা হলে সোহরাওয়াদী সাহেব ঢাকায় চলে যান তাঁর কিছু মক্কেলের মামলা পরিচালনার জন্য।
পূর্ব পাকিস্তানে ভাসানী গ্রুপ এবং মুসলিমলীগের সমর্থক বিভিন্ন দলের নেতাদের উপর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষেধ করা হয়। এরমধ্যে আতাউর রহমান খান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদ এবং দিলদার আহমদের নাম উল্লেখযোগ্য। ওরা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে মোকাবেলা না করে বরং স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে সাত বছরের জন্য বিদায় নিলেন। আহমদ সাহেবের বক্তব্য হলো, নোটিশ থেকে স্পষ্ট যেকোনভাবে আমাদেরকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হবে, ফলে আদালতে গিয়ে লাভ কি? নুরুল আমিন, খাজা নাজিম উদ্দিন, শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ আলী বগুড়াকে কোন নোটিশ দেওয়া হয়নি। তবে শেখ মুজিবকে হয়রানি করতে এগারোটি মামলা দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন মামলার জন্য আদালতে যেতে হচ্ছে। তাঁকে বিভিন্ন দফা দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয়। এরপর থেকে তাঁকে বিভিন্ন জেলে গিয়ে দেখতে হয়, কিংবা আদালতে হাজির করা হলে দেখা হয়। সামরিক শাসন থাকার পরও তাঁর সাথে দেখা করার লোক কম ছিলো না। শেখ মুজিবও এই সুযোগের ফায়দা উঠাতেন। তিনি নিজ কর্মী ও বন্ধুদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। মাঝেমধ্যে তিনি বক্তব্যও দিয়ে ফেলতেন। টুঙ্গি পাড়ায় শেখ মুজিবের বাবা খুব অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাঁকে ফরিদপুর জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালে একবার গভর্ণর আজম খান শেখ সাহেবের বাবাকে দেখতে আসেন এবং চিকিৎসার জরুরী নির্দেশ দিয়ে যান। শেখ মুজিব যখন এই সংবাদ পেলেন তখন সাথে সাথে গভর্ণরের শোকরিয়া জানিয়ে পত্র লিখেন। আজম খানের কৌশল এমন ছিলো যে প্রদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হোক, মানুষ শান্তিতে থাকুক, মানুষের সমস্যা সমাধানে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হোক। রাজনীতিবিদদের সাথে তাঁর ভালো এবং গভীর সম্পর্ক ছিলো। তিনি শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং খাজা নাজিম উদ্দিনের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দিলেন। খাজা সাহেবের অনেক ব্যক্তিগত সমস্যাও সমাধান করে দিলেন। সরকারী অনুষ্ঠানাদিতে সকল রাজনীতিবীদদেরকে দাওয়াত করা হতো এবং প্রত্যেকের শান অনুযায়ি মর্যাদা দেওয়া হতো। একবার গভর্ণর হাউসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উপস্থিত হয়ে পিছনের চেয়ারে বসে গেলেন। তখন গভর্ণর নিজে উঠে আসেন এবং সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে মঞ্চে নিয়ে যান। আয়ূব খান গভর্নরের এসব পছন্দ করতেন না। সোহরাওয়াদী সাহেব গভর্ণরকে প্রশ্ন করেন; আপনি কেন আয়ূব খানকে নারাজ করেন? গভর্ণর উত্তর দিলেন; আমি আল্লাহ এবং নিজের কাছে দায়বদ্ধ। আমি অন্যকারো নারাজির পরোয়া করি না। আমার যা দায়িত্ব আমি তা আদায় করছি।’ সোহরাওয়ার্দী সাহেব এই উত্তর শোনে নিরব হয়ে যান এবং অনুষ্ঠানের কার্যক্রমের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। গভর্ণরের পরিশুদ্ধ চিন্তা তাঁকে খুব আকর্ষণ করে। তিনি এক বক্তব্যে বলেন, গভর্ণর এই প্রদেশের জন্য অনেক কিছু করতে ইচ্ছুক কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার করতে দিচ্ছে না।’
সামরিক শাসন থাকার পরও ইত্তেফাকের নীতিতে কোন পরিবর্তন হয়নি। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনার সংবাদ এবং নিবন্ধন, ছবি সবই প্রকাশিত হচ্ছিলো। মানিক মিয়া ‘ঢাকা টাইমস’ নামে একটি ইংরেজি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। এই পত্রিকা শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবীদদের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিলো। সেই সময় এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সালাউদ্দিন মুহাম্মদ। ঢাকা টাইমসের মাধ্যমে রাজনীতির সাথে পাঠকেরা নতুন চিন্তার সংযুক্তির কথা ভাবছিলো এবং প্রচুর সংযুক্তও করছিলো। পরে সংবাদ প্রকাশের নতুন নীতি পাশ হলে অনেক নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় এবং আর সত্য প্রকাশ অনেকটা অসম্ভব হয়ে যায়। সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদেরকে আত্মরক্ষা করে চলতে হয়। ইত্তেফাক তখন বাংলাভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে প্রধান ছিলো। পাকিস্তানের ভেতর এবং পাকিস্তানের বাইরে বাংলাভাষায় সংস্কৃতিকÑহিন্দির পরিবর্তে ফার্সী ও উর্দু ভাষার শব্দ বেশি ব্যবহার করা হতো। মানিক মিয়া সাংবাদিকতার নীতির দিকে শুধু নয়, ইত্তেফাকের শব্দের দিকেও নজর রাখতেন। ইত্তেফাকে ভাষাগত ভুল হলে তিনি শক্তভাবে তা নোট নিয়ে ধমক দিতেন। ইত্তেফাক অফিসের সুনাম ছিলো এমন যে, সবাই বলতেন এখানে টিক্কা খান ছাড়া বাকি সকল নেতা এবং গভর্ণর এসেছেন। মনিক মিয়ারও দেশের রাজনীতিবীদ এবং শাসকদের সাথে গভীর সম্পর্ক ছিলো। নীতিতে তিনি খুব দৃঢ় ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর সাথে তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। তবে যখন মাওলানা ইস্কন্দর মির্জার ইশারায় সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করতে চাইলেন তখন মানিক মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে উলঙ্গ তলোয়ারের মতো কলম ধরেন। কারণ তিনি জানতেন মাওলানার মিশন কি। মানিক মিয়া ছিলেন গভর্ণর আজম খানের ঘনিষ্ট বন্ধু। গভর্ণর কর্তৃক চুক্তি ভঙ্গের পরও এই বন্ধুত্ব ছিলো। মুজিব যখন জেলের বাইরে থাকতেন তখন সপ্তাহে দু একদিন ইত্তেফাক অফিসে যেতেন। সেখানে কর্মরতদের সাথে কথা বলতেন। মুজিব যখন জেলে থাকতেন তখন মানিক মিয়া তাঁর ঘরে যেতেন এবং পরিবারের খবরাখবর নিতেন। বেগম মুজিবের এক আশ্চর্যজন বৈশিষ্ট্য ছিলো, তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কারো কাছেই করতেন না। শেখ মুজিবের বাবার সাথেও না। তিনি আমাকে বলতেন, আমরা অপেক্ষায় থাকি কখন সে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসে আমাদের কাছে। কিন্তু আমরা অপেক্ষায়ই থেকে গেলাম, কিন্তু কোনদিন আসলো না। আমাদের বউ কোনদিন তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি। সে তার ছেলে-মেয়েকেও বাপের পথ অনুসরণের শিক্ষা দিতো।’ জেলে থাকা অবস্থায় মুজিব পরিবার অনেক মুশকিলের ভেতর দিয়ে সময় অতিবাহিত করেছে। তারা সবাই খুব দৃঢ়তার ভেতর দিয়ে সেই সময়কে অতিক্রম করেছেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রীত্ব থেকে ইস্তেফা দিয়ে দলের জেনারেল সেক্রেটারীর পদকে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে কর্মিরা তাঁর ভক্ত হয়ে যায়। তখন তিনি দলের অবস্থা এমন শক্ত করেছিলেন যে সামরিক শাসনও তা ভাঙতে পারেনি। শেখ মুজিবকে হত্যা করেও দলকে ধ্বংস করতে পারেনি, বরং আরও দৃঢ় এবং শক্ত হয়েছে। যত দিন যাচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্ব আরও দৃঢ়তার সাথে প্রকাশিত হচ্ছে।
এদিকে লাহোর আদালত সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে মামলার রায়ে তাঁকে সাত বছরের জন্য রাজনীতি থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়। এই সাত বছর তিনি কোন দল বা গ্রুপের নেতা হতে পারবেন না। নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। এই রায়ের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হরতাল হয়। ঢাকায় গরম জনশ্রুতি ছিলো যে, জেনারেল আয়ূব খান নির্বাচনকে তিনভাগে ভাগ করে শেষ করবেন। প্রথমভাগে প্রাপ্ত বয়স্ক এবং পাগল নয় এমন আশি হাজার মৌলিক গণতান্ত্রিক নির্বাচিত করা হবে। এরপর আশি হাজার শহর ও জাতীয় পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত করা হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে এবং এতে এই নির্বাচিতরা ভোট দেবেন। যখন বিবিসির মাধ্যমে এই সংবাদ প্রচারিত হয় তখন শেখ মুজিব জেলে ছিলেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা। তারপরও তিনি ঘোষণা দিয়ে বসলেন, এই অসংবিধানিক আইনের বিরুদ্ধে তিনি গোটা দেশে আন্দোলন করবেন। এই সংবাদ যখন আয়ূব খানের কাছে পৌঁছে তখন সে ভয় পায়। তার ভয় ছিলো এই আন্দোলন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিবে। তাই আয়ূব খান প্রাদেশিক গভর্ণরকে নির্দেশ দিলেন সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করতে। কিন্তু গভর্ণর তার অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে যখন সোহরাওয়ার্দী ঢাকা থেকে করাচি যান তখন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ মাঠে আসে এবং প্রতিবাদ করতে থাকে। গোটা পূর্ব পাকিস্তান রাজন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT