পাঁচ মিশালী

জ্ঞানার্জনের পথে

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০২০ ইং ০০:১২:৫৭ | সংবাদটি ৩৪০ বার পঠিত
Image

চিৎকার করে বললেই সবসময় সবকথা সবাই শুনে না। ধীরে বলতে হয়। মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয় আর শুনতে হয়। অন্ধকারে হঠাৎ বিজলি আর ধীরে ধীরে ঊষার আলো ফোটা এক নয়। ঊষার সূর্যের প্রভাব দীর্ঘ হয়। কিন্তু আজকাল আমরা বড়ো অস্থির সবকিছুতেই। যেন তেন উপায়ে নিজেকে আমি জ্ঞানী আমি জানি’ ভাব নিয়ে প্রচার ও প্রকাশ করার মানসিকতা বড়োই শোচনীয়। অনেকেই তা বুঝতে পারি না। মঞ্চে, সম্মুখে কিংবা উচ্চ আসনে গিয়ে স্বরতন্ত্রের জোরে চিৎকার করলেই তা শৈল্পিক বক্তৃতা হয় না।
শিল্প হচ্ছে জ্ঞানের প্রভাবে প্রস্ফুটিত সৌন্দর্য। জ্ঞানের প্রভাব অন্য প্রাণীর উপর নয়; বরং তা মানুষের মাঝেই পড়ে এবং মানুষের মাঝেই তা প্রকাশ পায়। আমরা অনেকেই আলো এবং অন্ধকারের গুরুত্ব বুঝতে পারি না। তাই প্রকৃত আলোটুকু অবহেলায় ফেলে রাখি ঘরে কিংবা বাহিরে। জ্ঞান হচ্ছে আলো আর মূর্খতা হলো অন্ধকার। জ্ঞান যে কেবলমাত্র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-ই নয়; বরং তা প্রকৃতি ও চারপাশ থেকে দেখে চিন্তা শক্তি দ্বারা খুঁজে পাওয়া তাও আমরা অনেকে ভুলে বসে আছি। তাই কেউ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি শ্রেণি পাস করলেই আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাকে জ্ঞানে ঠাসা জ্ঞানী মানুষ মনে করি। এটা খুবই ভুল। চারপাশের জ্ঞানকে গ্রহণ না করে আমরা অন্ধকারের মোহে কাটিয়ে দিই সারাজীবন। তারপর পৃথিবীর পথে হাঁটা শেষ হয় অন্য অনেক প্রাণীর মতো। আমরা বলি সকল প্রাণীর মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কেন? তা খুঁজি না। তাই শ্রেষ্ঠ প্রাণীকূলে জন্মেও আমরা অনেকেই উৎকৃষ্ট চিহ্ন রেখে শ্রেষ্ঠ প্রাণ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারি না। এখানে অধিকাংশের কাজ ও ধ্যান হলো, যেখান থেকে যা পাও তা-ই খাও, জমাও আর যেমন ইচ্ছা পারো ফূর্তি করে মরো। এমন ধারণা শ্রেষ্ঠ প্রাণ পাওয়া মানুষের জন্যে ঠিক নয়। রম্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেন, জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্ত্বর। তিনি যথার্থ বলেছেন। জ্ঞানশক্তি ও চিন্তাশক্তি কখনো টাকা বা অন্য কোনো ধনের বা সম্পদের সাথে তুলনা নয়। এর মূল্য অনেক উপরে। আমরা জেনেছি এক মহান ব্যক্তির মহৎ কথা- ‘জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র। এরপরও আমরা দেখতে পাই মানুষ অন্যায়ভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে সারাজীবনে। এসব দেখেই আমি বলি অন্যকথা। জ্ঞানার্জন ঘুষ গ্রহণের মতো নয় যে আপনি মানুষকে বেকায়দায় ফেলে, জিম্মি করে, মানবতাকে গলা টিপে যাচ্ছে তাই ব্যবহার করে, নিজেদের মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে তা অর্জন করবেন। এতোসব অনৈতিক কাজ করেও যখন আপনি দেখছেন যে, কারো কাছ থেকে সরাসরি ঘৃণা বা থুথু পাচ্ছেন না, তখন নিজেকে মনে মনে খুব সম্মানি মনে করে আত্মতৃপ্তি পেলেও, যদি কোনো অবসরে কিংবা আপনার সীমাবদ্ধ সময়ের ক্লান্ত বা পড়ন্ত বেলায় ভেবে দেখেন, তখন বুঝতে পারবেন আপনি মেকি সম্মান বহে এতোটা পথ হেঁটেছেন। অবশ্য কতোটুকু বুঝতে পারবেন, তা নির্ভর করে আপনার মাঝে মনুষ্য ধর্ম ও পশু ধর্মের পার্থক্য কতোটা আছে তার উপর। সততা হচ্ছে আলো এবং তা জ্ঞানেই পাওয়া যায়। জ্ঞান মানুষকে তুলনামূলক অধিকার সচেতন করে। একজন অসৎ লোকের চেয়ে অধিকারের ভিত্তিতে সমাজের একজন হিসেবে অপর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে খাওয়া দুর্বল মানুষটি অনেক ভালো। সে যখন সবল হবে তখন সেও সমাজকে দিবে বহুগণে। কিন্তু অসৎ লোকের দিনে দিনে দেনার দায় বাড়ে এবং তার পুঁজির সুবিধাভোগী তারই উত্তরসূরীও এর দেনা থেকে মুক্তি পায় না।
অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষকে সকল পথেই কষ্ট করতে হয়। তবে অর্থ-সম্পদ ও জ্ঞান-সম্পদ এক হয় না। অর্থ সম্পদ অর্জনের জন্যে মানুষ প্রকৃতি ও অন্য মানুষের প্রতি জুলুমের পথ বেছে নেয়, অবৈধ পন্থা গ্রহণ করে এবং তা আয়ত্ত্বে আনে। এভাবে আয়ত্বে আনা সম্পদ অর্জনের নয়; বরং তা দুর্নীতি দ্বারা প্রাপ্ত, বলা যায় এক প্রকার ডাকাতির মাল। পক্ষান্তরে দেখুন, জ্ঞানার্জন কখনো অবৈধ চিন্তায় হয় না। সুস্থ পথে, ধীরে এবং সাধনায় তা আসে। জ্ঞানার্জন ভিক্ষার চালের মতো। অসমর্থ একজন মানুষ যেমন অনেকটা পথ হেঁটে নানান জনের কাছ থেকে লাঞ্চনা সয়ে একমুঠো দুইমুঠো করে চাল সংগ্রহ করে দিন শেষে পেয়ে যায় এক থলে ভর্তি চাল; তেমনি জ্ঞান পিপাসু মানুষ গ্রাম, দেশ ও পৃথিবীর পথে নানান বাধা ডিঙিয়ে অনেক লাঞ্চনা ও গঞ্জনা সয়ে জীবনের সঞ্চয় জ্ঞান অর্জন করতে হয়। জ্ঞানার্জনের পথে কষ্ট সইতে হয়। এই কষ্টের অর্জন মহান অর্জন। এই পথে হাঁটতে গিয়ে বড়ো বড়ো মনীষীগণ পরিবার, সমাজ, এমনকি রাজ্য বা রাষ্ট্রের রাজা কিংবা নিষ্ঠুর শাসক ও তার পরামর্শ দাতাদের থেকে অনেক মানসিক ও শারীরিক কস্ট সহ্য করেছেন।
এই পৃথিবীর যে কোনো বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ কোনো না কোনো ধর্মের মন্ত্রে দীক্ষিত। এমনকি যে জন বহুল প্রচলিত ধর্মের উল্লেখিত স্রষ্টার বিশ্বাস করতে চায় না, সে জনও কোনো না কোনো পথে আপন বিশ্বাসে ধর্মের ভিতরে থেকে যায় এবং জ্ঞান খুঁজে ফিরে। আসল খুঁজে পেলেই সে ঝলমল করে ওঠে মানব সমাজে। আর যে জন জ্ঞান খোঁজে না সে জন অন্ধকারেই জীবন যাপন করে আর অন্ধকারেই তলিয়ে যায়। ভূমিষ্ট হয়ে মানুষ আলো পায়, কাজেই মানুষ আলোটাকেই গ্রহণ করে। আলো যেহেতু জ্ঞান, তাই এখানে জ্ঞান খুঁজে সে নিজেকে আলোকিত করতে চায়। আরবের মানুষের বহু নির্যাতন সয়ে আপন বলয়ে মানুষ দ্বারা বাধা পেয়েও ওই সমাজের মানুষকে সত্যটা জানাতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহম্মদ সা: জীবনে কষ্ট সয়েছেন। তারপর পৃথিবীর মানুষ সত্যালোকের দেখা পেয়েছেন। নিশ্চয় জ্ঞানের ব্যাপার হলো তা-ই যা মানব কল্যাণের। মনীষী সক্রেটিস, এরিস্টটল, গৌতম বুদ্ধ, বাংলাদেশের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ সমাজের মানুষের নির্মমতা সয়ে জ্ঞানার্জনের পথে হেঁটেছেন পৃথিবীর পথে পথে এবং পেয়েছেন ও অকার্পণ্যে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁরা শিক্ষক, আলোর শিখা হাতে ছুটেছেন এবং শতাব্দী পরেও তাঁরা টিকে আছেন আলোকবর্তিকা হয়ে, সকল মানুষের অভিভাবক হয়ে। এই পথের মহৎ মানুষকে যারা যুগে যুগে অবজ্ঞা করেছে, অত্যাচার করেছে, হিংসা করেছে, তারা ইতিহাসে ঘৃণিত এবং হারিয়ে গেছে। আলোর পথের মানুষ হারায় না; টিকে রয়।
আলো বারবার উদ্ভাসিত হয়, প্রজ্জ্বলিত হয় অন্ধকারের পথে। চোখ থাকার পরও যারা কানা বা অন্ধ তারা বুঝে না, তাই প্রদীপের নীচে বসবাস করেও তারা আলোটুকু দেখে না। এই সমাজ যেনো এক কানার হাট বাজার। হ্যাঁ এমনকি কানার হাট-বাজারে সকল সময়ে সকল কালে জ্ঞানান্বেষী কিছু মানুষ নিরন্তর খোঁজে সত্যটারে। সে পায় এবং এই পথে করে আহ্বান আরো আরো মানুষের প্রাণ। এমন আহ্বানে সকলেই আসে না, বরং কেউ কেউ আসে, পায় এবং পথে হেঁটে হেঁটে আলোর মেলায় ডাকে আরো আরো প্রাণ।
খুব কাছের মানুষ যেমন বন্ধু বৎসল হয়, তেমনি কাছের মানুষের রক্তচক্ষু ও হিংসা দেখেই অনেক সত্যানুসন্ধানী মানুষকে পথে হাঁটতে হয়। সারাজীবন পরিবার, স্বজন এবং সমাজে বসবাসরত নিন্দুকের নানানরকম যন্ত্রণা সহ্য করে কিছু মানুষ ছুটে জ্ঞান অর্জনের পথে। এতোসব নিন্দুকের ভীরেও কাউকে পাওয়া যায় খুবই আপন। এখানে দেখতে হয়, পড়তে হয়, ভাবতে হয়, শিখতে হয়, তারপর পেয়ে দিয়ে যেতে হয়। যারা আলো পেয়ে দিয়ে যায়, তারা কভু হারায় না; বরং মরেও বেঁচে রয়। এই পথে কষ্ট সইতে হয়। প্রকৃত সুন্দর ও আসল সম্মানজনক জীবনের জন্যে জ্ঞানের পথে হাঁটতে হবে বহুদূর পৃথিবীর পথে।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT