পাঁচ মিশালী

অবিস্মরণীয় নাম হাজী মোবারক বক্ত

এম.এ. হান্নান সেলিম প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০২০ ইং ০০:১৩:৪০ | সংবাদটি ২৫২ বার পঠিত
Image

সময়ের প্রয়োজনেই বোধহয় মাঝেমধ্যে বিশেষ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের উদয় ঘটে, যারা সমকালীন সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দেন। এমনি এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম হাজী মোবারক বক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক অথবা ধর্মীয় শিক্ষায় যথেষ্ট শিক্ষিত না হয়েও ১৯৪০ থেকে ১৯৮০ সাল (মৃত্যুকাল) পর্যন্ত হাজী মোবারক বক্ত সিলেটে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। এহেন ব্যক্তিত্বকে স্মরণ না করলে সামাজিক ও নৈতিক দায়ভার রয়েই যায়।
খুব একটা কুসুম ছড়ানো অবস্থায় হাজী মোবারক বক্ত সাহেব জীবন শুরু করেননি। কিন্তু নিজ প্রতিভা-গুণে ভারত বিভাগের ক্রান্তিলগ্নে অনেক অনভিপ্রেত সামাজিক সমস্যার মোকাবেলা করেছেন শক্ত হাতে। তৎকালীন জাতিগত দাঙ্গা (রায়ট) ঠেকিয়েছেন নিজের জীবনবাজি রেখে। সেগুলো অবশ্য আমার দেখা নয়, মুরব্বিদের কাছ থেকে শোনা। ৫০-এর দিকে মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানীর সহচর্যে দিয়েছেন ঘনিষ্ঠভাবে। নিজের প্রতিষ্ঠিত মোবারক হোটেল ছিল মাদানী সাহেবের সিলেটে ধর্মভিত্তিক কর্মকান্ডের মূল ঠিকানা।
সিলেট জামে মসজিদ ছিল স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় কেন্দ্রবিন্দু। হাজী মোবারক বক্ত সাহেব দীর্ঘদিন এই মসজিদের মুতাওয়াল্লী ছিলেন। হাজী মোবারক বক্ত সাহেবকে নিজে মসজিদের গেটে বসে মসজিদের উন্নয়নের জন্য ডাব নিলাম করতে দেখেছি। বাজারে ডাবের তৎকালীন মূল্য তিন আনা হলেও মসজিদের উন্নয়নের জন্য উনি ১ টাকা ২ টাকা মূল্যে ডাব গছিয়ে দিতেন। পুকুরের তেলাপিয়ার পোনা বাজার মূল্যের থেকে অনেক বেশি মূল্যে বিক্রি করে মসজিদের আয় বাড়াতেন। যার কাছ থেকেই পেতেন, মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করতেন। উনার প্রাথমিক এহেন প্রচেষ্ঠার ফলশ্রুতিই আজকের বন্দরবাজার জামে মসজিদ।
শাহী ঈদগাহের মোতাওয়াল্লীও ছিলেন হাজী মোবারক বক্ত সাহেব। নিজে রুমাল নিয়ে ঈদের দিন ঈদগাহের টাকা সংগ্রহ করে শাহী ঈদগাহের শ্রী বৃদ্ধি করেছেন।
হজ্বে যাওয়া এখনকার মতো এত সহজ ছিল না তখনকার দিনে। হাজীদের আসন সীমিত থাকায় লটারির মাধ্যমে যাত্রী নির্ধারিত হতো ডিসি অফিস থেকে। তকালীন ধর্মীয় নেতা হিসাবে হাজী মোবারক বক্ত সাহেবকে দিয়েই ডিসি সাহেব লটারী পরিচালনা করাতেন।
রমজানের ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সূর্যাস্তের সময় ব্যবধানের কারণ প্রায়ই মতান্তর দেখা দিত ঈদের দিন নিয়ে। ডি.সি. সাহেব নিজেকে দ্বিধা থেকে বাঁচানোর জন্য হাজী মোবারক বক্ত সাহেবের হাতেই সিদ্ধান্ত অর্পণ করতেন।
হাজী মোবারক বক্ত সাহেব কাজীটুলা উঁচাসড়ক মসজিদ এবং কাজীটুলা জামে মসজিদও সংস্কার করেন। যার কাছ থেকে যেভাবে পারেন মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করতেন। এ ব্যাপারে একটি ব্যতিক্রম ধর্মী চাঁদা আদায়ের কথা না বললেই নয়।
উঁচাসড়ক মসজিদের একটি পেয়ারা গাছে বেশ কটা পাঁকা পেয়ারা দেখে আমি স্থানীয় এক বন্ধুকে বললাম, মসজিদের পেয়ারা দু’চার টাকা দিয়ে কিনে খেয়ে নাও না কেন? উত্তরে সে বললো, “এই মসজিদে পেয়ারার দাম পঁচিশ হাজার টাকা। গত শুক্রবারে হাজী মোবারক বক্ত সাহেব উনার লন্ডন প্রবাসী পুত্রের কাছে একটি পেয়ারা নিলামে বিক্রি করেছেন পঁচিশ হাজার টাকা।” এইভাবে বক্ত সাহেব মসজিদের জন্য টাকার সংস্থান করতেন।
দেশ বিভাগের পূর্বে উনি সিলেট মিউনিসিপালিটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তৎকালীন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সিলেটের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, সিলেটের অক্টয় আন্দোলন ও কবে-নিষ্কর আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
তার মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকায় রিপোর্ট অনুযায়ী কয়েকশত বৎসর পূর্বে আফগানিস্তান থেকে আগত সম্রাট শের-শাহের বংশের জনৈক সামরিক অফিসার সিলেটের কাজীটুলায় বসতি স্থাপন করেন। হাজী মোবারক বক্ত ছিলেন তাদেরই বংশধর।
তিনি অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন, এমন কোন মসজিদ মাদ্রাসা নাই যেখানে তার সাহায্য পৌঁছায়নি, এমনকি চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও দোহাজারী মাদ্রাসায়ও তার সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।
১৯৭৬ সালের দিকে পুত্র জহির বক্তের পাঠানো একটি নতুন কার কাস্টম থেকে ছাড়াবার জন্য হাজী মোবারক বক্ত সাহেব চট্টগ্রাম গেলে আমার বাসায় উঠলেন । গাড়ী চট্টগ্রাম পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় উনার অবস্থান কিছু প্রলম্বিত হয়। আজ আসবে, কাল আসবে করে সপ্তাহ দুই দেরী হওয়ায় এই কটা দিন আমি উনার অতি নিকট সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। বক্ত সাহেব এমনি বিবেকবান লোক ছিলেন যে আমার ঝামেলা বাড়বে মনে করে আমাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন যে বাসায় খেতে বললে উনি আমার বাসা ছেড়ে দেবেন।
সকালেই নামাজ থেকে অনেক মুসল্লি উনাকে ঘিরে রাখতো। কিন্তু ওদের নাস্তা করাতে পারিনি একদিনের জন্য। উনি স্থানীয় এক হোটেল ওয়ালাকে দিয়ে সব ব্যবস্থা করিয়ে নিতেন। সামান্য ক’দিনে উনি যেন বেশ কজন মুসল্লির মুর্শিদ হয়ে পড়েছিলেন। এমনি ব্যতিক্রমধর্মী পুণ্যবান ছিলেন তিনি। উনার বৈচিত্র্যময় জীবনের অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ করে কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। মহান আল্লাহ তার দ্বীনদরদী আত্মাকে শান্তি দান করুন।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT