জুয়েল
চিঠিটায় আমার কোনো স্বস্তি হয়নি, হাতের লেখাটা পরিচিত লাগে না। লীলা বলে, মা, ভাইয়া অনেক দিন ধরে লেখে না। তাই এমন অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়তো লিখে দিয়েছে, বোঝো না কী সময়! কিন্তু আমাকে টলাতে পারে না। আমার ছেলের হাতের লেখা আমি চিনি। যেমন সে ভালো ছাত্র তেমনি অপূর্ব তার হাতের লেখা। এ লেখা তার নয়; হতে পারে না।
আমার উল বোনার মেশিন এখন প্রায় অলস। গত বছরের কিছু কাজ পড়ে ছিল। সেগুলোই একটু একটু করে করি, আবার ফেলে রাখি। কখনও নতুন নতুন ডিজাইন বানাই, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। আবার খুলে নতুন ডিজাইন তৈরি করি...এসব চলে। আগে নতুন ডিজাইন তৈরি করে মেয়েকে কিংবা আবুল হোসেনকে দেখাতাম। এখন দেখাতে ভালো লাগে না।
আবুল হোসেনকে আমি দোষ দিই না। ছেলের চিন্তায় অস্থির। সে সব সময় বলতে চায়, ছেলেটা নাকি আমার মতো স্বাধীন আর একটু ত্যাড়া। বিয়ের পর আমি রজঃস্বলা হয়েছি: কাপড় সে-ই বেঁধে নিতে শিখিয়েছে। তাহলে ত্যাড়া হওয়ার হাত থেকে সে কেন রক্ষা করল না! সে আজও বিশ্বাস করে, ছেলে আমায় অন্তত বলে গেছে। আজকাল আমি এসব অভিযোগ গিলে ফেলা শিখেছি। শীতল চোখে তাকিয়ে থেকে বলতে শিখেছি, কী যে বলেন! তারপর দুর্দান্ত অভিমান বুকে জমিয়ে রেখে মমতাজের মাকে শেখাই একভাগা পুঁটি ইচ্ছে করলে কতদিন খাওয়া যায়, ডাল কত পাতলা রান্না করেও মজা করা যায় জিরা-রসুন ফোড়নে! আর যুদ্ধের বাজারে কম খরচ করে একটা লোককে কিছুটা স্বস্তিও দেওয়া যায়। আর নিজেকে নির্বিকার জীবনের পাঠ দিতে উঠেপড়ে লাগি, কাজ হয় না।
নিজেকে বোঝাই- মানিকের দেওয়া চিঠিটা আসলে মানিকেরই লেখা। চিঠি আনতে ভুলে গেছে বলে বাড়িতে এসে নিজেই লিখেছে! খারাপ কিছু হলে অন্য কিছু বলত, কিংবা দেখাই করত না!
আজকাল চাবিটা দিতে আসলে তপন সাহেব একটু বেশিই হাসে, তারপর বলে, ছেলের খবর পেলেন! আমি সবাইকে যেমন বলি, ছেলের ঠিক খবর পাইনি, কার একটা চিঠি...। তপন সাহেবকে তা বলি না। বলি, হ্যাঁ, ছেলে ভালো আছে, পাক সেনাদের সাথে খুব লড়াই করছে। সে তখনও হাসিটা মুখে অমলিন রাখে, চাবিটা হাতে দিয়ে চলে যায়।
আবুল হোসেন সেদিন একটা মৃগেল মাছ এনেছে, আধা সের ওজন হবে, দরোজাটা আমিই খুলি। দেখি দুজনেই দরোজায়। তপন সাহেব চাবিটা দেব দেব করছে কিন্তু দিচ্ছে না। আবুল হোসেন ঘরে না ঢুকেই বলতে লাগল, ছোট ছোট টুকরা করবে, মানুষ তো মোটে চারজন, দুদিন চালাবে। আমি তাকে ঘরে ঢুকাতে চাই, মানে যা বলার ঘরে ঢুকেই বলতে পারে, দরোজায় কেন! সিঁড়ির ভাঙা মাথাগুলো ধুলোয় ভরা, মাথার ওপর ঝুল মরা মাকড়সাসহ কালো হয়ে ঝুলছে। সুইপার শুকরানী কতদিন আসে না! শিববাড়িতে আর কেইই বা ঝুঁকি নিয়ে থাকে যে ভোর হতেই ছুটে আসবে কাজে! তপন সাহেবের ওপর খুব রাগ হলো। আমাদের পারিবারিক এসব প্রাত্যহিক তার শুনবার দরকার কী! চাবি দিয়েই সিঁড়িতে পা রাখুক সে! আবুল হোসেন ঘরে ঢুকে গেল মাছ বুলাতে বুলাতে আর আমি চাবির জন্য অপেক্ষা করেই রইলাম। সে চাবিটা দেওয়ার সময় আজকে আর হাসি হাসি মুখ করে কিছু জানতে চাইল না।
ঘরে ঢুকে হুলস্থূল, মাছটা ঘিরেই সব। তার আশাআকাক্ষা কীভাবে আমি উপেক্ষা করতে পারি তা যেন সে বুঝতেই পারে না। যুদ্ধের বাজারেও সে দিব্যি মৃগেল মাছ কিনে এনেছে, সে কেবল আমার কথা ভেবে!
মানিকের কাছ থেকে পাওয়া চিঠিটার বয়স দেড় মাস, সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের চিঠি। ডান্ডিকার্ড বুকে ঝুলিয়ে আবুল হোসেন অফিসে চলে গেলে চিঠিটা নিয়ে বসি। জুয়েলের বাংলা খাতার সাথে হাতের লেখা মেলাই, একমাত্র ‘দেখা” শব্দের 'খ'টা মেলে; আর কিছুই না। জুয়েলের মাত্রা। খুব ঢেউ খেলানো, এখানে টানা।
অক্টোবরের শেষের দিকে একটু একটু ঠান্ডা পড়ে। আবুল হোসেন তাড়া দেয় গত বছরের কাজগুলো শেষ। করতে। কিন্তু আমি রোজ বসি আর নতুন নতুন ডিজাইন আবিষ্কার করি; মূল কাজের ধার দিয়েও হাঁটি না।
একদিন তপন সাহেব সন্ধ্যার ঠিক আগে। আমিই খুললাম। আমার পেছনে আবুল হোসেন। দেখি হাতে একটা বড় কাতলা মাছ চার-পাঁচ সের তো হবেই। আমার হাতে দিয়ে বলে, আমার বন্ধু এনেছে গ্রাম থেকে। তার বউ-বাচ্চা দেশে, সে খায় মেসে। তাই আমাকে দিয়েছে।
কথাটা অবাক করার মতো। বউ-বাচ্চা দেশে তো ঢাকায় মাছ আনবে কেন! এত বড় মাছ! আমি কিছু বলার আগেই আবুল হোসেন হাস্যমুখে বলে, কী আশ্চর্য, এত বড় মাছ! ঠিক আছে, আজ কিন্তু আপনি এখানে রাতে খাবেন। তপন সাহেব ললিত মুখ করে বলে, না না, আমায় দু'টুকরা। ভাজি করে দেবেন, আমি ভাত রেধে খেয়ে নেব। আবুল হোসেন যেন লজ্জা পেল। -ছিঃ ছিঃ আমরা থাকতে আপনি কেন ভাত রান্না করে খাবেন! আমার তো রান্নার লোক আছে মমতাজের মা সব রান্না করে দিয়ে যায়। আপনার ভাবি সেলাই-টেলাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে!
ব্যস, হয়ে গেল। তিন বেলা খেতে আসে তপন সাহেব, আমাদের একজন।
তপন সাহেব একা থাকে বিশাল বাসাটায়। বাসার আসল মালিক তরফদার সাহেব, যে কিনা বাসার সামনে ট্রেস কেটেছিল কলোনির কয়েকজনকে নিয়ে। আর সাইরেন বাজলে তিনতলা থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসত গর্ভবতী বউ সমেত। কিছুদিন হলো বউ-বাচ্চাসহ গ্রামে চলে গেছে চাকরির মায়া ছেড়ে! সাবলেট গ্রহীতা হিসেবে নয়, আসলে বাসা পাহারাদার তপন সাহেব!
আমার মাঝেমধ্যে বিরক্তি লাগে; সুযোগ পেলেই ছেলের খবর জানতে চায়, যেন এটা জানতে চাওয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। না হলে তার খুব অন্যায় হয়ে যাবে। আমি তার উপস্থিতিতে ভয়ে ভয়ে থাকি-এই বুঝি জানতে চায়- ছেলের খবর ভালো! ঢাকা শহরের ছোট ছোট প্রতিরোধ গড়ে তুলছে মুক্তিবাহিনী। সেসব খবর পাই বাইরের মানুষের কাছ থেকে, আশায় বুক বাঁধি। আবুল হোসেন কি তপন সাহেব কেন খবর রাখে না? নাকি এসব খবর রাখা বেআইনি? রাত হলে এক ধরনের আড়ষ্টতা আমাকে কাবু করে ফেলে। আবুল হোসেন রাতবিরাত, কখনও ভোরে উপগত হতে এলে মাথায় খুন চেপে যায়। আমি প্রায়ই চেষ্টা করি মেয়েদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু অর্ধেক রাতে আবুল হোসেন ধরেবেঁধে নিয়ে আসে মেয়েরা কি একটু শান্তিমতো ঘুমাবে না
মানিকের বাসায় যেতে যেতে ওদের বিরক্ত করে ফেলেছি, কিংবা কী জানি হয়তো বিরক্ত হয়নি। বাউন্ডারির ভেতর দিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের পথ, নীলক্ষেত এপাড়াওপাড়া!
বলা ভালো, তপন সাহেব এখন নিয়মিত বাজার করে দেয়, আবুল হোসেন বেজায় খুশি। কিন্তু সুযোগ পেলেই কেমন যেন একটা শ্লেষ দিয়ে আমায় কী বোঝাতে চায়! আমি বোঝার মতো অবস্থায় সব সময় থাকি না, কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করি। তপন সাহেবের খাওয়ার সুবাদে বেশ দু'বেলা ভালোমন্দ চলছে, তাতে আমার স্বস্তিই বলা চলে।
কিন্তু তপন সাহেবের প্রতি আমার ভালো লাগাটা একটা নিদারুণ প্রহসনে রূপ নেয়! কেমন একটা ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়! ভয়টা আমার ছেলে সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে। আমি তার মধ্যে আবিষ্কার করি সে আমার ছেলের যুদ্ধে যাওয়াটা পছন্দ করছে না। সোজাসুজি নয়, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ো। আবুল হোসেনের সাথে প্রায়ই সঙ্গত দেয়-তাই তো আবুল হোসেন সাহেব, জুয়েলের মতো ছেলে, জুয়েল সে। তাকে কেন যুদ্ধে যেতে হবে? ওর মতো ছেলের দরকার আছে না দেশের, দেশ গঠনে! চাষাভুষারা যাক। কী মূল্য আছে তাদের জীবনের! আবুল হোসেন গাড়লের মতো সায় দেয় বড় মাছের মুড়োয় কবজি ডুবিয়ে খেতে খেতে কুৎসিত দৃশ্য!
এখন প্রতি রাতে লড়াই চলে, ধর্ষকের ভূমিকায় চলে যেতে চায় সে, কিন্তু আমার চিৎকারে নিরস্ত হয়। প্রতি রাতে একই ঘটনা। বড় মেয়ে কি টের পায়, জানি না! একদিন বলেই ফেলে, রাতবিরাতে চেঁচাও কেন মা!
তারপর একদিন আবুল হোসেন বলেই ফেলে, তুমি তপন সাহেবের প্রেমে মজে আছ। আমাকে আর চাই না; তাই তো!
রাতের পর রাত একই কথা। আমি বলি, তাকে বলেন আর এ বাসায় না আসতে। তাতেও সে রাজি নয়। নোলা ডুবিয়ে খেয়ে খেয়ে নাকি আমারই খুব লোভ। সে তাকে যেতে বলতে পারবে না। আমি বলি, কাল তবে আমিই বলব। আবুল হোসেন ধমকায়- খবরদার এ কথা বললে খারাপ হবে!
তপন আমার ছেলের শত্রু। তাকে আমি ভাত বেড়ে খাওয়াই-এই যন্ত্রণা কাউকে বোঝাতে পারি না। বড় মেয়ে তো প্রথম থেকেই বিরক্ত। নাম দিয়েছে রাজাকার। বাবার লোভের কথা সে জানে, কখনও মুখোমুখি হয় না তপন সাহেবের।
তারপর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আফসার সাহেব আসেন। কী কী যেন বলেন আবুল হোসেনকে, কিছুই বুঝি না। বোঝার ক্ষমতা আমার লুপ্ত হয়েছে। একটা কথা কানের কাছে বাজতে থাকে- মানিক বলে গেছে স্বাধীনতা না নিয়ে ফিরবে না।
আর তপন সাহেব হারিয়ে গেছে। মানে সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে অথবা পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। তপন মাহমুদের ভুয়া ডান্ডিকার্ড কোনো কাজে লাগে না। কেউ জানিয়ে দিয়েছে, আসলে সে তপন সাহা; মালাউন। যুদ্ধকালীন এ পাড়ায় সাবলেট নিয়ে চাকরিটা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল, বেচারা। আমার মনে পড়ে, সে আমার মোকসেদুল মোমেনীন বইটা চেয়ে নিয়েছিল। কলেমা বল, কয় ওয়াক্ত নামাজ, অজুর ফরজ কয়টা... তারপর প্যান্ট খুলে সারা মাঠ দৌড় করিয়ে এনে শুধু একটা শব্দ, ব্যস! ননী গোপালের মতো! হায়!
প্রতিদিন ছেলের হাতের লেখা মিলাই, প্রতিদিন দেখি কত মিল 'দেখা' শব্দের ‘খ’-এর সাথে, নভেম্বর মাসটা সারাজীবন ধরে চলতে থাকে। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ। অর্ধ শতাব্দী!

 

'/> SylheterDak.com.bd
সাহিত্য

যুদ্ধ দিনের গল্প

নাসিমা আনিস প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৩-২০২০ ইং ০০:২৯:৪৩ | সংবাদটি ১৩৭ বার পঠিত
Image

আবুল হোসেন বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, শোনো, পুঁটি মাছগুলো আজকেই শেষ করে ফেলো না; কালকেও যেন চলে। আর ঘন ডাল আমি খেতে পারি না, কত বলব!
তা বটে, বাজারে মাছের দাম অনেক। ছ’আনায় কেনা এক ভাগা পুঁটিমাছ একদিনেই খেয়ে ফেলা কাজের কথা নয়। মমতাজের মাকে ডেকে বলে দিলাম অর্ধেক মাছ জ্বাল দিয়ে রাখো কালকের জন্য। জ্বাল দেওয়ার সময় একটু তেল দিও। আমার সেলাইর ক্লাস খোলা থাকলে মাঝেমধ্যে লুকিয়ে আধা সের মসুর ডাল এনে রেখে দিই কৌটায়; এ অঞ্চল তার নিবিড় তদারকির বাইরে। এ পয়সা আমার রিকশা ভাড়ার, সে-ই বেরুনোর মুখে গুনে গুনে আট আনা দেয়। নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর লেডিস ক্লাব, কী আর এমন রাস্তা! এইটুকু হাঁটলে চার আনা বেঁচে যায়। এখন তো এসব হওয়ার জো নেই- অবরুদ্ধ সব, সবাই।
মিনিট পনের পরেই দরোজায় কড়ার শব্দ; মৃদু, মোলায়েম। এই শব্দ নতুন, কয়েক দিন ধরে শুনি। আমিই দরোজা খুলি। তপন সাহেব, চাবিটা হাতে দিয়ে মৃদু হাসেন, ধীর পায়ে চলে যান। আবার বিকেলের মরা আলোয় এসে কড়া নাড়লে চেষ্টা করি আমিই খুলে দিতে, ছিটেফোটা আলো কোথাও কোথাও ঝিলমিল করে ওঠে কি! মাঝেমধ্যে হেরফের হয় অবিশ্যি। বিকেলে বেশিরভাগ সময় আবুল হোসেন বাগানে পানি দিতে যায় পাইপ দিয়ে। পাইপের কারবার, বেশ সময় লাগে তিন তলা থেকে পাইপ নামিয়ে গাছে পানি দিতে। ফেরার সময় কতগুলো ডাটা, ঢেঢ়স আর পেঁপে তুলে আনে; একই জিনিস রোজ রোজ! এখন একই মানসিক উদ্বেগ রোজ রোজ আমাদের সবার। হ্যাঁ, কখনও কখনও এক থোকা রোদ লাগা মেহেদি ফুল থাকে আবুল হোসেনের হাতে, যা কিনা একবোঝা পাইপের চাপে কু কু করে বটে! রাতে কোনভাঙা গ্লাসের পানিতে মাদকতা। বেশিরভাগ সকালে আমার উলের মেশিনটা বন্ধ করে অপেক্ষা চলে, মোলায়েম মৃদু কড়া নাড়ার। মেশিন খুলি আবুল হেসেনের জন্য, সে খুশি মনে বের হয়। ডান্ডিকার্ডটা গলায় ঝুলাতে বুলাতে বলে, বেশ মালা, তাই না! বলা হয়নি, আমার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। কলেজে পড়া বড় মেয়ে খুব কবিতা লেখে আজকাল। আর ছোট মেয়েটা নিতান্তই ছোট, ওয়ানে পড়ে, এখনও কোনো কোনো রাতে বিছানা ভিজায়। আহা! ও যে খুব ছোট! আর একমাত্র ছেলে ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষ; এপ্রিলে না বলে চলে গেছে যুদ্ধে।
অনেক অপেক্ষা প্রতীক্ষার পর পরশু একটা চিঠি পেয়েছি মানিকের হাতে পাঠানো। আফসার সাহেবের ছেলে মানিক, এক সঙ্গেই গেছে ওরা। মাত্র দু'লাইন, মা, চিন্তা করো না, আমি ভালো আছি। বাঁচলে দেখা হবে, লড়াই চলছে মা।
জুয়েল
চিঠিটায় আমার কোনো স্বস্তি হয়নি, হাতের লেখাটা পরিচিত লাগে না। লীলা বলে, মা, ভাইয়া অনেক দিন ধরে লেখে না। তাই এমন অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়তো লিখে দিয়েছে, বোঝো না কী সময়! কিন্তু আমাকে টলাতে পারে না। আমার ছেলের হাতের লেখা আমি চিনি। যেমন সে ভালো ছাত্র তেমনি অপূর্ব তার হাতের লেখা। এ লেখা তার নয়; হতে পারে না।
আমার উল বোনার মেশিন এখন প্রায় অলস। গত বছরের কিছু কাজ পড়ে ছিল। সেগুলোই একটু একটু করে করি, আবার ফেলে রাখি। কখনও নতুন নতুন ডিজাইন বানাই, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। আবার খুলে নতুন ডিজাইন তৈরি করি...এসব চলে। আগে নতুন ডিজাইন তৈরি করে মেয়েকে কিংবা আবুল হোসেনকে দেখাতাম। এখন দেখাতে ভালো লাগে না।
আবুল হোসেনকে আমি দোষ দিই না। ছেলের চিন্তায় অস্থির। সে সব সময় বলতে চায়, ছেলেটা নাকি আমার মতো স্বাধীন আর একটু ত্যাড়া। বিয়ের পর আমি রজঃস্বলা হয়েছি: কাপড় সে-ই বেঁধে নিতে শিখিয়েছে। তাহলে ত্যাড়া হওয়ার হাত থেকে সে কেন রক্ষা করল না! সে আজও বিশ্বাস করে, ছেলে আমায় অন্তত বলে গেছে। আজকাল আমি এসব অভিযোগ গিলে ফেলা শিখেছি। শীতল চোখে তাকিয়ে থেকে বলতে শিখেছি, কী যে বলেন! তারপর দুর্দান্ত অভিমান বুকে জমিয়ে রেখে মমতাজের মাকে শেখাই একভাগা পুঁটি ইচ্ছে করলে কতদিন খাওয়া যায়, ডাল কত পাতলা রান্না করেও মজা করা যায় জিরা-রসুন ফোড়নে! আর যুদ্ধের বাজারে কম খরচ করে একটা লোককে কিছুটা স্বস্তিও দেওয়া যায়। আর নিজেকে নির্বিকার জীবনের পাঠ দিতে উঠেপড়ে লাগি, কাজ হয় না।
নিজেকে বোঝাই- মানিকের দেওয়া চিঠিটা আসলে মানিকেরই লেখা। চিঠি আনতে ভুলে গেছে বলে বাড়িতে এসে নিজেই লিখেছে! খারাপ কিছু হলে অন্য কিছু বলত, কিংবা দেখাই করত না!
আজকাল চাবিটা দিতে আসলে তপন সাহেব একটু বেশিই হাসে, তারপর বলে, ছেলের খবর পেলেন! আমি সবাইকে যেমন বলি, ছেলের ঠিক খবর পাইনি, কার একটা চিঠি...। তপন সাহেবকে তা বলি না। বলি, হ্যাঁ, ছেলে ভালো আছে, পাক সেনাদের সাথে খুব লড়াই করছে। সে তখনও হাসিটা মুখে অমলিন রাখে, চাবিটা হাতে দিয়ে চলে যায়।
আবুল হোসেন সেদিন একটা মৃগেল মাছ এনেছে, আধা সের ওজন হবে, দরোজাটা আমিই খুলি। দেখি দুজনেই দরোজায়। তপন সাহেব চাবিটা দেব দেব করছে কিন্তু দিচ্ছে না। আবুল হোসেন ঘরে না ঢুকেই বলতে লাগল, ছোট ছোট টুকরা করবে, মানুষ তো মোটে চারজন, দুদিন চালাবে। আমি তাকে ঘরে ঢুকাতে চাই, মানে যা বলার ঘরে ঢুকেই বলতে পারে, দরোজায় কেন! সিঁড়ির ভাঙা মাথাগুলো ধুলোয় ভরা, মাথার ওপর ঝুল মরা মাকড়সাসহ কালো হয়ে ঝুলছে। সুইপার শুকরানী কতদিন আসে না! শিববাড়িতে আর কেইই বা ঝুঁকি নিয়ে থাকে যে ভোর হতেই ছুটে আসবে কাজে! তপন সাহেবের ওপর খুব রাগ হলো। আমাদের পারিবারিক এসব প্রাত্যহিক তার শুনবার দরকার কী! চাবি দিয়েই সিঁড়িতে পা রাখুক সে! আবুল হোসেন ঘরে ঢুকে গেল মাছ বুলাতে বুলাতে আর আমি চাবির জন্য অপেক্ষা করেই রইলাম। সে চাবিটা দেওয়ার সময় আজকে আর হাসি হাসি মুখ করে কিছু জানতে চাইল না।
ঘরে ঢুকে হুলস্থূল, মাছটা ঘিরেই সব। তার আশাআকাক্ষা কীভাবে আমি উপেক্ষা করতে পারি তা যেন সে বুঝতেই পারে না। যুদ্ধের বাজারেও সে দিব্যি মৃগেল মাছ কিনে এনেছে, সে কেবল আমার কথা ভেবে!
মানিকের কাছ থেকে পাওয়া চিঠিটার বয়স দেড় মাস, সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের চিঠি। ডান্ডিকার্ড বুকে ঝুলিয়ে আবুল হোসেন অফিসে চলে গেলে চিঠিটা নিয়ে বসি। জুয়েলের বাংলা খাতার সাথে হাতের লেখা মেলাই, একমাত্র ‘দেখা” শব্দের 'খ'টা মেলে; আর কিছুই না। জুয়েলের মাত্রা। খুব ঢেউ খেলানো, এখানে টানা।
অক্টোবরের শেষের দিকে একটু একটু ঠান্ডা পড়ে। আবুল হোসেন তাড়া দেয় গত বছরের কাজগুলো শেষ। করতে। কিন্তু আমি রোজ বসি আর নতুন নতুন ডিজাইন আবিষ্কার করি; মূল কাজের ধার দিয়েও হাঁটি না।
একদিন তপন সাহেব সন্ধ্যার ঠিক আগে। আমিই খুললাম। আমার পেছনে আবুল হোসেন। দেখি হাতে একটা বড় কাতলা মাছ চার-পাঁচ সের তো হবেই। আমার হাতে দিয়ে বলে, আমার বন্ধু এনেছে গ্রাম থেকে। তার বউ-বাচ্চা দেশে, সে খায় মেসে। তাই আমাকে দিয়েছে।
কথাটা অবাক করার মতো। বউ-বাচ্চা দেশে তো ঢাকায় মাছ আনবে কেন! এত বড় মাছ! আমি কিছু বলার আগেই আবুল হোসেন হাস্যমুখে বলে, কী আশ্চর্য, এত বড় মাছ! ঠিক আছে, আজ কিন্তু আপনি এখানে রাতে খাবেন। তপন সাহেব ললিত মুখ করে বলে, না না, আমায় দু'টুকরা। ভাজি করে দেবেন, আমি ভাত রেধে খেয়ে নেব। আবুল হোসেন যেন লজ্জা পেল। -ছিঃ ছিঃ আমরা থাকতে আপনি কেন ভাত রান্না করে খাবেন! আমার তো রান্নার লোক আছে মমতাজের মা সব রান্না করে দিয়ে যায়। আপনার ভাবি সেলাই-টেলাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে!
ব্যস, হয়ে গেল। তিন বেলা খেতে আসে তপন সাহেব, আমাদের একজন।
তপন সাহেব একা থাকে বিশাল বাসাটায়। বাসার আসল মালিক তরফদার সাহেব, যে কিনা বাসার সামনে ট্রেস কেটেছিল কলোনির কয়েকজনকে নিয়ে। আর সাইরেন বাজলে তিনতলা থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসত গর্ভবতী বউ সমেত। কিছুদিন হলো বউ-বাচ্চাসহ গ্রামে চলে গেছে চাকরির মায়া ছেড়ে! সাবলেট গ্রহীতা হিসেবে নয়, আসলে বাসা পাহারাদার তপন সাহেব!
আমার মাঝেমধ্যে বিরক্তি লাগে; সুযোগ পেলেই ছেলের খবর জানতে চায়, যেন এটা জানতে চাওয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। না হলে তার খুব অন্যায় হয়ে যাবে। আমি তার উপস্থিতিতে ভয়ে ভয়ে থাকি-এই বুঝি জানতে চায়- ছেলের খবর ভালো! ঢাকা শহরের ছোট ছোট প্রতিরোধ গড়ে তুলছে মুক্তিবাহিনী। সেসব খবর পাই বাইরের মানুষের কাছ থেকে, আশায় বুক বাঁধি। আবুল হোসেন কি তপন সাহেব কেন খবর রাখে না? নাকি এসব খবর রাখা বেআইনি? রাত হলে এক ধরনের আড়ষ্টতা আমাকে কাবু করে ফেলে। আবুল হোসেন রাতবিরাত, কখনও ভোরে উপগত হতে এলে মাথায় খুন চেপে যায়। আমি প্রায়ই চেষ্টা করি মেয়েদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু অর্ধেক রাতে আবুল হোসেন ধরেবেঁধে নিয়ে আসে মেয়েরা কি একটু শান্তিমতো ঘুমাবে না
মানিকের বাসায় যেতে যেতে ওদের বিরক্ত করে ফেলেছি, কিংবা কী জানি হয়তো বিরক্ত হয়নি। বাউন্ডারির ভেতর দিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের পথ, নীলক্ষেত এপাড়াওপাড়া!
বলা ভালো, তপন সাহেব এখন নিয়মিত বাজার করে দেয়, আবুল হোসেন বেজায় খুশি। কিন্তু সুযোগ পেলেই কেমন যেন একটা শ্লেষ দিয়ে আমায় কী বোঝাতে চায়! আমি বোঝার মতো অবস্থায় সব সময় থাকি না, কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করি। তপন সাহেবের খাওয়ার সুবাদে বেশ দু'বেলা ভালোমন্দ চলছে, তাতে আমার স্বস্তিই বলা চলে।
কিন্তু তপন সাহেবের প্রতি আমার ভালো লাগাটা একটা নিদারুণ প্রহসনে রূপ নেয়! কেমন একটা ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়! ভয়টা আমার ছেলে সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে। আমি তার মধ্যে আবিষ্কার করি সে আমার ছেলের যুদ্ধে যাওয়াটা পছন্দ করছে না। সোজাসুজি নয়, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ো। আবুল হোসেনের সাথে প্রায়ই সঙ্গত দেয়-তাই তো আবুল হোসেন সাহেব, জুয়েলের মতো ছেলে, জুয়েল সে। তাকে কেন যুদ্ধে যেতে হবে? ওর মতো ছেলের দরকার আছে না দেশের, দেশ গঠনে! চাষাভুষারা যাক। কী মূল্য আছে তাদের জীবনের! আবুল হোসেন গাড়লের মতো সায় দেয় বড় মাছের মুড়োয় কবজি ডুবিয়ে খেতে খেতে কুৎসিত দৃশ্য!
এখন প্রতি রাতে লড়াই চলে, ধর্ষকের ভূমিকায় চলে যেতে চায় সে, কিন্তু আমার চিৎকারে নিরস্ত হয়। প্রতি রাতে একই ঘটনা। বড় মেয়ে কি টের পায়, জানি না! একদিন বলেই ফেলে, রাতবিরাতে চেঁচাও কেন মা!
তারপর একদিন আবুল হোসেন বলেই ফেলে, তুমি তপন সাহেবের প্রেমে মজে আছ। আমাকে আর চাই না; তাই তো!
রাতের পর রাত একই কথা। আমি বলি, তাকে বলেন আর এ বাসায় না আসতে। তাতেও সে রাজি নয়। নোলা ডুবিয়ে খেয়ে খেয়ে নাকি আমারই খুব লোভ। সে তাকে যেতে বলতে পারবে না। আমি বলি, কাল তবে আমিই বলব। আবুল হোসেন ধমকায়- খবরদার এ কথা বললে খারাপ হবে!
তপন আমার ছেলের শত্রু। তাকে আমি ভাত বেড়ে খাওয়াই-এই যন্ত্রণা কাউকে বোঝাতে পারি না। বড় মেয়ে তো প্রথম থেকেই বিরক্ত। নাম দিয়েছে রাজাকার। বাবার লোভের কথা সে জানে, কখনও মুখোমুখি হয় না তপন সাহেবের।
তারপর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আফসার সাহেব আসেন। কী কী যেন বলেন আবুল হোসেনকে, কিছুই বুঝি না। বোঝার ক্ষমতা আমার লুপ্ত হয়েছে। একটা কথা কানের কাছে বাজতে থাকে- মানিক বলে গেছে স্বাধীনতা না নিয়ে ফিরবে না।
আর তপন সাহেব হারিয়ে গেছে। মানে সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে অথবা পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। তপন মাহমুদের ভুয়া ডান্ডিকার্ড কোনো কাজে লাগে না। কেউ জানিয়ে দিয়েছে, আসলে সে তপন সাহা; মালাউন। যুদ্ধকালীন এ পাড়ায় সাবলেট নিয়ে চাকরিটা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল, বেচারা। আমার মনে পড়ে, সে আমার মোকসেদুল মোমেনীন বইটা চেয়ে নিয়েছিল। কলেমা বল, কয় ওয়াক্ত নামাজ, অজুর ফরজ কয়টা... তারপর প্যান্ট খুলে সারা মাঠ দৌড় করিয়ে এনে শুধু একটা শব্দ, ব্যস! ননী গোপালের মতো! হায়!
প্রতিদিন ছেলের হাতের লেখা মিলাই, প্রতিদিন দেখি কত মিল 'দেখা' শব্দের ‘খ’-এর সাথে, নভেম্বর মাসটা সারাজীবন ধরে চলতে থাকে। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ। অর্ধ শতাব্দী!

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT