উপ সম্পাদকীয়

বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু

মো. আব্দুল ওদুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০২০ ইং ০০:১৪:৫১ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত
Image

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ‘জুলি ও কুরি’ শান্তি পদক প্রাপ্ত, মহান রাজনীতিবিদ, বিশ্বনেতা, বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণার মহা-নায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বাবা শেখ লুৎফুর ও মাতা সায়েরা খাতুনের সন্তান। তিনি স্থানীয় মিলন স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। ম্যাট্রিকে পাশ করার পর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। বাংলা ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ ইংরেজিতে ছাত্র থাকা অবস্থায় জেল খাটেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ছাত্রলীগ গঠনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। সদ্য জেলখানা থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে দেখা যায় যে, বঙ্গবন্ধু ৩০৫৩ দিন জেলখানায় ছিলেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিতব্য কনভেনশনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। তখন তিনি জেলে। এই কনভেনশনে আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠন করা হয়। জেলে থাকা অবস্থায় সেই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আওয়ামী লীগের ৬ দফা অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ১১ দফা দাবিনামা পেশ করে। এই ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৯৬৯- সালে এই গণঅভ্যুত্থানের সফলতার মাধ্যমে তখন শেখ মুজিবুর রহমান সহ ৩৫ জন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ৬৯ মুক্তিলাভ করেন।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সাবেক রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিরাট গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সংবর্ধনা সভায় লাখ লাখ লোক উপস্থিত হন। তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় সভা ছিল এটি। এই সংবর্ধনা সভায়ই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সভায় সভাপতি ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন থেকেই তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও দাবির মুখে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। এই সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদৃঢ় নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১৯৭১ এর ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। যার ফলে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের বিশাল জনসভা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উনার বক্তব্যে বলেন-ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যার যা কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। তিনি আর বলেন-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এবং সাথে সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে উনাকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে। কোটি কোটি বাঙালির দাবির মুখে ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাপের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। এবং ১০ জানুয়ারি লন্ডন ও ভারত হয়ে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে বলা আবশ্যক যে, দেশে ফেরার সময় ভারতে যাত্রা বিরতি করেন, এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। এই আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলে ছিলেন বাংলাদেশ থেকে ভারতের সেনা সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সাথে সাথে বলেছিলেন, আপনি যখনই বলবেন তখনই আমার দেশের সেনা সদস্যদের বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনব। পরবর্তীতে ভারতের সেনা সদস্যদেরকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম একটি বিরল ঘটনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এক বৎসরের মধ্যেই ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরকে সংবিধান দিলেন। এই সংবিধানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হল। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা ও ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষ সব নাগরিককে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও সংবিধানে লেখা হল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতিও আদায় করলেন। ১ বৎসর ৩ মাসের মধ্যে নতুন সংসদ নির্বাচন দিলেন। চরম প্রতিক্রিয়াশীল নীতির পরিবর্তন হলে বঙ্গ জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করলেন। যা বিশ্বের অত্যন্ত প্রশংসা পায়। সব রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে সমান বন্ধুত্বের বৈদেশিক নীতি ঘোষণাও বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান একটি দিক ছিল। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে ইসলামী ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয়। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকেও সরকারীকরণ করলেন। এভাবে বঙ্গবন্ধু একের পর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতে থাকলেন।
১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট সালভেদ আলেন্দের মত অবস্থা আমার হলেও আমি সা¤্রাজ্যবাদীদের নিকট মাথা নত করব না। আমার সেই সম্মেলনে উপস্থিত থেকে এই যুগান্তকারী বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই বক্তব্য থেকে কখনও সরে আসেন নাই। যার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের ভোর রাতে বন্ধুবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু হয়।
১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন। সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছেন। ১০ জানুয়ারি ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েছে উনার জন্মের ক্ষণগণনা। মুজিববর্ষে দেশে বিদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানানো হবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। পাশাপাশি বছরব্যাপী বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে বিদেশে এই উৎসব পালন করা হবে। উনার জন্মশতবার্ষিকীর গুরুত্বের সঙ্গে যোগ হবে দেশের বর্তমান উন্নয়ন ও সফল অগ্রগতির অনেকগুলো বিষয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল সুখি-সমৃদ্ধশালী বৈষম্যহীন সোনার বাংলা। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক দিক দিয়ে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সফলতাও এসেছে। এবং আরোও সফলতা আসবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের সব আয়োজন সফল করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবার বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনায় উনার শাসন আমলে প্রণীত মূল সংবিধানের পুনরুজ্জীবন ঘটানো হবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • তিস্তা ও ফারাক্কা চুক্তিই এখন জীয়ন কাঠি
  • দার্শনিক মানুষ ও বেপরোয়া মানুষ
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের অভ্যাস
  • আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ
  • হারিয়ে যাচ্ছে মিঠে পানির মাছ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT