উপ সম্পাদকীয়

স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার

মুহম্মদ সজীব প্রধান প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০২০ ইং ০০:২১:৩৯ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

বিশ্বায়নের যুগে স্মার্টফোনের ব্যবহার স্থান করে নিয়েছে দিনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকায়। সকালে নাশতার টেবিলে, অফিসে কাজের ফাঁকে, পড়ার টেবিলে বইয়ের আড়ালে, এমনকি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্মার্টফোনের ব্যবহার যেন দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি স্মার্টফোনের এই আনস্মার্ট ব্যবহার কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে একক মোবাইল সংযোগ সংখ্যা ৪৯২ কোটি; যেখানে ৫০ শতাংশ সংযোগ স্মার্টফোনে। চলতি বছর যা ৬৬ শতাংশে দাঁড়াবে। অন্য দিকে ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিসের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালে বিশ্বে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ৩৪৭ কোটি। বিশ্বে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। সেই সাথে সমহারে বাড়ছে হতাশা, কর্মবিমুখতা, মানসিক রোগ, মাদকাসক্তি।
দক্ষিণ কোরিয়ার রেডিওলজির অধ্যাপক ইয়ুং সুক এক গবেষণায় অভিমত দিয়েছেন, যেসব কিশোর-কিশোরী স্মার্টফোনে বেশি সময় কাটায় তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে; যা দেখে বুঝা যায় তাদের এ বিষয়ে আসক্তি রয়েছে। এর ফলে তাদের মাঝে হতাশা ও উদ্বেগ কাজ করে। অন্যদিকে, স্মার্টফোনে থাকা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপ, ইউটিউব এবং বিভিন্ন অনলাইন গেমস যা সহজে ব্যবহারকারীকে কাবু করতে সক্ষম।
ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁকপ্রবণতা আর বন্ধুত্ব কিশোর-কিশোরীদের এত বেশি আবেগপ্রবণ ও রোমাঞ্চিত করে, বাস্তব জগতের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ে। পাঠ্যবইয়ের সাথে যোগসূত্র ছিন্ন হতে থাকে। ফলে তারা পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত ফল নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে না। যা তাদের পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ভবিষ্যৎ জীবনকে বিভীষিকাময় করে দেয়। একসময় মাদকাসক্তির দাবানলে হারিয়ে যায়। মরীচিকা হয়ে মিছে হয়ে যায় স্মার্ট ক্যারিয়ারের ভাবনা।
বর্তমানে বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী অনলাইন গেমসে আসক্ত। তারা দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে ভার্চুয়াল জগতে। যা খেলার মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এতে তাদের মাঝে নেতৃত্বগুণ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা ও নিয়মশৃঙ্খলা লোপ পেয়ে নৈতিক ও সামাজিক জীবনযাপন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো : অনেকে আড্ডা, পার্টি কিংবা ভ্রমণে শখের বশে একাকী কিংবা প্রিয় মানুষের সাথে সেলফি তুলতে পছন্দ করে। তবে আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন এক গবেষণায় মানসিক ব্যাধির সাথে অতিরিক্ত সেলফি তোলার সম্পর্ক নিশ্চিত করেছে। গবেষকরা দাবি করছেন, অতিরিক্ত নিজের ছবি তোলার প্রবণতা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইটে দেয়ার মানসিক সমস্যাটির নাম ‘সেলফিটিস’। এর কুফল সম্পর্কে মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জিন ওবাগি বলেছেন, মোবাইল ফোনের ত্বড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণে শরীরবৃত্তীয় ক্ষতি হয়; ফলে ত্বক কুঁচকে যায় এবং চেহারা ক্রমাগত শ্রীহীন হতে থাকে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে সময় অপচয় ছাড়াও স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব। ফলে ঘুমের দফারফা হয়ে যায়। যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপ, অ্যানজাইনা, তীব্র মাথাধরাসহ দেখা দিতে পারে চোখ ও কানের নানা সমস্যা। আমেরিকান ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের নীল আলো রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মোবাইল থেকে নির্গত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ব্রেন টিউমারের সবচেয়ে বড় কারণ; যা বড়দের তুলনায় ছোটদের জন্য বেশি ক্ষতিকর। কেননা শিশুদের খুলির বাইরের অংশ বড়দের তুলনায় পাতলা হয়। রেডিয়েশনের প্রভাব তাদের মাথায় বেশি পড়ে। আর এভাবে শিশুরা চরম হুমকির মুখে; যা অদূরভবিষ্যতে জাতীয় জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। সম্প্রতি সুইডেনের একটি গবেষণায় জানা গেছে, ২০ বছরের নিচে যেসব কিশোর স্মার্টফোনে আসক্ত, তাদের ব্রেন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি। সত্যিকার অর্থে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি স্মার্টফোনের ভার্চুয়াল জগতে প্রতিনিয়ত হাজারো স্বপ্ন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার যেমন যে কারো জীবনে অভিশাপ বয়ে আনে; ঠিক তেমনি স্মার্টফোনের স্মার্ট ব্যবহার পর্যাপ্ত সুফলও দিতে পারে। তাই তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে স্মার্টফোনের স্মার্ট ব্যবহারের বিকল্প নেই।
লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT