উপ সম্পাদকীয়

কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০২০ ইং ০০:২৬:৫৯ | সংবাদটি ৩২৮ বার পঠিত
Image

সাংবাদিকতা অনেকেরই শখের পেশা। সেটা হোক প্রিন্ট অথবা ইলেকট্রনিক। আমাদের দেশের অধিকাংশ সংবাদকর্মীরাই শখের বসবতি হয়ে এই মহান পেশার সাথে জড়িত হন। তারা জানেন এই মাধ্যমে তেমন কোন আর্থিক ফ্যাসিলিটি নেই। বিশেষ করে মফস্বল শহর গুলোতে। যারা রাজধাণী অথবা বিভাগীয় শহর গুলোতে সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেন তাদের প্রসঙ্গ আলাদা। তাদের জীবনমানের সঙ্গে মফস্বল শহরে কাজ করা সংবাদকর্মীদের জীবনের তুলনা চলেনা কখনো। তার পরেও মফস্বল শহর গুলোতে শখের বশবর্তি হয়ে অনেকে সৌখিন সাংবাদিকতায় নাম লেখান। আর এই সৌখিন পেশাই কারো কারো জীবনের মূল পেশা হয়ে যায় এক সময়। তার কারণ একটাই, সেটা হচ্ছে এই পেশায রয়েছে সম্মান ও যথেষ্ট মর্যাদা। আর যে বিষয়টা রয়েছে সেটা হচ্ছে সমাজের কোন অন্যায় অসঙ্গতি অথবা সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক বিষয়সমূহ নিজের কলম দিয়ে জনসম্মুখে তুলে ধরা যায়্। তাতে সংবাদকর্মীরা একটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন। এতকিছু বিবেচনা করেই আমাদের দেশে মফস্বল শহর গুলোতে অনেকেই সাংবাদিকতা পেশাকে আকড়ে ধরে থাকেন। এমনি এক সংবাদকর্মীর নাম আরিফ আহমদ রিগান। দেশের পশ্চাদপদ এক জনপদ কুড়িগ্রাম জেলায় সাংবাদিকতার সুমহান পেশায় জড়িত তিনি। কাজ করেন বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি হিসেবে। রিগানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনিনা। মানুষ হিসেবে তারও হয়তোবা অনেক ভুল ত্রুটি রয়েছে। আর সেটা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে তাকে রাত দুটায় তার বাসার দরজা ভেঙ্গে ফিলমি স্টাইলে বাসা থেকে প্রশাসনের লোকজন তুলে এনে যে নির্যাতন আর নিষ্ঠুর আচরণ করলেন সেটা সমাজের সব বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে গেছে।
আরিফ আহমদ রিগানের অপরাধ কি ছিল সেটা সকলেই জানেন। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন সরকারি টাকা লুটপাট করে জেলার একটি পরিত্যাক্ত পুকুর বাধাই করে সেটাকে তার নিজের নামে সুলতানা সরোবর নামকরণ করেছিলেন। আর এই বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন আরিফ। যে সংবাদের শিরোনাম ছিলো ‘কুড়িগ্রামে সরকারি টাকায় সুলতানা সরেবোর’। এই সংবাদ প্রকাশের পর আরিফ আহমদ রিগানের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন সুলতানা পারভীন। প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে তিনি পরামর্শ করলেন তার অধীনস্থ মোসাহেবদের নিয়ে। মোসাহেবরা তাদের সাহেবকে খুশি করতে পারলেই পার পেয়ে যাবে হাজার অপকর্ম করে। তাই তারাও নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে আরিফ আহমদ রিগানকে ধরে এনে ইয়াবা আর গাঁজা দিয়ে কোর্ট বসিয়ে জেল জরিমানা করার পরামর্শ দিলো। আর একটি জেলার সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তি সুলতানা পারভীণ মহা খুশি হয়ে তাতে সায় দিলেন। রাত দুটায় একটি পশ্চাদপদ মফস্বল শহরে একজন নিরীহ সাংবাদিকের বাসায় অভিযান শুরু করলেন সুলতানা পারভীন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। কুড়িগ্রামের আরডিসি (পরে প্রত্যাহারকৃত) নাজিম উদ্দিন লাথি দিয়ে দরজা ভাঙলেন আরিফ আহমদ রিগানের বাসার। এত গভীর রাতে প্রশাসনের লোকজনের এই অভিযানে স্তব্ধ হত বিহব্বল হয়ে পড়লেন আরিফ এবং তার স্ত্রী সন্তান। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই নাজিম উদ্দিন তাকে কিলঘুষি মেরে টেনে হেচঁেড় বাইরে নিয়ে আসেন। গাড়িতে করে তাকে নিয়ে আসা হলো সুলতানা পারভীনের কার্যালয়ে। আর তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কোর্ট বসালেন সেখানে। নাজিম উদ্দিনরা আরিফের পকেটে পুরে দিলেন ইয়াবা আর গাঁজার পুরিয়া। আর সেই অপরাধে এক বছরের জেল দিয়ে তাৎক্ষণিক জেলে পাঠিয়ে দিলেন তাকে। পরদিন সকালে রিগানের স্ত্রীর মাধ্যমে বিষয়টি কুড়িগ্রামের সাংবাদিক সমাজসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর হয়। আর তাতেই ধ্বস নামে সুলতানা সরেবোরের। জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় বিষয়টিকে তাৎক্ষনিক ভাবে নজরে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে পরদিন সুলতানা পারভীনকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রত্যাহার করা হয় আরডিসি নাজিম উদ্দিনসহ আরো তিনজনকে যারা ডিসি সুলতানা পারভীনকে সন্তোষ্ট করতে গিয়ে অমানসিক আচরণ করেছিলেন সাংবাদিক আরিফ আহমদ রিগানের প্রতি।
সেদিন এই বিষয়টি নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে টকশো দেখলাম। যেখানে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব এবং দেশের একাধিক জেলায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারী সাবেক জেলা প্রশাসক আলী ইমাম মজুমদার এই বিষয়টিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখ জনক মন্তব্য করে বলছেন, জেলা প্রশাসক নির্বাচনে কোথাও না কোথাও ভুল হয়েছে। যে সব বিষয় দেখে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে সুলতানা পারভীনের ক্ষেত্রে এর কোন না কোনটির ঘাটতি ছিলো। তা না হলে এমন দুংখজনক ঘটনার সৃষ্টি হতোনা। এখানেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকে যায়। বর্তমানে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুনেছি জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। এ কারণে সুলতানা পারভীনরা একটি জেলার প্রধান কর্তা নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন। আর এর মাসুল দিতে হচ্ছে সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠিকে। দেশের অনেক জেলায় জেলা প্রশাসকদের নানা অনিয়ম আর অসঙ্গতি নিয়ে মফস্বল সাংবাদিকরা অনেক লেখালেখি করে থাকেন। কই কখনো তো দেখিনি কোন জেলা প্রশাসককে এভাবে ক্ষিপ্ত হতে। যেভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের চেম্বারে কোর্ট বসিয়ে একজন জাতির বিবেক বলে খ্যাত সাংবাদিককে তুলে নিয়ে জেল জরিমানা করলেন সুলতানা পারভীন। কি এক অদ্ভুত দেশের বাসিন্দা আমরা। যাই হোক, দেশের জনপ্রশাসন বিভাগ বিষয়টি যেভাবে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছেন তাতে সরকারের প্রতি গণমানুষের আস্থা আর বিশ^াস কিন্তু বেড়েছে। এই আস্থা আর বিশ^াস আরো দৃঢ় হবে যদি তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর সুলতানা পারভীনসহ তার মোসাহেবদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
লেখক : সিলেট প্রতিনিধি বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

 

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT