উপ সম্পাদকীয়

বেকারত্ব ও যুবসমাজ

মো. তাজ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০২০ ইং ০০:৫৮:৩৮ | সংবাদটি ৩৩৩ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশে যুবসমাজের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় মারাত্মক হারে বেকারত্ব বেড়েছে। আর দিন দিন মানুষের শ্রেণী পরিবর্তন হচ্ছে। শিক্ষার মান অনুযায়ী যুবসমাজ চাকুরি না পাওয়ায় তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যোগ্যতানুযায়ী সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ পূরণ করে বেকারত্ব দূরীকরণ করা জরুরি। অন্যদিকে রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াত খরচ কমিয়ে দেশের জেলায় জেলায় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গকে উদ্যোগী করে তুলতে হবে। দেশের সবকটি জেলাতে কল-কারখানা স্থাপন করতে হবে।
ইদানিং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে মেধাবী যুবসমাজ উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি চাকুরি করার সুযোগে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যার ফলে মেধা শূন্য হয়ে যাচ্ছে সমাজ এবং রাষ্ট্র। এদের মুখে একটিই বাণী ‘দেশে চাকুরি নাই’। দেশের উন্নয়নশীল শিল্প প্রতিষ্ঠানে যুবসমাজ চাকুরি পেলেও বিপরীতও ঘটছে। কিছু কলকারখানায় নিয়মিত শ্রমিক ছাটাই অব্যাহত রয়েছে। যার ফলে দেশে যুবসমাজের বেকারত্ব, আর দারিদ্র্য বহাল থাকছে। অন্যদিকে উন্নয়ন থেকে দূরে থাকছে বাংলাদেশ। কেউ কেউ বেকারত্বের যন্ত্রনা মাথায় নিয়ে যৌবনকাল হারিয়ে ফেলেছে। তাই মেধাবী যুবসমাজকে চাকুরির সুযোগ সৃষ্টি করে দেশে মেধাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সকলের দায়িত্ব। বিগত বছর একটি সংস্থা শিক্ষিত যুবসমাজকে নিয়ে এক জরিপ প্রকাশ করে বলে প্রতি বছর ১ লক্ষ ছাত্রের মধ্যে ৩৯ জন ছাত্র বেকারত্বের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
তাই এসব শিক্ষিত যুবসমাজের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রতিটি জেলায় ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তোলা ও পাশাপাশি দেশে কৃষিখাতকেও স্বাবলম্বি করে গড়ে তোলতে সরকারের আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে দেশে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি হ্রাসমূল্যে বিক্রয় ও সার বীজ প্রথমে বিনামূল্যে দিয়ে যুবসমাজকে কাজে লাগানো যেতে পারে। না হয় বেকার যুবসমাজ অর্থ উপার্জনে ব্যর্থ হলে দেশের আরও ক্ষতি হতে পারে।
দেশে চাকুরি ব্যবসা শুরু করেছে এক ধরনের অসাধু জনগোষ্ঠী। জেলায় জেলায় চাকুরির দোকান খুলে যুবসমাজকে চাকুরি দিবে বলে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কারো চাকুরি হলেও কোন ব্যক্তির চাকুরি না হওয়ায় ফেরৎ পাচ্ছে না টাকা। আর কিছু ধনাঢ্যবানদের ছেলে-মেয়ে চাকুরি পেলেও দেশের প্রকৃত মেধাবী যুবসমাজ টাকার অভাবে চাকুরি থেকে বাদ পড়ছে। কথা হলো যারা উৎকোচ দিয়ে চাকুরিতে প্রবেশ করছে তারা এক সময় ঐ টাকা জনগণের পকেট থেকে আদায় করে নিতে বাধ্য হবে। যার ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত হবে সমাজ ও রাষ্ট্র। এসব বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর নেওয়া জরুরি। দেশে স্বল্প সময়ে অনলাইন ভিত্তিক চাকুরি নিয়মিতকরণ করে মেধাবি যুবসমাজকে চাকুরির সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। না হয় দেশ থেকে মেধাবী ছাত্র বের হয়ে গেলে মেধাহীন দেশ হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। প্রতি বছর ইউরোপ-আমেরিকার দেশে চলে যাচ্ছে মেধাবি যুবসমাজ। এসব খবর রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। ইদানিং কিছু কিছু মেধাবী যুবক কানাডাসহ ইউরোপ-আমেরিকায় লেখাপড়া করার পাশাপাশি চাকুরি করার সুবাদে বিদেশমুখি প্রবণতা বাড়ছে। এক সময় দেশে মেধাবি যুবসমাজ খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে।
এ বেকার যুবসমাজের মধ্যে কিছু কিছু অভাবের তাড়নায় ভাল-মন্দ না খুঁজে বা সময়োপযোগী কর্মের দিকে লক্ষ্য না করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষিত যুবসমাজকে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগাতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। না হয় পৃথিবীর উন্নত দেশের সাথে তালমিলিয়ে চলা কঠিন হবে। দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও চুরি-ডাকাতি ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম আধুনিক যন্ত্রপাতির দ্বারা ঘটিত হচ্ছে। পূর্বেকার দিনে চোরেরা ঘর চুরি করতে গেলে মাটি খুড়ে ঘরে প্রবেশ করতো। ইদানিং তা আর নয়, চোরেরা ঘরে চুরি করতে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো যে, দেশে উচ্চ শিক্ষিত থেকে শুরু করে স্ব-শিক্ষিত যুবসমাজ কর্মহীন। উঠতি বয়সি যুবসমাজ সময়মত সাংসারিক জীবন পরিচালনায় টাকা উপার্জন করতে হিমসিম খেতে দেখা যাচ্ছে। আগে যুবসমাজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকলেও বেকারত্বের হার ছিল কম। সেই সময় যুবসমাজ লেখাপড়া শেষ করে চাকুরি না পেলেও পিতা ও মামার স্থলাভিষিক্ত হয়ে কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়েছিল। এই সময় একটি প্রবাদ হয়ে উঠে ‘মামা-ভাগনা যেখানে আপদ নাই সেখানে।’ বর্তমান সময়ে বেকারত্বের হার বাড়তে থাকায় মামার সংসারে টানাপোড়নে ভাগিনার খোঁজ-খবর রাখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর দেশ হতে মানবিক দিকগুলি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়।
দেশের যুবসমাজ টাকা আয়-রোজগারের উপায় খোঁজতে এখন আর কেউ কারও খবর রাখেনা। সবাই ব্যস্ত, হঠাৎ-হঠাৎ মোবাইল, ইমু, ওয়াটসএপ দ্বারা কথা চলে, এসব প্রথা ভারতসহ ইউরোপের কিছু দেশে চালু রয়েছে। বর্তমানে এসব এলাকার প্রথা বেকারত্বের কারণে দেশেও ঢুকে পড়েছে বলে মনে হয়। ইদানিং বেকারত্বের মাত্রা বাড়তে থাকায় নতুন সংসার বিবাহের পর থেকে মাতা-পিতা, ভাই-বোন হতে পৃথক থাকতে দেখা যাচ্ছে। আর এই অমানবিক কার্যক্রম থেকে শুরু হয় সাংসারিক ফিতনা। স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে নিয়মিত বিবাদ বেড়ে যাওয়ার কারণও রয়েছে, আর এসব গোপনীয় অভাব ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়, নারী, শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা। যার ফলে দেশের যুবসমাজের অস্তিত্ব ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে যুবসমাজের মান উন্নয়নের স্বার্থে যুবউন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু থাকলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবসমাজ প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মহীন হয়ে ঘরের মানুষ ঘরেই থাকতে হচ্ছে। পিতা-মাতা অত্যন্ত পরিশ্রম করে পড়া-লেখা করালেও সন্তান শিক্ষিত হয়ে চাকুরি কিংবা ব্যবসা করে সাংসারিক জীবন গঠন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিগত সময়ে দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ চাকুরি কিংবা ব্যবসার উপায়ান্তর না পেয়ে অনলাইন’র শেয়ার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে এই শেয়ার ব্যবসা তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। শেয়ারের টাকা কেউবা পিতা-মাতা হতে এনে, কেউবা জমি বিক্রি করে এনে, কেউবা স্বর্ণ বিক্রি করেও বিনিয়োগ করেছিল। প্রথমার্ধে ভাল ফলাফল হলেও পরবর্তীতে জমাকৃত ধানের নিচে ইঁদুর ও পোকার আক্রমণের মতো শেয়ার ব্যবসা লুন্ঠিত হয়। যার ফলে দেশ থেকে কত যে তাজা প্রাণ চলে গেল তা লিখে বলা সম্ভব নয়। শেয়ার ব্যবসায়ীগণ হার্ট স্ট্রোক করে পঙ্গু, কেউবা মৃত্যুর পথ বেঁচে নিয়েছে। এসব ব্যবসা দেশের মানুষের জন্য উপযুক্ত না হলে বন্ধ করা ভাল। তাই শিক্ষিত যুবসমাজকে চাকুরি দিলে দেশের উন্নয়নসহ কয়েক রকমের উপকার হতে পারে। এক সময় বৃটিশ শাসনামলে শিক্ষিত লোকের কদর ছিল বেশি, তখনকার সময় বৃটিশরা অক্ষরজ্ঞানী লোকজনকে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রাখে। আজ শিক্ষিত যুবসমাজ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিনের পর দিন পার করছে। এসব সহজ-সরল যুবসমাজকে দেশের মাটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের সমতুল্য করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে মহামারী
  • চীন-ভারত সংঘাতের আশংকা কতটুকু
  • করুণাধারায় এসো
  • করোনাকালের ঈদোৎসব
  • মহাপূণ্য ও করুণার রাত শবে-কদর
  • মাহে রামাজান: যাকাত আদায়ের উত্তম সময়
  • দারিদ্র দূরীকরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
  • চীন-আমেরিকার শীতল যুদ্ধ
  • চাই আশার বাণী
  • কোভিড-১৯:সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • Image

    Developed by:Sparkle IT