ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী

হাবিবুর রহমান চৌধুরী (সেজু) প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৩-২০২০ ইং ০১:২৮:১৭ | সংবাদটি ৪০ বার পঠিত

১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের পূর্ব বাংলার ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮২ টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনের পর হতেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী গণরায় বানচাল করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১৩ ই ফেব্রুয়ারী এক ঘোষণায় ১৯৭১ সালের ৩ রা মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের দিন ধার্য করেন। নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর না করার হীন চক্রান্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ১লা মার্চ হঠাৎ করে ৩রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। ১লা মার্চের বিকাল হতেই সমস্ত বাঙ্গালী জাতি এক চরম বিক্ষোভ এ ফেটে পড়ে। ছাত্ররা শিক্ষাঙ্গন থেকে, শ্রমিকেরা কল-কারখানা থেকে, আইনবিদগণ বের হয়ে আসলেন আদালত হতে, ব্যবসা কেন্দ্র বন্ধ হলো, এখন আর ৬ দফা কিংবা স্বাধিকার নয়, এবারের এক দফা স্বাধীনতার দাবী নিয়ে বাংলার সর্বস্তরের জনতার মিছিল রাস্তায় নেমে আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে ২ রা মার্চ ঢাকায়, ৩ রা মার্চ সারা বাংলায় পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। গগণবিদারী “জয় বাংলা”, “জয় বঙ্গবন্ধু” “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।” ধ্বনিতে বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত। চারদিকে মিছিল আর মিছিল। বাংলার ইতিহাসে এমন স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন আর দেখা যায় নাই।
ইয়াহিয়া সরকার এই গণজোয়ারকে স্তব্দ করার জন্য ২ রা ও ৩ রা মার্চ সান্ধ্য আইন জারী করলে জনতা স্বতস্ফূর্তভাবে তা ভঙ্গ করে। সরকার নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। ফলে বহু বাঙ্গালী হতাহত হয়।
১৯৭১ সালের ৩ রা মার্চ পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খুনি সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর এ ডাক যাদুর মত কাজ করে।
কল-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসাকেন্দ্র সবকিছুই বন্ধ হয়ে যায়। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী সর্বত্রই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হতে থাকে। প্রচন্ড গণবিক্ষোভের মুখে ইয়াহিয়া খান নতুন কৌশল অবলম্বন করেন এবং ৬ ই মার্চ ঘোষণা করেন যে, ২৫ শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং ১০ ই মার্চ ঢাকায় সংসদীয় দলের নেতৃসম্মেলনের ও তিনি প্রস্তাব করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুজিব এই ঘোষণার মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস লক্ষ্য করে তা নাকচ করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, “বাঙালির তাজা রক্ত মাড়িয়ে আমি কোন সম্মেলনে বসতে পারব না।” ঐ দিনেই গভর্ণর আহসানের স্থলে কুখ্যাত টিক্কা খানকে পূর্ব বাংলার গভর্ণর করে পাঠানো হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি নবনিযুক্ত গভর্ণরকে শপথবাক্য পাঠ করাতে অস্বীকার করেন।
অসহযোগ আন্দোলনের চলমান গতিধারায় সমগ্র বাঙ্গালী সত্ত্বা যখন উদ্বেলিত, ঠিক সে সময়ে আওয়ামী লীগ ৭ ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। এই ঐতিহাসিক জনসভায় লাখ লাখ মুক্তিপাগল বাঙ্গালীর সামনে উদাত্ত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু মুজিব যে ঘোষণা প্রদান করেন তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে অম্লান হয়ে থাকবে। উক্ত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমগ্র বাঙ্গালী জাতিকে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানান। বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি আরও দেব, দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশা আল্লাহ।”
উক্ত ৭ ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু মুজিব অসহযোগ আন্দোলনকে আরও বেশি জোরদার করার জন্য কতকগুলো আদেশ জারী করেন। যেমন:
(ক) সকল প্রকার অফিস আদালত বন্ধ রাখা
(খ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা
(গ) খাজনা ট্যাক্স না দেওয়া
বঙ্গবন্ধু মুজিবের ৭ ই মার্চের ভাষণ সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করে। বস্তুত ৭ ই মার্চের ভাষণই স্বাধীনতার ডাক। এই ভাষণই নয়মাস মুক্তি সংগ্রামে জনগণের মধ্যে জীবনী শক্তির ন্যায় কাজ করে।
এই সময় বঙ্গবন্ধু মুজিব কর্তৃক জারীকৃত বিধি সমূহ ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত আইনের মর্যাদা ভোগ করে। মূলত: এই ভয়াবহ সংকটে দেশ চলতে থাকে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত পথে। অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্য এত পরিষ্কার হয়ে উঠে যে, পূর্ব বাংলা হতে পাকিস্তানের শাসন উঠে যায়। পূর্ব বাংলায় বঙ্গবন্ধু মুজিবের বাণী ও নির্দেশ আইন হিসেবে প্রতিপালিত হয়। গভর্ণর হাউজের বদলে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নং বাড়ি প্রশাসনিক নির্দেশের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু হন বাংলার মুকুটবিহীন সম্রাট। পাকিস্তানী শাসন শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ থাকে সেনা ছাউনিগুলোতে।
অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে সে সময় ১৫ ই মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং ১৬ ই মার্চ হতে ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট নিরসন সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা করেন। শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানে মুজিব ছিলেন আন্তরিক। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতার ভান করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পূর্বেই পশ্চিম পাকিস্তান হতে অস্ত্র-শস্ত্র, গোলা-বারুদ এসে পৌছার পর পরই ২৫ শে মার্চের রাতে কাউকে না জানিয়ে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ঢাকাসহ পূর্ব বাংলায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন। তিনি পশ্চিমা শাসন কায়েম রাখতে ২৫ শে মার্চ রাতে সে বর্বর হামলা শুরুর সময় চেয়েছিলেন এই আলোচনাকে সাংবাদিক মাসকারেনহাস বিশ শতকের সবচাইতে জঘন্য প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন।
আর বঙ্গবন্ধু মুজিবের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনই সেই কাল রাত্রির পর হতে শসস্ত্র সংগ্রামে রুপান্তরিত হয় যার সার্থকতা আসে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর। এই অসহযোগ আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাঙ্গালীদের ইস্পাত কঠিন ঐক্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে জনগণের এই ঐক্য সুশৃঙ্খল আচরণ ও মনোবল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে মহাত্মাগান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ইহা যে এত বেশি শক্তিশালী হতে পারে তা স্বয়ং গান্ধীজীও ভাবতে পারেন নাই। একই শতাব্দীর অষ্টম দশকে তাই সফল করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অসহযোগ আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিতে থাকলে গান্ধীজী আন্দোলন পরিহার করেন। আর বাংলাদেশের সেই অহিংস অসহযোগই পরবর্তী পর্যায়ে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে জন্ম হয় স্বাধীনতার পুণ্যক্ষেত্র বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT