ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৩-২০২০ ইং ০১:২৮:৫৮ | সংবাদটি ৭২৩ বার পঠিত
Image

১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়টি অত্রাঞ্চল ও দেশের মানুষকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা দেখি এ অঞ্চলের খ্যাতি শতবর্ষ পূর্বে হতেই বহমান। শিক্ষায় সিলেটের গুরু সদয় দত্ত, খান বাহাদুর গজনফর আলী খান, মুরারি চাঁদ, মো.আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া, অধ্যাপক জিসি দেব, লীলা নাগ, শামসি খানম প্রমুখের খ্যাতি উপমহাদেশময়। ১৯৪৭ সালে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেট আসাম প্রদেশ হতে বেরিয়ে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হলো। নতুন দেশের নতুন প্রদেশ আমলে প্রথম দিকে দেখা গেল এই সিলেটীরাই শিক্ষা, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগসহ সর্বক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ভৌগোলিক রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ধর্মীয় ও বিদেশগামীতার কারণে ঐতিহ্যের ধারা ম্রিয়মান হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এক সময় আমরা শিক্ষায় দেশের অনগ্রসর অঞ্চলগুলো থেকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করি।
বালাগঞ্জ উপজেলায় বহু কৃতি পুরুষের জন্ম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী, বালাগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়। তিনি সিলেটের উচ্চ শিক্ষার প্রথম বিদ্যাপীঠ মুরারিচাঁদ হাই স্কুল (বর্তমানে এম.সি কলেজ) ১৮৯২ সালের ২৭ জুন স্থাপন করেছিলেন। এরইধারায় বালাগঞ্জ উপজেলার ৪নং পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী বাংলাবাজার নামক স্থানে ১ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এলাকার তৎকালীন কয়েকজন শিক্ষানুরাগী, সমাজকর্মী ব্যক্তিদের উদ্যোগে ও অগ্রণী ভূমিকায় তাঁদের ভূমি দান ও অর্থায়নে সর্বস্তরের জনগণের উৎসাহে ব্যাপক অংশ গ্রহণে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এসব মহান ব্যক্তিদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই, তবুও এলাকার মানুষ আজও তাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। বিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী যারা প্রতিষ্ঠাতা তাঁরা হচ্ছেন; পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামের রাধিকা রঞ্জন দাস, হাজী মো. সুনু মিয়া, রাজ মোহন দাস, মো. ইসরাইল আলী, প্রল্লাদ চন্দ্র দাস, সুধাংশু রঞ্জন দাস ও হিমাংশু রঞ্জন দাস। পরবর্তীতে এলাকার আরো অনেকেই বিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। তাছাড়াও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত যারা সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন, এরই মধ্যে অনেকেই পরলোকে চলে গেছেন। তাদের সকলের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত/শান্তি কামনা করছি। তাঁদের অবদানের ফলে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ এ প্রতিষ্ঠানটি অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত ১ জানুয়ারি ১৯৯০ সালে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক বিদ্যালয়টি পাঠদানের অনুমতি লাভ করে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৫২০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ৮জন শিক্ষক, শিক্ষিকা নিষ্ঠার সহিত শিক্ষা দান করছেন। বিদ্যালয়ে ১ একর ৮১ শতক নিজস্ব ভূমির উপর ৩টি ভবন রয়েছে। ২টি ভবন সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। ১টি ভবন এলাকার দানশীল ব্যক্তিদের অনুদানে নির্মিত হয়েছে। ০১ জুলাই ১৯৯৪ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত (গড়হঃযষু চধুসবহঃ ঙৎফবৎ) হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে দক্ষ, কর্মঠ পরিচালনা কমিটি এবং প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে ১ জানুয়ারি ১৯৯৩ খ্রিঃ বিদ্যালয়টি বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে।
এ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারকল্পে প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে এককালীন অনুদান প্রদান করে আজীবন দাতা সদস্য হিসেবে যাঁদের নাম স্মরণীয় হয়ে আছে তাঁরা হচ্ছেন; পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, শহরস্থ বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলা কল্যাণ সমিতির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার এ.এস.এম আনোয়ারুল ইসলাম, তেঘরিয়া গ্রামের সমাজসেবী শিক্ষানুরাগী মো. জবান উল্লাহ, পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, সমাজসেবী মো. মাহমদ হোসেন চৌধুরী, দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের কৃতি সন্তান, সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি’র প্রাক্তন সভাপতি এম.এ. হক। হরিশ্যাম গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী তরুণ সমাজকর্মী মো. নজরুল ইসলাম। যুক্তরাজ্যে প্রবাসী কমিউনিটি নেতা, শিক্ষানুরাগী তেঘরিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমান নেফুর। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, গৌরীপুর গ্রামের কৃতি সন্তান, শিক্ষাদরদী মো. রমজান আলী ১ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন এবং ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রধান শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছেন শ্রী দিলীপ রঞ্জন রায়।
এ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে যেসব মহৎ ব্যক্তিরা অবদান রেখেছেন তাঁরা হচ্ছেন; পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, আজীবন দাতা, প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি এ.এস.এম আনোয়ারুল ইসলাম (কার্যকাল ১.১.১৯৮৮-১৫.১.১৯৯৯), উপজেলা নির্বাহী অফিসার বালাগঞ্জ (কার্যকাল ১৬.১.১৯৯১-৩০.১.১৯৯১), পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, শিক্ষানুরাগী মো. মাহমদ হোসেন চৌধুরী (কার্যকাল ৩১.১.১৯৯২-২৩.৩.২০০২ খ্রি.), এডহক কমিটির সভাপতি বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (কার্যকাল ২৪.৩.২০০২-১৩.৩.২০০৫ খ্রি.) ও (১৪.৩.২০০৫-২২.৬.২০০৮ খ্রি.) হরিশ্যাম গ্রামের শিক্ষানুরাগী, সমাজকর্মী, প্রতিষ্ঠানের আজীবন দাতা মো. নজরুল ইসলাম (২৩.৬.২০০৮-৩.১১.২০১১ খ্রি.) এডহক কমিটির সভাপতি বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (৪.১১.২০১১-১৪.১.২০১৫ খ্রি.), গৌরীপুর-হরিশ্যাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হরিশ্যাম গ্রামের মৌলানা আব্দুল হামিদ (১৫.১.২০১৫-১৪.৩.২০১৭ খ্রি.), মো. নজরুল ইসলাম (১৫.৩.২০১৭-চলমান) বলা আবশ্যক, আর্থিক অনগ্রসর ও দুর্গম এ জনপদে অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে সুষ্ঠুভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা কঠিন ছিল। তারপরও এ অর্জন সম্ভব হয়েছে অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি-প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষাদরদীদের সমন্বিত প্রচেষ্ঠায়। যেখানে শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ দুর্গম এলাকা হতে নিয়মিত ক্লাসে আসতে অপারগ, যাদের অধিকাংশের অভিভাবক শিক্ষা ব্যয় বহনে অক্ষম, সেখানে আশানুরূপ ফল পাওয়া দুঃসাধ্যের। তাছাড়া বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত, সেহেতু কোন প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। তারপরও জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রশংসনীয়। এছাড়া এখনও বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা লাভের জন্য বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব চালু করা সময়ের দাবী। এস্থলে বলে রাখা ভালো, এ প্রবন্ধে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত বাদ পড়তে পারে। যার কোন তথ্যাদি আমি পাই নি, এ ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থী। অতএব, বাদ পড়া ও ভুল থাকাটা প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। পরিশেষে বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাফল্য কামনা করি। অনেক দূর এগিয়ে যাক এই বিদ্যাপীঠ, আরোহন করুক সাফল্যের শীর্ষে........।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT