'/> SylheterDak.com.bd
উপ সম্পাদকীয়

চীন-আমেরিকার শীতল যুদ্ধ

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০২০ ইং ১৩:০১:৪৫ | সংবাদটি ৪২৭ বার পঠিত
Image

করোনাভাইরাস সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশ্বের জাতিসমুহের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ ছিলো জরুরি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি,জাতিগুলো ঐক্যবদ্ধ ভাবে মহামারী সংকট মোকাবিলার জন্য সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তো দুরের কথা বরং জাতিগুলো বিভেদ, বিভক্তি ও একে অন্যের ওপর দোষারোপের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। জাতিসমুহ ক্রমেই আমেরিকা ও চীন,এদুটি বলয়ে বিভাজিত হতে চলেছে। এধরণের বিভাজন ও বিভক্তি বিশ্বব্যবস্হার জন্য বড় ধরণের বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।বৃহৎ এদু'টি রাষ্ট্র করোনাভাইরাসের উৎপত্তি ও বিস্তার নিয়ে তর্ক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে,একে,অন্যকে দোষারোপ করে চলেছে।বিশেষ করে,আমেরিকা এ ভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ি করছে।বেইজিংয়ের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের ইওং ওয়ার তাই মন্তব্য করে বলেন,ট্রাম্প প্রশাসনের করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের জন্য চীনকে দোষারোপের কঠোর বক্তব্য একটা নতুন শীতল যুদ্ধ শুরুর ঝু্ঁকি তৈরি করছে।এটা চীনা জনগণের মধ্যে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিও ক্ষুন্ন করতে পারে। অথচ বর্তমানের এই করোনাভাইরাসজনিত বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে ওঠতে আমেরিকা ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক সংহতকরণ ও রাজনৈতিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন ছিলো। চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বলে দাবি করে আসছে চীন।পক্ষান্তরে আমেরিকা এ মহামারী চীনের ল্যাবে মনুষ্য তৈরি বলে দাবি করছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো রাখঢাক না করেই করোনাভাইরাসকে"চীনাভাইরাস"বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁর পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেও এটাকে"উহানভাইরাস"হিসেবে বর্ণনা করেছেন।অন্যদিকে চীনা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এটা প্রচার করা হতে থাকে যে,করোনাভাইরাস আমেরিকান মিলিটারি জার্ম ওয়ারফেয়ার কর্মসূচির কারণেই উৎপত্তি হয়েছে। চীন,আমেরিকার মধ্যে এ ভাইরাস নিয়ে চলমান কথার যুদ্ধ ক্রমশ শীতল যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।দু'টি রাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্হাহীনতার কারণে ভাইরাসজনিত সংকট শীতল যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত কনভেনশনাল যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করার আশংকা করা হচ্ছে। যদিও এখন অবধি তীব্র উত্তেজনা সামরিক দ্বন্দ্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার কোনোও ইঈিত পাওয়া যায়নি,যদিও আমেরিকান নৌবাহিনী সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগরের একটি "নৌ পরিবহণ স্বাধীনতা"অভিযান পরিচালনা করেছিলো, এটি এমন একটা অন্জ্ঞল যেটাকে বেইজিং তার নিজস্ব ভুখন্ড হিসেবে দাবি করে থাকে।তবে আমেরিকান ঐ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চীন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আমেরিকা ও তার মিত্ররা মনে করে করোনাভাইরাস উৎপত্তির একেবারে শুরুর দিকে চীন ভাইরাস প্রসঙ্গটা বিশ্ববাসীকে জানতে দেয়নি,ইচ্ছাকৃত ভাবেই তা গোপন করেছিলো। এমনকি, এখনও আমেরিকান কর্মকর্তারা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চীনের করোনা সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা নির্ভরযোগ্য কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ও সংশয় প্রকাশ করছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন,যদি আগে থেকেই ভাইরাসের খবর জানা যেতো তবে এর বিস্তার রোধে বিশ্ববাসীর পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতো,বিশ্ববাসীকে হয়তো এত মানুষের মৃত্যু দেখতে হতো না।কিন্তু চীন সেটা গোপন করায় বিশ্ববাসী আজ বিপদগ্রস্ত হয়েছেন।তথ্য গোপনের অভিযোগ তাই চীনের প্রতি আমেরিকার। চীন কর্তৃক গোপনীয়তা অবলম্বনের কারণে চীনের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং চীনের উহানের ল্যাবেই ভাইরাসটি তৈরি বলে দাবি করছে আমেরিকা। তাই আমেরিকা ও তার মিত্ররা ভাইরাসের উৎপত্তি বিষয়ে সত্যতা যাছাইয়ের জন্য উহানের ল্যাবে তদন্তের দাবি জানিয়ে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিলো। তবে চীন সেটা আমলে নেয়নি। তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান হওয়ায় আমেরিকাকে চীনের প্রতি অসন্তুষ্ট করে তুলে এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বড় অভিযোগ তুলে বলেন,সামনের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে পরাজিত করার জন্য চীন কাজ করছে।চীনের প্রতি আমেরিকার এমনতর অভিযোগ তুলে ধরার মধ্যেই চীন,আমেরিকার সম্পর্ক যে চরম অবনতির পর্যায়ে চলে গেছে এটা সহজেই অনুমাণ করা যায়। উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক যে তলানিতে এসে ঠেকেছে এবং তা যে আর কথার যুদ্ধের মধ্যে সীমিত থাকেনি, বরং মারাত্মক মৌলিক সংকটের দিকে চলে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিঃ স্টোকস বলেছেন,চীন,আমেরিকা সম্পর্ক প্রায় ৫০-বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্হানে রয়েছে। এশিয়া গ্লোবাল ইন্সটিটিউট এট হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক চেন জিউই এ প্রসঙ্গে বলেন,তাঁর দেখা ৪০-বছরের ইতিহাসে চীন,আমেরিকার সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।এমনকি ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমিন স্কয়ারের ঘটনার পরে চীন,আমেরিকার সম্পর্কের অবনতির চেয়েও বর্তমানেের সম্পর্ক অনেক বেশি গভীরতম মন্দাবস্হায় উপনীত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মিঃ চেন। প্রকৃতপক্ষে এটা সত্য যে,করোনাভাইরাসের উৎপত্তির অনেক আগে থেকেই, বিশেষ করে ১৯৮৯ এর তিয়েনআনমিন স্কয়ারে চীনা গণতন্ত্রীপন্থী আন্দোলনকারীদের ওপর চীনা সরকারের তীব্র দমন অভিযানের পর থেকে চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতির শুরু হয়েছিলো। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগর,এশিয়া-স্প্যসিফিক ইত্যাকার ঘটনাবলি নিয়েও দেশ দু'টির সম্পর্ক তিক্ত রয়েছে। তবে বর্তমানের মহামারী বিশ্বের এদু'টি সবচেয়ে শক্তিশালী দেশদ্বয়ের মধ্যে উত্তেজনা তীব্রতর করে তুলেছে। বেইজিংয়ের দ্য লিয়ান এন একাডেমী থিন্কট্যান্কের উপপরিচালক ইউ ওয়ানলি বলেন,চীন,আমেরিকান সম্পর্ক তিয়ানআনমিন ক্র্যাকডাউনের চেয়েও নিম্নতর পর্যায়ে চলে গেছে।এছাড়া গত দু'বছর ধরে চীন,আমেরিকার মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধও বর্তমান করোনাভাইরাসজনিত সংকটকে আরো বেশি প্রকট করে তুলতে ভুমিকা রাখছে,যা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো পথ খোলা নেই। দু'টি রাষ্ট্রের এ শীতল সম্পর্কের সুযোগে চীনা বিরোধী আমেরিকান গোষ্ঠীগুলো এখন যুক্তি দেখিয়েছে যে,সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে শীতল যুদ্ধের মতো চীনকে মোকাবিলা করা আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির সাংগঠনিক নীতি হওয়া উচিত। ট্রাম্প প্রশাসনও তাই চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক সহ নানা পদক্ষেপ নেবার হুমকি দিয়ে চলেছে।তবে ট্রাম্প যদি চীনের বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপ বা অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি অনুসরণ করেন, তবে এটা নাটকীয়ভাবে অর্থনৈতিক সংকটকে আরও খারাপ করতে পারে।এটা বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারের ওপর শীতল প্রভাব ফেলবে।বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের ইওং ওয়ার এ সম্পর্কেবলেন,আমেরিকা যদি কুটনৈতিক ভাবে চীনকে আলাদা করার চেষ্টা করে তবে বেইজিং ইউরোপ, এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে আরও গভীরতম জোট গঠনের দিকে অগ্রসর হবে।ট্রাম্প প্রশাসন যদি এই বিপজ্জনক পথে হাঁটতে থাকে তবে চীন অর্থনৈতিক পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকবে।এতে করে বিশ্বব্যবস্হা আরও সংকটে পতিত হবেে। রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ ভালডাই ডিসকাশন ক্লাবের রিসার্চ ডাইরেক্টর ফয়েডর লুকিয়ানোভ বলেন,জাতিসমুহ সত্যিকার অর্থে সম্মিলিত ভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সমর্থ হয়নি, তার বদলে বিশ্ববাসী নতুন এক শীতল যুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলছে এবং এ শীতল যুদ্ধের একদিকে চীন,অন্যদিকে রয়েছে আমেরিকা। এ শীতল যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্হার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সিস্টেমের জন্য হবে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। কারণ,এটা জাতিসমুহকে একটা পক্ষে অবস্হান নিতে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।অর্থ্যাৎ, হয় চীন নতুবা আমেরিকা, এর যেকোনো একটা পক্ষে অবস্হান নিতে জাতিগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকবে উভয় দেশ।ফলে অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ সুবিধাদির প্রত্যাশায় জাতিসমুহ কোনো না কোনো শক্তির অনুগামী হতে বাধ্য হবে।যদি এসব ঘটে তবে বিশ্বশৃংখলা ভেঙ্গে পড়ার আশংকা থেকে যায়।আর এটা হবে শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্হার জন্য বড় ধরণের হুমকি। চীন ও আমেরিকা যে শীতল যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সেটা চীনা বিশেষজ্ঞরাও স্বীকার করে নিয়েছেন।যেমন চীনের স্টেট কাউন্সিলের উপদেষ্টা ও চীনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক শি ইয়েনহং এই বলে মন্তব্য করেছেন যে,চীন ও আমেরিকা সত্য সত্যই শীতল যুদ্ধের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। যদি শেষ পর্যন্ত উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ শুরু ও তীব্রতর হয়, তবে তার পরিণতি হবে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার শীতল যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ।এ শীতল যুদ্ধেরও সমাপ্তি হবে যেকোনো একটা শক্তির পতনের মধ্যদিয়ে এবং এর ফলশ্রুতিতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার) উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।আর এই শীতল যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের ক্ষমতা কেন্দ্রের স্হানান্তর প্রায় অনিবার্য বলেই মনে করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আত্মীয়তা-আত্তীকরণ দুটোকেই না বলুন
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • Image

    Developed by:Sparkle IT