উপ সম্পাদকীয়

দারিদ্র দূরীকরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৫-২০২০ ইং ১৪:১৬:৪৫ | সংবাদটি ২৬৩ বার পঠিত
Image

কোনও দেশের অর্থনৈতিক জীবনের সৃষ্ট পরিচয় পেতে হলে এর অর্থনৈতিক কাঠামোর অধ্যয়ন আবশ্যক। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা, মূলধন গঠনের হার, কৃষি ও শিল্পের অবস্থা, জাতীয় আয় ও এর বন্টন, মাথাপিছু আয় ও জনগণের জীবনযাত্রা প্রণালী প্রভৃতি থেকেই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো প্রভৃতি অনুমান করা যায়। তাছাড়া শিক্ষা, আয় ও স্বাস্থ্যসেবা এ তিনটি সূচক মোটামুটিভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে এবং সামগ্রিকভাবে এ তিনটি এক সঙ্গে মানব উন্নয়নসূচকও নির্ধরণ করে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবশক্তি রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারলে জনগণের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে ও জীবনযাত্রার মানের বিশেষ পরিবর্তন ঘটবে এতে সন্দেহ নইে। এ কথা অনস্বীকার্য, পরিবার, সমাজ তথা দেশের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে অর্থনীতি। এ অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে চলা মানে লক্ষ্যহীনভাবে চলা।
অর্থনেতিক উন্নয়নের দিক থেকে পৃথিবীর সব দেশকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। (ক) উন্নত (খ) উন্নয়নশীল এবং (গ) স্বল্পোন্নত। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশী এ স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বাস করে। স্বল্পোন্নত দেশ বলতে সে সব দেশকে বুঝায় যাদের বর্তমান মাথাপিছু আয় উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অতি নগণ্য এবং দারিদ্র প্রকট, অথচ যাদের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সর্বনিম্ন থাকে মাঝে মধ্যে এর হ্রাস-বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রতিবেদনই উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমান বিশ্বে দারিদ্র আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা একশ বিশ কোটির কাছাকাছি। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ৪৪টি দেশ ২০১০ সালের তুলনায় অধিক গরীব হয়েছে। প্রতি ঘন্টায় বর্তমান বিশ্বে ১২০০ শিশু মৃত্যুর কোলে মাথা রাখছে, এর একটাই কারণ-দারিদ্র। উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ ও বিশ্বায়নের মোড়কে বাজার অর্থনীতির ভিত্তি উন্নয়নের মূল কথা হল-জনপিছু সর্বোচ্চ উৎপাদন, সর্বাধিক কর্মসংস্থান নয়। এ হচ্ছে বিশ্বায়নের ফসল। আমাদের মত গরীব দেশ ও মানুষের কাছে বিশ্বায়ন চিরদিনই অধরা হয়ে থাকবে। তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতি বিশেষ করে বিত্তীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশ্বায়নের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারের চরিত্র ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
সে জন্যেই প্রথমে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরী তা হল দারিদ্র কাকে বলে তা যদি সঠিকভাবে নিরূপিত না হয় তবে দারিদ্রের সংজ্ঞা নিয়ে যেমন বিতর্ক থাকবে তেমনি বিতর্ক থাকবে দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীদের সংজ্ঞা নিয়েও। জাতীয় আয়ের অনুপাতে নিম্নতম আয় কাদের এবং কেন তা নিরূপিত হবে না, হতে পারেনা। জাতীয় আয়ের কত শতাংশ আয়ের ভাগীদার ওই দরিদ্র ও দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারীরা, তারও সঠিক কোনও তথ্য আজ পর্যন্ত তুলে ধরা হয়নি কোথাও। নুন্যতম মজুরিকে যদি দারিদ্র সীমায় ধরা হয় তাহলে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা কত দাঁড়াবে এ বিষয়েও নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্যের অভাবের ফলে দৃঢ় এবং বলিষ্ঠ অর্থনীতি অবশ্যই আশা করা যায় না।
বাংলাদেশের দারিদ্র অতি প্রকট। এটি অর্থ ব্যবস্থাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। চরম দারিদ্র প্রতিটি স্বল্পেন্নত দেশে চক্রের মত আবর্তনশীল। এ সব দেশে লোকের আয় কম। আয় কম হলে সঞ্চয়ও কম হয়, মূলধন গঠন কম হয় এবং মূলধন গঠন কম হলে বিনিয়োগ সম্ভব হয়না তাই আয় বৃদ্ধির আয় বৃদ্ধির সুযোগ ঘটেনা। অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের স্বল্পতাই নিদারূণ দারিদ্রের কারণ, এ নিদারুণ দারিদ্র প্রতিটি স্বল্পোন্নত দেশের একটি প্রধান সমস্যা। এ প্রসঙ্গে চৎড়ভ. জবমহবৎ ঘঁৎশংবব মন্তব্য করেছেন, ‘কোনও দেশ দরিদ্র বলেই দেশের জনসংখ্যা বিপুল অংশ দরিদ্র বলেই চিহিৃত হয়ে থাকে তাই দেশের অগণিত মানুষকে অতিশয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে জীবন-যাপন করতে হয়। এখন প্রশ্ন জাগে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে দারিদ্রের প্রবণতা বৃদ্ধির মূল কারণ কী? বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশুগুলোতে দারিদ্রের প্রবণতা বৃদ্ধির অনেক কারণের মধ্যে অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা, অধিকহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ধর্ম-বর্ণ সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ এবং এবং দারিদ্র পছন্দ করা অন্যতম। এছাড়া (*) স্বাল্পোন্নত দেশগুলোতে মাটির মালিক হওয়াকে বিশেষ মর্যাদার বিষয় বলে গণ্য করা হয়। ফলে স্বল্প ও মুনাফাহীন হলেও প্রত্যেকেই নিজের নামে এক খন্ড জমি পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। এ মোহ এবং উত্তরাধিকার আইন নামক নিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে যার কৃষি জমির বিশেষ প্রয়োজন নেই, সে ব্যক্তিও পৈতৃক সম্পত্তির অতি ক্ষুদ্রতম জমি খন্ডটুকু ভাগ করে নিতে দ্ধিধাবোধ করেনা। (*) আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৩০ শতাংশ লোক দিনে এক বেলাও আহার সংগ্রহ করতে পারে না। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ লোক দারিদ্র সীমার নিচে বাস করেন, ২০ শতাংশেরও কিছু বেশি লোক দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। দেশের উৎপাদিত খাদ্যশস্য যে সব সময়ই উদ্বৃত্ত থাকবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয় না। অভ্যন্তরীণ স্তরে এই যে অসম বন্টন তার প্রতিকারের কোনও সাদিচ্ছা যে রাষ্ট্র নেতাদের আছে এমন কোনও আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে উৎপাদিত উদ্ধৃত পণ্য গুদামে থাকবে এবং পচে নষ্ট হবে অন্যদিকে দেশের মানুষ না খেয়ে মরবে। (*) অল্প উন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যা অধিকহারে বৃদ্ধি হওয়ার মূল কারণ গরীব পিতা-মাতা ধরে নেন যে সন্তানের সংখ্যা অধিক হলে ভবিষ্যতে পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাবে। এ ধারণার বশতর্বী হয়ে তারা অধিক সন্তানের জন্ম দেন। তাছাড়া চরম দারিদ্রের দরুন হতাশাগ্রস্ত মানুষ কাম-ক্ষুধা চরিতার্থ করে সাময়িকভাবে পেটের ক্ষুধা থেকে মুক্ত থাকতে চায়। (*) অর্থনৈতিক বন্টন ব্যবস্থার বৈষম্য সামাজিক স্তরে এক বিরাট পার্থক্যের সৃষ্টি করে। এটি খুব ধীরে গতিতে কাজ করে বলে সহজে এ কারণটিকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। সরকার সব দেশেই আপন আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নিলেও সেগুলো রূপায়ণের দায়িত্ব যেসব সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত থাকে তাদের নিষ্ঠা, সততা ও কর্ম প্রচেষ্টার অভাব প্রকল্পগুলো থেকে যে সুফল লাভের আশা করা হয় সেটি লাভ করা যায় না। (*)সামাজিক শ্রেণী বিভেদ, বর্ণ ও সম্প্রদায়গত বিভেদ, কর্মে শ্রেণী বিভেদ, উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ এবং নিরক্ষরতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি করে। আমরা দেখেছি নিরক্ষরতা, জাত-পাতের বৈষম্য, সরকারি আমলা ও কর্মচারীদের দূর্নীতি, সরকার গৃহীত প্রকল্প রূপায়ণ ক্ষেত্রে পার্থক্য সৃষ্টি করে চলেছে। এর ফলে দারিদ্র মোচনে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবে কোনও স্থির পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাছাড়া এদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরক্ষরতা তাদের বঞ্চিত থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে। (*) দেশে জনপ্রতি আয় বা জিডিপি বৃদ্ধি হলেই সে দেশে দারিদ্র কমে যাবে এমনটি মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়। ইতিপূর্বে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডাঃ মোহাম্মদ ইউনুস উল্লেখ করেছিলেন, কোনও দেশে দূর্ভিক্ষের মূলে খাদ্য দ্রব্যের অভাব নয়, বন্টন বৈষম্য ও সরকারের উদাসীনতাও খাদ্য দ্রব্যের প্রাচুর্যের মধ্যে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে পারে। (*) দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার ফলে আমাদের দেশের মত স্বল্পোন্নত/ উন্নয়নশীল দেশের কৃষি উৎপাদনের পরিকাঠামোই ভেঙ্গে পড়ছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে যে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ছিল সেটিও সংকুচিত হয়ে বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেছে। এ অবস্থায় অনিবার্যভাবেই চলেছে সে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি যাদের ক্রয় ক্ষমতা বাজার দরের নীচে। ফলে অপর্যাপ্ত শস্য উৎপাদন ঘটলেও সেটি লভ্য নয় বহু কোটি মানুষের কাছে। দারিদ্র ও ক্ষুধা এখন হাত ধরাধরি করে গ্রাস করতে চলেছে মানবকুলকে। কোটি কোটি মানুষ এমন স্তরে রয়েছেন যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বলতে কিছুই নেই এবং তার কারণ দারিদ্রের বিস্তৃতি লাভ। বিশ্বের অর্থনৈতিক ধারা এমনভাবে প্রবাহিত হচ্ছে যা বিত্তশালীকে আরও বিত্তবান হতে সাহায্য করছে কিন্তু দারিদ্রে নিষ্পেষিত জনগণের সে অর্থনীতি সামান্যতম সহায়তা করছে না। খাদ্য ও পণ্য সামগ্রীর মূল্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থপূরণে নিরূপিত হচ্ছে। প্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে সব নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তার সিংহভাগই বিশেষ নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতার দাবি করে যা অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তির আয়ত্বের বাইরে। (*) বাংলাদেশে ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়েছিল দেশ গঠনের দায়িত্বে অর্থাৎ গরীব ও দরিদ্র লোকদের কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্প ক্ষেত্রে ঋণ দান করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কিন্তু বর্তমান ব্যাংক উদারীকরণ প্রক্রিয়ায় সামাজিক ও আর্থিকভাবে দায়িত্ব পালনে কতটুকু সক্ষম হয়েছে সেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন কারণে দারিদ্রের পরিমাণ ও গভীরতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে দারিদ্র দূরিকরণ প্রকল্পে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে- (*) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আয়ের সুষম বন্টন হতে পারে। কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মাথাপিছু আয় হ্রাস পাবে ফলে আয়গত বৈষম্য দেখা দিবে। সে জন্য দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী স্বল্পমূল্য বা বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া জন্ম নিয়ন্ত্রণে উন্নততর এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি প্রয়োগ করলে জনসাধারণের আগ্রহ বাড়বে। এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে হবে।
বাজার অর্থনীতিতে দারিদ্র সীমারেখা মুছে যাবে না। তাই ভূমি সংস্কার এবং গ্রামোন্নয়নের মাধ্যমে সহনশীল উন্নয়নই হল দারিদ্র মোচনের চাবিকাঠি। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অধিকাংশ মানষ গ্রামে বাস করেন এবং এ অধিকাংশ মানুষই কৃষির উপর নির্ভরশীল। ভূমি আইনের সংস্কার সাধন করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে ভূমি বন্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে আয়ের অসমতাও দূর হবে। (*) দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা যে সকল অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য ভোগ করেন সে সকল দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে এবং এ সকল দ্রব্যের সাধারণ বন্টন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। (*) অনুন্নত অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যুৎ, পানীয়জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব। ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের আয়ের বৃদ্ধি ঘটবে ও আয়গত অসমতা অনেকাংশে হ্রাস পেতে থাকবে। (*) গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র দূরীকরণের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে যদি আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি ও অন্যান্য ন্যুনতম প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হয় তা হলে দারিদ্র দূরীকরণের পথে অনেক দূর অগ্রসর হওয়া যাবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অধিকাংশ লোক দারিদ্র সীমারেখার নীচে বাস করে তাই গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন দ্রুতগামী করে দারিদ্র নির্মূলীকরণ সম্ভব। তাছাড়া স্ব-নিযুক্তি প্রকল্প কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয় বাড়াবার ব্যবস্থা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দারিদ্র সংকোচন সম্ভব। (*) শহর ও গ্রামভিত্তিক নিযুক্তির জন্য সরকারেরও নীতি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সাবলীল করতে হবে। শিল্প-কারখানা ও মূলধন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক নিয়োগও বৃদ্ধি করতে হবে। ফলে আয়ের ভৈষম্য অনেকটা হ্রাস পাবে। (*) উৎপাদন ব্যবস্থায় সরকারের একটি নির্দিষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। দ্রব্য সামগ্রীর উপর সরকারি কর বা রেহাই মূল্য পরিকল্পনা ও নীতির মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে যাতে দেশের অধিকাংশ মানুষ এর সুবিধা লাভ করতে পারেন। জনসাধারণের মঙ্গলার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে ক্ষতিও স্বীকার করতে হবে। তাই দারিদ্রের সাথে ভর্তুকি থাকা বাঞ্চনীয় আর তখনই আয়ের সুষম বন্টন সম্ভব হবে। (*) আয়ের বন্টনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মজুরিনীতি থাকতে হবে। শিল্প ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই ন্যুনতম মজুরি-নীতি ও জাতীয় মজুরি নীতির দ্বারা ঠিক করতে হবে, এতে আয়ের সুষম বন্টন হবে এবং আয়গত বৈষম্য অনেকটা হ্রাস পাবে। (*) সরকারি নীতি নির্ধারণ করে একচেটিয়া ব্যবসার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ সঠিক ও কঠোর করতে হবে। দেশের আয় কতিপয় মানুষের হাতে না গিয়ে বরং সব শ্রেণীর মানুষের হাতে যাতে যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে আয়গত অসমতা দূর হবে। (*) বিগত কোনও কোন সরকারের আমলে দরিদ্রের জন্য সরকারি কর্মসূচি নিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা হয়েছিল, এখনও হচ্ছে কিন্তু তখন বাজার উন্নত ছিল না, এখন বাজার অনেক উন্নত। সুতরাং এখন গরীব মানুষকে বাজারের জন্য তৈরী করে দেওয়াটা অনেক বেশি জরুরি।
মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদন বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ বিরাট সংখ্যক গরীব লোকের বাসভূমি ও পৃথিবীর ১৭৪টি গরিব দেশের মধ্যে এর স্থান ১৫৮ নম্বরে। এটি খুবই বেদনাদায়ক বার্তা। কাজেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র নেতাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হওয়া উচিত কৃষি ও কৃষিজীবী সম্বন্ধে যথাযথ পরিসংখ্যান নির্ণয়, দারিদ্র সীমারেখার যথাযথ সংজ্ঞা নির্ধারণ, দারিদ্রসীমায় বসবাসকারীর সংখ্যা কত তা নিরূপণের প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি দেওয়া। যদি তা না হয় তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং জাতীয়স্তরে বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াবে। সেজন্য জনপ্রতি আয় বা জিডিপি এর হিসাবের চেয়েও এখন প্রধান প্রয়োজন সে সব অঞ্চল ও শ্রেণীগুলোকে চিহ্নিত করা যেগুলো দারিদ্র কবলিত অবস্থায় রয়ে গেছে। এরপর এদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য গৃহীত কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না সেদিকে কঠোর নজরদারি করা যাতে প্রকল্প বরাদ্দ অর্থ যথার্থ ও সম্পূর্ণরূপে হিতাধিকারীদের উন্নয়ন সুনিশ্চিতকরণে ব্যয় হয়। প্রকল্প রূপায়ণের পরবর্তীস্তরে এটির ফলাফলে সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। রয়েছে পরবর্তী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সে জন্যই বিশ্বের রাষ্ট্র প্রধানদের আগাম ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে। ক্ষুধার বিরুদ্ধে তাদের প্রুতিশ্রুতিকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেছে, ক্ষুধা নিরসনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ যদি এখনও সুনিশ্চিত করা না হয় তবে দুর্ভিক্ষের কালোছায়া আরও প্রসারিত হবে এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতিকেই বাধাগ্রস্ত করে তুলবে। প্রতিকারের প্রথম স্তর হিসাবে তারা পরামর্শ দিয়েছে ক্ষুধা নিবৃত্তি ও খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা আনয়নের জন্য প্রথম প্রয়োজন বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং কৃষি ও গ্রামের উন্নয়ন ঘটানো। আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই আমাদের দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে সময়ে সময়ে দুর্ভিক্ষের কালোছায়া ঘনিয়ে উঠে। সেক্ষেত্রে খাদ্য সামগ্রীর অসম বিতরণ ব্যবস্থা যেমন দায়ী তেমনি গ্রামীণ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অভাবও সমভাবে দায়ী। অথচ দেশে গ্রামোন্নয়নে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও গ্রামগুলোর অবস্থা তারতম্য কেন ঘটছে না সে অনুসন্ধানের প্রয়োজন কেউই অনুভব করছে না। গ্রামোন্নয়নের নামে কোটি কেটি টাকা কোন কাজে ব্যয় করা হচ্ছে সেটি ন

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আত্মীয়তা-আত্তীকরণ দুটোকেই না বলুন
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • Image

    Developed by:Sparkle IT