উপ সম্পাদকীয়

মহাপূণ্য ও করুণার রাত শবে-কদর

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০২০ ইং ০০:১৩:৫৭ | সংবাদটি ২৭৩ বার পঠিত
Image

ইসলামিক চান্দ্র মাস মতে সমস্ত বছরের মধ্যে বিশেষ করুণা, ক্ষমা, বরকত ও মহাপূণ্য মাস হল পবিত্র রমজান মাস। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা সমস্ত বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও পুণ্যময়। ঐ রাতে উপাসনা করা হাজার মাস উপাসনা করার চেয়ে শ্রেয়। ঐ পুণ্যময় রাতকে পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘লাইলাতুল-কদর’ বলা হয়েছে। সাধারণ মুসলমানরা যাকে ‘শবে-কদর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পবিত্র শবে-কদরের বৈশিষ্ট্য মর্যাদা ও মাহাত্ম্য বর্ণনা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে একটি সুরা বা অধ্যায় রয়েছে যার নাম সুরা কদর। ঐ সুরায় মহান আল্লাহ বলেছেন, শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ঐ রাতে ফেরেশতা শ্রেষ্ঠ জিবরাইল একদল ফেরেশতা নিয়ে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন এবং প্রতিটি ব্যাপারে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফজর উদয় হওয়া বা প্রত্যুষ পর্যন্ত থাকে।
শবে-কদরের একটি মাত্র রাতে উপাসনা করলে এক হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের বেশি সময় এবাদত করার পূণ্যলাভ সম্ভব। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, একদা আল্লাহর রসূল হযরত মোহাম্মদ (স.) অতীত যুগের বনি ইসরাইলের জনৈক উপাসনাকারীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, ঐ ব্যক্তি এক হাজার মাস পর্যন্ত রাতে উপাসনায় রত থাকেন এবং সারাদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদে লিপ্ত থাকেন। তা শুনে নবীর সহচররা স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে রসুল আমরা তো এত দীর্ঘ জীবন লাভ করব না। তখন আল্লাহতায়ালা সূরা-কদর অবতীর্ণ করে বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদের অনুসারীদের সান্ত¡না দিলেন যে তোমাদের জীবন এত দীর্ঘ না হলেও বাধা নেই। তোমাদের জন্য একটি বিশাল দান হল শবে-কদর। যে কোনো ব্যক্তি এ রাতে উপাসনা করলে এক হাজার মাসের উপাসনার চেয়েও অধিক মর্যাদা লাভ করতে পারবে।
বছরের সমস্ত রাতের তুলনায় এ রাতের সম্মান ও মাহাত্ম্য অধিক হওয়ার জন্য এ রাতকে শবে-কদর বা লাইলাতুল কদর নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাছাড়া কদর অন্য অর্থ তক্কদির (ভাগ্য) বা আদেশ। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের জন্য অবধারিত সৃষ্টজগতের মৃত্যু, রিযেক বা আহার্য, বৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদির পরিমাণ নির্ধারিত ফেরেশতাদের কাছে সমঝিয়ে দেওয়া হয় বলে এ রাতকে লাইলাতুল-কদর বলা হয়। এ অর্থে মানুষসহ সৃষ্টজগতের বয়স, জন্ম, মৃত্যু রিজেক প্রভৃতির পরিমাণ সংক্রান্ত বিষয়াদির প্রাথমিক ফয়সালা শবে-বরাতে হয়ে থাকে এবং তার বিশদ বিবরণ শবে-কদরে লিপিবদ্ধ হয়। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, শবে-কদর রমজান মাসে নিহিত রয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে সঠিক তারিখ নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত না হওয়ায় নির্দিষ্ট তারিখ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মত রয়েছে। পবিত্র কুরআনের প্রসিদ্ধ তফসির গ্রন্থ মাজহারিতে এ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করে উপসংহারে বলা হয়েছে, অধিক যুক্তিসঙ্গত এবং নির্ভুল তথ্য মতে বলা যায় যে, শবে-কদর রমজান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে নিহিত থাকে। তবে তার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই বরং যে কোন বছর যে কোন রাতে হতে পারে। বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনা মতে, শেষ দশদিনের মধ্যে বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে কোনও রাত হবার সম্ভাবনা প্রবল।
বিজ্ঞ উলামাদের মতে, রমজানের শেষ দশদিন একুশের রাত হতে শুরু হয়। এ মতে শবে-কদর ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ রমজানের রাতের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে অনেক আউলিয়া কেরামের মতে, শবে-কদর ২৭ রমজান অর্থাৎ ২৬ রমজানের দিবাগত রাতে হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল। এজন্য সাধারণ মানুষরা ২৬ রমজানের দিবাগত রাতে আল্লাহর রসুল হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেন, শবে-কদরে ফেরেশতাদের শ্রেষ্ঠ হযরত জিবরাইল একদল ফেরেশতা নিয়ে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। পৃথিবীতে যারা দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আল্লাহর জিকির (গুণগান) এবং বিভিন্ন এবাদতে (উপাসনায়) রত থাকেন তাদের জন্য বিশেষ রহমত বা করুণা বর্ষণ করেন তারা যেন প্রত্যেক উপাসনাকারীর সঙ্গে মুছাফাহা বা করমর্দন করেন। জিবরাইলের আদেশপ্রাপ্ত হয়ে ফেরেশতারা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পানিতে, স্থলে, ঘরে-বাইরে যেখানে কোন মানুষ এবাদতে রত থাকেন, তার সঙ্গে মুছাফাহা করেন। মহাপূণ্যময় শবে-কদরের রাত অর্থাৎ ২৬ রমজানের দিন শেষে সূর্যাস্ত থেকে পরদিন ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত শবে-কদরের বৈশিষ্ট্য থাকে। ঐ রাতে জাগ্রত থেকে অধিক মাত্রায় নফল নামাজ, কুরআন পাঠ, বিভিন্ন তসবিহ, জিকির দরুদ শরিফ পাঠসহ বিভিন্ন ধরণের এবাদতে অতিবাহিত করা বাঞ্ছনীয়।
তাছাড়া ঐ রাতে কায়মনোবাক্যে ব্যথিত চিত্তে অনুতৃপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে নিজের জীবনের সমূহ পাপ কাজ থেকে তওবা করা বা ক্ষমা চাওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ঐ রাতে একটি দোয়া বিশেষভাবে করবে। এটি হল ‘হে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করো।’ অনুরূপভাবে দোজখ থেকে পরিত্রাণ লাভ এবং বেহেশত লাভের কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। তবে এ রাতে বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা অথবা মাইক যোগে কুরআন পাঠ করে অপরের এবাদতে বা নিদ্রায় ব্যাঘাত করা ইসলামসম্মত কাজ নয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক ইসলামী পদ্ধতিতে শবে-কদরের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অর্জনের ক্ষমতা দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আত্মীয়তা-আত্তীকরণ দুটোকেই না বলুন
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • Image

    Developed by:Sparkle IT