'/> SylheterDak.com.bd
উপ সম্পাদকীয়

করোনাকালের ঈদোৎসব

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০২০ ইং ০০:৪৭:১৫ | সংবাদটি ৩০২ বার পঠিত
Image

বছর ঘুরে আবারো ঈদুল ফিতর আমাদের মাঝে সমাগত। দীর্ঘ এক মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পরে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট ঈদুল ফিতরের দিনটা অত্যন্ত আনন্দঘন খুশির এক মহাউৎসবের দিন হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে যুগ-যুগান্তর থেকে। তবে এবারের ঈদুল ফিতর ভিন্নতর এক মাত্রা ও আবহে আমাদের মধ্যে হাজির হয়েছে যখন গোটা বিশ্বসম্প্রদায়কে নভেল করোনাভাইরাস নামের এক মরণঘাতি মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে বাঁচার জন্য।পৃথিবীর চতুর্দিকে চলছে মৃত্যুর আহাজারি। যদিও চিরাচরিত ভাবেই আনন্দ -বেদনা,হাসি-কান্না,সূখ-দুঃখ আর খুশীর সম্মিলনই হলো মানুষের জীবনের ধারা,তাসত্ত্বেও এবারের বেদনাবিধুর এই করোনাকাল মানব জীবনে গভীর এক অভিঘাত ও ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যা এখনো চলমান অবস্হায় মানবজীবনকে লণ্ডভণ্ড করে চলেছে, কোথায় এর পরিসমাপ্তি সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না এখন অবধি। তার মাঝেও মানুষের জীবন থেমে থাকেনি।জীবনের চলমান বাস্তবতা ও প্রক্রিয়ায় মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে চায় শত শোক আর দুঃখ-বেদনার মাঝেও। করোনাকালের এই মহাদুর্যোগেও মানুষের আনন্দ-উৎসব থেমে থাকবে এমনটা ভাবা যায় না।মানুষ তার সীমাবদ্ধ বাস্তবতায় এই ঈদুল ফিতরেও মেতে উঠবে উৎসবে-আনন্দে,জীবনকে উপভোগ করতে চাইবে নিজের মতো করে।যদিও এবারের এ উৎসব উদযাপন হবে ভিন্ন এক মাত্রায়।উৎসব-আনন্দ মানুষের জীবনকে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দিগন্ত বিস্তৃত এবং সৌন্দর্যমন্ডিত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সার্থকতা ও যথার্থতা সম্পর্কে আশাবাদী করে তোলে এবং এই আনন্দধারা প্রত্যাশী চেতনাবোধ মানুষের মনোজগৎ থেকে নিরাশাবাদী ধারণা ও দুঃখবোধ মুছে দিয়ে মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়।এই করোনাকালের ঈদ উৎসবও মানুষকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জয়যুক্ত হতে শাণিত করবে,এমনটা আশা করা যায়। উৎসব-আনন্দই মানুষকে দুঃখ-বেদনা,আর গ্লানি থেকে মুক্ত করে সজীব-সচেতন রাখে। উৎসব তাই মানুষের বেঁচে থাকার,সজীবতা নিয়ে বিকশিত হওয়ার একটি অনুষঙ্গও বটে।উৎসব তাই মানবজীবনের পথ-পরিক্রমার একটি অংশ বিশেষ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।যেখানে উৎসব,আনন্দ নেই,সেখানে প্রাণও নেই,এমনটা মনে করেন বিশেষজ্ঞজনেরা।একারণেই দুনিয়া পত্তনের সময়কাল থেকেই দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মের সাথে উৎসব-আনন্দেরও একটি যোগাযোগ রয়েছে। মানুষ তার নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনের আওতায় ধর্মীয় উৎসবাদি পালনের দ্বারা তার জীবনকে আনন্দে ভরে তোলে, জীবনকে ভোগ করে এবং এভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সার্থকতা খোঁজে পায়।একারণে সকল ধর্মের সাথে উৎসবও জুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং শত বেদনার মাঝেও মানুষ উৎসব পালন থেকে বিরত থাকেনি কখনো। পবিত্র ইসলাম ধর্মানুসারীরা প্রতিবছর দু'টি প্রধান ধর্মীয় উৎসব পালন করার মধ্যদিয়ে জীবনকে ভোগ করার সার্থকতা অনুভব করেন।এর অন্যতম একটি উৎসব ঈদুল ফিতরের উৎসবের আনন্দের ভেলায় ভেসে মানুষ খোঁজে বেড়ায় শান্তির এক জগত,-যেখানে থাকবে না কোনো দুঃখবোধ এবং গ্লানি। আনন্দের এই আতিশয্যে মানুষ ভুলে যাবার চেষ্টা করে সকল দুঃখ,বেদনা,ক্লান্তি, হতাশা আর না পাওয়ার বেদনা।তবে করোনাকালের এই ঈদোৎসবে মানুষ কী ভুলে থাকতে পারবে করোনাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা,মানুষ কী অগ্রাহ্য করতে পারবে লক্ষ লক্ষ করোনাক্রান্ত জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি থাকা মানুষগুলোকে,-এখানেই তো ঈদের আনন্দটা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে যাবে।এক মাসের সংযম সাধনার শেষে মানুষ যখন ঈদের জামাতে ময়দানে সমবেত হতে পারবে না,পারবে না প্রাণভরে প্রিয়জনদের সাথে কোলাকোলি করতে তখন কী ঈদের আনন্দ অপু্র্ণ থেকে যায় না। তাসত্ত্বেও আনন্দ আর উৎসবের ভেলায় ভেসে মানুষ অনুসন্ধান করবে তার ভবিষ্যৎ সূখ,শান্তি ও আনন্দময় জীবনধারা,-এটাই মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য।উৎসবের আনন্দগত মাত্রা বিবেচনায় ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব সর্বাধিক। ঈদুল ফিতরের উৎসবের মধ্যে যে ধরণের আনন্দধারা প্রবাহিত হয়ে থাকে,সে ধরণের আনন্দ -উচ্ছাসের ধারা অন্য কোনো উৎসবে দেখতে পাওয়া যায় না।যেমন,ঈদের পোষাক কেনার যে ধুম ঈদুল ফিতরে দেখা যায়,সেটা কিন্তু ঈদুল আজহায় দেখা যায় না।তবে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন শাটডাউনের ফলে মানুষ ঘরবন্দি,দোকানপাঠ বন্দ্ব,এবং যানবাহন চলাচল প্রায় বন্দ্ব থাকায় এবার ঈদের কেনাকাটায়ও আছে স্তবিরতা,মানুষ তার পছন্দের ঈদপোষাকও ক্রয় করতে না পারায় ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। তবুও এটা সত্য যে,ঈদুল ফিতর মানুষের জীবনে খুশি আর আনন্দের ফুল্গধারা সৃষ্টি করে সেটা অনস্বীকার্য।ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু নির্বিশেষ প্রতিটি মুসলমানই ঈদের খুশি ও আনন্দ নিজ নিজ সামর্থ্য ও অবস্হান থেকে ভোগ করার চেষ্টা করে থাকে।যদিও বর্তমানের এই করোনাকালের বেদনাবিধুর বিশ্বে সকল মুসলমানের পক্ষে যথার্থ আনন্দ সহকারে সমান উপভোগ্যে ঈদোৎসব পালন করা সম্ভব হবে না বলেই মনে হয়। করোনা সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট,মানুষে -মানুষে আর্থিক অসমতা ও বৈষম্যমুলক ব্যবস্হা,গোষ্ঠীগত বৈষম্য, অসমতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের কারণেও মানুষ ঈদোৎসব সমভাবে উপভোগ করতে পারে না। বাংলাদেশের কথাই বলি,ধনী-দরিদ্রের যে বিভাজন,অর্থনৈতিক যে অসমতা,রাজনৈতিক যে বৈরিতা তার ফলে সকলের পক্ষে সমান আনন্দে ঈদোৎসব পালন করতে পারাটা ভাবাই যায় না।কারণ,ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক মানদণ্ডে যে অক্ষমতা এবং তারতম্য রয়েছে সেদিক থেকে দেখতে গেলে বলতেই হয় যে,ধনী ও দরিদ্রের পক্ষে সমভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ একেবারেই নেই বললে চলে।কেননা,ঈদের আনন্দ ভোগ করার বিষয়টি কেবল মন-মানসিকতার মধ্যে সীমিত নয়।ঈদের আনন্দ উপভোগের সাথে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতাও জড়িত এবং এইসকল আনুষ্ঠানিকতাগুলো প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আর্থিক খরচাদি মেটানোর মতো সামর্থ্য ও সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত।ঈদোৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে সীমিত নয়,এটি কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা এবং আড়ম্বরপুর্ণ উৎসবের একটি অংশও বটে।তাই এর সাথে রয়েছে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি জড়িত।একারণে ঈদের ময়দানে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু সকল স্তরের মুসলমানরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করলেও, একে-অন্যের ভাই ভাই হলেও আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থেকে যায় এবং বৈষম্যমুলক ভেদাভেদের কারণে ঈদের ময়দানের বাইরে ঈদানন্দ ভোগের যে আনুষ্ঠানিকতা সেখানে ধনী-দরিদ্রের ঈদ আনন্দ উপভোগের মধ্যে অনেক ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।জন্ম প্রক্রিয়ায় মানুষে-মানুষে সমতা থাকলেও পৃথিবীতে আগমনের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, বৈষম্য এবং অসমতা সৃষ্টি হওয়ার কারণে যেকোনো উৎসব অনুষ্ঠান ও আয়োজনেও এর প্রভাব পড়ে।ঈদোৎসবও এর ব্যতিক্রম নয়ক।অর্থ্যা বৈষম্যমুলক ব্যবস্হায় সকল মানুষের পক্ষে ঈদের সমান আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় সত্য যে,আনন্দ উৎসব ভোগ করার বিষয়টি কিন্তু আপেক্ষিক। অর্থকড়ির সাথে আনন্দ উপভোগের প্রসঙ্গটি সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে সম্পর্কিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়ে থাকেন।আনন্দ উৎসবের বিষয়টি মনোজগতের সাথে সম্পর্কিত।দেখা গেছে,অনেক টাকাকড়ির মালিক কিন্তু উৎসব-আনন্দে দরিদ্রের চেয়েও পিছিয়ে থাকে।আসলে সকল মানুষই তার নিজ নিজ অবস্হান থেকে আনন্দ, সূখ,অবকাশ আর খুশির উৎসবগুলো গভীরতার সাথে পালন করে থাকে,যেমনটা ধনী-দরিদ্র সকল মুসলমানই শত অসমতা ও বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে যথাসাধ্য খুশির উচ্ছাসে আনন্দের ভেলায় অবগাহন করে ঈদের আনন্দ ও সৌন্দর্য গভীর পরিতৃপ্তির সাথে উপভোগ করার চেষ্টা করে থাকে।আসলে উৎসব-আনন্দ হলো মানুষের মনের অনুভূতির বিষয়।মানুষ হিসেবে সকলেই সমান এবং একই পৃথিবীর বাসিন্দা, এই অনুভূতিই জাগ্রত হয় মানুষের মনে।ফলে উৎসবের আমেজে মানুষ ভুলে যায় বৈষম্যের ভেদাভেদটি। এভাবেই,ঈদ মানুষের মধ্যে ক্ষণকালের জন্য হলেও সমতামূলক বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন তৈরি করে ধনী-দরিদ্র সকল মানুষের মধ্যে।এটিই ঈদোৎসবের তাৎপর্যময় দিক।করোনাকালের ঈদও মুসলমানদের জীবনে আনন্দের বন্যায় ভরে তোলবে তাদের জীবন,এটা আশা করা যায়।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আমাদের রাজনীতির কবি ও জাতীয় কবি
  • বেকারত্ব বর্তমান সময়ে হুমকি
  • বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিকতা
  • সমকালীন কথকতা
  • চামড়া শিল্প কি ধ্বংস হয়ে যাবে!
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • সম্ভাবনাময় যুব সমাজ : অবক্ষয় এবং উত্তরণের উপায়
  • নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে
  • কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
  • একটি খেরোখাতার বয়ান
  • পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
  • জীববৈচিত্র এবং মনুষ্য সমাজ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT