উপ সম্পাদকীয় ইনাম চৌধুরী

করুণাধারায় এসো

প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৬-২০২০ ইং ২৩:০৩:৫৮ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত
Image

ধারণামতো বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া দেশেই স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রবণতা বেশি এবং যৌক্তিক কারণও রয়েছে এটির পেছনে। গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষই দারিদ্র্য সীমার নীচে আবার বাস্তব শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারেও অনেকটা পিছিয়ে। বাস্তবধর্মী শিক্ষা বলতে স্বাস্থ্য, জীবনধারা আর আহার্য্য সম্বন্ধে খুব যে একটি স্বচ্ছ ধারণা এ সকল লোকের রয়েছে সেটি মানা যায় না। এদের রোগ-শোক থাকবেই, মৃত্যু ঝুঁকি থাকবেই আবার দায়িত্বশীল মহল এর স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যাবলী আর উন্নয়নের ফিরিস্তির কাহন থাকবেই। একটি অজ্ঞাত পরিচয় রোগের থাবায় উন্নত বিশ্ব আর অনুন্নত বিশ্ব দুটোই এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক মানদন্ডে। আজ সারাবিশ্ব আতঙ্কিত। কখন কার প্রাণ যায় আর কখন কে বা কারা রোগটি দ্বারা আক্রান্ত হয়। এমন একটি রোগ যেটি অতি সাধারণ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয় আর সমাপ্তি টানে ভয়ংকর মাত্রায়।
বিস্ময়করভাবে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি সামাজিক কার্যক্রম সমূহ পর্যন্ত বিপর্যস্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এই অজানা রোগটির কারণে। নানা বিশেষজ্ঞ নানা ধরণের নিদান বাতলে দিচ্ছেন আক্রান্ত বা আতংকিতদের উদ্দেশ্যে। বিশেষজ্ঞদের বয়ান মতে এবং তাদের যুক্তি সমূহের মূল্যায়নের বুঝা যায় তারা নিজেরাই আতংকিত অবস্থায় রয়েছেন। প্রাথমিক একটি সুরক্ষা ব্যবস্থায় হদিস দেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন বলেই তাদের মূল্যবান যুক্তি আর পরামর্শ তুলে ধরছেন জনসমক্ষে।
আমাদের দেশের প্রবাসীদের সংখ্যা প্রায় এককোটি সত্তুর লক্ষ। তারা নিয়োগকর্তাদের সুবিধা মতো ছুটি ছাঁটা পেয়ে দেশে এসে থাকেন। আমাদের সরকারও তাদেরকে নানা গালভরা বিশেষণে আখ্যায়িত করে প্রায় জামাই আদরে বরণ করে নিতে চান সবসময়। বিমানবন্দর বা অন্যান্য আগমনী কেন্দ্রে এ সকল প্রবাসীদের কাছ থেকে সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী কেড়ে নেয় পকেটে যা আছে সবকিছু আবার নিরাপত্তারক্ষী নামে যে সকল কর্মচারী রয়েছে তারা চুরি করে নেয় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত উপার্জন দ্বারা আনীত নানা ধরণের মূল্যবান মালামাল। বেশ কয়েকটি ভিডিও চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে, যে গুলিতে দেখা যায় শুধু মাটিতে সুরক্ষিত গুদামঘরেই নয় উড়ন্ত বিমানের অভ্যন্তরে মালপত্র রাখার স্থানেও এ সকল নিরাপত্তারক্ষী পোশাক পরিহিত (নির্দিষ্ট) অবস্থায় সব মালামাল চুরি করে নিচ্ছে। হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন প্রকার মূল্যবান এবং শখের জিনিসপত্র। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অবহিত হয়েছেন কিন্তু এ জাতীয় অপরাধ কর্ম নির্মূল বা প্রতিবিধানে রয়েছেন রহস্যজনকভাবে নীরব। তারা যেন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেই পছন্দ করছেন নতুবা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
আগেই উল্লেখ করেছি বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বা পরিবহন খাতটি তাদের ব্যাপ্তি আর পরিসর ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে এনেছে। দেশে এবং বিদেশে সবাইকে পারতপক্ষে আপন গৃহের বাইরে না আসার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মান্যবর ট্রুডো জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন যেটি আমি নিজেও শুনেছি। তিনি সকল শ্রেণী পেশার মানুষজনকে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবেলায় আপন গৃহকোণকে বেছে নিতে বলেছেন। তিনি নিশ্চিত করে বলেছেন-প্রতিটি নাগরিকের খাবার দাবার সহ সবকিছু নিজ নিজ আলয়ে পৌঁছে দেয়া হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। যদিও কর্মবিরতিতে আছেন তারপরেও কানাডার সকল শ্রমজীবীর নির্দিষ্ট মজুরি তাদের আপন আপন ব্যাংক হিসাবে জমা করে দেয়া হবে এমনকি বাড়ি ভাড়াটি পর্যন্ত।
আমাদের দেশটিতে সরকারি বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনেকে মন্তব্য করেছেন এটি পর্যাপ্ত নয় কিন্তু সরকার যে সচেতন আছেন সেটি নিয়ে আত্মতুষ্টি লাভ করা যায়। কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে আবার বিভিন্ন আগমনী কেন্দ্রে রোগ নির্ধারণী ব্যবস্থা সংযোজিত করা হয়েছে। আমাদের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে পর্যটকদের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসে নিরুৎসাহকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় নিশ্চয়ই অপ্রাসংগিক হবে না যদি উল্লেখ করি সেটি হলো মৌলভীবাজার জেলায় আকবর পুরে একটি বিরাট আকারের পর্যটন মোটেল রয়েছে। সেটি নিয়ে অনেক ধরণের সংস্কার, প্রচারণা আর দৃষ্টি আকর্ষণীয় ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা হয়েছিল কিন্তু ইতিবাচক কোন ফললাভ ঘটে নাই। আশা করবো এই পর্যটন কেন্দ্রটিকে স্থায়ীভাবে একটি স্যানিটোরীয়াম রূপে গড়ে তুলতে পারলে এতদঅঞ্চলে অনেক ছোঁয়াছে বা সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের পূনর্বাসিত করা যাবে রোগ নিরাময়কালীন সময়টুকুতে। মনে রাখতে হবে এটি যেমন দীর্ঘ মেয়াদী পরিচর্যার দাবি রাখে তেমনি প্রকৃতির খোলামেলা আবহে এ জাতীয় ভবনের বা স্থাপনার অবস্থিতির দাবি রাখে। আশা করবো সরকার মৌলভীবাজার জেলার আকবরপুর বা এমনতরো অন্যান্য স্থানে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশে অবস্থিত স্থাপনাসমূহ অধিগ্রহণপূর্বক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুচারু রক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
শুনতে পাই সরকার বিপথগামী তরুণদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন। বিনোদন, খেলাধূলা জাতীয় কার্যক্রমের জন্য অবারিত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমাদের সিলেট মহানগরীতেই অনেকগুলি মাঠ রয়েছে। এগুলির কোনটি হারিয়ে গেছে, কোনটি বেদখল হয়েছে আবার কোনটি ভবঘুরেদের আড্ডাস্থল বা আশ্রয় স্থলে পরিণত হয়েছে। অবশ্যই সে জাতীয় অতি পরিচিত কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মাঠগুলি উদ্ধারে তৎপর হতে হবে এখনই। সিলেট সরকারি আলীয়া মাদ্রাসা ময়দান, সিলেট পুলিশ মাঠ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সিলেট পুলিশ ময়দান সংলগ্ন একটি মনোরম দীঘি রয়েছে সেটিকে সাঁতার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এনে সংস্কার করা যেতে পারে। অনুরূপভাবে যে সকল পুকুর দীঘি কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় ভরাট করা হয়েছে সেগুলিকে অধিগ্রহণ করে ছোট আকারের হলে পার্ক আর মধ্যম বা বড় আকারের হলে খেলার মাঠ হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। পর্যাপ্ত বিনোদন বা খেলাধূলার সুযোগ সম্প্রসারণ না করে বরং সংকুচিত করার কারণে মাদকাসক্তদের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়েই চলেছে।
আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন-সিলেট অঞ্চলে আরও খেলার মাঠ তিনি স্থাপন করবেন। বিশেষত দক্ষিণ সুরমা এলাকায়। এ ব্যাপারে লক্ষণীয় সিলেট মহানগরীর সন্নিকটে দক্ষিণ সুরমা এলাকার কুচাই এর ইছরাব আলী কলেজিয়েট স্কুলটির খেলার মাঠটি অযত্নে অবহেলায় যেন নিশ্চিহ্ন হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই মাঠটিকে আরও বড় পরিসরে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত করে গড়ে তোলা কোন অসম্ভব বিষয় হবে না বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ গ্রহণে মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় সহ মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। অনুরূপভাবে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার এম.সি একাডেমীর খেলার মাঠটি রয়েছে একেবারে জীর্ণ ও করুণদশায়। এটির যেন দেখভালের কেউ নাই। এই মাঠটিকে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আধুনিক নির্মাণশৈলী ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে রূপান্তর করা যায় সহজেই। বিয়ানীবাজার পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাইস্কুল মাঠ, ঢাকাউত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের (সম্প্রসারণসহ) উন্নয়ন কর্মসাধন করলে অবশ্যই ক্রীড়া ক্ষেত্রে, বিনোদন সুবিধার ক্ষেত্রে এবং মানোন্নত শারীরিক ও মানসিক (উন্নয়ন) বিনোদন সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি নতুন মাঠ তৈরীর নামে অজস্র কৃষিজমির বিলুপ্তিও পরিহার করা যায়। আশা করি বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
নিবন্ধটি তৈরি করার সময়ই জানতে পারলাম একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছে বিশ্বব্যাপী আতংক সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসটি নাকি মানবসৃষ্ট নয়। তাহলে ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুসারে এটাকে মহান আল্লাহতায়ালা কর্তৃক আপতিত গজব হিসাবে ধরে নিতে পারি। অন্যদিকে প্রকৃতিবিদদের ধারণামতো বিষয়টিকে প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসাবেও গণ্য করা যেতে পারে। মানব কর্তৃক অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, প্রকৃতি বিরুদ্ধ কার্যকলাপ সহ ব্যাখ্যাতীত নানা গূঢ় বিষয় এটির পেছনে রয়েছে বলেই মনে হয়। মানবপ্রেম মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ধর্মীয় হানাহানিমুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত মূখ্য উদ্দেশ্য বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে। রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে কোন ধর্মীয় গোষ্ঠিকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা যেমন কোনক্রমেই কাম্য নয় তেমনি কতপুরুষ ধরে বাস করছে সেই অজুহাতে নাগরিকত্ব বাতিল জাতীয় অমানবিক ও ঘৃণ্য তৎপরতাও কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহতায়ালা সীমা লংঘনকারীকে ভালবাসেন না।
আগেকার আমলের সমাজবদ্ধতা আর পঞ্চায়েত নির্ভর জীবনধারা মানুষকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত পথে পরিচালিত করতে পারে। আমাদের সিলেট শহরতলীর কদমতলীর বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব আবার বামধারার একনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ মরহুম আব্দুল হামিদ সাহেবের ব্যক্তিত্ব উদারতা আর মূল্যবোধের কথা এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। জনাব আব্দুল হামিদ মরহুম দান খয়রাত এ ছিলেন মুক্ত হস্ত। নিজ মতাদর্শের সাথে মিল নাই কিন্তু প্রতিষ্ঠান বা কোন কর্ম অবশ্যই জনকল্যাণমুখী তিনি চোখ বুঝে সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। মরহুম আবু হেনা চৌধুরী সাহেব ছিলেন সিলেট মহানগরীর একটি বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু দানে ধ্যানে ছিলেন সর্বোচ্চ স্তরের। প্রত্যেক মানুষের বিপর্যয়ে আবু হেনা চৌধুরী ভাইয়ের উপস্থিতি ছিলো অবশ্যম্ভাবী। মানবতার জয়গান তারাই গেয়ে গিয়েছেন। তাদের অমলিন স্মৃতিকে পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করে নিষ্কলুষ জীবনের অঙ্গীকার করতে হবে সকলকে। আগর ফেরদাউস বররুয়ে জমিনস্ত।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পাখি, মশা, ভাইরাস, অতঃপর আরো কিছু!
  • বিশ্বজনসংখ্যা দিবস
  • উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • তিস্তা ও ফারাক্কা চুক্তিই এখন জীয়ন কাঠি
  • দার্শনিক মানুষ ও বেপরোয়া মানুষ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT