সম্পাদকীয় যে তোমার নিকট পরনিন্দা করে, সে নিশ্চয়ই অন্যের সাক্ষাতেও তোমার নিন্দা করবে। -আল হাদিস

জনতার কামরান

প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০২০ ইং ০৩:০৫:১২ | সংবাদটি ২২৮ বার পঠিত
Image

জনতার কামরান আজ লোকান্তরে। যদি সাদামাটাভাবে প্রকাশ করতে হয়, তবে শিরোনামটা এরকমই হবে। কিন্তু যিনি ‘জনতার’ তিনি তো সাধারণ কেউ নন; তিনি অসাধারণ। আর অসাধারণ কারও লোকান্তরিত হওয়ার, খবরটি এরকম হতে পারে না, হবার নয়। কারণ এরা লোকান্তরিত হন না, হারিয়ে যান না। এরা বেঁচে থাকেন জনতার হৃদ-গহনে। বেঁচে থাকেন চিরদিন। জনতা মানে অগণিত মানুষের সমাগম-আমজনতা। এই শব্দগুলো রাজনীতির অলংকারে অলংকৃত। আর ‘রাজার নীতি’র প্রসঙ্গটি যখন এসে যায়, তখন জনতা শব্দটির সঙ্গে আরও একটি শব্দ না বললেই নয়; তা হলো মাটি। মানে দেশ। দেশ আর জনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঠিক তেমনি জনতার অন্তরে যার বসতি তিনি তো দেশের তথা এই মাটির অতি আপনজন। এই দেশ এই মাটি এই জনতা যাদেরকে বুকের উষ্ণতায় সিক্ত করেছে, ধন্য তাদের জন্ম। তেমনি একজন কামরান, বদর উদ্দিন কামরান। তিনি জনতার কামরান।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান মারা যান সোমবার। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় আক্রান্ত কামরানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে পরিবার পরিজন আর অগণিত মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কামরান স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই সিলেটে একটি পরিচিত নাম। তখন তিনি কলেজে এইচএসসি অধ্যয়নকালেই তৎকালীন সিলেট পৌরসভার সর্বকনিষ্ট কমিশনার নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড তৈরি করেন। আর সেই থেকে শুরু হয় তাঁর জনতার কামরান হয়ে ওঠার গল্প। আর গল্পের পরবর্তী অংশে কেবলই সাফল্যের সিঁড়ি টপকানো। তিনি একাধিকবার পৌর কমিশনার, একবার পৌর চেয়ারম্যান, একবার ভারপ্রাপ্ত সিটি মেয়র এবং একবার নির্বাচিত মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থাকার এই দীর্ঘ পথচলায় কামরান একটি চমৎকার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন; যা ছিলো সকল দল ও মতের উর্ধে। আর তাইতো তিনি এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও ছিলেন বিশ্বস্ত-প্রিয়জন। যা ছিলো আমাদের রাজনীতির জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এই প্রেক্ষাপটে এমনটি বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বদর উদ্দিন কামরানের মতো যুগান্তকারী নেতৃত্বের কারণেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই জনপদে বরাবরই রাজনীতির অঙ্গনে বিরাজ করছে একটি চমৎকার সহাবস্থানের পরিবেশ। এর সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে সিটি নির্বাচনে পর পর দু’বার তিনি পরাজিত হয়েছেন যার কাছে, সেই বর্তমান মেয়রের সঙ্গে ছিলো তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। আর তার চেয়েও বড় উদাহরণ হতে পারে, করোনা-আতঙ্কে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত তাঁর জানাজায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীসহ সব শ্রেণি- পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। কামরানের এই আদর্শকে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও ছড়িয়ে দেয়া উচিত বলে দেশের বুদ্ধিজীবীগণ অভিমত দিচ্ছেন।
টুঙ্গিপাড়া নামক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেয়া একজন মুজিব একটা দেশের জন্মদাতা, একটা জাতির পিতা। সিলেটের মতো ছোট্ট একটি জেলা শহরে জন্ম নিয়ে বদর উদ্দিন কামরানও ঠাঁই করে নিয়েছেন জনতার মনে, পরিণত হয়ে ওঠেছেন জাতীয় মানের নেতৃত্বে। তাইতো তিনি দলের স্থানীয় কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির যখন যে পদেই আসীন থাকেন না কেন, তাঁর যশ খ্যাতি ছিলো সেই পদপদবীর মর্যাদার চেয়েও ওপরে। আক্ষরিক অর্থেই একজন প্রকৃত রাজনীতিকের গুণাবলী ছিলো তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। যা আমাদের রাজনীতিকদের থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিরোধীমত ও পথকে সম্মান জানানো তথা রাজনৈতিক শিষ্টাচার যেন দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গন কিংবা এর বাইরের জনসমাজে সুন্দর পথে আলোক প্রদর্শনকারী বদর উদ্দিন কামরান বড় অসময়েই চলে গেলেন। মাত্র ৬৯ কি খুব একটা বেশি সময়? মানুষ শতায়ওতো হয়। আসলে এমনই করেই বুঝি প্রিয়জনদের জীবনের গল্প অপূর্ণ থেকে যায়। কামরানের অপূর্ণ কাজগুলো করবে আগামী প্রজন্ম। আর এর মধ্যেই জনতার কামরান জনতার মধ্যে বেঁচে থাকবেন। আমরা তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT