সম্পাদকীয় তোমার বিরোধীকে উত্তর দেওয়ার আগে তাকে বুঝতে চেষ্টা করো। -ক্যানিং

‘চিকিৎসায় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’

প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৬-২০২০ ইং ০৩:১৯:৩৮ | সংবাদটি ১৬৭ বার পঠিত
Image

করোনাভাইরাস সংক্রমণে উদ্ভুত প্রেক্ষাপটে সাধারণ রোগীসহ আক্রান্তদের চিকিৎসা নিয়ে উচ্চতর আদালত একটি নির্দেশনা জারি করেন গত সপ্তাহে। কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যেই নির্দেশনাটি স্থগিত করা হয়। নির্দেশনায় যেসব বিষয় ছিলো- হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা প্রদানে অনীহায় রোগীর মৃত্যু হলে এটা ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ বলে বিবেচিত হবে; যা ‘ফৌজদারি অপরাধ’ এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে প্রদত্ত নির্দেশনা যথাযথ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে যাতে কোভিড ও নন-কোভিড সব রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু এই সব নির্দেশনাই স্থগিত করা হয়। তবে স্থগিত করা হয়নি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও জবাবদিহিমূলক ও বিস্তৃত করতে হবে এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে আইসিইউতে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় যাতে অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত ফি আদায় করা না হয়, সে ব্যাপারে মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আদালতের এই নির্দেশনা খুবই গুরুত্ববহ।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালকে নির্বাচন করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসা করা হচ্ছে না। তবে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল ছাড়া অন্যান্য হাসপাতাল-ক্লিনিকে নন-কোভিড রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করার কথা। কিন্তু অনেক সরকারি বেসরকারি হাসপাতালেই সাম্প্রতিককালে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক রোগীই চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এর প্রেক্ষিতে ইতোপূর্বে সরকারি নির্দেশনায় বলা হয় সব সরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ সন্দেহে আগত রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকেও অনুরূপ কোভিড সন্দেহে আগত রোগীদের ফেরৎ দেয়া যাবে না; প্রয়োজনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোগীর চিকিৎসার বিষয়টি সুনিশ্চিত করে রেফার করতে হবে। সরকারি এইসব নির্দেশনা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তার ব্যাপারে যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা করা জরুরি। সত্যি বলতে কি, আমাদের স্বাস্থ্যখাতে বর্তমান বাস্তবতা এই যে, শুধুমাত্র করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতেই নাজেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে যেন ননকোভিড রোগীদের কথা ভাবারই সময় নেই। তাই যা হবার তাই হচ্ছে। নানান জটিল রোগে আক্রান্তরা চিকিৎসার জন্য এখান থেকে ওখানে ঘুরছেন। সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা হচ্ছে না অনেক রোগীর। এভাবে অনেক রোগীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। যাতে বরখেলাপ হচ্ছে সরকারি নির্দেশনার।
শুধু চিকিৎসার ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সরকারের অনেক নির্দেশনাই কার্যকর হয় না। তবে সাম্প্রতিক করোনা মহামারিতে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে, বিশেষ করে চিকিৎসা সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সরকারের সব নির্দেশনা মেনে চলবেন বলেই আশা করা হচ্ছিলো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বছর কয়েক আগে তৈরি করা বেসরকারি চিকিৎসাসেবা আইনের খসড়ায় বলা হয়, চিকিৎসকের অবহেলায় কোন রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা যাবে। কিন্তু সেই আইনও বাস্তবায়ন হয়নি। সার্বিকভাবে চিকিৎসা যদি একটি সেবামূলক পেশা হয়ে থাকে, তবে সেই ‘সেবা’ প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত সময় বর্তমান সংকটকাল ছাড়া আর কী হতে পারে? তবে এক্ষেত্রে এই কথাটিও না বললেই নয়। তাহলো সাম্প্রতিক সংকটে মানবসেবার অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছেন মানবদরদী অসংখ্য চিকিৎসক। এতে অনেকের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। করোনা মোকাবেলায় এই চিকিৎসকযোদ্ধাদের ‘বীর’ উপাধিতে ভূষিত করার জন্য ইতোপূর্বে আদালত নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আদালতের এইসব নির্দেশনা কার্যকরের মাধ্যমে মানবতার সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকেরা উপযুক্ত সম্মান মর্যাদা ভোগ করবেন এবং একই সঙ্গে গোটা চিকিৎসক সমাজ এতে উজ্জীবিত হবে বলেই আমরা আশাবাদী।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT