উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষায় নব সঞ্জীবনী

মুস্তাফিজ সৈয়দ প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৬-২০২০ ইং ০৩:০০:৪৫ | সংবাদটি ৩৬৩ বার পঠিত
Image

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করার ফলে সে বিভিন্ন কিছু জানে, বুঝে এবং মানে। শিক্ষা গতিশীল সামাজিক প্রক্রিয়া। মানুষের সার্বজনীন গুণাবলির বিকাশ ও মানব সম্পদ উন্নয়নের নিরব পরিবর্তনের হাতিয়ার। সভ্যতা ও সমাজ পরিবর্তন-পরিবধর্নে বদলে যায় শিক্ষার রূপচিত্র।ব্যবিলনীয় সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতাসহ বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সভ্যতার পর্যালোচনায় আমাদের চিন্তার আধার মস্তিক ভান্ডারে একটি চিত্র পরিকল্পিত হয় তা হচ্ছে- শিক্ষার ক্রম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও উৎকৃষ্টতা। শিক্ষাধারা অতীত হতে বর্তমান পর্যন্ত পরিবর্তিত- পরিবর্ধিত হয়ে জ্ঞানের রাজ্যে অবাধ বিচরণ করছে। শিক্ষার সহজ অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি যা কিছু শেখে তাই শিক্ষা। শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি ইতিবাচক পরিবর্তনের সদু ূর পথের সঙ্গী হয়ে চলতে থাকে সুিশক্ষার আলোয়। সেই সুিশক্ষার আলোয় ব্যক্তি আলোকিত হলে, আলোকিত হয় পরিবেশ, সমাজ, দেশ এবং এই অপরূপ বিশ্বমন্ডল। মানুষের জীবনব্যাপী অজানাকে জানার কষ্টকর প্রচেষ্টার নামই শিক্ষা।
শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে পরিপূর্ণ জীবনের উপলুদ্ধির স্বাদ পাইয়ে দেয়া। শিক্ষা কার্যক্রমে মিশে আছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা উপকরণ। আজকের শিশুরা আগামীর ভবিষ্যত। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে গড়ে তোলার মাধ্যমে আমাদেরকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলবে। জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিক ফ্রয়েবল বলেন “শিশু হলো উদ্যানের চারাগাছ। শিক্ষক হলেন মালী। শিক্ষকের কাজ হলো সযতেœ চারাগাছটিকে বড় করে তোলা। শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৎ ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা শিক্ষকের কর্তব্য”। আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি সঠিকভাবে গড়ে ওঠে তাহলে আমাদের বৃহৎ লাভ। কেননা আজকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপুল সম্ভাবনা। এই বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষক এবং অভিভাবকরা যদি তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন তাহলে পরিবর্তন হবে আমাদের শিক্ষার হালচিত্র, বদলে যাবে দেশীয় ব্যবস্থা। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেন “শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস। তিনি হবেন একজন আদর্শ শাসক”। শিক্ষক তাঁর উৎকৃষ্ট আর্দশ আর শাসনে এবং দক্ষতায় শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন। শিক্ষকরাই তো সমাজ ও সভ্যতা পরিশুদ্ধির ধারক এবং বাহক। শিক্ষার্থীদের সঠিকরূপে গড়ে তুলতে পারলে গড়ে ওঠবে আমাদের আগামীর স্বপ্নমুখর রঙিন প্রজাপ্রতিগুলো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। জন ডিউই এর ভাষ্যমতে “জীবনের প্রস্তুতি নয় জীবনের পরিপূর্ণ উপলব্ধিই হলো শিক্ষা”। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষার্থীরা জীবনে পরিপূর্ণ উপলব্ধির স্বাদ খুঁজে পাচ্ছে না বরং জীবনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যে জীবনের উপলব্ধি খুঁজে না এর পেছনে বহুকারণ। এসব কারণসমূহ বিশ্লেষণ করলে ওঠে আসবে আমাদের শিক্ষায় উৎকর্ষতা অর্জিত না হওয়ার আসল কারণ।এ প্রজন্মের শিক্ষায় চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যেকোন প্রতিযোগিতা অবশ্যই ভালো তবে একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। এ সীমা কতুটুক তা জানা দরকার।
আমাদের সিংহভাগ অভিভাবক মহলে একটাই ভাবনা আমার সন্তান যেন ক্লাসে সেরা অবস্থানে থাকে, সব বিষয়ে সর্বোচ্চ মার্কস পায়। বিকেলে কোচিং ক্লাস, সন্ধ্যায় আবার গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াটা যেন মিস না হয়। এই হচ্ছে বর্তমান শিক্ষার হালচিত্র। আমাদের অভিভাবকরা যদি শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বর্হিভূত বই পড়ার জন্য সুযোগ করে দিতেন, শিল্প সাংস্কৃতিক চর্চায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন, খেলাধূলা করার সুযোগ দিতেন। সহশিক্ষাক্রমিক কার্যাবলিতে অংশগ্রহণ করতে বলতেন, কবিতা গল্প কিংবা যেকোন রচনা লিখতে বলতেন তাহলে তার মনের জাগরণ হবে। পরীক্ষার রচনার লেখার ক্ষেত্রে একটি ব্যাপার খেয়াল করবেন। গণ অওগ ওঘ খওঋঊ বা আমার জীবনের লক্ষ্য রচনার সবাই বইয়ের মধ্যে লেখা ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হবো ঐ গৎবাধা রচনাই মুখস্থ করে পরীক্ষায় লিখে রেখে দিয়ে আসে অথচ এই শিক্ষার্থীটি কখনোই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়নি, হতে চেয়েছিল একজন আর্দশ শিক্ষক।
বর্তমানের সময়টা খুব কঠিন, দিন দিন আমাদের দেশের জনসংখ্যা বেড়েই চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়লেও আমাদের দেশে মানসম্মত শিক্ষিত মানুষ তৈরি হচ্ছে না। মানসম্মত শিক্ষার অভাবে বদলে যাচ্ছে আমাদের সার্বিক চিত্র। যেখানে মানসম্মত শিক্ষা নেই সেখানে গুণগত মানবিক বিকাশ সাধন হয় না। সবাই আছে রুটি রোজগার, হালুয়া আর উদরপূর্ণ ভোজের খুঁজে। আমাদের জীবনের স্বাদ খুঁজে নিতে হবে। জীবনের মানে কি সেটাই বুঝে নেয়া প্রকৃত শিক্ষা। শিক্ষা শেষে সবাই যার যার পছন্দের ক্ষেত্রেই হোক কিংবা অপছন্দের ক্ষেত্রেই হোক জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে কর্মসংস্থানে যোগ দিতে হয়। এটি চিরন্তন সত্য তবে এর চেয়ে বেশি সত্য হলো মানবের মন মানসিকতার মুক্তিই শিক্ষা তথা প্রকৃত শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা কখনো অনুসন্ধান করে না কার কয়টা গাড়ি আছে, শহরের নামিদামি এলাকায় বিলাসবহুল বাসা বাড়ি, কয়টি প্রতিষ্ঠান আছে অথবা কয়জন মানুষ তার অধীনে কাজ করে। প্রকৃত শিক্ষা একটা ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে সবথেকে বেশি সেটি হচ্ছে মানুষের নীতি নৈতিকতা, মানবতার পরিপূর্ণ শুদ্ধিতা। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারি তাহলে আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে ঘোর আঁধার কালো রাত্রির ছোঁয়া। শিক্ষায় উৎকৃষ্টতা অর্জনে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করতে হবে এমন শিক্ষার যে শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা, মানবতাকে জাগ্রত করবে শুদ্ধিতার বুদ্ধিতায় নব সঞ্জীবনী প্রবাহরেখায় শ্যামল-কোমল চির সত্য সৌন্দর্যের খুঁজে। শিক্ষার কাজই তো মিথ্যাকে ধ্বংশ করা আর সত্যকে আবিষ্কার করা জীবনের পাঠশালায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
  • ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক মুক্তি
  • পাখি, মশা, ভাইরাস, অতঃপর আরো কিছু!
  • বিশ্বজনসংখ্যা দিবস
  • উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT