উপ সম্পাদকীয়

করোনাকালের কবিতা ‘বনি আদম’

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৬-২০২০ ইং ০৩:০১:৩০ | সংবাদটি ২৩৫ বার পঠিত
Image

১৩ শতকের একজন প্রধান ফার্সি কবি ছিলেন সাদী সিরাজি। আমাদের দেশে তিনি শেখ সাদী নামেই বেশি পরিচিত। ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ তার লিখা দুটো বিখ্যাত বই। এই দুটি রচনাই মূলত তাঁর আধা-আত্মজীবনীমূলক রচনা। আর সেই সাথে দার্শনিক ধ্যান, ব্যবহারিক জ্ঞান, হাস্যকর উপাখ্যান এবং পর্যবেক্ষণ দ্বারা পরিপূর্ণ। মার্জিত ভাষা এবং বিন্যাস ছাড়াও তার লেখাতে থাকত সমাজ ও নৈতিকতা নিয়ে গভীর চিন্তা। ‘গুলিস্তাঁ’ বইয়ে ‘বনি আদম’ বা ‘আদমের সন্তানেরা’ নামে তার একটি কবিতা আছে। কবিতাটি হচ্ছে : ‘বনি আদম আ’জায়ে এক্ দিগারান্দ/ কেদার আফেনিরাশ্ জে এক যওহারান্দ।/ চুঁ ওজব্ েবদরদ্ আওয়ারাদ্ রোজেগার,/ দির্গা, ওজবেহারা নামানাদ কারার,/ তুঁ কাজ্ মেহনতে দিগারাঁ বেগমি,/ নাশাইয়াদ কে নামাত্ নেহান্দ আদমি।’
কবিতাটির বাংলা অনুবাদ করলে যা দাড়ায় : ‘আদমের সন্তানেরা একে অপরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ,/ একই উপাদান থেকে তৈরি,/ যখন দুঃসময় একটি অঙ্গকে আঘাত করে/ অন্য অঙ্গ তখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না।/ যদি অন্যের কষ্টে তুমি ব্যথিত না হও,/ তাহলে তুমি নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয়/ দেওয়ার মত যোগ্য নও।’
কবিতাখানার লাইনগুলো একটি সুদৃশ্য কার্পেটে খোদাই করে জাতিসংঘের একটি সভাকক্ষের দেয়ালেও ঝুলানো আছে ২০০৫ সাল থেকে। ব্রিটিশ ব্যান্ড দল ‘কোল্ড প্লে’ তাদের ২০১৯ সালে প্রকাশিত গানের অ্যালবাম ‘এভরিডে লাইফ’ এ এই কবিতাখানাকে গান হিসেবে গেয়েছে। খুব সহজভাবে বলতে গেলে, কবিতাখানা মানবতার কথা বলছে। আর এই করোনাকালে, কবিতাটি যে মানবতার কথা বলছে তা আমাদের খুব দরকার।
করোনার কারণে আমরা ইদানিং বেশ কিছু শব্দ নতুন করে শুনছি। যেমনÑ‘কোয়ারেন্টাইন’, ‘আইসোলেশন’ ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ এবং ‘লকডাউন’ এই শব্দগুলো। অবশ্য করোনার কিছুদিন আগে ‘লকডাউন’ শব্দটি আমরা অনেকেই শুনেছি কাশ্মীরের কারণে। কিন্তু শেষ মেষ ‘লকডাউন’ যে আর কেবল কাশ্মীরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে তা আমরা বুঝতে পারিনি তখন। যাই হোক সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ।
এই শব্দগুলো আমাদেরকে যেটা বোঝাতে চায় তা হচ্ছে, আমাদেরকে পারিপার্শ্বিক মানুষ ও পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকটাই ‘একা’ কিছুদিন বাঁচতে হবে। শুধুই একা নিজের পারিবারিক গ-ির ভেতরে থেকে আবার কখনো সম্পূর্ণ একা হয়ে স্রেফ নিজেকে নিয়ে। আমরা অনেকটাই সেটা রপ্ত করার চেষ্টা করছি এখন। যার কারণে মানবিক স্পর্শের প্রত্যক্ষ উত্তাপ থেকে আমরা অনেকটাই দূরে।
গত কয়েক মাসের বেশি সময় ধরে বলা যায় পৃথিবীর সব দেশেই আমরা অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আড্ডা, সিনেমা হল, সভা, অনুষ্ঠান, কনফারেন্স, বিয়েশাদি, চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, দর্শনীয় স্থান, ভ্রমণ সবকিছু থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছি। হয়তো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত আছি অনেকেই। কিন্তু এই ভার্চুয়াল যোগাযোগে ও আমরা সবাই কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে বন্দি। এই সময়ে আমাদের অনেকের মনে হচ্ছে আমরা ‘একলা’ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের এরকম মনে হচ্ছে কারণ সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে আমরা বিভিন্নভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। সাদী সিরাজীর কবিতায় উল্লেখিত একে অপরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মত।
এবার অন্য প্রেক্ষিতে একটু ভাবি। আসলেই কি আমরা করোনার কারণে ‘একলা’ হয়ে যাচ্ছি? করোনা আসার আগে কতটুকুই বা ‘সবাই’ ছিলাম আমরা? একটু গভীরে চিন্তা করলেই মনে হবে, করোনা আমাদের একা করেনি। আমরা আসলে সব সময়ই কিছুটা একা। করোনার কারণে শারীরিক দূরত্বটুকুই নতুন সংযোজন মাত্র। যদিও আমরা শারীরিকভাবে একে অন্যের পাশাপাশি হয়তো ছিলাম, কিন্তু মানসিকভাবে দূরে ছিলাম অনেক। মানুষ হিসেবে আমরা অনেকেই ব্যস্ত ছিলাম পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, বিদ্বেষ আর ধনী দরিদ্রের ভেদাভেদ নিয়ে। ছিলাম হানাহানি আর লুটপাটে। ছিলাম পেশিশক্তি প্রদর্শনে, ছিলাম অন্যের ক্ষতি করে নিজের ফায়দা লুটতে। ছিলাম ধর্মভিত্তিক বিভাজনে। আমরা সামাজিক অসমতা আর আয় বৈষম্য কেবল বাড়িয়েছি। করেছি দুর্নীতি, চুরি এবং লুণ্ঠন।
করোনার আগে পৃথিবীতে সর্বশেষ বড় মহামারি ছিলো স্পেনিশ ফ্লু। সেটি প্রায় ১০০ বছর আগে। এরপর অনেক দিন গত হয়েছে। আমরা দাবি করছি, এত দিনে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। আমরা বলছি সভ্যতার চরম শিখরে আমরা। আমাদের সম্পদ বেড়েছে বহু গুণ। আমরা এগিয়েছি সত্যি। কিন্তু সাদী সিরাজী নিজেকে মানুষ দাবি করার মত যে যোগ্যতার কথা বলেছেন তা কি আমরা সবাই পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে পেরেছি? তিনি তার কবিতায় যে ভ্রাতৃত্বের কথা বলছেন তা কি আমরা অর্জন করতে পেরেছি?
আমরা এগিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের এই অগ্রগতি মøান হয়ে যায়, যখন দেখি আমরা আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তায় অন্যের কথা ভাবি না। একটি মানবকল্যাণমূলক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি না। সবসময় রাষ্ট্রকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদের মধ্যেও পরিবর্তন আনা দরকার। আর অনেক সময় ব্যক্তিগত আচরণই সমষ্টিগত আচরণ হয়ে রাষ্ট্রীয় আচরণকে প্রভাবিত করে। আর তাই প্রত্যেকটি মানুষকেই যার যার অবস্থানে থেকে ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনা এবং আচার আচরণের পরিবর্তনই সবচেয়ে জরুরি। আমাদের চিন্তা করতে হবে মানবিক আচরণগুলো নিয়ে। কেবলই নিজের স্বার্থ নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। ‘বনি আদম’ আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে।
অথচ এই চলমান এই মহামারিতে ও আমাদের অনেকের আচরণের মধ্যেও তেমন একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আমরা এখনও নিতাপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছি। ভাবছি না সকলের কথা। বাড়িয়ে দিচ্ছি মাস্ক, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম। বাজারে প্রচলিত কোনও ওষুধকে যদি করোনার প্রতিষেধক মনে করার গুজব উঠে, তাইলে সে ওষুধের দাম বেড়ে যায়। আমরা গরিবের জন্য বরাদ্দের চাল চুরি করছি। আমরা ত্রাণ-সাহায্য দিতে গিয়ে ফটো সেশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি।
এই মহামারির সময় যারা করোনায় সংক্রমিত হচ্ছেন বা সন্দেহের তালিকায় আছেন, তাদেরকেও আমরা অন্য চোখে দেখছি। তাই তাদের জায়গা হচ্ছে না হাসপাতালে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজ মহল্লাতে। এমন ঘটনা ও ঘটেছে যেখানে করোনা সন্দেহে নিজের মাকে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে এসেছেন সন্তানেরা। বাড়িওয়ালা আইসোলেশনে থাকা রোগীকে গভীর রাতে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। লাশেরও দাফন হচ্ছে না নিজ সমাজে বা এলাকায়। তাদের সবাইকে আমরা অস্পৃশ্য ভাবছি। আমরা ক্রমশই যেনো অনেকটা স্বার্থপর হয়ে উঠছি। আমরা যদি সাদী সিরাজীর কবিতার মত করে নিজেদের সাথে সাথে অন্যদের কথা ভাবতাম, অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হতাম, তাহলে আমাদের আচরণগত অনেক পরিবর্তন দেখা যেত হয়তো।
আসলে করোনা ভাইরাস আমাদের বিশ্বলোকের সবার একই নিয়তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়,অর্থনৈতিক, পরিচয় ভিন্ন থাকলেও আসলে মানুষের শরীরের জীববিজ্ঞান একই। সাদী সিরাজী তার কবিতায় রূপক অর্থে এটিই বলছেন। আর তাই আমাদের শারীরিক গঠনতন্ত্রকে চেনা এবং আঘাত করা করোনা ভাইরাসের জন্য খুবই সহজ হয়েছে। যে কাউকে সে আক্রান্ত করছে। বাছবিচার না করে সবার মাঝে ছড়িয়ে গিয়ে আমাদের ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু আমরা সেটা বুঝি না।
সাদী সিরাজীর কবিতাখানার অনেকটাই যেন ফুটে উঠেছে ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বরে জাতিসংঘের ঘোষিত ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লেয়ারেশন অব হিউম্যান রাইটস’ এ। ওই ঘোষণার প্রথম ধারা হচ্ছে, ‘সমস্ত মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে। সুতরাং সকলেরই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিত।’
কয়েকদিন পরে করোনা হয়তো নিজের নিয়মেই চলে যাবে। যেভাবে আগের মহামারিগুলো চলে গিয়েছিল এই পৃথিবী ছেড়ে। মৃত্যুর মিছিল ও হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু এই পৃথিবীকে নরকের চেয়েও দুঃসহ করে দেওয়ার মত অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জীবাণু আমরা যে আমাদের মধ্যে লালন করছি তা কি চলে যাবে? করোনার চেয়েও ভয়ংকর এইসব জীবাণুগুলো ইতিমধ্যেই আমাদের মানবিক গুণাবলি অনেকটাই নষ্ট করে ফেলেছে। বাকিটুকু নষ্ট করার আগে আমাদেরই ওদেরকে মেরে ফেলতে হবে।
একলা থাকার এই দিনে আমরা সবাই অনেকটা একান্ত নিজস্ব পরিসরে আছি। আর এইটাই সবচাইতে উত্তম সময় ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে উঠার। এখনই সময় আমাদের নিজেদেরকে বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করানোর। এখনই সময় শপথ নেওয়ার মনের ভেতরের ওইসব বিষাক্ত জীবাণুদের চিরতরে হঠিয়ে ‘নতুন আমরা’ হয়ে উঠার। আর ‘বনি আদম’ কবিতার যথার্থ মর্মার্থ আমরা তখনই বুঝতে পারবো।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
  • ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক মুক্তি
  • পাখি, মশা, ভাইরাস, অতঃপর আরো কিছু!
  • বিশ্বজনসংখ্যা দিবস
  • উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT