উপ সম্পাদকীয়

হারিয়ে যাচ্ছে মিঠে পানির মাছ

মো. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০২০ ইং ০১:৪৮:৫৬ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত
Image

কথায় বলে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’, ‘দুধ-ভাতে বাঙালি’, ‘ডাল-ভাতে বাঙালি’, ‘ভেতো বাঙালি’। কত ধানে কত চাল’, পুকুর ভরা মাছ ছিল গ্রাম বাংলার গর্বের বস্তু। বাঙালীদের খাদ্য তালিকায় প্রথম এবং প্রধান অঙ্গ হিসেবে মাছকেই প্রধান্য দেয়া হয়ে থাকে। অবশ্য বাঙালী ছাড়াও অনেকে মাছ পছন্দ করে থাকেন। তবে যত দোষ নন্দ গোষ। মাছের কদর বাঙ্গালীদের ঘরে ঘরে দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং আরও বাড়বে বৈ কমবে না। ঊর্ধ্বগামী দামের মাছ এখন নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত লোকের হাতের নাগালের বাইরে। যাদের প্রতিদিন মাছ না হলে চলে না তাদেরকেও বর্তমানে লাগাম টানতে হচ্ছে। তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রবাদ-প্রবচনের প্রচলন হয়েছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি।
দেশের উন্মুক্ত জলাশয় নদ-নদী, খাল,বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর, দীঘি হলো আমাদের অভন্তরীণ মৎস্য সম্পদের অন্যতম উৎস। আবহমান কাল থেকে এ দেশে আমিষের বড় একটি অংশের চাহিদা পূরণ হয়ে আসছে মিঠাপানির উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে দৈনদিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে পানি নিষ্কাশন, সেচ প্রকল্পের আওতায় অপরিকল্পিতভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, রাজস্ব আদায়ে জলাশয় ইজারা প্রদান প্রথা, কীটনাশকসহ কলকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য জলাধারে নিক্ষেপ, পলি জমা, শুকনো মৌসুমে উজানের দেশের পানি প্রত্যাহার, নির্বিচারে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধনসহ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে এ উৎপাদন কমেছে। কিন্তু কয়েক দশক আগেও দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসত উন্মুক্ত জলাশয় থেকে। এখন এ উৎপাদন প্রায় ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এসব কারণে দেশে জলাভূমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমছে। অথচ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর সর্বনি¤œ দৈনিক মাছের চাহিদা ৪৬ গ্রাম।
২০০৯ সালে দেশে মাছের চাহিদা ছিল ৩২ লাখ ২০ হাজার টন, যা ২০১৩ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার টনে। এ হিসাবে বর্ধিত জনসংখ্যার পুষ্টিচাহিদা পূরণ, রফতানি পরিমাণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মাছের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-২১ সালে দেশে মোট মৎস্য চাহিদা ৩৯ লাখ ১০ হাজার টনে উন্নীত হবে। হেক্টরপ্রতি মাছ উৎপাদিত হয়েছে দুই টন পর্যন্ত। বর্তমানে প্লাবন ভূমিতে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ২৭১ কেজি। পুকুর-দীঘিতে মাছচাষ নিবিড়করণ দেশের পুকুর-দীঘিতে বর্তমানে বার্ষিক গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ২.৬৬ টন।
সরকারি তথ্যমতে, উন্মুক্ত জলাশয় নদী-হাওর-খাল-বিলে বছরে মাছের উৎপাদন ১০ হাজার টন কমেছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের চাহিদা পূরণ করতে হলে বছরে অতিরিক্ত পাঁচ লাখ টন মাছ উৎপাদন করতে হবে। এই প্রবণতার কারণে দেশের প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। তারা বাব-দাদা অর্থাৎ পারিবারিক পেশা পরিবর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য উপখাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে সম্ভাবনাময়। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ মৎস্য উপখাতের অবদান। দেশের মোট কৃষিজ আয়ের ২৩ শতাংশ মৎস্য উপখাত থেকে আসে। ২০০৮ সালে মৎস্য উপখাতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল পাঁচ দশমিক শূন্য শতাংশ।
আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় ৪ দশমিক শূন্য চার শতাংশ আসে মৎস্য উপখাত থেকে। দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ এ খাতের নানা কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অতিসাম্প্রতি দৈনিক একটি জাতীয় পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারপ্রণীত একটি পরিকল্পনার আওতায় হেক্টরপ্রতি মাছের বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১দশমিক ৫০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২০-২১ সালের মধ্যে প্লাবন ভূমিতে সমাজভিত্তিক মাছচাষ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে চাষ এলাকা এক লাখ ৭০ হাজার হেক্টরে উন্নীত করার কথাও ওই পরিকল্পনায় রয়েছে। এতে সার্বিকভাবে দেশের মোট প্লাবন ভূমির বর্তমান গড় উৎপাদন হার হেক্টরপ্রতি ২৭১ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০-২১ সাল নাগাদ ৪৯৫ কেজিতে উন্নীত হবে বলে আশা করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগকে পুকুর ও খাল নিয়ে জরিপের নির্দেশ দেয়া হয়। সারা দেশে খাস খাল, পুকুর, দীঘি খনন ও সংস্কার এবং জলাশয়গুলোর সংস্কার করে মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে চায় সরকার। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পগুলোর কাজ হয়ে থাকে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্প যথাসময়ে শেষ হবে কিনা তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় জাগা স্বাভাবিক। অথচ দেশের মানুষের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য চাই পর্যন্ত আমিষের জোগান। আর উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদ যদি দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে, তাহলে আমিষের সহজ এ জোগানে প্রয়োজন অনুপাতে ঘাটতি আরো বাড়বে। তাই মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের হাতে নেয়া পরিকল্পনাটি দ্রুত শেষ করা জরুরি। যাতে দেশের মানুষ এর সুফল পেতে পারে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
  • ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক মুক্তি
  • পাখি, মশা, ভাইরাস, অতঃপর আরো কিছু!
  • বিশ্বজনসংখ্যা দিবস
  • উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT