উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : শিশুদের অভ্যাস

দিলীপ রায় প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০২০ ইং ০২:৫২:০৫ | সংবাদটি ৪৪৪ বার পঠিত
Image

এক.
সকাল বেলা কিংবা পড়ন্ত বিকালে পরিবারের সবাই মিলে একসাথে চা চক্রে মিলিত হওয়া আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। মা কিংবা বাবা অথবা বড়রা যখন চায়ের মধ্যে বিস্কুট চুবিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে মুখে পুরে তৃপ্তিভরে খায়, তখন তাদের পাশে থাকা ছোট্ট সন্তানটি হা করে তাকিয়ে থেকে এই পরম দৃশ্য অন্তর দিয়ে অবলোকন করে।
কখনও কখনও বড়রা আদরের আতিশয্যে চায়ে ভেজা একটুকরো বিস্কুট ছোটটির মুখে দিয়ে আনন্দে আটখান হয়। ছোটটি তখন চায়ে ভেজা বিস্কুটের স্বাদে মজে নিজ হাতেই খাওয়ার জন্য চাসহ বিস্কুটে খাবলা বসায়। আর এতদিন এই স্বাদের খাবার থেকে বঞ্চিত করবার জন্যে মনে মনে হয়তো বড়দের গালিও দেয়। তারপর থেকে ছোট বাচ্চাটির ক্রমশ: চা পানে অভ্যস্ততা বড়তে থাকে।
দুই.
পরিবারে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, হাট-বাজারে সর্বত্র বড়দের পান খাওয়া আমাদের সমাজের চিরচারিত অভ্যাস। পান না হলে একত্রে বসে পরিবারের বউ-ঝিদের আলোচনাই তো জমে না! শুধু কি পান? সাথে সুপারি, চুন, জর্দা, খয়ের, তামাকপাতা আরও কত কী! পাড়া-পড়শির সকল হাড়ির খবর আলোচনার উপজীব্য বিষয়।
ছোট্ট শিশুটি বিশেষ করে মেয়ে শিশুটি এই আড্ডাস্থলের আশেপাশে থেকে তাদের রসিয়ে রসিয়ে পান চিবিয়ে মুখ লাল করা আলাপে মশগুল হয়। একদিন শিশুটি এই পানের স্বাদ নিতে আকৃষ্ট হয় এবং একসময় অভ্যস্ততায় একেবারেই আটকে যায়।
তিন.
কোনো কোনো পরিবারে বাবা কিংবা বড়রা প্রকাশ্যে ধুমপান করে। এরা ভাবে এটা তো সহজাত প্রক্রিয়া। এমনকি অনেক সময় ছোট ছোট বাচ্চারা সিগারেট কিংবা বিড়ির প্যাকেটটা, দিয়াশলাই কিংবা লাইটারটা এগিয়ে দেয়।
কখনও কখনও বড়রা পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা দেশ উদ্ধারের আলোচনায় অংশ নিয়ে একের পর এক সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দেয়। ছোট বাচ্চাটিও মনে মনে সুখটান দিয়ে পুলক অনুভব করে এবং একদিন সে আবিষ্কার করে প্রকাশ্যে ছোটদের এটি খাওয়া বারণ। তাই, সে গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়।
বড়দের ফেলা দেওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশটুকু দিয়েই অভ্যস্ততার প্রাথমিক কাজটুকু শুরু হয়। একদিন এই অভ্যাসটাই ছোট্ট শিশুটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই সে অন্যান্য আসক্তির দিকে ক্রমান্বয়ে ধাবিত হয়।
চার.
অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী কিংবা বড়দের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। একসময় এটা ঝগড়ায় রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ঝগড়ায় ভয়াবহ কিস্তিখেউড় হয়। অশ্রাব্য গালাগাল নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। ফলশ্রুতিতে তা মারামারির পর্যায়ে গিয়ে স্থিত হয়। ছোট বাচ্চাটি তখন আতংকে শিটিয়ে থেকে এইসব কিস্তিখেউড় এবং মারামারি রপ্ত করে।
কখনও কখনও কোনো পুচকে আদু আদু বুলিতে গালাগাল দিতে পারলে মা-বাবারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়। মজার বিষয় হিসেবে এটা প্রতিবেশীর কাছে উৎসাহভরে উপস্থাপনও করে। এভাবেই ছোট্ট বাচ্চাটি যে তাদের মনের অজান্তেই এইসব কিস্তিখেউড়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তা তারা টেরও পায় না। কিংবা টের পেলেও কিচ্ছুটি করার থাকে না তখন। এরাই একসময় হয়ে ওঠে গাঁও গেরামে, পাড়া-মহল্লায়, বস্তিতে, বাংলার ঘরে ঘরে কিস্তিখেউড়ের নায়ক।
পাঁচ.
বর্তমান এই তথ্য-প্রযুক্তির জামানায় দুনিয়াকে ঘরের কোণে, হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে একেকটা স্মার্টফোন। সকাল-দুপুর-রাত, অবসরে-বিনোদনে এই স্মার্টফোন এখন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।মা-বাবা কিংবা বড়রা একটি শিশুকে যতটুকু না সঙ্গ দেয় তারচে বেশি সঙ্গ দেয় এই স্মার্টফোনকে। ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, কিংবা নেটে সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকা যেন সাধারণ দৃশ্য।
তাই, একটা শিশু হঠাৎ তার মানসজগতে আবিষ্কার করে, বড়দের কাছে তার চেয়ে এই ঝাকানাকা যন্ত্রটার গুরুত্বই বেশি। এটা পাবার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। একসময় মা-বাবারা ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়, আদরে কিংবা অনাদরে এই স্মার্টফোনটি বাচ্চাটির হাতে তোলে দেয় অথবা দিতে বাধ্য হয়। বাচ্চাটিও এটির দখল পেয়ে তাবত দুনিয়ার প্রকৃতি প্রদত্ত সবকিছু ভুলতে বসে।
আগেকার মায়েরা তাদের বাচ্চাদের প্রাকৃতিকভাবে গান শুনিয়ে খাওয়াত কিংবা ঘুমপাড়াতো। বর্তমানে এ দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই স্নেহ আর সোহাগের যায়গাটুকু অদ্ভুতভাবে দখল করে নিয়েছে একটা প্রাণহীন স্মার্টফোন। আজকাল হৃদয়হীন খবর তৈরিতে এই স্মার্টফোন কিন্তু কম দায়ী নয়।
ছয়.
এইসব প্রথাগত পারিবারিক সংস্কৃতিতে ছোটদের যে অভ্যাসটা গড়ে ওঠে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় হয়েও ত্যাগ করতে পারে না। বরং তা বয়সের সাথে সাথে আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হয়। এই ছোট ছোট বদ অভ্যাসগুলোই প্রকারান্তরে আরও বড় বড় বদ অভ্যাসের জন্ম দেয়।
পৃথিবীর নির্মল আলো-বাতাসে নিষ্পাপভাবে জন্ম নেয়া শিশুটি খারাপ অভ্যাসের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে একদিন সে আরও ভয়ংকর বদ অভ্যাসের দিকে ধাবিত হয়। নিষ্পাপ এই শিশুটির একদিন নাম হয় মদী মইত্যা, গাঁজা গাইজ্যা, হিরোইন হিরা, ..., ইত্যাদি।
পরম দয়ালু সৃষ্টিকর্তা যখন একটা শিশুকে পৃথিবীতে পাঠান, তার মগজে অফুরন্ত সম্ভবনা ঢুকিয়ে দেন। এই সম্ভবনা কাজে লাগোনোর দায়িত্ব কিন্তু বড়দের। একথালা নরম কাদা মাটি দিয়ে যেমন দরদি দেবতার প্রতিকৃতি তৈরি করা যায়, তেমনি তৈয়ার করা যায় অপকর্মের অসুর।
বড় হিসেবে ভালই বুঝার কথা, কোনটা আমাদের চাই।
পারিবারিক পরিম-লে শিশুটিকে আগলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে ওঠার সুন্দর সুযোগটুকু করে দিতে হবে। বইপড়া, ছবি আঁকা, গান শেখা, কবিতা বা গল্প লেখা, খেলাধুলা, বিনোদন কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যে অভ্যাস মানুষের জন্য ক্ষতিকর তা সর্বাগ্রে বর্জন করা- তাকে শেখাতে হবে। শেষ করতে চাই দ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর একটা কবিতার মাধ্যমে।
"এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি।/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
লেখক : প্রভাষক, এমসি কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
  • ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক মুক্তি
  • পাখি, মশা, ভাইরাস, অতঃপর আরো কিছু!
  • বিশ্বজনসংখ্যা দিবস
  • উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ
  • বদলে যাওয়া পৃথিবী
  • কৃষিতে আমাদের অগ্রযাত্রা
  • মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ
  • বাংলাদেশ পারে, আমরা ভুলে যাই
  • সমাজ, সময় এবং মানুষের লড়াই
  • করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা
  • বিশ্বনেতৃত্বে চীনের সম্ভাবনা কতটুকু
  • প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার
  • সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে করণীয়
  • করোনা ও মানবিক সহযোগিতা
  • চীন-ভারত স্নায়ুযুদ্ধ : বাংলাদেশে প্রভাব
  • মানব পাচার আইনের প্রয়োগ
  • কৃষিই হোক একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
  • স্বাস্থ্যবিধি মানলে প্রশমিত হবে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT