উপ সম্পাদকীয়

দার্শনিক মানুষ ও বেপরোয়া মানুষ

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০২০ ইং ০২:৫২:৫৪ | সংবাদটি ৩৬৫ বার পঠিত
Image

মানুষ অনন্য। প্রতিটি মানুষের সম্ভাবনা অসীম। প্রতিটি মানুষের কর্ম দক্ষতাও অসীম। আবার মানুষের সীমাবদ্ধতা ও ভিন্ন, ভিন্ন। মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, কর্মক্ষমতার যেমন অনন্য ঠিক তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা ও অনন্য। এই যে মানুষের অনন্যতার মধ্যে ভিন্নতা এবং বৈচিত্র্য, এটাই মানব সমাজের সৌন্দর্য। মানুষ লম্বা, বেটে, সাদা, কালো, বাদামী, চোখ ছোট, চোখ বড় মানুষের মধ্যে কতো কতো ভিন্নতা। পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, গভীর জঙ্গলে বসবাস করা মানুষ, বরফকে সহনীয় করে বরফের মধ্যে বসবাস করা মানুষ, মানুষ কতো ভাবেই না এ বিশ্বকে নিজেদের মতো করে নিয়েছে। ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য দিয়ে পৃথিবী নামক গ্রহ আমদের সামনে অপরূপ রূপে সজ্জিত। পৃথিবীর সকল কোনে অনুকুল ও বৈরী পরিবেশে মানুষ তাঁর সৃজনশীলতা দিয়ে তিলে তিলে পৃথিবীর উপযোগী হয়ে উঠেছে। প্রতিটা মানুষ যদি সব বিষয়ে পারদর্শী হতো, প্রতিটি মানুষের সাংস্কৃতিক পর্যায়, মান ও উচ্চতা যদি এক হতো, পৃথিবী কি এতো সুন্দর হতো?
এবার প্রকৃতির দিকে তাকান, কতো বৈচিত্র্য প্রকৃতিতে। সমুদ্রের নীল জলরাশি, পাহাড়ের ঢেউ খেলানো অবয়ব, নদীর আঁকাবাঁকা পথ চলা, নদী তার বুক চিরে মানুষের চলার পথকে সুগম করে দিয়ে তার তীরে কৃষি , সভ্যতা, সমাজ গড়ে তোলার অপার সুযোগ সৃষ্টি করে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। হাজার রকমের পাখির অপরূপ সউন্দর্য, আকশের বিচিত্র রঙ, সন্ধ্যার আকাশ, গোধুলির আকাশ, পূর্ণিমার আকাশ, অমাবস্যার আকাশ, প্রতিটি সময়ে ভিন্ন রূপ, ভিন্ন রঙ, ভিন্ন মেজাজ। অন্তর দিয়ে তাকান মনে হবে স্বর্গীয় সৌন্দর্যে অবস্থান করছেন। এই সৌন্দর্য আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে উপহার পেয়েছি। আপনি যখন সায়েন্স সিটিতে গ্রহ, উপগ্রহ, তারকা মন্ডলীর চলচ্চিত্র দেখবেন নিজে কে ভাগ্যবান মনে হবে আর মনে হবে এ’ বিশ্ব চরাচরের আপনি কতো ক্ষুদ্র। গ্রহ, উপগ্রহ, তারকা মন্ডলী, সুর্য কতো কতো বড়, কত ত্যজোদীপ্ত। আমরা এখনো তাদের সৃষ্টি রহস্য এবং প্রকৃতির অনেক কিছুই জানিনা। একদিন হয়তো জানবো অথবা সম্পুর্ন জানা হবেনা কখনো। প্রকৃতির বৈচিত্র্য , স্বাভাবিক বহমানতা, প্রকৃতির সাথে মানুষের সৌন্দর্য মন্ডিত সহাবস্থান সব মিলিয়ে আমাদের এই অপূর্ব গ্রহ, যার নাম পৃথিবী। বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে, রাজ পথের দিকে তাকাচ্ছিলাম, মানুষের মিছিল দেখছিলাম। ভরদুপুর, প্রখর সুর্যের উত্তাপ। এরকম দুপুরে, পৃথিবীর ক্রান্তিকালে, দেশের বিপন্নতায় কতো কতো ভাবনা আসে মনে। যিনি দার্শনিক নন তিনিও কেমন জানি দেখার থেকে বেশি দেখেন, আর এই দেখার থেকে বেশি কিছু দেখাই দর্শন। মানুষকে নিয়ে কতো ভাবনা, মানুষের সক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা, মানুষের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন সব কিছু মাথার ভিতরে ঘুরাফেরা করে।মানুষের মুখের দিকে তাকাই, মনটা কেমন জানি বিষন্ন হয়ে পড়ে।
কেনো বিষন্ন হয়? মনে হয় এই মানুষের মিছিলইতো আবার মৃত্যুর মিছিলে শামিল হবে হয়তো কাল, পরশু না হয় অচিরেই। প্রত্যেক মানুষের ভিতর আর একটা মানুষ থাকে, সে মানুষটা কিছুটা দার্শনিক। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই দার্শনিক মানুষ খোলস থেকে বেরিয়ে আসে। আয়নায় নিজের মুখ দেখে, আর দেখে আশপাশের মানুষের মুখ। স্বাভাবিক সময়ে কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় পায় না। জীবনকে সাজাতে হবে, পরিবারকে সাজাতে হবে। অর্থ চাই, বিত্ত চাই, সম্পদ চাই। যে মানুষ শুধু মাত্র তার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে নিজেকে কয়েক প্রস্ত ঢেকে দিতে পারবে সেরকম মানুষ, একটু অক্সিজেনের জন্য কতো অসহায়। দেশের শীর্ষ দুজন শিল্পপতি ভাই ভেন্টিলেটর ভাগাভাগি করে নিজেদের জীবনকে রক্ষা করতে পারলেন না। এরকম ঘটনা যখন মানুষ শুনে কিংবা দেখে তখন তার মধ্যে জেগে উঠে একজন হাসন রাজা, রাধারমন অথবা লালন শাহ। হাসনের মতো দার্শনিক হয়ে মানুষ তখন বলে উঠে, “কি ঘর বানাইলাম আমি শূন্যেরো মাঝার, লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি বালা নায় আমার”। জীবন অর্থে পরিপুর্ণ আবার কখনো মনে হয় ইংরেজি সাহিত্যের মহাকবি, নাট্যকার শ্যাক্সপিয়ারের মতো, “জীবন বোকার বর্ণিত একটি গল্পের মতো”, তার ভাষায়, “লাইফ ইজ এ টেল, টোল্ড বাই এন ইডিয়ট”। সত্যি কি তাই? করোনা কালে কি আমরা কি নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠলাম? নাকি এরকম বিষন্নভাব খুবই সাময়িক।
করোনা শুরুর সাথে সাথে যখন আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছিলো, তখন স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করলেও, পরিচিত মানুষের মৃত্যুর খবর পাইনি । মৃত্যু এখন দোয়ারে, মনে হয় দোয়ারে পাল্কী প্রস্তুত আমদের, এই যে আমাদের মরমী শিল্পী আব্দুল আলীমের সেই গানের মতো, “দুয়ারে আইসাছে পাল্কী, নাইওরী গাও তুলো, তুলোরে মুখে আল্লাহ রসুল সবে বলো”। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এতো গুনী মানুষ আমরা একসাথে হারাইনি, মৃত্যুর যে মিছিল শুরু হয়েছে, সে মিছিলে ইতিমধ্যে আমরা হারিয়েছি, প্রায় সতেরশ স্বজন। আমাদের প্রকৌশল জ্ঞানের সবচেয়ে বড় নাম জামিলুর রেজা চৌধুরী , আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পন্ডিত আনিসুজ্জামান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক, সারা জীবন বাংলা সংস্কৃতি লালনকারী কামাল লোহানীর মতো আর কতো কতো নাম, কতো চিকিৎসক কতো চিকিৎসা কর্মী, কতো সাংবাদিক, কতো জানা, অজানা স্বজন। এ মিছিলে আমরা যারা এখনো শামিল হইনি, আমাদের একদল আতঙ্কগ্রস্ত আর একদল বেপরোয়া ।
যারা বেপরোয়া, তাদের মধ্যে অনেকেই সরকারী প্রণোদনা কিভাবে আত্মসাত করা যায়, কিভাবে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরী করা যায় এসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল এসময়ে যারা আত্মসাত করতে পারেন, তাদেরকে আমরা, কাদের সাথে তুলনা করতে পারি? আমি জানি না। তারা বিশ্বচরাচরের কোন জীবের সাথে তুল্য নন। সুশাসনের কথা আমরা বলি, সুশাসন যারা করবেন তাদেরকে দায়ীত্ত্বে অবহেলার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মতো মন্ত্রনালয় থেকে সরিয়ে নিতে হয়, লাগাম টেনে ধরার জন্য। মন্ত্রনালয় থেকে সরিয়ে তারপর কি করা হয় সেটা আরও বিস্ময়কর। পদোন্নতি দিয়ে সচীব থেকে সিনিওর সচিব করা হয়। সুশাসনের কথা তখন পরিহাস বলে মনে হয়। এসমস্ত কর্মকান্ড যারা করছেন, তারা মনে করছেন তারা মনে হয় মৃত্যুর মিছিলের তালিকার বাইরের মানুষ। তাঁরা পৃথিবীর সব প্রান্ত এমন কি বাংলাদেশের দিকেও তাকাচ্ছেন না। তারা হয়তো জানেন না, ইতিমধ্যে করোনা ১০ নম্বর ডাউনিং ষ্ট্রীটে, বৃটেনের প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ে হানা দিয়েছে, তারা প্রবল পরাক্রমশালী বৃটেনের রাজ পরিবার, স্পেনের রাজ পরিবার, সৌদি আরবের রাজ পরিবারের রান্না ঘরে করোনা অবাধে যাতায়াত করছে। সে খবর কি তাঁরা রাখছেন না? অবশ্যই রাখছেন তবে মনের ভিতরের পশুশক্তি তাদের ভুলিয়ে দিচ্ছে। ভোগ বিলাস, পুঁজি তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না, চলে যাওয়ার সময় স্বজনরা পাশে থাকবেন না। তাদের মনে হয় এখনো সময় আছে, তাদের বোঝা উচিৎ অদৃষ্টকে তাঁরা কোন ভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না।
মানুষ এ মহামারীকে নিজেরাই ডেকে এনেছে। উন্নয়ন নামক ডাইনোসরকে পরিপোক্ত করতে। উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এখন উন্নয়ন ডাইনোসরই মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী। মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে শিল্প,কারখানা করেছে। মানুষ রাসায়নিক বর্জ ফেলে সমুদ্রের বিশুদ্ধ পানিকে দূষিত করেছে। মানুষ পৃথিবীর ফুসফুস নামে খ্যাত আমাজন বনকে ধ্বংস করেছে। ধ্বংস করছে সুন্দরবনকে। মানুষ মারণাস্ত্র, ভোগ্য বিলাসের দ্রব্য তৈরি করে বাতাসকে বিষাক্ত করেছে। এসব কথা কিন্তু খুব পুরোনো, মানুষ সজ্ঞানে নিজের বিত্ত, বিলাস, ক্ষমতার মোহে নেশাগ্রস্থ হয়ে, প্রকৃতির দান, এ’ পৃথিবীকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। অথচ প্রকৃতি যে আমদেরকে বুক পেতে, নিজেদেরকে বিপন্ন করে রক্ষা করে সে কথাটির জ্বলন্ত উদাহরণ সুন্দরবন। বারবার সুন্দরবন বুক পেতে দিয়ে আম্ফান, আইলা সহ অনেক ভয়াবহ সাইক্লোনের হাত থেকে আমদেরকে রক্ষা করেছে। কৃতজ্ঞতাবোধ, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাহীন হয়ে মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণীতে রুপান্তরিত হয়েছে।
আমাদের রূপান্তর প্রক্রিয়া কি অব্যাহত থাকবে? আশা করবো, মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমরা শারিরিক ভাবে অনেকেই হয়তো বিদায় নেবো, যারা বেঁচে থাকবো তাদেরকে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে বাচতে দিন। আমাদের আকাশ আমাদের বাতাস, আমরা বিষাক্ত গ্যাস মুক্ত দেখতে চাই। আমরা মারণাস্ত্র দেখতে চাইনা। আমরা যুদ্ধ চাইনা। আমরা বলতে চাই, “নানান বরন গাভীরে ভাই, একই রকম দুধ, জগত ভরমিয়া দেখি, একই মায়ের পুত”। শাশ্বত বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ মানবিক বাণী সারা পৃথিবীতে ধ্বনিত হোক। জীবন ফিরে আসুক আবার জীবনের ছায়া বৃক্ষ তলে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আমাদের রাজনীতির কবি ও জাতীয় কবি
  • বেকারত্ব বর্তমান সময়ে হুমকি
  • বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিকতা
  • সমকালীন কথকতা
  • চামড়া শিল্প কি ধ্বংস হয়ে যাবে!
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • সম্ভাবনাময় যুব সমাজ : অবক্ষয় এবং উত্তরণের উপায়
  • নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে
  • কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
  • একটি খেরোখাতার বয়ান
  • পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
  • জীববৈচিত্র এবং মনুষ্য সমাজ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT