উপ সম্পাদকীয়

তিস্তা ও ফারাক্কা চুক্তিই এখন জীয়ন কাঠি

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৭-২০২০ ইং ০৩:৩০:১৬ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত
Image


ইদানীংকালের প্রায় সংবাদপত্রসমূহে তিস্তা নদী সৃষ্ট বন্যার খবর ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে। হঠাৎ অত্যধিক পানির চাপে ধসে পড়ছে নদীর দুটি কূলের মাটি আর সৃষ্টি হচ্ছে বিরাটাকার ভাঙন। মাথায় হাত দিয়ে নদীর দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে সবকিছু হারানো কৃষকদের ছবি ছাপানো হচ্ছে। অন্যান্য প্রচার মাধ্যমেও এমন ধরনের সংবাদচিত্র ছাপানো হচ্ছে। দেশের প্রতিটি নদীর কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সে হিসাবে তিস্তা নদীটির আগ্রাসী রূপের পরিচয় এর আগে কেউই পায় নাই। অতি বৃষ্টি আর বর্ষার প্লাবনে বন্যা তো হবেই কিন্তু নদীর ধারণ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে একেবারে দুকূল ভাসিয়ে, ভেংগে, ঘরবাড়ি, বিদ্যালয়, মসজিদ সহ সবকিছু একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মতো অবস্থা কখনও হয়নি বলে দাবি করেছেন অনেক প্রবীণ ব্যক্তিত্বরা। তিস্তা নদীর উজানে ভারতীয় অংশে রয়েছে বিরাটাকৃতির একটি বাঁধ। সেটি ভারতীয় উষর ভূমিতে জল সিঞ্চনে ভূমিকা রাখে শুষ্ক মৌসুমে অন্যদিকে বাংলাদেশ এলাকায় পানি পানি করে হাহাকার করতে থাকেন কৃষককূল। এই এলাকার তিস্তা বিধৌত কৃষিজমি সমূহ একেবারে বিরান ভূমি হয়ে পড়ে থাকে। বিগত শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশের কৃষককূল একেবারে লবেজান হয়ে পড়েছিলেন পানি সংকটে। যাই হোক কোন এক মায়াবলে হঠাৎ করে কিছু পানি এসে মরণাপন্ন কৃষি ব্যবস্থা আর নাভিশ্বাস উঠা কৃষককূলকে রক্ষা করে। ইদানীং এর বন্যাটি হলো বৃষ্টির পানি আর তিস্তার উজানের আটকে থাকা পানির সমাহার। দুটো পানির প্রবাহের চাপ তিস্তা নদীর ধারণক্ষমতাকে ভারসাম্যহীন করে তোলার কারণে নদীটির দুটি তীরই সমানতালে ভাসছে। দুর্ভোগ নয় প্রাণান্তকর অসহনীয় (জীবন) দুর্বিপাকে পড়েছে তিস্তাপারের মানুষ জন। তারা আজ কোথায় যাবে।
রোহিঙ্গা সমস্যা, চীন-ভারত সমস্যা জাতীয় বিষয় হলে জাতিসংঘ মুখ খুলতো কিন্তু এখানে যেটি তা নিয়ে কেউই মুখ খুলবে না কারণ ওজরটি রয়েছে একেবারে তৈরি করা। বলা হয় বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক। এব্যাপারে তিস্তা চুক্তি নামক পানি বন্টনের একটি চুক্তিপত্র বলতে গেলে তৈরি হয়েই আছে কিন্তু কার্যকরী করতে গিয়ে নাকি একটু সমস্যা বা গোল বেধেছে এবং সেটি হয়েছে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অপরপক্ষের টেবিলে। জানি না এই প্রাণরক্ষাকারী চুক্তিটি আদৌ সম্পাদিত হবে কিনা। ধরে নিলাম চুক্তিটি সম্পাদিত হলোই কিন্তু বাস্তবে সেটি কতোটুকু ফলদায়ক হবে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রচার মাধ্যমে বলা হচ্ছে তিস্তাচুক্তির মাধ্যমে পানি বন্টন কার্যকর করতে হবে ভারত বাংলা সীমান্তরেখার জলধারাকে নিয়ামক হিসাবে ধরে নিয়ে। এটি হলে কিন্তু চুক্তিটি একটি কাগুজে ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে কারণ তিস্তাবাধটি তার ধারণ ক্ষমতার পুরোটাই অপর পক্ষের ভান্ডারে ঢেলে দেবে আর ক্ষীয়মান জলধারাটিকে ভাগ করে একেবারে তেতো ঔষধ গেলানোর মতো পানি বাংলাদেশের ভাগে আসবে। আগের অবস্থাটাই বিরাজমান থাকবে। মরুকরণ এর প্রভাব থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তাপারের লোকদের জীবন জীবিকা রক্ষা করা যাবে না। বায়ু প্রবাহের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবে ঝড় ঝঞ্ঝা বারবার আঘাত হানবে। শস্য ফলানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি যেমন পাওয়া যাবে না তেমনে অনুকূল আবহাওয়ার বৈপরীত্য রবিশষ্য সহ অন্যান্য ফলদ ও ভেষজ গাছপালা, বৃক্ষরাজির উপর পড়বে যা কালক্রমে তিস্তাবিধৌত পুরো অঞ্চলটি হয়ে পড়বে একটি বিরান ভূমি। চুক্তিটির বাস্তবায়ন যদি হয় ন্যায়ভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক নদী অধিকার রক্ষা আইনের ধারামতে অবশ্যই বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির অংশটুকু পাবে।
আন্তর্জাতিক নদী আইনে বলা হয়েছে একটি প্রবহমান নদীর জলের উপর উজানের জনগোষ্ঠীর যে অধিকার ঠিক সেই অধিকারটি বহাল থাকবে ভাটির জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও। বাস্তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিস্তা নদীর পানি বন্টন কি হচ্ছে ন্যায়ানুগ পদ্ধতিতে বা যথাযথ নদী অধিকার আইনের অধীনে সে বিষয়ে আরো একটু সতর্ক হওয়া দরকার। এটি একটি মানবিক সমস্যা, তদ্রুপ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে হিসাবে যে কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বঞ্চিত পক্ষ হিসাবে বাংলাদেশকে যথাযথ স্থানে আপন দাবীটির পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। করুণা ভিক্ষা করে কোন ফলোদয় হবে না কারণ উজান দেশটি তার বিস্তীর্ণ বিরান (একদা) ভূমিকে সবুজ আর শ্যামলে পরিণত করেছে কৃষিপণ্য উৎপাদনের দ্বারা অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবিটি আরো গুরুত্ববহ। কৃষি উপযোগী জমিগুলিই আমাদের দেশে তিস্তা নদীর পানির অভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না কোন ধরনের বিস্তৃতি বা অধিক ফলনের উদ্দেশ্যে তো নয়ই। সে হিসাবে এখনই তিস্তা পানি চুক্তির একটি সুষ্ঠু এবং ন্যায়ানুগ সমাধান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আমাদের দেশে বিজ্ঞমহল কথায় কথায় বলে থাকেন ফারাক্কা চুক্তিটি তো করাই আছে। পানি প্রবাহ ঠিকই আসছে। আসলে সেটি ঠিক। চুক্তিটি যখন সম্পাদিত হয়, তখন বলা হয়েছিলো তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো ও সংকট মোচনের জন্য ফারাক্কা চুক্তিটি সম্পাদিত হলো। সেটির আইনী ও স্থায়ী রূপ প্রদান করা হবে পরবর্তীতে বাস্তবতার নিরীখে ও প্রয়োজনের খাতিরে। মনে রাখতে হবে ফারাক্কা চুক্তিটি যখন স্বাক্ষরিত হয়েছিলো আমাদের দেশটির মোট জনসংখ্যা ছিলো সাড়ে সাত কোটি আর বর্তমানে হয়েছে প্রায় সতেরো কোটি। অবশ্যই ফারাক্কার মাধ্যমে প্রাপ্য পানির চাহিদা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ কিন্তু চুক্তি অনুসারে পানি আসছে চাহিদার মাত্র একভাগ। অন্যদিকে ফারাক্কার মাধ্যমে প্রাপ্য পানির উপর নির্ভরশীল চৌদ্দটি জেলার মানুষের সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। কিন্তু তাদের চাষ বাস, জীবন পদ্ধতি সবকিছু পাল্টে গেছে ব্যাপকভাবে। ইলিশ মাছের গতিপথ বদলে গেছে। মৎস্যজীবিরা বিকল্প রোজগারের সন্ধানে নামছেন। নৌকাচালকরা শুষ্ক মৌসুমে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। সে সময় পুরো পদ্মা নদীটি হয়ে পড়ে বালুকা বেলার এক বাস্তব প্রতিফলন। গাড়ী ঘোড়া চলাচল করে আর স্থানীয়রা গরুর গাড়ি ব্যবহার করেন পদ্মার বুক চিরে চলাফেরা করার উদ্দেশ্যে। পদ্মার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস (শুষ্ক মৌসুমে) হয়ে উঠে উষ্ণ। প্রায় লু-হাওয়ার মতো সেটি বইতে থাকে এবং সে কারণে পরিযায়ী পাখ পাখালী বিকল্প পথে তাদের উড়াল শুরু করতে বাধ্য হচ্ছে। আগে যেখানে পদ্মার বুকে বিভিন্ন চরাঞ্চলে পাখী প্রেমিকরা ভীড় জমাতেন আজ সে কালও নেই তেমনি পাখি প্রেমিকদের ভীড়ও নেই। পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ দুপারে মরুকরণ প্রক্রিয়া যেন শুরু হয়েছে গরম এবং উষ্ণ বায়ু প্রবাহের কারণে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে উত্তাল ঢেউ উঠার কারণে অনেক নৌদুর্ঘটনা ঘটছে যেগুলি আগে হতো না। কারণ হিসাবে বলা যায় পদ্মা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে উচু হয়ে উঠার কারণে অস্বাভাবিক ঢেউ আর পানির উদ্দামতা বেড়ে যাচ্ছে। জলযানগুলি সেখানে টাল সামলাতে না পেরে হয় ডুবছে আর না হয় উল্টে পড়ছে, সলিল সমাধি হচ্ছে অগণিত আদম সন্তানের। কে শুনবে কার দুঃখের মর্মগাথা আর কে করবে ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন আর প্রয়োজন মাফিক পূণর্বিন্যাস। সবখানেই যেন হা হতোষ্মী। রাজশাহীর কানসঘাট সীমান্ত থেকে ভারত অভ্যন্তরে মাত্র তেরো মাইল দূরেই ফারাক্কা বাঁধটির অবস্থান। চৌত্রিশ ফুট চওড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এটির উপর দিয়ে। সাথে রাখা হয়েছে রেলযোগাযোগ ব্যবস্থাও। এই বাঁধটি সাত হাজার পাঁচশত ফুট লম্বা পঁচাত্তর ফুট চওড়া আর এটির রয়েছে একশত নয়টি পানি নির্গমন পথ। এর মধ্যে চৌত্রিশটি মোটামুটি চালু থাকে আর অত্যধিক পানির ভারে অনন্যোপায় হলে সবকটি পানি নির্গমন পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ভাটির দেশটির অবস্থা তখন কি হলো কেইবা সেটি ভাবতে যায়।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদীজি বাংলাদেশ সফরকালীন সময়ে বলেছিলেন তিস্তা চুক্তিটি প্রায় সমাপ্ত হয়েই রয়েছে অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বেগম মমতা ব্যানার্জি বললেন উল্লেখিত চুক্তিটি সম্পাদনে এবং কার্যকরি করতে একটু সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ অবস্থা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রইলো। ফারাক্কা বিষয়ক চুক্তি নিয়েও আলাপ আলোচনা নাস্তা পানি খাওয়া হলো-অনেক অবস্থা রইলো তথৈবচ। আমাদের সুরমা কুশিয়ারার উৎসস্থলে ফুলেরতল নামক এলাকায় অনুরূপ বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানো হলো। পানি প্রবাহ বিঘিœত হলো। টানাপোড়েন আর আলাপ আলোচনা আক্ষরিক অর্থেই অস্বভিম্ব। তার পরে কি হবে। হামিনস্ত, হামিনস্ত।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT