সম্পাদকীয় তুমি যদি সর্বোচ্চ আসন পেতে চাও তবে সর্বনিম্ন স্থান থেকে শুরু করো ।-ডেল কার্ণেগি

হারিয়ে যাচ্ছে কয়েন

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০২০ ইং ০০:৫৫:১৪ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত
Image

আমাদের অর্থ ব্যবস্থায় কয়েন বা খুচরা পয়সা কি হারিয়ে যাচ্ছে? এ রকম প্রশ্নই করছেন আজকাল অনেকে। সাধারণত লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেকেই খুচরা পয়সা এড়িয়ে যাচ্ছেন। ক্রেতারা য়েমন নিতে চাচ্ছেন না তেমনি বিক্রেতারাও। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রমানের এসব মুদ্রার প্রচলন কমছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে,নোট ছাপানোর ব্যয় কমাতে নোটের পরিবর্তে বেশী করে কয়েন তৈরির ব্যবস্থা করা যায়। এক্ষেত্রে দশ টাকা পর্যন্ত কয়েন তৈরি করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষঞ্জগণ। অতীতে সর্বনি¤œ এক পয়সার কয়েন থেকে শুরু করে পাঁচ, দশ, পঁচিশ, পঞ্চাশ পয়সার কয়েন প্রচলিত ছিলো। পরবর্তৗতে দুই টাকা এবং পাঁচ টাকা মূল্যমানের কয়েনের প্রচলন হয়। কিন্তু বর্তমানে বাস্তবতা এমনই যে, এক দুই বা পাঁচ টাকায়ও কিছু কিনতে পাওয়া যায় না। মুদি দোকানদার, বাস কন্ডাক্টর এমন কি ভিক্ষুকও কয়েন নিতে চায় না।কয়েনের এই দূরবস্থার প্রধান কারণ হচ্ছে, অত্যধিক মূল্যস্ফীতি, পাশাপাশি মূদ্রার মান কমে যাওয়া।
আসল কথা হলো টাবার মান কমছে দ্রুত। স্বাধীনতার পরে একশ টাকায় যে পণ্য কেনা যেতো এখন তা কিনতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারও বেশী। বৈদেশকি মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং অত্যধিক মূল্যস্ফীতির কারণে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত টাকার মান কমেছে ব্যাপকভাবে। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার দাম ও দ্রব্যমুল্য। এর প্রভাবে টাকার মান কমে যাওয়ায় একদিকে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি, অপরদিকে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। দুভাবে টাকার মান নির্ধারন করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার দামের সঙ্গে তুলনা করে এবং দেশীয়ভাবে মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে দুভাবেই টাকার মান কমেছে। অবশ্য অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশের অর্খনীতি বিকাশের ¯¦ার্থে মুদ্রার মান কমানো অর্থনীতির একটি চলমান প্রক্রিয়া। অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং বিদেশের বাজারে দেশের পণ্যকে দামের দিক থেকে আকর্ষনীয় করতেও টাকার মান কমানো হয়। টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মূদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে অর্থনীতির যে বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, সে অনুযায়ী ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে; সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ১০০ টাকা বর্তমানে ১০ টাকারও কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, মাঝে মধ্যে অর্থনীতির স¦ার্থেই টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়। কারণ কোন দেশের মূদ্রা অবমূল্যায়িত হলে ওই দেশে বিদেশী বিনিয়োগ যেতে চায়না, বিদেশের বাজারে পণ্য স্থান দখল করতে পারেনা। আমদানীকারকরা পণ্য নিতে চায়না। কারণ পণ্যের দাম বেশী পড়ে। এজন্য মূদ্রাকে অবমূল্যায়ন করে অর্থনীতির আকার বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। অর্থনীতিবিদেরা বলেন, টাকার মান কমে যাওয়া মানে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া। স্বাধীনতার পর থেকে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সে হারে আয় বাড়ে নি; বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের আয় তুলনামূলক তেমন একটা বাড়েনি। বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে বর্তমানে টাকার মান নির্ধারিত হচেছ বাজারভিত্তিতে। বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে টাকার মান। বাজারে চাহিদার চেয়ে বৈদেশিক মুদ্যার সরবরাহ বেশী থাকলে টাকার মান বাড়ে এবং চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকলে টাকার মান কমে যায়। বাংলাদেশের সবচেযে বেশী বৈদেশিক বাণিজ্য রয়েছে এবং সবচেয়ে বেশী চালু এমন ১৫ টি দেশের মুদ্রাকে একত্রিত করে একটি বৈদেশিক মুদ্রার বাস্কেট তৈরী করা হয়। যেগুলোর বিনিময় হারের সঙ্গে তুলনা করে টাকার মান নির্ধারণ করা হয়। গবেষকদের মতে, ৯০ দশকের শুরুতে কয়েনের ব্যবহার কমতে থাকলেও দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। কিন্তু ৯০ দশকের শেষের দিকে জিনিসপত্রের দাম বেশী হারে বেড়ে যাওয়ায় কয়েনের ব্যবহার কমতে থাকে এবং তা এক সময় অপ্রচলিতই হয়ে পড়ে।
দশ পয়সায় হাওয়াই মিঠাই, পঁচিশ পয়সায় চকোলেট আইসক্রিম, পঞ্চাশ পয়সায় খিলি পান কিংবা চার পাঁচ পয়সায় সপ্তাহের বাজার করার দিন নেই এখন। তাই বলে কয়েন হারিয়ে যাবে এমনতো হতে পারেনা। বিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন মানের কয়েন প্রচলিত রয়েছে। প্রয়োজনে বেশী মানের যেমন দশ টাকা বিশ টাকা মূল্যের কয়েনও বের করা যায় কি না দেখতে হবে। কারণ কাগজের নোটের চেয়ে কয়েনের স্থায়িত্ব অনেক বেশী। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো, কয়েনের ব্যবহারিক মূল্য কমে গেলেও প্রতœতাত্ত্বিক মূল্য বাড়ছে। সময়ের পরিক্রমায় বাড়ছে দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, আর কমছে টাকার মান। অর্থনীতির এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একে মেনে নিতে হবে। তার মানে এই নয় যে, ধাতব মুদ্রা বা কয়েনের প্রচলন বন্ধ করে দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT