উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৭-২০২০ ইং ০২:৪৯:৪০ | সংবাদটি ২৪২ বার পঠিত
Image

সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, শুনে আসছি কোন হিন্দু ব্যক্তির মৃত্যু হলে সেই মৃত ব্যক্তির লাশ সৎকারে হিন্দুরাই এগিয়ে আসেন এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান-বিধি বিধান মোতাবেক লাশ সৎকার করা হয়। এখানে অন্যকোন ধর্মের লোক সাধারণত সৎকার কাজে যোগদান করেন না। একই নিয়ম মুসলিম ভাইদের ক্ষেত্রেও। কিন্তু কখনো কখনো এ নিয়মের এতোটাই ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায় যে, শুধুই দুঃখজনকই নয়, অমানবিকও বটে। শুধু কি তাই? পবিত্র ধর্ম নিয়ে যে বা যারা ব্যবসা করেন, নিজেদেরকে সমাজের হোমড়া-চোমড়া ভেবে আত্মতৃপ্তিতে মশগুল থাকেন ঐ বিশেষ সময়ে তাদের প্রকৃত চেহারাটি অবশ্য আপনা থেকেই উন্মোচিত হয়ে যায়। প্রকাশ পায় নিজ ধর্ম, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীর প্রকৃত চেহারা।
এমনি এক ব্যতিক্রমী ঘটনার খবর আসে ১৫ জুন ২০২০ তারিখের দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার পাতায়। খবরটির শিরোনামটিই ভারতীয় উপমহাদেশের যেকোন ধর্মের যেকোন মানুষের নজর না কেড়ে পারে না। কারণ পৃথিবীর অন্য কোন মহাদেশের কোন দেশে মৃত ব্যক্তির লাশ সৎকারের আইন কানুন আমি জানি না। সংশ্লিষ্ট সবার সহৃদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে খবরটির শিরোনাম উল্লেখ করছি এবং সেটি হলো- ‘কুমিল্লায় হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার করল মুসলিমরা।’ ভেতরের বিস্তারিত খবরটি এরকম- ‘কুমিল্লার মুরাদনগরে সংক্রমণের ভয়কে উপেক্ষা করে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এক হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ সৎকার করলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন। জানা যায়, গত শনিবার উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের প্রদীপ সূত্রধরের (৪৫) সৎকারে তার আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরা এগিয়ে না আসায় স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক মরদেহ সৎকার করেন। স্থানীয়রা জানান, ৮ থেকে ১০ দিন ধরে জ্বরে ভুগতে থাকা প্রদীপ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিজ বাড়িতেই মারা যান। তার মৃত্যুর খবরে পূজা উদযাপন পরিষদের লোকজন, পুরোহিত ও আত্মীয়স্বজন মরদেহ সৎকারে প্রথমে আশ্বাস দিলেও পরে অপারগতা জানায়। পরদিন শনিবার সকালে খবর পেয়ে মরদেহ সৎকারে এগিয়ে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের নির্দেশনায় গঠিত উপজেলা যুবলীগের মরদেহ দাফন কমিটির সদস্যরা। এরপর বেলা ১০ টার দিকে প্রদীপের মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে তার পারিবারিক শ্মশানে সৎকার করেন তারা।
খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় যদিও শিরোনামটি স্থান পায়নি তবুও কেন জানি মনে হয় খবরটির গভীরতা অনেক অনেক বড়ো। বিশেষ করে বাঙালির বাংলাদেশে এর আবেদন তুলনাহীন। বাঙালি সমাজের প্রেম-প্রীতি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত বাঙালির ব্যক্তিগত, পারিবারিক সামাজিক বন্ধনে দারুণভাবে আঘাত হেনেছে এই ছোট্ট খবরটি। করোনার আঘাতে সারা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশও বিপর্যস্ত। এটা অস্বীকার করার কোনই উপায় নেই যে দেশে মৃত্যুর খবর মানুষকে আতঙ্কিত করছে কিন্তু তার চেয়েও শঙ্কা বিষয় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে মারাত্মক ফাটল ধরেছে। অজানা মৃত্যুর ভয়ের কাছে সামাজিক বন্ধন আজ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে করোনার চেয়েও এক ভয়ানক শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যা সমাজকে আরো শঙ্কিত করে তুলছে।
সামাজিক বন্ধন এমনিভাবে ছিঁড়ে গেলে ভবিষ্যতে আলোর চেয়ে আঁধারের প্রভাব বেশি বাড়বে। করোনাকে আমরা অবশ্যই একদিন জয় করতে পারবো কিন্তু হাজার বছরের প্রেমের বন্ধন ছিড়ে গেলে সেটাকে আর জোড়া লাগানো যাবে না। এর ফল ভয়ঙ্কর। কুমিল্লার সেই খবরটি মানুষের শারীরিক মৃত্যুর চেয়ে ঐতিহ্যের মৃত্যুর কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
পবিত্র আল-হাদিসের একটি বাণী হলো- ‘কোন শবযাত্রা তোমার পাশ দিয়ে গেলে ওঠে দাঁড়াবে- তা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুসলমান যারই হোক। কুমিল্লার মৃত প্রদীপ চন্দ্র সূত্রধরের মরদেহ মুসলমান ভাইয়েরা যখন সেখানে উপস্থিত পূজা উদযাপন পরিষদের লোকজন, পুরোহিত ও মৃতের আত্মীয় স্বজনের পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তারা উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন কি না জানি না। কিন্তু সে সময় তাদের যে আচার-আচরণ ছিলো তা থেকে বিশ্বাস করাই যায় না যে তারা দাঁড়িয়ে শেষ শ্রদ্ধাটুকুও জানাতে পেরেছিলেন! প্রশ্ন আসতে পারে কেন যাননি! অবশ্যই ভয়ে! করোনার ভয়ে। ঐসব হিন্দু ভাইদের কাছে বিনীতভাবে প্রশ্ন রাখছি যে মুসলিম ভাইয়েরা প্রদীপের মরদেহ কাঁধে নিয়ে তার পারিবারিক শ্মশানে সৎকার করলেন, তাদের জীবনের মূল্য কি উপস্থিত হিন্দু ভাইদের জীবনের চেয়ে খুব একটা কম?
‘কাষ্ট জ্ঞাতি’ বলে হিন্দু সম্প্রদায়ে একটা কথা রয়েছে। অর্থাৎ যারা সৎকারে অংশগ্রহণ করলেন, তারাই সে জ্ঞাতি। কুমিল্লার হিন্দু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কাছে প্রশ্ন- কাষ্ট জ্ঞাতি কারা হবেন? এসব প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক কিনা জানি না। কিন্তু এমন ঘটনা তো প্রায়ই ঘটছে। ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের জনৈক খোকন সাহার মৃত্যু নিয়ে যা কখনো কাম্য হতে পারে না। করোনার ভয়ে ভীত হয়ে মানবিকতা বিসর্জন দেয়া কতোটুকু যুক্তিযুক্ত জ্ঞানী মহলে আলাপ আলোচনা জরুরি। পুরোহিতদের বক্তব্যই বা কি তাও জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপন পর বিষয়টি নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে। এ প্রসঙ্গে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। যেমন তিনি বলেছেন- সংসারে আপন পর বলিয়া কেহ নাই। যে আপন মনে করে সেই আপন- যে পর বলিয়া জানে সে আপন হইলেও তাই। যেটির প্রমাণ পাওয়া যায় কুমিল্লার প্রয়াত প্রদীপ চন্দ্র সূত্রধরের জীবনে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT