উপ সম্পাদকীয়

করোনাকালে শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা

মুস্তাফিজ সৈয়দ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৭-২০২০ ইং ০২:২২:১৮ | সংবাদটি ২৫৩ বার পঠিত
Image

আমরা এখন যে সময়ে বসবাস করছি তা অত্যন্ত কঠিন সময় বেঁচে থাকার জন্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা। আর্থিক ক্ষতি, শারীরিক দুর্বলতা পুষিয়ে নেয়া যায় কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া অনেকাংশে কঠিন। কোভিড-১৯ প্রভাবে মহাকালের মহাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা।
শিক্ষার্থী-শিক্ষক, স্কুল স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে গত ১৮ মার্চ, ২০২০ থেকে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রমসহ যাবতীয় কাজ বন্ধ করা হয়েছে।সার্বিক পরিস্থিতির কোন ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে নেই শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি কিংবা সবুজ মাঠে সমবেত কন্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনা। শিক্ষক কমনরুমে নেই শিক্ষকদের খন্ড খন্ড আলোচনা,সর্বত্র যেন শ্মশানের নিরবতা। দিনে দিনে আরো কঠিন পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি। বর্তমান সময়ে করোনা মহামারী দিন ক্রমশহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।আবার হঠাৎ বন্যার ভয়াবহতায় ডুবে গিয়েছে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলগুলো। একদিকে ভয়াল বন্যা অন্যদিকে ভাইরাস কোভিড ১৯ করোনা। মানুষজনের টিকে থাকাটাই কঠিন এই অবস্থায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে নাগাদ খুলবে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না তবুও পড়াশোনা অল্প স্বল্প হোক করতে হবে। বিপুল মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে না। সিংহভাগ অভিভাবক এ সিদ্ধান্তে খুশি আছেন আবার একটা অংশ মনে করেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া গেলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে পারলো।
বাংলাদেশ শিক্ষা ও তথ্য পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী-প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট সংখ্যা ১ লক্ষ ২৯ হাজার ২৫৮টি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৬২০টি। মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৬০টি। এর মধ্যে সরকারি ৬৭৫টি। সরকারি ও বেসরকারি মিলে দেশে কলেজের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৫১টি। এর মধ্যে বেসরকারি কলেজের সংখ্যা ৩হাজার ৯৯০টি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৩টি আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৩টি।এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-মাদ্রাসা, পলিটেকনিক, কারিগরি ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠানের অগণিত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনরাত্রির অলসকাব্য লিখে চলেছে প্রতীক্ষার প্রহর গুণে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা কবে নাগাদ খুলে দেয়া হবে তা নিয়ে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। আমরা তো কমবেশি জানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কীভাবে ক্লাস করে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনব্যবস্থা, স্যানিটেশনসহ সার্বিককাঠামো কোন পর্যায়ের। বর্তমানযুগে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেখভাল সঠিকরূপে হয় না।
আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি এদিক-ওদিক কাজে-অকাজে যখন যেভাবে পারছি নিয়ম না মেনেই। বিপণি বিতান কিংবা পাবলিক পরিবহনে নেই কোন বাস্তব উদাহরণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে কি ? স্বাস্থ্যবিধি না মানার ফলে করোনা সংক্রমিত হয়েছে অধিক মাত্রায়। আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর মিছিল হচ্ছে দীর্ঘ। জীবন থেমে থাকে না, ছুটে চলে বহতা নদীর মতো। এখন প্রশ্ন হলো আমরা কতদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখবো? আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও নিজেদের মধ্য দূরুত্ব বজায় রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব নয় তাই এখন ভরসা অনলাইন পাঠদান। সারাদেশের মতো বিভাগীয় শহর সিলেট জুড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে অনলাইনে পাঠদান করছেন এ অঞ্চলের শিক্ষকরা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে।
আমাদের এই সময় থেকে শিক্ষা নিতে হবে কীভাবে দূর্যোগ কিংবা মহামারীতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।এ নিয়ে গবেষণা করা সময়ের দাবি একই সাথে দূরশিক্ষণের জন্য একটি টিম চালু রাখা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। যাতে যেকোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় কার্যকরভাবে। বিভাগীয় শহর সিলেট অঞ্চলসহ দেশের শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাই ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যাঁদের শ্রম ও পরামর্শে এটা সম্ভব হয়েছে। অনলাইন পাঠদানে কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীরা লাভবান হচ্ছে যদিও ইন্টারনেট প্যাকেজ মূল্য সহজলভ্য নয় এবং নির্দিষ্ট এর মেয়াদসীমা দেয়া থাকে। অনেক অভিভাবক হয়তো কষ্ট করে হলেও ইন্টারনেট প্যাক কিনে দিচ্ছেন যেন তার সন্তান পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত না হয়। এই কঠিন সময়ে গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক, রবিসহ সকল অপারেটর যদি নামমূল্যে ও অনির্দিষ্ট মেয়াদসীমার জন্য ইন্টারনেট প্যাকেজ ক্রয় করার সুযোগ দিতো তাহলে শিক্ষার্থীরা লাভবান হতো এবং এসব কোম্পানি সর্ব সাধারণের প্রশংসা, পুষ্পমাল্য পেতো কিন্তু যাদের কাছে নগদ টাকা পয়সার চাহিদা বেশি সাধারণের পুষ্পমাল্য তো আর এমন কি। শিক্ষার্থীরা টাকা দিয়ে ইন্টারনেট কিনে ঠিকমতো পড়তে পারছে না কেননা অনেক অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সমস্যা যার ফলে ঠিকমতো অনলাইনে ক্লাস করতে পারে না। এছাড়াও আছে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার প্রবণতা তবুও বর্তমান বিরূপ পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষাদান হচ্ছে Something is better than nothing বর্তমানে সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস আলোচনার টেবিলে কেন্দ্রবিন্দু। এসময় শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু করতে হবে নিজেকে ভালো রাখার জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য। শিক্ষার্থীরাই তো দেশ ও দশের সম্পদ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ) হলো ভবিষ্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা। টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারটা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৮৭ সালে, ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন এর রিপোর্টে। ২০০০ সালে শুরু হওয়া ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ অর্জনের সময় শেষ হয় ২০১৫ সালে। এরপর জাতিসংঘ ঘোষণা করে ১৫ বছর মেয়াদি ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৪র্থ লক্ষ্য হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা। করোনা পরবর্তী সময়ে সারাবিশ্বে তৈরি হবে অর্থনৈতিক মন্দা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটাই কঠিন হয়ে যেতে পারে আমাদের জন্য। সবথেকে বেশি কঠিন হয়ে যাবে শিক্ষাকে মানসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। অনলাইনে শিক্ষকরা শিক্ষাদানে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন তবে আমাদের চাই সুনির্দিষ্ট দূর শিক্ষণ যাতে আমরা সব পরিস্থিতিতে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারি। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন- ‘তুমি যখন সবচেয়ে বাজে মূহুর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছো তখনো থেমোনা, চলতে থাকো।’ বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে থমকে আছে পুরো বিশ্ব, আমাদের দেশ এবং নাগরিক জীবনযাত্রা। আমরা সবাই নিজেদের জীবনের বাজে মুহূর্তের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছি তবে আমাদের থেমে যাওয়া যাবে না, চলতেই হবেই পথ। পথের তো শেষ আছে, সেই পথের শেষে প্রতীক্ষায় নতুন দিনের নতুন বিশ্ব, নতুন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পথ থেমে থাকেনা, চলবেই স্বপ্নের খুঁজে শিক্ষার আলোর পথে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT