উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০২০ ইং ১৩:০৬:৩০ | সংবাদটি ৬৮ বার পঠিত
Image

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একের পর এক নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোয় আসছে বড় ধরণের পরিবর্তন। গত ১০ বছর ধরে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এক বছর মেয়াদি থাকলেও আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে দুই বছর মেয়াদি হচ্ছে। এছাড়া এতদিন প্রাক-প্রাথমিকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হলেও এখন থেকে চার বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার এসব পরিবর্তনের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠালে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এতে স্বাক্ষর করেছেন। ফলে আগামী বছর থেকেই দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়ে গেছে। প্রথম দফায় সারাদেশে ২ হাজার ২৮৩ স্কুলে এটি চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে সারাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে। ২০০৮ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা অনুমোদন করে। ২০১০ সাল থেকে সীমিত আকারে ও ২০১৪ সাল থেকে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি করা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম সোপান হিসেবে শিশুদের পরবর্তী শিক্ষার সঙ্গে মানসিক ও ভাষাগত মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের ফলে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার কমেছে। প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার, সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও সমাপনীতে পাসের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রাক-প্রাথমিকের কারণেই। এছাড়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ পর্যায়ক্রমে চার বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; ইউনেস্কোর ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী উন্নত বিশ্বের ৫২ শতাংশ দেশে ৩ বছর মেয়াদি ও ৩৩ শতাংশ দেশে দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে। আমাদের দেশে ২ বা ৩ বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু না থাকায় শহর ও গ্রামে প্রতিনিয়ত বেসরকারি উদ্যোগে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রসার ঘটছে। এতে শিক্ষার অসম প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিবেশিত তথ্য মতে, দেশে ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে ৩৪ হাজার ৭৯৯টিতে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। ৩৭ হাজার ৬৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য একজন করে সহকারি শিক্ষক রয়েছেন। চার বছর বয়সী প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের অধিকতর যতেœর জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে যতœকারী কর্মী বা আয়া নিয়োগ করবে সরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ বছর থেকেই স্কুল ড্রেস, ব্যাগ ও জুতা কেনার জন্য পাবে ১ হাজার টাকা করে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে দেশের ১০৪টি উপজেলায় পুষ্টিকর বিস্কুট দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ১৬টি উপজেলায় রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু করা হবে। এর আলোকেই মন্ত্রিসভায় ন্যাশনাল স্কুল ফিডিং পলিসি অনুমোদন করা হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে যে, প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের টিফিন দেয়া হবে। সপ্তাহে তিনদিন বিস্কুট আর তিনদিন রান্না করা খাবার দেয়া হবে। ধাপে ধাপে সারা দেশের মোট ৬৫ হাজার ৬২০টি স্কুলেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের প্রতিটি পরিকল্পনাই অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এসব পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান সুনিশ্চিত হবেই। কিন্তু আমরা একটি বিষয় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, আর তা হচ্ছে-প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার সব ধরণের পদক্ষেপ পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন বটে; কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান মোটেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বেসরকারি কেজি স্কুলে অভিভাবকগণ হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াতে চায় কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে (একদম ফ্রি) পড়াতে চায়না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র প্রতি ১৫০-২০০ টাকা উপবৃত্তি দেয়া হয় কিন্তু কেজিতে ১ টাকাও উপবৃত্তি দেয়া হয় না। এরপরও কোন সচেতন অভিভাবক তার ছেলেমেয়েদেরকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে চাননা। এর মূল কারণ হল-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠ দান করা হয় না। একজন বেসরকারি কেজি স্কুলের শিক্ষক যেখানে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন সেখানে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সর্বনি¤œ বেতন পেয়ে থাকেন ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকের বেতন ৩০-৪০ হাজার টাকা। এরপরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি কেজি শিক্ষার মানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষকদের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রাথমিক শিক্ষকদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণেই প্রাথমিক শিক্ষার মান পিছিয়ে রয়েছে। আর এ কারণেই সরকারের সকল পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষা অফিস থেকে বারবার পরিদর্শন করা হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এত দুর্নীতি করার সুযোগ পেতেন না। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান সুনিশ্চিত করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দুর্নীতি অবশ্যই দূর করতে হবে। এ ব্যাপারে সকল কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারেরই দায়িত্ব।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT