উপ সম্পাদকীয়

মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০২০ ইং ১৩:০৯:২২ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত
Image

কৃতিত্বময় জীবনের অধিকারী হতে চায় সব মানুষ। অন্যের কৃতিত্বে গা জ্বললেও মূল কৃতিত্বটাকে সবাই পছন্দ করে। কৃতিত্বের অধিকারী হতে হলে মানুষকে অনেক কিছু করতে হয়। কৃতকর্মা হওয়ার জন্য যেসব জিনিষকে মানুষ নমুনা হিসাবে গ্রহণ করতে পারে, তার একটি হল বৃক্ষ। বৃক্ষের দু’টি দিক মানুষের জন্য জীবন্ত আদর্শ। একটি বীজের বৃক্ষ হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ভাঁজে ভাঁজে বিছানো আছে বহু শিক্ষা, বহু গ্রহণীয় বিষয়। বৃক্ষ নিজের জন্মলগ্ন থেকে পরিণত পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের পক্ষপাত থেকে মুক্ত থাকে। বৃক্ষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশায়নে কারো সঙ্গে পক্ষপাতের আচরণ করে না। একটি বৃক্ষ অপর এক বৃক্ষের বীজ থেকে জন্ম গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে সে বেড়ে উঠে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবেই। বেড়ে উঠার পথে সে বহু জায়গা থেকে সহযোগিতা নেয়, শক্তি সঞ্চয় করে। এতে তার কোনো সঙ্কোচ নেই, নেই অভিমান ও পক্ষপাত। সে সূর্য থেকে আলো গ্রহণ করে। আকাশ ও মেঘ থেকে সঞ্চয় করে পানি। বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে নেয়। জমি থেকে চুষে নেয় মাটি ও উর্বরতা। এসব জিনিষের দানে ও অবদানে ক্রমে বিকশিত হয় একটি বৃক্ষ। ফলে একটি সামান্য বীজ একটি বিশাল ছায়াবিস্তারী বৃক্ষে পরিণত হয়। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কোনো বৃক্ষ বড়াই ও পক্ষপাতের আশ্রয় নেয় না। অন্যথায় কখনো একটি বীজ বৃক্ষ হতে পারত না।
বৃক্ষের মাঝে আমাদের জীবনের জন্য আরেকটি আদর্শ হল তার সহনশীলতা ও পরোপকার। তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হলেও সে আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। বৃক্ষের জন্মলগ্নের দিকে তাকালে দেখতে পাই, একটি বীজ পচা-দুর্গন্ধময় মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়, অথচ সে কোনো অভিযোগ করে না। মানুষের এ অবিচারের বিরুদ্ধে সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে না। বৃক্ষরোপনের কিছুদিন পর পেয়ে যায় চেষ্টার সুফল, মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় জমির উপর। কেমন বিশ্রী ন্যাংড়াভাবে গজিয়ে উঠে একটি চারা। পরে সে গাছ হয়, যোগ দেয় সবুজের সমারোহে। মানুষকে দান করে ফুল, ফল, কাঠ ও অক্সিজেন। পুরো জগৎকে ভরিয়ে তুলে বসন্তে। রূপ-রস-গন্ধের নিটোল সমারোহ পৃথিবীকে মর্মরিত করে, ফলে মানুষের মন-মন্দির আকুলতায় হয়ে উঠে আবেশমুগ্ধ। এছাড়াও বৃক্ষ রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য। তাই বৃক্ষের বুকে যে অদম্য বল ও উদারতা, তার তারিফ না-করে উপায় নেই। মানুষ তার গায়ে পাথর মারে, লোহা মারে কিন্তু সে তাদেরকে উৎসর্গ করে নিজের ফল। রৌদ্রে সে ঝলসে যায়, কিন্তু মানুষকে দান করে শীতল ছায়া। সর্বোপরি যখন তাকে কেটে ফেলা হয়, তখনও সে ভোলে না চিরবন্ধু মানুষকে। বিচিত্র ফার্নিচার হয়ে আলোকিত করে মানুষের ঘর। আগুনে পুড়িয়ে ফেলুন, তবুও আপনাকে ভুলে না, আপনাকে দান করে আলো ও তাপ। মানুষ ও বৃক্ষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এক নিবিড়তম সম্পর্ক, রয়েছে পারস্পারিক নির্ভরশীলতা। বিশেষ করে মানুষ ও উদ্ভিদের পরস্পরের দেহোপযোগী সামগ্রীর জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে বিনিময়ে অক্সিজেন গ্রহণ করে। পৃথিবীতে বৃক্ষের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকলে এক সময় মানুষের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞানীরা।
মানুষও যদি বৃক্ষের মতো সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ও পক্ষপাতের পক্ষাঘাত ব্যাধি থেকে মুক্ত থেকে সেবা করে যায় এবং বৃক্ষের মতো নিজের স্বভাব গড়তে পারে, তা হলেই সে অর্জন করতে পারে মহত্ত্ব ও মর্যাদা, লাভ করতে পারে উত্তম প্রতিদান, পেতে পারে আখেরাত-জগতের ফলে-ফুলে ভরা জান্নাতের বাগান।
গাছ অবশ্যই জমির অলঙ্কার। গাছের অলঙ্কার পাতা। পাতা হল গাছের পোশাক। এ পাতাই ডালকে উলঙ্গতা থেকে রক্ষা করে। সে সঙ্গে রেশমের মতো তুলতুলে মসৃণ সাজ পরিয়ে তাকে অলংকৃত করে। আমাদের দেশে তো প্রায় গাছের রং সবুজ হয়ে থাকে। শুনেছি ও দেখেছি আমেরিকা, কানাডা প্রভৃতি দেশে কোনো কোনো মৌসুমে পাতার রঙ হয়ে যায় লাল, সবুজ ও বাদামি।
শরৎকালের শাসনে এসব রং-বেরং-এর পাতাগুলো ঝরে যায়, এমনকী গ্রীষ্মকালে গাছগুলো একেবারে বিবস্ত্র হয়ে পড়ে। আবার কিছুদিন পর এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। শুরু হয় বসন্ত। আবার নতুন পাতা, নতুন মুকুল, নতুন রং, নতুন আর নতুন, নতুনের সমারোহ। সবুজের সাজে, নব সাজের স্রোতে প্লাবিত হয় পুরো জমি। সবুজের সমারোহ মাতিয়ে তোলে আকাশকে। আকাশ এ দৃশ্য দেখে ভালবাসার উত্তাপে বিগলিত হয়। ভালবাসার বৃষ্টিবর্ষণ নিবেদন করে জমির কাছে। গাছের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আপনি। ঝুলে থাকা গাছের ডাল থেকে একটি পাতা ঝরে আপনার সামনে পড়ল। পাতাটি হাতে উঠালেন। এ রকম হয়তো অনেকবার হয়েছে আপনার জীবনে। আপনি এ পাতা হাতে তুলে চিন্তা করুন বা নাই করুন, সে কিন্তু প্রকৃতির নীরব ভাষায় আপনাকে শিক্ষা দিয়েছে। কী শিক্ষা? প্রতিটি মানুষ পৃথিবীর বাগানে একটি পাতার মতই ফুটেছিল। যে বাগানে তার ফোটা, সে বাগানে গ্রীষ্মও অবধারিত। গ্রীষ্ম ধেয়ে আসছে দ্রুত। আজ নয় কাল আপনার বাগানকে শুনসান করে দেবে গ্রীষ্মের গর্বে একদিন হারিয়ে যাবে বাগানের গৌবর।
গাছের এক অংশ শেকড়, যা মাটির নীচে থাকে প্রোথিত, আরেক অংশ তার শাখা-প্রশাখা, যা লোকচোখে স্পষ্টায়িত। কারও কারও মন্তব্য, গাছের যেটুকু অংশ জমির উপর থাকে, তার প্রায় সমান অংশ শেকড়ের আদলে জমির নীচে লুক্কয়িত থাকে। গাছ নিজের অস্তিত্বের অর্ধেকাংশকে সবুজ-শ্যামল চেহারায় ততক্ষণ পর্যন্ত জমির উপর দাঁড় করাতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের দ্বিতীয় অর্ধেকাংশকে জমির নীচে প্রোথিত করার জন্য স্বেচ্ছায় প্রস্তুত না থাকে। গাছের এ আদর্শটি মানবজীবনের জন্য সর্বশক্তিমানের পক্ষ থেকে বড় শিক্ষা। এখান থেকে মানুষ বুঝে নিতে পারে, জীবন-বিনির্মাণ ও দৃঢ়ায়নের জন্য তাকে কী কী করতে হবে।
শেকড় নীচের দিকে, আর ফল উপরের দিকে-এ হল স্রষ্টার অমোঘ নিয়ম। গোলাপ ফুল রং ও সুগন্ধির এক মানদন্ডিক সমষ্টি, যা প্রকাশ পায় শেকড়ের মাধ্যমে নয়, শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে। কিন্তু গোলাপের এ মান ও মানদন্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয়নি। এ জন্য গোলাপ গাছের একটি শেকড়কে হারিয়ে যেতে হয়েছে মাটির নীচে। তবেই না সে ছড়াতে পারে মন মাতানো ঘ্রাণ। গাছের সব শক্তি মূলত শেকড়েই। সে শেকড়কেই সমাধি দিতে হয় কাদার নীচে। শেকড়ের এ স্বেচ্ছাসমাধিতেই জীবন লাভ করে নতুন এক শক্তি।
আমরা তৃপ্তিভরে ফল খাই, ফুলের গন্ধে মেতে উঠি, শেকড়ের আত্মোৎসর্গের কথা ও সচ্ছতলার আশায় মত্ত হই, কিন্তু ভুলে যাই সাধনভূমির গভীরে শেকড় জমানোর কথা। গাছ জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সে জমির নীচে নিজের শেকড় আমানত রাখে। গাছ নীচ থেকে উপরের দিকে বাড়ে, উপর থেকে নীচের দিকে নয়। গাছ স্রষ্টার কুদরতের ভাষা-শব্দহীন এক শিক্ষক। তার দেওয়া শিক্ষা মহান ও মূল্যবান। মানবজাতির পাঠশালায় তার শেখানো অমূল্য পাঠ; পৃথিবীতে অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়।
পৃথিবীতে দু’ধরনের গাছ রয়েছে। এক, ফলবান গাছ। দুই, ফলহীন গাছ। ফলহীন গাছ লতা-পাতাময় গাছ। ফলহীন গাছ বা লতা মাসের ভেতর বড় হয়ে মাসের ভেতরে মরে যায়। পক্ষান্তরে গাছ বড় হয় বহু বছরে। তাই সে জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকে বহু বছর, এমনকি শতাব্দী পর্যন্তও। দু’ধরনের গাছের সৃষ্টি অহেতুক নয়। এতে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে জীবন ও জগতে সফলতা অর্জনের কলকব্জা শেখার জন্য।
জীবন ও জাতির বিনির্মাণে আমাদের লাউয়ের লতার মতো ছড়ালে হবে না, বাড়তে হবে গাছের মতো শক্ত মাটিতে শেকড় চারিয়ে, দীর্ঘ জীবনের আশায় বুক বেঁধে। লাউয়ের লতা দিনে দিনে বাড়ে। মাসের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ে বিশাল জায়গাজুড়ে। কিন্তু মাসের ভেতরেই আবার শুকিয়ে মরে যায়। প্রথম লাফে যত দীর্ঘ জায়গাই পার হোক মাস খানেকের ব্যবধানে তাকে দেখা যায় মানুষের পায়ের তলায় দলিত হতে। পক্ষান্তরে গাছ বাড়ে খুব ধীরে। বছরের পর বছর পার হয়ে পরিণত হয় একটি বৃক্ষে। সে পরিমাণে তার শেকড়ও মজবুত হতে থাকে মাটির পেটে। গাছ উপরে যতটুকু বাড়ে, ততটুকু তার শেকড়ও ছড়িয়ে পড়ে মাটির ভাঁজে ভাঁজে। সে শেকড় মাটির গভীর থেকে নিজের খোরাক সঞ্চয় করে। এসব চেষ্টা ও কৌশলের পরেই একটি বৃক্ষ বিকশিত হয়ে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী। তেমনিভাবে মানুষের জীবন ও জাতির স্থায়ী নির্মাণে বিস্তৃতির চেয়ে দৃঢ়তাই বেশি প্রয়োজন। দৃঢ়তা ছাড়া বিস্তৃতি মানে ভিত্তিহীন ঘর। আর ভিত্তিহীন ঘরের মতো জীবন গড়লে কাক্সিক্ষত সফলতা অধিকারে তো আসেই না , বরং তাতে রয়ে যায় ফাঁক ও ফাঁকি।
মানুষের জীবনে গ্রহণ করতে হয় গাছের জীবন বিকাশের ধীর অথচ দৃঢ় ধারাটি। আমরা যদি জীবনের শক্তিশালী ও স্থায়ী নির্মাণ চাই, তা হলে কষ্ট, সাধনা ও ধৈর্যের পাহাড় ডিঙ্গাতে হবে। জীবনকে যদি শিশুদের খেলাঘর মনে করি, তাহলে মুহূর্তে তা গড়া যাবে ঠিক, কিন্তু আবার মুহূর্তেই তা ভেঙে পড়বে। গড়তে যত না সময় লাগে, তার চেয়ে অনেক কম সময়ে তা মিশে যাবে মাটির সঙ্গে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT