উপ সম্পাদকীয়

বদলে যাওয়া পৃথিবী

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৭-২০২০ ইং ০৩:৩২:২৭ | সংবাদটি ৩৪৪ বার পঠিত
Image

পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাইরের বদলে যাওয়াকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মেনে ও নিচ্ছি। আপনি জরুরি প্রয়োজনে ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন, অফিসে যাচ্ছেন, আপনার আশপাশের সবার নাক মুখ ঢাকা মাস্ক দিয়ে, কারো কপালে প্লাস্টিকের প্রটেক্টর যা’রক্ষা করছে চোখ, নাক ও মুখ। হাতে গ্লোবস। দৃশ্যটা খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে এখন।
সবার আচরণে মনে হচ্ছে, এরকমই তো হওয়ার কথা ছিল কিংবা যুগ যুগ ধরে এরকম ভাবেই আমরা নিজেদেরকে রক্ষা করে আসছি। মানুষ কতো সহজে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, ভাবলে ভালোই লাগে আবার কিছুটা কস্ট হয়। কস্ট কেনো হয়? ভেবে দেখুন, ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত, দীর্ঘ দিন পর দেখা হওয়া বন্ধুকে আপনি দু’হাত দিয়ে ধরে উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে পেরেছেন, এই যে ভালবাসার প্রকাশ তা’ এখন আপনি ইচ্ছা থাকলে ও আর করতে পারছেন না। উষ্ণ করমর্দন ও হয়তো হারিয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে। আপনি হয়তো বন্ধু স্বজনের সাথে দেখা হলে হাত তুলে এখন অভিবাদন জানাবেন, করমর্দনের বদলে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হল, আপনার শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, আপনার সামান্য খুশ, খুশে কাশি হয়েছে, আপনার কপালে আপনার স্নেহময়ী মা কিংবা স্বজনের স্পর্শ আপনাকে যতোটুকু নিশ্চিত করতো, সেই মায়াময় প্রেমময় স্পর্শ এখন আর আপনি পাবেন না। পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, অনেক বিপর্যয় এসেছে, মানুষকে তাঁর স্বাভাবীক আচরণ পরিবর্তনে বাধ্য করেনি কোন বিপর্যয় কিংবা কোন মহামারী ।
সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং যাদুকরী পরিবর্তন এসেছে যোগাযোগ মাধ্যমে, অনুষ্ঠানের প্রকৃতি এবং অনুষ্ঠান কিংবা সভাতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে। আপনি আপনার শহরে আছেন কিন্তু সামাজিক দুরত্ত্ব বজায় রাখা যাবেনা বলে অফিসে যেতে পারছেন না, আপনার অফিসের পূর্ব নির্ধারিত মিটিং’এ আপনি অংশগ্রহন করছেন, আপনার সহকর্মীরা অংশগ্রহন করছে জুম অ্যাপ ব্যবহার করে। মিটিংযের আলোচনা হচ্ছে, সিদ্দান্ত হচ্ছে আপনি সে অনুযায়ী কাজ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। এতো গেলো, অফিসের কথা।
মানুষ মানুষের সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমাগত একা হয়ে যাচ্ছে। সেই একাকীত্ব দূর করার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ এখন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের বাইরে থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিংবা সংগঠনের পক্ষ থেকে। করোনাকালীন সময়ে যাতে মানুষ বিষন্নতায় আক্রান্ত না হয় এ’জন্য মানুষের এ’আন্তরীক আয়োজন। জুম, ওয়েবনার, স্কাইপ সহ নানারকম অ্যাপ ব্যবহার করে আলোচনা, আবৃত্তি, সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফেসবুক লাইভে। ফ্রান্স, ইতালি, আমেরিকা, বৃটেন সহ পৃথিবীর বিভিন্নদেশে বসবাসরত বাঙালিরা এরকম আয়োজনে সবথেকে বেশী উদ্যোগী। এই করোনাকালীন সময়েই বিশ্বের সকল বাঙালি নানান আয়োজনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী পালন করেছে। আগামী বছর থেকে হয়তো জাতীয় অনুষ্ঠাণ গুলো ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদযাপিত হতে পারে, যদি ও আমরা চাই, সমস্ত জাতীয় অনুষ্ঠানের পুর্বেই যেন, করোনা এ’ বিশ্ব থেকে বিদায় নেয়। এই যে ভার্চুয়েল মাধ্যমে যোগাযোগ, এ যোগাযোগ আমরা কতোদিন অব্যাহত রাখবো। এ’ যোগাযোগ কি খুব সাময়িক না এরকম যোগাযোগের মাধ্যমেই আমাদেরকে চলতে হবে অনেকদিন, এ’ প্রশ্নের উত্তর আসলে এই মুহুর্তে কারো কাছে নেই। প্রশ্নটি তোলা থাক, ভবিতব্যের হাতে।
যে সমস্থ অফিসে স্ট্র্যাস্টেজি বা কৌশল নির্ধারণ করা হয়, বুদ্ধি বৃত্তিক কাজ বেশি হয়, সে সমস্থ অফিস কি তার ভৌত অবস্থান নিয়ে থাকবে? বিশাল অফিস বিল্ডিং, এয়ার কন্ডিশনার, লিফট, ডেস্ক, অফিস সহকারী, সিকিউরিটি গার্ড, ক্লিনিং সার্ভিসের বিশাল ব্যয় নিয়ে বুদ্ধি বৃত্তিক কাজের অফিস থাকা উচিৎ কি না করোনা পুর্ব কাল থেকেই আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। এখন তো এ প্রশ্নের পালে আরও জোরেশোরে হাওয়া লেগে যাবে। যে সমস্থ অফিসে, কিছু মানুষ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজিক নির্দেশনা মুলক কাজ করেন, সে সমস্ত অফিসে হয়তো অফিসে উপস্থিত হয়ে কাজ করা লোকের সংখ্যা কমে যাবে। এটা এখন রূঢ় সময়ের বাস্তবতা ।
কম্পিউটার সায়েন্সের গবেষণায় এখন ম্যাশিন লার্নিং, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা নিয়ে ব্যপক ভাবে কাজ করা হচ্ছে। শুনলে অবাক হবেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে করোনাকালে পি, এইচ, ডি গবেষকদের বিশেষ করে কম্পিঊটার সায়েন্সের গবেষকদের গবেষনা এখন অন লাইনে হচ্ছে। গবেষকদের অধ্যাপকরা নির্দেশনা দিচ্ছেন ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে, তাদের চিন্তার আদান প্রদান ও নানা আয়পের মাধ্যমে চলছে এখন। বদলে যাওয়া সময়েকে সর্বোচ্চ বুদ্ধিবমত্ত্বা এবং কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য এরকম উচ্চতর গবেষণা কর্ম করতে তাদের একটু ও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছেনা। একটি সময় আসবে, যে সময়ে গবেষকরা গবেষণা করবেন, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং ভার্চ্যুয়েল যওগাযোগের মধ্যে কার্যকর কোনটা। আমরা তখন বোঝতে পারবো, পরিবরতিত সময়ে আমরা নিজেদেরকে কোন মাধ্যমে খাপ খাইয়ে নেবো।
এবার আমরা তাকাই অর্থনীতির দিকে। বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতি কিন্তু ইতোমধ্যে মুখ থুবড়ে দ্রুত ভূপাতিত হচ্ছে। শুরুতে সবার ধারনা ছিলো, বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত মাথা তুলে দাঁড়াবে। এরকম মহামারির ধারনা ছিলোনা বলে, মানুষ এরকম ভুল ধারনা পোশন করেছিলো। এক কোটি পচিশ লক্ষের মতো আনুষ আক্রান্ত, আর ছয়শত নিরানব্বই কোটি মানুষ ভয়ার্ত। লক ডাউনে মানুষ ঘরের মধ্যে বন্দী। চাকরি হারাচ্ছেন নানা পেশার লক্ষ লক্ষ মানুষ। চাহিদা দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। ভোগ্যপন্যের চাহিদা, বিলাসী দ্রব্যের চাহিদা থেকে শুরু করে সব্রকমের দ্রব্যের চাহিদা এখন আর করোনা পূর্বকালের জায়গায় নেই। সম্প্রতি জোসেফ ই স্তীগলিৎসের একটি লেখায় যার শিরোনাম, ‘অর্থনীতি বদলাচ্ছে, আমাদেরও বদলাতে হবে’ পড়ছিলাম তাতে তিনি পরিস্কার ভাবে বলছেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক থিওরি ও ইতিহাস, এ দুই সূত্র থেকেই জানতে পারছি বাজারে এ ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন গোটা ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে’। স্তীগলিৎসের এই মন্তব্য আমাদেরকে অনেক বড় সতর্ক বার্তা অথবা প্রস্তুতির জন্য আহব্বান জানায়। করোনাকালীন এবং করোনা পরবর্তী সময়ের অর্থনৈতির জন্য এখনই আমদের মাঠে নেমে যেতে হবে। কৌশলগত পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের জন্য আমদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।
যতোদিন আমরা করনাত্তোর অর্থনীতির দিকে যেতে না পারছি, আমাদের বাজারকে লাগাম পরাতে হবে। করোনা এবং বন্যার ভয়াল থাবায় যাদের জীবন ক্ষতবিক্ষত তাদের জন্য বাজারকে যুক্তিগ্রাহ্য আচরণে বাধ্য করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে কোন পরিস্থিতিতে জিনিস-পত্রের দাম না বাড়ানোর একটা শৃংখলা আছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশে, মৃতের সংখ্যা বাড়লে ‘কাফনের কাপড়’ কিংবা ‘চিতার খড়ির’ দাম বাড়িয়ে দিতে আমাদের ব্যবসায়ীরা একটুও কুন্ঠা বোধ করেন না। মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন করোনা নিয়ে ব্যস্ত; তখন বস্তি পুড়িয়ে দালানের ব্যবসার আয়োজন করতে ও দ্বিধা নেই আমাদের ক্ষমতার কারিগরদের।
মহামারির এই সময়ে আমরা যখন দেখতে পাচ্ছি সব কিছু সাইক্লোনের গতিতে বদলে যাচ্ছে, আমাদেরকে মেনে নিতে হবে বদলে যাওয়া। উন্নয়ন অধ্যয়নে একটি কথা আছে, পৃথিবীতে সবকিছু অস্থায়ী শুধুমাত্র একটি জিনিস স্থায়ী সেটি হলো পরিবর্তন এবং বদলে যাওয়া। বদলে যাওয়া পৃথিবীর সাথে যদি আমরা নিজেদেরকে বদলাতে না পারি... তাহলে অন্যরা এগিয়ে যাবে, আমরা রেসের মাঠে পিছনে পড়ে হাঁপাতে থাকবো। আমাদের অর্থনীতির নানান সূচক যখন সবাইকে তাক লাগিয়ে উপরের দিকে উঠছিলো, তখনই করোনার মতো বিপর্যয় সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে প্রায়। এ’ বিপর্যয় থেকে উঠে দাড়াতে হলে আমাদের প্রশাসনকে, রাজনীতিকে রাতারাতি বদলে যেতে হবে। ইতিহাসের এই ক্রান্তিকালে আমরা যদি, পরিবর্তন অনুযায়ী আচরন করতে না পারি, দুঃশাসন, লোভ, দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে না পারি তাহলে আমদের অর্থনীতি যেমন খাদে পড়ে যাবে জাতি হিসাবে আমরা ও আর উঠে দাড়াতে পারবো না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যিনি আমাদের ভরসার স্থল, তিনি কিন্তু উঠে দাঁড়িয়েছেন। সংসদে যখন চিকিৎসকদের খাওয়ার অস্বাভাবিক বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তিনি কিন্তু সুস্পস্ট ভাবে বলেছে এটা অস্বাভাবীক, তদন্তের প্রয়োজন। তদন্তে যাই বেরিয়ে আসুক, তাঁর এই দাঁড়িয়ে যাওয়ায় জাতি মনোবল পেয়ে যায়। সাধারন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, লড়াকু, পরিশ্রমী নেতৃর নেতৃত্ত্বে আমরা ঘোর অমানিশার রাত নিরাপদে পার হতে সক্ষম হবো। আমরা ভরসা নিয়ে বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় আছি সূর্যোকরোজ্জ্বল স্বপ্নের সেই ভোরের জন্য।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • জিলহজ্জের প্রথম দশকে করণীয়
  • জিলহজ্জের প্রথম দশক : ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়
  • প্রসঙ্গ : শিশুদের নিরাপত্তা
  • চেনাজানা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে করোনা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT