উপ সম্পাদকীয় মতামত

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা প্রসঙ্গ

কৃষ্ণপদ সূত্রধর প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৭-২০২০ ইং ০২:৫০:০২ | সংবাদটি ৬১৭ বার পঠিত
Image

সর্বপ্রথম গত ৮ মার্চ করোনা রোগী সনাক্ত ও ১৮ মার্চ ১ম করোনা রোগীর মৃত্যুর মাধ্যমেই আমাদের দেশে নভেল কোভিড-১৯ এর যাত্রা শুরু। এর শেষ কবে? এমনটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে বলে আমাদের ধারণায় নেই। দেশের সরকারও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অঘোষিত লকডাউন বা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেও একে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে জীবিকার প্রয়োজনেই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে। ফলে শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দেওয়ানী আদালত ছাড়া দেশের সরকারি বেসরকারি স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠানসহ ব্যবসা বাণিজ্য খুলে দেওয়া হয়েছে কিছুটা সীমিত পরিসরে। ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি ও অতীত ইতিহাস বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার এক বক্তব্যে বলেছেন- কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে এর রাশ কিছুটা টেনে ধরতে পারলেও আগামী ২/৩ বছরের মত লেগে যাবে একে নির্মূল করতে। কথাটি যে অমূলক নয়। তা সময়ই বলে দিবে বলে অনেক বোদ্ধাই মনে করছেন। যদি ও সরকার তার জায়গা থেকেই বক্তব্যটির সমালোচনা করেছে, কারণ সরকার তার জনগণের মনোবলে আঘাত দিতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। মোদ্দাকথা করোনাকে সাথে নিয়েই আমাদের সকলকে এগিয়ে যেতে হবে।
মূল বক্তব্যে চলে আসি। প্রতি বছরের ন্যায়ই গত ১লা এপ্রিল থেকে প্রত্যেক ছাত্রের তার শিক্ষা জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা’ শুরু হওয়ার কথা ছিল। সংগত কারণেই পরীক্ষাটি স্থগিত হয়ে যায়, যা আজও অনিশ্চিয়তার মধ্যে আছে। করোনাকে সাথে নিয়ে কিভাবে যথাশীঘ্র পরীক্ষাটি সম্পন্ন করা যায়, এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিমত আপনাদের সাথে বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে শেয়ার করতে চাই।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে হয়তো বা আরেকধাপ বন্ধের ঘোষণা আসতে পারে। অবশ্য এটা সময়ই বলে দিবে। যেহেতু করোনাকে সাথে নিয়েই আমাদের এগুতে হবে, অতএব স্থগিত এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি কিভাবে সর্বাধিক সামাজিক সুরক্ষা বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং পরীক্ষার্থীদের মাথা থেকে পরীক্ষার এই বোঝা ঝেড়ে ফেলা যায় তার পক্ষে কতগুলো প্রস্তাব আপনাদের সামনে তুলে ধরছি-
১. উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা-২০২০ শুরুর তারিখ করা যেতে পারে আগামী ১৭ আগস্ট।
২. ১৭ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষাসহ একটি সুচিন্তিত রুটিন প্রণয়ন করে ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশকার্য সম্পন্ন করা যায়।
৩. পরীক্ষাকেন্দ্র কর্তৃক সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড হতে পরীক্ষা সংক্রান্ত মালামাল গ্রহণের দিন বোর্ড চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (অধ্যক্ষ) মধ্যে পরীক্ষা সংক্রান্ত সভাটি ১২ আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারেন। ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আগে যেখানে ২টি সভা করা হতো, সেখানে ভাগ করে ৪টি সভা করতে হবে। (প্রেক্ষিতঃ সিলেট শিক্ষা বোর্ড)
৪. পরীক্ষাকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশ্নপত্রের সর্টিং, উপজেলাগুলোতে প্রশ্নপত্রের ট্রাঙ্ক বন্টন, একটি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী অন্য কোন কেন্দ্রে যাবে, সেই কেন্দ্রের একোমডেশন ব্যবস্থা ইত্যাদি পর্যালোচনা সংক্রান্ত জেলা প্রশাসকের সাথে জেলার অন্তর্গত সকল কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সভাটি আসন্ন ‘ঈদুল আজহা’র ছুটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সম্পন্ন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আগে যেখানে ১টি সভা করলেই হতো, সেখানে ভাগ করে ন্যূনতম ২টি সভা করতে হবে। (প্রেক্ষিতঃ সিলেট জেলা)
৫. জেলার অন্তর্গত উপজেলাগুলোতে প্রশ্নপত্রের ট্রাঙ্ক চলে যাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সমন্বয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুবিধেমত প্রশ্নপত্র সর্টিং এর ব্যবস্থা করে নিবেন। কিন্তু জেলা সদরের ক্ষেত্রে ট্রেজারি অফিসে আগে যেখানে ১দিনে প্রশ্নপত্র সর্টিং হতো সেখানে অন্তত ২ দিনে সর্টিং এর কাজ সম্পন্ন করতে হবে, নতুবা স্বাস্থ্যবিধি মানা মোটেই সম্ভব হবে না। (প্রেক্ষিতঃ সিলেট সদর)
৬. পরীক্ষা কক্ষে আগের মতই ৬ ফুট লম্বা ডেক্স বেঞ্চে ২ জন পরীক্ষার্থী বসবে। কিন্তু প্রতি ২ জোড়া ডেক্স বেঞ্চের মধ্যে অন্তত ১ ফুট ফাঁকা রাখতে হবে, ফলে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ ফুট দূরত্ব বজায় থাকবে। এতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অযথা দেখাদেখির একটা প্রবণতাও কমে যাবে এবং কক্ষের পরিবেশ আরো সুন্দর হবে। এক্ষেত্রে হয়তো প্রত্যেক পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য অতিরিক্ত ৩/৪টি কক্ষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
৭. সাধারণত পরীক্ষা কক্ষ সকাল ৯টায় খুলে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এইবার অন্তত সকাল ৮ টায় খুলে দিতে হবে। কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে একসাথে ভিড় এড়ানোর জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রবেশদ্বার সকাল পৌণে ৮ টায় খুলে দিতে হবে।
৮. প্রত্যেক পরীক্ষার দিন ট্রেজারী অফিস সকাল ৭ টায় খোলা রাখতে হবে এবং একই সময়ে ট্রেজারী অফিসারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও ট্রেজারী অফিসারের স্বাক্ষর নিতে একসাথে ভিড় এড়ানো এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে। (প্রেক্ষিতঃ সিলেট সদর)
৯. প্রত্যেক পরীক্ষার দিন পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের শেষ ঘন্টা বাজার সাথে সাথে কক্ষ পরিদর্শক পরীক্ষার্থীদের লেখা বন্ধ করার মৌখিক ঘোষণা দিবেন এবং স্ব স্ব স্থানে বসে থাকতে নির্দেশ দিবেন। পরীক্ষকগণ পরীক্ষার্থীদের খাতা সংগ্রহ করে তাদের রোল নম্বর অনুযায়ী একজন একজন করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করবেন, এতে পরীক্ষা কক্ষ থেকে পরীক্ষার্থীরা বেরিয়ে যাবার সময় গতানুগতিক যে ভিড় লক্ষ করা যায়, তা এড়ানো সম্ভব হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যাবে।
১০. আমাদের দেশের অনেক পরীক্ষা কেন্দ্রেরই বিজ্ঞানাগার যথোপযুক্ত মানসম্পন্ন নয় এবং পর্যাপ্ত আসন ব্যবস্থা না থাকার কারণে ব্যবহারিক পরীক্ষা বোর্ড নির্ধারিত তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করতে গিয়ে যথেষ্ট জটলা বা ভিড়ের সৃষ্টি হয়। চলমান পরিস্থিতিতে এই ভিড় এড়ানোর জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষার সময়সীমা ১০ থেকে ১৫ দিনের মত বাড়াতে হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক পরীক্ষাকেন্দ্র তার কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং ল্যাবরেটরির একোমডেশন বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে একটি রুটিন তৈরি করে তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলাকালীন মাঝামাঝি সময়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ডে প্রেরণ করবেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ সকল কেন্দ্রের রুটিন সমন্বয় করে অন্তঃ ও বহিঃ পরীক্ষক নিয়োগ করে প্রত্যেক কেন্দ্রের পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সকল কেন্দ্রে পরীক্ষা সম্পন্ন করার নির্দেশ দিবেন। এতে কেন্দ্র কর্তৃক প্রেরিত রুটিনের তারিখের পরিবর্তন হতে পারে।
১১. জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রচলিত অন্যান্য সকল নিয়মই যথারীতি প্রযোজ্য হবে।
১২. যেহেতু সমগ্র প্রক্রিয়াটি উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সম্পন্ন করতে নতুন কলেবরে ঢেলে সাজাতে হবে, সেহেতু সরকার বা বোর্ড কর্তৃক সকল পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য বাড়তি বরাদ্দ রাখতে হবে।
বৈশ্বিক এই মহামারীকে সাথে নিয়ে কিভাবে এগিয়ে যেতে হবে তার মডেল হলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছেন। কাজেই উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার সুবিধামত স্থগিত এই পরীক্ষাটি শীঘ্রই সম্পন্ন করতে পারবে বলে আমি মনে করি, এতে দেশের শিক্ষা কার্যক্রমের বর্তমান অচলাবস্থার নিরসন ঘটবে এবং ধীরে ধীরে তা এগিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মইনউদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজ, সিলেট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT