উপ সম্পাদকীয়

ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক মুক্তি

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৭-২০২০ ইং ০২:১৮:০২ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত
Image

আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ একজন প্রবীণ এবং প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তার রাজনৈতিক ত্যাগ এবং কর্মকূশলতা আজ তাকে দেশের শীর্ষ পদটিতে বসার যোগ্যতা এনে দিয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কিন্তু অত্যন্ত দিলখোলা আর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব। তিনি তার জীবনের সকল বিষয়ই খোলামেলাভাবে ব্যক্ত করেন নানা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানাদিতে। কিভাবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হওয়ার মানসে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাছাইপর্বে তিনি বাদ পড়েন। আইন পরীক্ষা এবং আইন পেশায় যোগদানের পর্বে নানা বৈতরণী পার হতেও তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্যর্থতার পর্বসমূহ মোকাবিলা করতে হয়েছিলো তার বর্ণনা এবং রসাত্মক উপস্থাপনা সবাইকে আনন্দ যেমন দেয় তেমনি জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে এবং লড়াকু হতে আজকের তারুণ্যকে উজ্জীবিত করে নিঃসন্দেহে।
জনাব আব্দুল হামিদ কখনও হাওয়া বুঝে পাল তুলেন নাই বরং নানা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ও একই রাজনীতির ছায়াতলে অবস্থান করেছেন দূঢ়চিত্তে। তার রাষ্ট্রনায়কোচিত উদার্যও মানুষকে মোহিত করবে। তিনি অনেক দন্ডিত অপরাধীকে শুধুমাত্র মানবিক দিক চুলচেরা বিশ্লেষণপূর্বক ক্ষমা করে দিয়েছেন। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অনেককেও দন্ড লাঘব করে দিয়েছেন শুধুমাত্র মানবিক কারণে, তেমনি তার উদার মানসিকতার ফলস্বরূপ। অনেক কারাবন্দী মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদর্শিত ক্ষমার সুযোগটি গ্রহণ করে মুক্ত জীবনে ফিরে এসেছে।
ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত তো থাকবেই। এদের কেউ কেউ আবার তাদের পুরনো অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়েছে আপন স্বভাবদোষে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির পিতৃসুলভ উদারতার সুযোগটিকে নিজ দলীয় অবস্থান এর সুফল হিসাবে বিবেচনা করেছে এবং চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী বচনটিকে নিজ আদর্শ হিসাবে পুনরায় বেছে নিয়েছে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। সে দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবদুল কালাম সাহেবও তার দারিদ্র্য জয়, আপন জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভে কঠোরতর সংগ্রাম আর নৌকার মাঝি পিতার ত্যাগ তিতিক্ষার কথা নিজ লিখিত পুস্তকে বর্ণনা করেছেন অকপটে। শিশু বয়সে মান্যবর আবদুল কালাম আকাশে ফুলঝরী বা আতশবাজীর খেলা দেখে মনে মনে পরিকল্পনা আটতেন কিভাবে এমন কিছু তৈরী করা যায় যেটি সারা আকাশকে জয় করবে। দাপিয়ে বেড়াবে অসীম নীল আকাশকে। তিনি সেটি করে দেখিয়েছেন। দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থানরত গরিষ্ঠ সংখ্যক ভারতবাসীকে তিনি উপহার দিয়েছিলেন আনবিক বোমা। সেটি তিনি নিজেই গবেষণাকর্ম সহ সকল কিছু সমাধাপূর্বক তৈরী করেছিলেন। মহাকাশে কক্ষপথ পরিক্রমন উপযোগী যান তৈরী করে সাফল্যজনকভাবে সেটি যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করেছিলেন সফলতার সাথে। তার দেশের জনগণ তার যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে মান্যবর এ.পি.জে আবদুল কালামকে। তাকে অতীব মর্যাদা সহকারে দেশটির শীর্ষ এবং অতীব সম্মানিত কিন্তু আলংকারীক পদটিতে আসীন করে। জনাব এ.পি.জে আবদুল কালাম ভারত প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির পদটি অলংকৃত করেছিলেন।
আমাদের দেশটিও নিপীড়িত আর লুন্ঠিত হয়েছে বহিরাগত শক্তির দ্বারা বারবার। এমন কোন শক্তি ছিলোনা যারা ভারতবর্ষকে শাসন করেছে কিন্তু বাংলার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেয় নাই। এই ভূমিটিকে লুন্ঠন করে নাই। নাদির শাহ চেংগিস খানরা যেমন লুণ্ঠনে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু বাংলায় না এসেও তারা কেন্দ্রীয় রাজধানীতে রক্ষিত সম্পদ সমূহ লুন্ঠন করেছিলো। এই সম্পদ এর সিংহ ভাগই ছিলো এই বাংলা থেকেই সংগৃহিত। আমাদের দেশটিকে সোনার থালা হিসাবে বিবেচনা করে নিয়ে সকল আমলের সরকারই ভারত শাসনে এগিয়ে এসেছিলেন। পনেরো শত নিরান্নব্বই সালের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনে এক নিরানন্দময় সন্ধ্যায় একটি পানভোজনালয়ে একশত পচিশজন সম্পদলোভী বনিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নাম দিয়ে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। মূলধন জোগাড় হয় পচাত্তর হাজার পাউন্ড। পনেরোটন ওজনের একটি জাহাজ ঠিক করা হয় ভারত নামক সম্পদশালী দেশটির উদ্দেশ্যে অভিযাত্রা পরিচালনায়। এটির নামছিল হেকটর। তারপরে অনেক কাহিনী। অনেক লুন্ঠন বঞ্চনার ইতিহাস। শেষমেষ রাণী ভিক্টোরীয়া কোম্পানীটির কাছ থেকে ভারত সা¤্রাজ্যটির শাসনভার অধিগ্রহণ করেন। সেখানেও ছিলো লুন্ঠনের মানসিকতা। একশত উনআশী বছরের ইংরেজ শাসনামলে ভারত থেকে সোনা দানা, হীরা জহরত সহ নানাবিধ সম্পদরাশী পাচার করা হয় তৎকালীন ব্রিটেনে। নয়শত জাহাজ ভর্তি এসকল মহামূল্যবান দ্রব্যাদি সাত সাগর তেরো নদীর ওপারে পৌঁছানো হয় আর ফিরতি পথে উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে জাহাজগুলিতে মাটি বোঝাই করে নিয়ে আসা হয়। ওই মাটি এনে খালাস করে হুগলী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে তোলা হয় একটি সুন্দর ভূমিখন্ড। সেইখানটিতে গড়ে তোলা হয় ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গটি।
পরবর্তীতে যখন দেশভাগ এবং স্বাধীনতা লাভ এর পথ সুগম হয় যুক্ত বাংলাকে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার দাবী সোচ্চার হয়ে উঠে। সেখানেও ইংরেজ আইনবিদ স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ কাঁচি চালিয়ে দুই দেশের সীমানা ঠিক করে দিতে গিয়ে আমাদের বাংলাটিকে একেবারে খন্ডিত ও বঞ্চিত একটি অংশ হিসাবে রেখে দেন। ফলশ্রুতিতে আবারো তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত হয় আমাদের এই বাংলাটি। ক্ষমতার লড়াই আর ভোগের প্রতিযোগিতায় যখন সবাই লিপ্ত তখন একজন তরুণ নেতা আপন চিন্তাভাবনায় এই ভূখন্ডটিকে সকল ধরনের লুটেরা আর শোষণমুক্ত করার প্রত্যয় ধারণ করেন। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর ছত্রচ্ছায়ায় এজাতিয় লড়াকু একাধিক নেতাদের সমন্বয় ঘটে কিন্তু নানা পরীক্ষা, ত্যাগ-তিতীক্ষার মাপকাঠিতে টিকে থাকেন মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই এই বাংলার মুক্তিসনদ ছয়দফা ঘোষণা করেন এবং প্রকারান্তরে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতার রূপরেখার প্রকাশ ঘটান। অন্যদিকে কাগমারী সম্মেলনে মাওলানা ভাসানী এরও আগে শোষক গোষ্ঠিকে আসসালামু আলাইকুম বলে বাংলার স্বাধীকার তথা স্বাধীনতার ঘোষণাটি জানান দেন যদিও সেটি সে সময় এতো পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে অর্জন করার মতো সাংগঠনিক ভিত্তি ছিলোনা। যাই হোক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব এর নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় সমগ্র জাতি একতাবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। ত্রিশলক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। নতুন দেশ গড়ে তুলে শোষণমুক্ত এবং জালিম আর লুটেরামুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়ে অগ্রযাত্রা শুরু হয়। অদ্যাবধি সেই কর্মসূচী অব্যাহত আছে।
মোদ্দা কথাটি হলো, সত্যিকার অর্থেই কি আমরা লুটেরামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, নাকি একটি শোষণমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তুলতে পেরেছি? আমরা জানতাম তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে বাইশটি পরিবার ছিলো লুটপাটতন্ত্রের কারিগর বা মূল হোতা। এখন আমরা দেখছি প্রায় বাইশ হাজার পরিবার গড়ে উঠেছে জাতীয় অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি হিসাবে। এদের অঙ্গুলী ইশারায় জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। শেয়ার বাজার-এর অর্থ লোপাট হয়। মাথাপিছু প্রবৃদ্ধিহার বিঘিœত হয়। আমাদের দেশের ব্যাংক সমূহের প্রধান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে বিরাট সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন যারা শত কোটি টাকার মালিক। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা স্বল্প সময়ে আপন কোচড় ভর্তি করেছেন সম্পদ আর অর্থ দ্বারা। এদের অনেকেই শত টাকার নোট কামাই করার যোগ্যতা না রাখতে পারলেও কোন এক অদৃশ্য শক্তির মায়াবলে তারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। যারা বাঁদী আর বেগম এর পার্থক্য বুঝতে ছিলো অক্ষম আজ তারাই গড়ে তুলেছে বেগম পাড়া। সেটি আবার বিদেশের মাটিতে। এসকল অর্থগৃধুরা বিদেশ যাওয়ার কল্পনা যেখানে করতে পারে নাই বরং আকাশে উড়ন্ত বিমান দেখে চোক বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতো তারাই আজ আস্ত বিমান ভাড়া করে পরিজনসহ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। শোনা যায় এখন পর্যন্ত এদের কাছে লুকোনো অর্থ দিয়ে দেশের জন্য একাধিক বাজেট সম্পন্ন করা যেতো। ওই পথে কিন্তু কেউ হাটছে না। বরং জনগণকে কামধেনু বানাচ্ছে। সদ্ভবঃ তদ্ভবঃ।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে
  • কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
  • একটি খেরোখাতার বয়ান
  • পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
  • জীববৈচিত্র এবং মনুষ্য সমাজ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • Image

    Developed by:Sparkle IT