বিশেষ সংখ্যা

সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু কথা

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০২০ ইং ১৩:০০:২১ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত
Image

আমি আমার কথা বলতে পারি। যত ব্যস্ততা থাকুক, সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর আমার প্রথম কাজ দৈনিক সিলেটের ডাকে চোখ বুলানো। আমার ধারণা, আমার মত হয়তো আরো অনেকেই এইরকম আছেন। এই পত্রিকাটি যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করেছে আঞ্চলিক দৈনিক হিসেবে, তার মূল্যায়ন নিশ্চয়ই পত্রিকাটি আমার মতো তার সব পাঠকের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। আমার কাছে সিলেটের ডাক প্রতিদিন তাই সকালের প্রথম উপহার।
আজ ১৮ জুলাই দৈনিক সিলেটের ডাক এর ৩৭ তম জন্মদিন। ১৯৮৪ সালের এইদিনে যাত্রা শুরু করেছিলো দৈনিক সিলেটের ডাক। সেই হিসাবে সিলেটের ডাক ৩৭ বছরে পা দিয়েছে। সাধারণত ১৮ বছর বয়সে মানুষ সাবালক হয়। সেদিক থেকে একটি দৈনিক কাগজ হিসেবে সিলেটের ডাক তারণ্য পেরিয়ে পৌঢ়ত্বে পৌঁছেছে বলা যায়। আর এই সময়ের মধ্যে এটি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সিলেট বিভাগের অন্যতম পাঠকনন্দিত পত্রিকা হিসাবে।
পত্রিকাটির সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। সেই থেকেই দেখে আসছি একটি আঞ্চলিক দৈনিক হিসেবে এর অগ্রগতি। সময়ের সাথে সাথে পত্রিকাটি নিজেকে করেছে প্রস্ফুটিত। আর সেই সাথে অন্যদের ও করেছে বিকশিত। কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকদের এক সূতিকাগার হচ্ছে দৈনিক সিলেটের ডাক। অনেক লেখক সিলেটের ডাকে লিখে নিজেকে করেছেন পরিচিত। পেয়েছেন লেখক হিসাবে স্বীকৃতি। সিলেটের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে সিলেটের ডাক এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে সহযোগিতা, গুণীদের মূল্যায়ন, এবং নবীনদেরকে উৎসাহ দেয়ার ব্যাপারে সিলেটের ডাক অতুলনীয়।
২.
এডমান্ড বার্ক ছিলেন বৃটিশ একজন রাজনীতিবিদ। একইসাথে তিনি ছিলেন একজন লেখক ও দার্শনিক । আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী এই রাজনীতিবিদ ১৭৫০ সালে ইংল্যান্ড চলে আসেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ১৭৬৬ সাল থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনের পার্লামেন্টে নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তিনি ১৭৮৭ সালে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে সংসদীয় বিতর্কে বক্তৃতাকালে সংবাদপত্রকে ‘ফোর্থ স্টেট’ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। তার মতে, তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজের চারটি প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে : অভিজাত শ্রেণি (ফার্স্ট স্টেট), ধর্মযাজক শ্রেণি (সেকেন্ড স্টেট), সাধারণ মানুষ (থার্ড স্টেট) এবং সংবাদপত্র (ফোর্থ স্টেট)। তিনি আরো মনে করেন, এই ফোর্থ স্টেট অর্থাৎ সংবাদপত্র এদের সবার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ টমাস কার্লাইল তার ‘বুক অন হিরোস অ্যান্ড হিরো ওরশিপ’ বইয়ে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
বহু বছর আগে বার্কের সংবাদপত্রকে দেয়া এই আখ্যা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে সংবাদপত্রের ভূমিকা, দায়দায়িত্ব আর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক। তাই বলা যায়, শুধু ঘটিত বা সংঘটিত বিষয়ের বিবরণ পেশ করা ছাড়া ও রাষ্ট্রে ও সমাজে সংবাদপত্রের আরো অনেক বিশাল ও বিচিত্র ভূমিকা রয়েছে। আর এই দায়িত্ববোধের কথা মাথায় রেখেই ক্রমশ এগিয়েছে দৈনিক সিলেটের ডাক।
স্বাধীন সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, তা বাংলাদেশে ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় যে উত্থান ও পতন ঘটে, তার সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ওঠানামা করে। তারপরও যে কয়েকটি পত্রিকা নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পেরেছে, তার মধ্যে দৈনিক সিলেটের ডাক একটি। কাগজটির মালিক দানবীর রাগীব আলী একজন শিল্পপতি। কিন্তু উনার কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নেই। তা যে সত্যই নেই, তার প্রমাণ পত্রিকাটি যারা নিয়মিত পড়েন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন। পত্রিকাটি কারো তাবেদারী বা লেজুড়বৃত্তি করে না। বস্তুনিষ্ঠ আর নিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ এই পত্রিকাটি।
৩.
অন্যান্য বছরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চেয়ে দৈনিক সিলেটের ডাক এর এই বছরের প্রারম্ভ খানিকটা আলাদা। কারণ, এই মুহুর্তে করোনাভাইরাসের তান্ডবে জনজীবন ব্যাহত। আমরা সবাই বর্তমানে এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বয়স ও পেশা নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ একের পর এক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। মারা যাচ্ছেন। আর এই লড়াই কবে শেষ হবে সেটা ও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ।
বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র পড়েছে বিরাট সংকটে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রকে আর কখনো পড়তে হয়নি আগে কোনোদিন। সংবাদপত্র পুরোপুরি চালু রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। ঘরে ঘরে সংবাদপত্র পৌঁছানো ও সম্ভব হচ্ছে না। প্রকাশনা চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক পত্রিকা। পত্রিকার সার্কুলেশনও গেছে কমে। বিজ্ঞাপনও প্রায় বন্ধ। আর সেই সাথে সংবাদ সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সাংবাদিকরা যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলে জনগণ সঠিক তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। আর তাই সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও পড়ছেন ঝুঁকির মধ্যে। ইতিমধ্যেই অনেক সংবাদকর্মীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
এই সংকটের মধ্যে অনেক সংবাদপত্র সমন্বয় সাধন করে চলছে। কেউ কেউ বিকল্প ব্যবস্থায় প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। অনেকেই আবার এরই মধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে। এদিকে আবার বিজ্ঞাপন বন্ধ এবং সার্কুলেশন কমে যাওয়ায় সংবাদপত্রের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক পত্রিকা পড়েছে আর্থিক সংকটে। কর্মীদের বেতন দেওয়ার মতো আর্থিক জোগানও নেই অনেক পত্রিকার।

আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলো মূলত বেসরকারি উদ্যোগে প্রকাশিত। তারপরও গণমাধ্যমের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের সহায়তার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে করোনা সংকট মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন সেক্টরের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তাই সরকার এর উচিত সংবাদপত্রের জন্য ও বিশেষ প্রণোদনার চিন্তা করা। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রশিল্প টিকিয়ে রাখতে অন্তরবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সরকারের ভূমিকার ও প্রয়োজন রয়েছে।
আর পত্রিকাগুলোর উচিত সময়ের সাথে কিভাবে নিজেকে যুগোপযোগী করে এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়, তার উপর নজর দেয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক সংবাদপত্র এখন মুদ্রণের পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণের উপর জোর দিচ্ছে। আর পাঠকও অনেকটা বাধ্য হয়েই সেদিকে ঝুঁকছে। প্রতিদিনের সংবাদ মানুষ অনলাইনে সাথে সাথে পেয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য মুদ্রিত সংবাদপত্রের সাথে সাথে একটি শক্তিশালী অনলাইন সংস্করণের উপর সংবাদপত্রগুলোকে জোর দিতে হবে। এই দিক দিয়ে দৈনিক সিলেটের ডাক অনেকটাই পিছিয়ে আছে বলা যায়। বিষয়টি ইতিবাচক নয়। তাই দৈনিক সিলেটের ডাককে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।
৪.
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে লেখা ‘নববর্ষে’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন/ বর্ষ হয় গত!/ আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কবিতাখানা যদিও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে লেখা। তবুও সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই কবিতার খানিকটা প্রাসঙ্গিকতা আছে এই অর্থে যে কবিতাটি পুরাতন যত গøানি আছে সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
সমালোচকদের চোখে সিলেটের ডাক এর অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। এটি অস্বাভাবিক নয়। একটি প্রতিষ্ঠান সমাজের সব মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও দাবি পূরণ করতে পারে না। কিন্তু তারই মাঝে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যায়। সিলেটের ডাক ও সেইভাবেই এগিয়েছে। তার প্রমাণ এর ক্রমবর্ধমান পাঠকসংখ্যা। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই শুভলগ্নে দৈনিক সিলেটের ডাক এর ব্যবস্থাপনা, সম্পাদকীয় দপ্তর, সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি রইলো অভিনন্দন। দোয়া করি দৈনিক সিলেটের ডাক অমিতায়ু হোক। আরো এগিয়ে যাক সামনের দিনগুলোতে।
লেখক - কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • আদর্শ সাংবাদিকতার ধারক
  • শুভ কামনা দৈনিক সিলেটের ডাক
  • শুভ জন্মদিনে আলোকপাত
  • তরুমনি, জন্মদিনে যাচ্ছি
  • সিলেটের ডাক : সিলেটের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সাঁইত্রিশের তারুণ্যে উদ্দীপ্ত আমরা
  • পাঠক-প্রত্যাশার সবটুকুই পূরণ করতে চাই
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সিলেটের ডাক
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সিলেটের ডাক : সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক একটি সংবাদপত্র
  • সিলেটের ডাক : আমাদের সংবাদপত্র
  • পাঠকের নির্ভরযোগ্য বন্ধু
  • সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু কথা
  • সিলেট অঞ্চলের শীর্ষ দৈনিক
  • দৈনিক সিলেটের ডাকের জন্মদিনে
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • Image

    Developed by:Sparkle IT