বিশেষ সংখ্যা

সিলেটের ডাক : সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক একটি সংবাদপত্র

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০২০ ইং ১৩:০২:৩৪ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত
Image

দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর সাপ্তাহিক সংবাদপত্র থেকে, দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকেই পুর্ব বাংলার মানুষের মুখপত্র হিসাবে কাজ করা শুরু করে। ছেষট্টি সালে ছয় দফা ঘোষণার পর পর পত্রিকাটি সাত কোটি বাঙ্গালির সবচেয়ে বিশ্বস্থ তথ্য ও সংবাদ প্রদানের উৎস হয়ে দাড়ায়। সাধারণ বাঙ্গালির কাছে ইত্তেফাকের দেয়া তথ্য, সংবাদ বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন এতোই বিশ্বাস যোগ্য হয়ে উঠেছিলো, ঘুম থেকে উঠেই মানুষ পাগলের মতো ইত্তেফাক পড়ার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠতো। খবরটি ইত্তেফাক প্রকাশ করেছে, এ খবর কখনো ভুল বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হতে পারেনা, এরকম বিশ্বাস মানুষের অন্তরে প্রোথিত ছিলো। কোন একটি খবর ও তথ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্ব›দ্ব সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত ইত্তেফাকের শরণাপন্ন হতো মানুষ, ইত্তেফাকে যেহেতু এই তথ্য বা খবরটি এ’ ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, এ’ জন্য খবরটি সত্য ও নির্ভুল, এরকম বিবেচনা ছিলো পাঠকদের। পত্রিকাটির প্রতি মানুষের এতো আস্থা, নির্ভরতার কারণ কি ছিলো? কারণকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে তবে একটি কথা খুব জোর দিয়ে বলা যায়, ইত্তেফাক সব সময় জনগণের পক্ষে ছিলো। কথাটা আক্ষরিক অর্থে শুধু নয়, কথাটা প্রকৃত অর্থেও। ইত্তেফাক এবং মানিক মিয়া যেমন বাঙালির প্রাণের মানুষ হয়ে দাঁড়ালেন তখন, ঠিক একই ভাবে বিবিসি এবং মার্ক টালিও। বিবিসির ভোরের খবর এবং বিশেষ করে দিনের শেষে সন্ধ্যার খবরের জন্য রাস্তার পাশের দোকানে কিংবা রাস্তা সংলগ্ন বাড়ি কিংবা রেডিও’র দোকানের সামনে মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যেতো, যে করে হোক বিবিসির সংবাদ শুনতেই হবে। আমাদের এ’প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের, এ দৃশ্য এবং সংবাদ মাধ্যমের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতার এ’ বিষয়টি বুঝিয়ে বলা খুবই কষ্টকর। বিবিসি’র সংবাদ এবং প্রতিবেদনের জন্য মানুষের আস্থার ও একই কারণ, বিবিসি ছিলো জনগণের পক্ষে।
জনগণের পক্ষে থাকার অর্থ কি? কোন কোন পত্রিকা বা খবর ভিত্তিক ইলেক্ট্রোনিক টেলিভিশন চ্যানেল আত্মপ্রকাশে পুর্বে কিংবা পরে অনবরত বলে যেতে থাকে, “আমরা নিরপক্ষে নই, আমরা জনগণের পক্ষে”। এ’ কথাটি অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বলা হয়ে থাকে, তবে এ’কথা অমোঘ সত্য, আপনি যদি সত্যিকারভাবে জনগণের পক্ষে থাকেন, তাহলে জনগণ আপনার পত্রিকাকে অথবা নিউজ চ্যানেলকে এড়িয়ে যাবেনা। যদি তা’ না হয় জনগণ কিন্তু সচেতন ভাবে ওই সংবাদ মাধ্যমকে অবিশ্বাস করবে এবং সযতনে এড়িয়ে যাবে। আমার এই বক্তব্যের পক্ষে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ আছে। পর্যবেক্ষণ কিংবা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ হলো, পাকিস্তান আমলে, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রাণাধীন বেতার ও টিভির প্রতি মানুষের চরম অনাস্থা। দেশে যখন জনগণের পক্ষে, অধিকার আদায়ের পক্ষে লাখো জনগণ রাজপথে, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রানণাধীন বেতার ও টিভি তখন সারের দাম, ভাতের বদলে আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বেড়াতো। ক্ষমতাসীন সরকার ও তার মতামত প্রকাশের দায়িত্ব যে নিয়েছিলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রাণাধীন বেতার ও টিভির সেই বৃত্ত, সেই লেজুড় বৃত্তি থেকে এখনও কি বেরিয়ে আসতে পেরেছে? আমরা এরশাদ সরকারের শাসনের সময় দেখেছি আবার রাস্তায় মানুষের ভিড়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরম আগ্রহ এবং কৌতুহল নিয়ে দেশীয় সংবাদ মাধ্যমে আস্থা নিতে না পেরে বিবিসি শোনার জন্য জড়ো হতো। রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের প্রতি মানুষের ছিলো চরম অনাস্থা, তার কারণ ছিলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রাণাধীন বেতার ও টিভি কোনভাবেই সাধারণ মানুষের কাংখিত খবর পরিবেশন করতোনা বা পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যেত।
ওই যে জনগণের পক্ষে থাকার কথা বলছিলাম তা হলো, জনগণের অধিকার, বঞ্চনা, আশা আকাংখাকে ধারণ করে জনগণের কথা প্রতিফলন ঘটানো। জন-আকাংখা বাস্তবায়ন করে যদি কোন সংবাদপত্র, বাধাহীন ভাবে এগিয়ে যায় তাহলেই, সে সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যম জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের প্রেক্ষিতে, ইত্তেফাক এবং বিবিসির চেয়ে ভালো উদাহরণ এই উপমহাদেশে আর আছে কি না, আমি জানিনা।
ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হলো অনেক, বৃহত্তর সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক, “সিলেটের ডাকে”র সাইত্রিশতম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে লেখাটি শুরু করেছিলাম। ভূমিকাটি বড় হলেও মনে হয় প্রয়োজন ছিলো। দৈনিক সিলেটের ডাক, কি করে এতো বছর পার করলো? এ সময়ে সিলেটে অনেক দৈনিক সংবাদপত্র আন্তরিকতার সাথে তাদের পথ চলা শুরু করে।অনেকেই পুর্নোদ্যমে পথ চলছে এখনো। আবার অনেকেই কিছুদূর গিয়েই থমকে দাঁড়িয়েছে । অনেকেই পথ চলা বন্ধ করেছে। সবার উদ্দেশ্য এবং প্রচেষ্টার কি খুব ঘাটতি ছিলো? আমার মনে হয় ছিলো না। তা’ হলে ? “ট্রু রিফ্লেকশন অব পাবিøক ওপিনিয়ন” ওই যে জন আকাংখার সঠিক প্রতিফলন অবশ্যই “সিলেটের ডাকে” অন্য অনেক সংবাদ পত্রের তুলনায় বেশি ছিলো। আঞ্চলিক সংবাদ পত্র হিসাবে সিলেটের ডাক তার ভুমিকা, জনগণের মনের কথা তুলে ধরতে পেরেছে বলেই মানুষ সিলেটের ডাক’কে আস্থায় নিয়েছে। অথবা সিলেটের ডাক জনগণের আশা, আকংখাকে বুঝতে পেরেছে বলেই, জনগণের মুখপত্র হতে পেরেছে। জনগণের আস্থা ভাজন হওয়ার সুচক কি? প্রাথমিক সূচক প্রচার সংখ্যা, এই সূচকে সিলেটের ডাকের আশে পাশে এই মুহুর্তে মনে হয়, আর কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। আচ্ছা আলোচনার খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়, অন্য অনেকগুলো পত্রিকা সমসাময়িক কালে অনেক মান সম্পন্ন। অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু যথেষ্ট মান বজায় রেখে আপনি যদি আপনার বক্তব্য নিয়ে সাধারণ্যে উপস্থিত হতে না পারেন অথবা সাধারণ মানুষ আপনার মানকে আস্থায় না নেয় তাহলে, সার্বিক ভাবে সেই সংবাদপত্রটিকে নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে আধুনিক সিলেটের সবচেয়ে, স্বপ্নচারি প্রবাদ প্রতীম ব্যক্তিত্ব প্রয়াত আমীনুর রশীদ চৌধুরীর কথা, তিনি বলেছিলেন, সংবাদপত্র মূলত সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম, সংবাদ পত্র শুধু মাত্র সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিনোদনের মাধ্যম নয়। এই কথাটি প্রথম আলো উত্তর আমারিকা সংস্করনের একটি লেখায় যুগভেরী পত্রিকার প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহবুবু রহমান আমদের প্রিয় মাহবুব ভাই উল্লেখ করেছিলেন। তাই কোন একটি সংবাদ পত্রকে পাঠক প্রিয় হতে হলে ভাবতে হবে, আমাদের সংবাদ পত্রে কি পাঠকের মনকে পড়তে পেরেছে, পাঠকের চাহিদার সত্যিকারের প্রতিফলন কি হচ্ছে, প্রতি নিয়ত। সংবাদ পত্রটি কি সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক। এসব বিষয় না ভেবে এগিয়ে গেলে পিছিয়ে পড়া, ঝরে পড়া সময়ের ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যদি আমাদের সিলেট অঞ্চলের সংবাদ পত্রের ইতিহাসে দিকে একটু দৃষ্টি নিক্ষেপ করি তাহলে দেখতে পাবো সিলেট অঞ্চলের( সুরমা বরাক উপত্যকা) “শ্রীহট্ট প্রকাশ” ছিলো প্রথম সংবাদ পত্র, এটি ছিলো একটি পাক্ষিক সংবাদ পত্র। ১৮৭৬সালে পিয়ারী চরণ দাসের সম্পাদনায় পত্রিকাটি পথ চলা শুরু করে।সুরমা বরাক উপত্যকার প্রথম বাংলা পত্রিকা এটাই এবং সারা আসামে দ্বিতীয়। ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হয় বিপিন চন্দ্র পালের “পরিদর্শক”পত্রিকা। সিলেটের লালদীঘির পুর্ব পারে একটি দোতলা বাড়ির উপরতলায় থাকতেন বিপিন চন্দ্র পাল, এবং এ বাড়িরই নিচের তলায় ছিল পত্রিকা অফিস”। “শ্রীহট্ট প্রকাশ” থেকে “যুগভেরী” পর্যন্ত যদি একটি ইতিহাস রেখা তৈরি করি, জনশক্তি, দেশবার্তা কে বিবেচনায় রেখে, অবশ্যই এই রেখার সর্বশেষ এবং বর্তমান নাম হবে “দৈনিক সিলেটের ডাক”। এগিয়ে যাওয়ার পথ রেখায় সিলেটের ডাক অবশ্যই সকলের আস্থায় নেয়ার মতো দৈনিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।


“সিলেটের ডাকে” বেশ কিছুদিন থেকে লেখালেখির সুত্রে আমার সাথে দৈনিকটির সরাসরি একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ’ ছাড়া সিলেট শহরের একজন নাগরিক হিসাবে “সিলেটের ডাক”কে আমি জন্মলগ্ন থেকে পাঠক হিসাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সার্বিক পর্যবেক্ষণে আমি দেখেছি, সিলেটের ডাক, শত ফুল বিকশিত করার নীতিকে ধারন করেছে। সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, বৃহত্তর সিলেটের গহীন গ্রামের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংবাদ প্রকাশে সবসময় তৎপর পত্রিকাটি। সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সকল মতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সকলের মত প্রকাশ যাতে নিশ্চিত হয়, এ ব্যপারে সিলেটের ডাকের আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। এ’ ছাড়া সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক হওয়ার একটা চেষ্টা সিলেটের ডাককে ক্রমাগত জনপ্রিয় করে তুলছে। সিলেটের ডাক মনে হয় ইতোমধ্যে “সকলের” পত্রিকা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। পত্রিকাটি “আমার”, “আমাদের” কথা বলে, এই পত্রিকা পড়লে “আমার” “আমাদের” সংবাদ পাওয়া যাবে, আমার ধারণা পত্রিকাটি নিজেকে এই পর্যায়ে উন্নীত করতে পেরেছে বলেই বৃহত্তর সিলেটের সর্বাধিক মানুষ সিলেটের ডাক পত্রিকাটি পড়েন।
সিলেটের ডাকের জনপ্রিয়তা, সংবাদপত্রটির দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আমি মনে করি। এ’ কারণেই পত্রিকাটির মান উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করে যেতে হবে। জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার জন্য, বর্তমান প্রচেষ্টাকে যথেষ্ট মনে করার কোন কারণ নেই। সময় ও জনআকাংখা দ্রæত পরিবর্তন হচ্ছে। জনআকাংখাকে সঠিক ভাবে পড়তে হলে, পত্রিকাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে, জনআকাংখার অধ্যয়ন করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী নানা কিছুর সংযোজন ও বিয়োজন ঘটাতে না পারলে, ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুব মসৃন হবে না। পত্রিকাটির বিষয় বৈচিত্র্য, অঙ্গসজ্জা, সংবাদ পরিবেশনের মান, পাঠকের সাথে অব্যাহত যোগাযোগকে কার্যকর ও গতিশীল করে তুলতে হবে। আমরা আশা করবো, সিলেটের ডাক তার অর্জিত জনপ্রিয়তাকে, দায়িত্ববোধ হিসাবে গণ্য করে তার বহুমাত্রিক উন্নয়নের জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। সিলেটের ডাকের প্রতি মানুষের আস্থা, নির্ভরতা আরও বাড়বে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই ক্ষণে এরকম আন্তরিক প্রত্যাশা করছি।
লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • আদর্শ সাংবাদিকতার ধারক
  • শুভ কামনা দৈনিক সিলেটের ডাক
  • শুভ জন্মদিনে আলোকপাত
  • তরুমনি, জন্মদিনে যাচ্ছি
  • সিলেটের ডাক : সিলেটের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সাঁইত্রিশের তারুণ্যে উদ্দীপ্ত আমরা
  • পাঠক-প্রত্যাশার সবটুকুই পূরণ করতে চাই
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সিলেটের ডাক
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সিলেটের ডাক : সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক একটি সংবাদপত্র
  • সিলেটের ডাক : আমাদের সংবাদপত্র
  • পাঠকের নির্ভরযোগ্য বন্ধু
  • সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু কথা
  • সিলেট অঞ্চলের শীর্ষ দৈনিক
  • দৈনিক সিলেটের ডাকের জন্মদিনে
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • Image

    Developed by:Sparkle IT