বিশেষ সংখ্যা

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সিলেটের ডাক

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০২০ ইং ১৩:০৫:৫৮ | সংবাদটি ১৫৪ বার পঠিত
Image

সিলেট থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সিলেটের ডাক। আজ ১৮ জুলাই সিলেটের ডাক আত্মপ্রকাশের ৩৬ বছর পূর্ণ করে গৌরবের সঙ্গে ৩৭ বছরে পদার্পণ করল। পত্রিকাটি দৈনিক হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর অনেক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বয়ে চলেছে নিরবধি। নদী যেমন এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে, তেমনি সিলেটের ডাকও। নৈর্ব্যক্তিক তার পথচলা। কত শত্রæ-মিত্রর মোকাবিলা করে, তাদের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে সিলেটের ডাক নিজেকে ঋদ্ধ করেছে। শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করে আজ পূর্ণ-যৌবনা। দেশের আর পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার মতো সিলেটের ডাকের আছে নিজস্ব ঐতিহ্য। আছে একটি বিদগ্ধ পাঠকসমাজ। পান থেকে চুন খসলে যাঁরা কেউ সরাসরি, কেউ টেলিফোনযোগে, কেউ ইন্টারনেটে ভুল ধরিয়ে দেন, শুধরে নেওয়ার লক্ষ্যে। সুদূর টরেন্টো, নিউইয়র্ক, লন্ডন, জেদ্দা, মক্কা, আবুধাবি, ঢাকা থেকে ফোন করে, ম্যাসেজ পাঠিয়ে যেমন ছোট-খাটো ভুল ধরিয়ে দিতে আন্তরিকভাবে প্রয়াসী হন, তেমনই নির্ভীক, নৈর্ব্যত্তিক সাংবাদিকতার প্রশংসাও করেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ চিঠি লিখে সরাসরি, টেলিফোনেও তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নিঃসংকোচে। তাদের মতামতকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেন কর্তৃপক্ষ।
এমন কিছু শুভানুধ্যায়ীর কথা আমরা জানি, যাঁরা দৈনিক সিলেটের ডাক হাতে পাওয়ার পর প্রথমেই দেখেন পত্রিকাটি কতটি বিজ্ঞাপন পেল, বা আদৌ পেয়েছে কিনা। যদি পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন দেখেন, তখন তাঁরা আশ্বস্ত হন, আর বিজ্ঞাপন না থাকলে বিমর্ষ হন। হিসাব কষেন। খবর নেন। পত্রিকাটির ব্যয় নিয়ে তাঁরাও ভাবনা-চিন্তা করেন। বিশেষত, বিভাগীয় শহর থেকে প্রকাশিত এ দৈনিক সংবাদপত্রকে কীভাবে দীর্ঘজীবী করা যায়, এ নিয়ে তাঁরাও মাথাব্যথা অনুভব করেন।
আগেই বলেছি, সিলেটের ডাকের একটি নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। আছে অতীতও। সে প্রায় ৩ দশক থেকে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর মত ধাপে ধাপে এ পর্যায়ে এসে পৌছেছে। দৈনিক এ পত্রিকাটির ৩৬ বছরের পথ পরিক্রমা নেহাৎ মসৃণ ছিল বলবনা। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বিভাগীয় এ শহর সিলেট থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দৈনিক পত্রিকাগুলোর সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে বারবার হোচট হয়ত খেয়েছে। কিন্তু যাত্রা বিরতি করেনি।
আজকাল জাতীয়ভাবে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ তো এক ধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই তো কালো টাকা সাদা করার মানসে, প্রশাসন তথা রাজনৈতিক নেতৃবর্গকে বø্যাকমেল করার লক্ষ্যে, বাণিজ্যিক ব্যুৎপত্তি লাভের আশায় দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করেন, কেউ কেউ টিভি চ্যানেল করেন। এভাবেই চলছে ব্যাপকহারে সংবাদ-ব্যবসার নামে সংবাদ-হত্যা। নগদ কয়েক লক্ষ টাকা অর্থাৎ কাঁচা পয়সা যাদের হাতে আছে, তাদের অনেকেই এখন স্বপ্ন দেখেন একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করার। কেউ কেউ করেছেনও বিভিন্ন নাম দিয়ে। এসব পত্রিকার অনেকগুলোর অস্তিত্বও আজ আর নেই।
যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করেছিলেন জীবন-জীবিকা নির্বাহ করার লক্ষ্যে, তাঁদের আজ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। চোখে সরষেফুল দেখছেন। অথচ যত দিন এই সংবাদপত্রগুলো, টিভি চ্যানেলগুলো জীবিত ছিল, এই সংবাদকর্মী এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই কি মোটা অংকের মাইনে, গাড়ি-বাড়িসহ বিলাসী জীবন যাপন করছিলেন। আমজনতাকে ঠকিয়ে যে প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মীবৃন্দ দিনে দিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছিলেন, তখন তো তাঁরা কাউকে ভাগের হিসসা দেননি। জেনে শুনে বিষপান করেছিলেন। সাংবাদিকদের কাছ থেকে অন্তত এমন বিসদৃশ আচরণ কখনো কাম্য হতে পারে না। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে...’ কবিতার চরণগুলো সকলেরই জানা। ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সে অনুযায়ী তুলনামূলক বেশি মাইনে দিয়ে বশংবদ তৈরি করে রেখেছে তারা। নিজেদের মর্জি অনুযায়ী বশংবদ তৈরি করে রেখেছে এই সকল প্রতিষ্ঠান। নিজেদের মর্জি অনুযায়ী খবর তৈরি করে লবণ-লঙ্কা মিশিয়ে চটুল করে পাঠকদের গেলাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সক্ষম হচ্ছে যা সকল সংবাদপত্র যা সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে অশনি সংকেত।
দৈনিক সিলেটের ডাক তার জন্মলগ্ন থেকেই এমন খবর তৈরির প্রবণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই আস্থাটুকু বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছ থেকে আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে সিলেটের ডাক। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে এটা আমার বিশ্বাস। দৈনিক ‘সিলেটের ডাক’ অনেকের মতো আমার কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে, দূরের মানুষকে একান্ত কাছের করে তুলেছে, অচেনা অজানার সঙ্গে আমার নিকটতম পরিচয়ের যোগসূত্র রচনা করেছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে, মানুষের বিচিত্র কার্যকলাপ ও চিন্তাধারার বাস্তব রূপায়ণকে প্রত্যক্ষভাবে দেখে নেবার সুযোগ কোনো সংবাদপত্রের পাতায় কারো ঘটে না। কিন্তু প্রতিদিনকার সিলেটের ডাকের পাতায় চোখ রাখলে এসব অদেখা মানুষকে আমরা দেখাতে পাই, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের কর্মধারার সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। সিলেটের ডাক পৃথিবীর প্রতিবিম্ব নিজের বুকে চিহ্নিত করে আমাদের ছোট ছোট ঘরে আত্মপ্রকাশ করছে।
এই পত্রিকাটিতে চলতি দুনিয়ার কয়েকটি নির্দিষ্ট খবর যে মুদ্রিত থাকে তা নয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান, খেলাধূলা, বিচিত্র আমোদ-প্রমোদ, জীবিকা উপার্জনের সন্ধান ইত্যাদি নানা বিষয় স্থান করে নিয়েছে। বাইরের বড়ো পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় তুলে দেবার গুরুদায়িত্ব নিয়েছে ‘সিলেটের ডাক’। তাই একেবারে প্রথম পাতাতেই হতবাক হই যখন দেখি, সিলেটের বাজারে আগুন’। পরে জানতে পারি এ আগুণ ‘ছন বাড়ি বাজারে’ নয় পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে জিনিসপত্রের চড়া দামের ‘আগুন’। দেশের মন্ত্রীরা যখন বলেন, ‘‘রাজনীতির চেয়ে সিনেমা জগৎ ভালো’’-তখন মনে হয়, শিক্ষা জগৎ কিংবা খেলাধূলার জগৎ কি তার চেয়েও ভালো নয়?
‘মাঠে-ময়দানে’ সিলেটের ডাক এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সম্পাদকীয় পৃষ্ঠাটি যেমন রাজমুকুটের মধ্যমণি। যথার্থ জনসেবার দায়িত্ব নিয়ে সত্যনিষ্ঠ, নির্ভীক, নিরপেক্ষ ভাবনাকে পাথেয় করে ‘সম্পাদকীয়’ পাতায় পক্ষপাতহীন ভাবনা সত্যিই বিরল দৃষ্টান্ত।
সিলেটের ডাক অবশ্যই যথার্থ জনসেবক। কারণ প্রতিদিনই এই পত্রিকাটি বৃহত্তর সমাজকল্যাণকে তুলে ধরছে পত্রিকাটি ধীরে ধীরে এতদঞ্চলের জনগণকে রাজনীতিক ও সমাজনীতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলছে। এই পত্রিকার মাঝে মাঝে এমন লেখকের লেখা পাই, যাঁরা শুধু লব্ধপ্রতিষ্ঠ কলমচি নন, সমাজের প্রতিকূল সময়ের কান্ডারী। লেখাগুলো বারবার মূল্যবান হয়েছে এই কারণেই যে লেখকেরা তাঁদের রচনার মধ্য দিয়ে সমাজে কী নেই, কী হতে পারে, কী হওয়া দরকার, তা দেখবার চেষ্টা করেছেন। লেখাগুলো পড়ে মনে হয় এঁরা সৃষ্টিশীল। এঁরা শুধু তৈরি মঞ্চের লেখক নন, মঞ্চ তৈরির লেখকও বটেন।
লেখক হিসাবে নয়, সংবাদপত্র পাঠক হিসাবে ‘সিলেটের ডাক’ আমার কাছে এমনই এক নেশা এটা সকালে না পেলে ফোন করতে ইচ্ছা হয় সার্কুলেশন বিভাগে। আমি মানি না, ‘অতিরিক্ত সংবাদপত্র পাঠে সাহিত্য অরুচি হয়।’ সিলেট অঞ্চলে আর যা কিছুর অভাব থাক না কেন, সংবাদপত্রের অভাব নেই। দৈনিক ছাড়াও সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, দ্বিমাসিক, ত্রৈমাসিক, বার্ষিক-সবধরনের সংবাদপত্র আছে; এগুলো বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর-বৈচিত্র্য ‘কর্মখালি’তে, বৈচিত্র্য ‘হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ’-এ। আমি চাই ‘সিলেটের ডাক’ হোক গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।’
দৈনিক সিলেটের ডাক নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে পত্রিকাটি জনদরদিই শুধু নয়, এটি একটি নির্ভীক পত্রিকা। আত্মপ্রত্যয়ে পত্রিকাটি একনিষ্ঠ। এর নিরপেক্ষ ও উদার দৃষ্টিতে পাঠকরা ঋদ্ধ ও নন্দিত। জনগণকে সত্য ও মঙ্গলের পথে চালিত করাই বুঝি ‘সিলেটের ডাকের’ অভিন্সা। ‘সিলেটের ডাক’ শুধু শহরমুখী নয়, গ্রাম জীবনের স্পন্দন এতে অনুভূত হয়। পত্রিকাটির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পত্রিকাটি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাফল্য লাভ করেছে, তা হল এতদঞ্চলে কম শিক্ষিত মানুষেরাও ‘সিলেটের ডাক’ এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
দৈনিক সিলেটের ডাক এ অঞ্চলে কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রশংসা করে, কিন্তু তোষামোদ করে না। সমালোচনা করে, কিন্তু নিন্দা করে না। দৈনিক সিলেটের ডাক ৩৭ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে এর বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। সিলেটের ডাক পরিবারের সকল সদস্য-সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখকদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • আদর্শ সাংবাদিকতার ধারক
  • শুভ কামনা দৈনিক সিলেটের ডাক
  • শুভ জন্মদিনে আলোকপাত
  • তরুমনি, জন্মদিনে যাচ্ছি
  • সিলেটের ডাক : সিলেটের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সাঁইত্রিশের তারুণ্যে উদ্দীপ্ত আমরা
  • পাঠক-প্রত্যাশার সবটুকুই পূরণ করতে চাই
  • বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সিলেটের ডাক
  • জন্মদিনের শুভেচ্ছা
  • সিলেটের ডাক : সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক একটি সংবাদপত্র
  • সিলেটের ডাক : আমাদের সংবাদপত্র
  • পাঠকের নির্ভরযোগ্য বন্ধু
  • সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু কথা
  • সিলেট অঞ্চলের শীর্ষ দৈনিক
  • দৈনিক সিলেটের ডাকের জন্মদিনে
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • Image

    Developed by:Sparkle IT