উপ সম্পাদকীয়

আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৭-২০২০ ইং ০৩:০৮:৪৩ | সংবাদটি ২৫১ বার পঠিত
Image

অষ্টপ্রহর যে পরিবেশে আপনি জীবন যাপন করছেন, সেই পরিবেশ আপনাকে এতোই প্রভাবিত করে যে, ইচ্ছা করলেই তার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। প্রথম প্রথম যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটছিলো, তখন আপনার পরিচিত লোকের সংখ্যা খুব কম ছিলো, দ্রুত করোনা আপনার পরিচিত বৃত্তে ঢুকে যাচ্ছে। যতোই আপনার পরিচিত বৃত্তে করোনা হানা দিচ্ছে, ততোই আপনার মন ও দেহ নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
আজ লেখা শুরু করার আগে পণ করেছিলাম করোনা নিয়ে কিছু লিখবোনা, কিন্তু লেখা শুরুর সাথে সাথেই করোনা প্রসঙ্গ চলে আসলো। মানুষের মন ও চিন্তার সূত্র খুব জটিল। মনের ভেতরে মন, তার ভেতরে মন। মানুষের সাধারণ মন আর অবচেতন মনের সংযোগ ও খুব আকর্ষণীয় ও জটিল। দেখবেন, আপনি যে বিষয় বা ব্যক্তিকে নিয়ে কখনো ভাবেননি বলে মনে করছেন, তাকে আপনি স্বপ্নে দেখছেন। ভেবে ভেবে ক্লান্ত, এ’ বিষয় বা এ মানুষ, মানুষগুলোকে কেনো স্বপ্ন দেখলেন আপনি। কিন্তু আপনার অবচেতন মন কখন কিভাবে সঙ্গোপনে ওই বিষয় বা ব্যক্তিকে তার কোঠোরীতে সঞ্চয় করে রেখেছে সযতনে, আপনি তা’ জানেন না। সঞ্চয় করে রেখেছে বলেই, আপনি স্বপ্নে সেই বিষয় বা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে পান। অনেক সময় দেখবেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনি মনে করতে পারছেন না, কিন্তু আপনার কাছে আপাত গুরুত্বহীন বিষয় অবলীলায় আপনার স্মৃতিতে থেকে যাচ্ছে। স্মৃতি সঞ্চয়ের এই প্রক্রিয়াটি জটিল ও বিস্ময়কর। অবচেতন মন অনবরত, নির্ধারণ করছে কোন স্মৃতিকে ধরে রাখবে আর কোন স্মৃতিকে ছেড়ে দেবে। এভাবেই আমাদের মনে স্মৃতি জমছে, স্মৃতি বিলীন হচ্ছে।
মানুষের চিন্তার সূত্র খুব ইন্টারেস্টিং। আপনি যখন কোন কিছু নিয়ে ভাবছেন, তখন সেই ভাবনারও কিন্তু যৌক্তিক বিন্যাস আছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি উদাহরণ দেই। কয়েকদিন আগে কর্মহীন হয়ে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষদের নিয়তি নিয়ে একটি লেখার কথা ভাবছিলাম। নিয়তির ভাবনার প্রাথমিক যৌক্তিক চিন্তা সূত্র হলো টিভি, এবং সংবাদপত্রে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষদের নিয়ে প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন যখন দেখছি, তখন হঠাৎ করে শ্যাক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটকের কাহিনী মনে হলো। কেনো মনে হলো? কারণ একদা পাঠ্যবই হিসাবে ম্যাকবেথ আমাকে বারবার পড়তে হয়েছে। সেনাপতি ম্যাকবেথের রাজা হওয়ার আগেই তিনি জেনে যান ডাইনিদের ভবিষ্যৎবাণী থেকে যে তিনি রাজা হবেন। আরও অনেক নিয়তি নির্ভরতা আছে এই বিখ্যাত নাটকটিতে। ম্যাকবেথ নাটকের কাহিনীর ঘুরপাক খেয়েছে নিয়তিকে কেন্দ্র করে। আমার অবচেতন মনে নিয়তি ও ম্যাকবেথ সমার্থক হয়ে জমা পড়েছে। যদিও ম্যাকবেথ নাটকে নিয়তির ভূমিকা এবং আমাদের কর্মহীন মানুষের নিয়তির বিষয়টি ভিন্ন কিন্তু আমার অবচেতন মন আমাকে নিয়তি বলার সাথে সাথেই ম্যাকবেথকে মনে করিয়ে দিয়েছে। এভাবেই আমাদের চিন্তার সূত্রগুলো, আমাদেরকে নুতন নুতন চিন্তার জন্মদিতে সহায়তা করে থাকে।
আর একটি উদাহরন দেই , যেমন আপনি রাস্তা দিয়ে হাটতে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন, কোন এক কিশোর ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। সেই ঘুড়ি আপনাকে নিয়ে যাবে আপানার ছোট বেলার পাড়ার মাঠে,পাড়ার বন্ধুদের কাছে। সেই বন্ধুদের মুখ সেলুলয়েডের ফিতার মতো একটি করে করে আপনার চোখের সামনে দিয়ে আসতে থাকবে। ঘুড়ি, মাঠ, বন্ধু, দস্যিপনা, বন্ধুদের নিয়ে অনেক মজার স্মৃতি অনেক অনেক ঘটনা এই বিন্যাসে চলে আসবে। এর মধ্যে মধুর স্মৃতি আপনাকে আনন্দ দেবে আর কিছু অমধুর স্মৃতি আপনাকে অপরাধ বোধ, এবং হতাশা ও দিতে পারে। রোমান্টিক মানুষদের চিন্তা সুত্রে আবেগ প্রচন্ড ভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের দেশে অতি সাধারণ মানুষদের একটি ধারনা আছে, রোমান্টিসিজম ও প্রেম বোধ হয় সমার্থক। এ কথাটি মোটেই ঠিক বলা যাবে না। রোমান্টিসিজমের সাথে আছে কল্পনা, সৌন্দর্যবোধ, সাহসীকতা, অর্থাৎ চরম বাস্তবতার বিপরীত বিষয়গুলো আছে রোমান্টিসিজমে। যে কথা বলছিলাম, রোমান্টিক মানুষগুলোর চিন্তায় কল্পনা ও আবেগ এতোই প্রভাবিত করে যে তাঁরা দিনের পর দিন কল্পনা করে কাটিয়ে দিতে পারেন। সেই চিন্তাকে যারা সুবিন্যস্ত করে সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারেন তাঁরা হয়ে ওঠেন কবি, দার্শনিক, বিজ্ঞানিসহ অনেক নুতন ও বিচিত্র চিন্তার ধারক।
তাহলে আজকের লেখার চিন্তা সূত্রকে আমি কী করে ব্যাখ্যা করবো? এ লেখার আদি চিন্তা সূত্র কী? শুরুতে আমি চিন্তা করেছি, করোনার কারণে সৃস্ট পরিবেশে আমাদের মনে যে বিষন্নতা তৈরি করছে তার থেকে দূরে থাকা যায় কিভাবে সে প্রসঙ্গে কিছু লিখবো। তারপর ভাবলাম করোনা সৃস্ট নয়, আমাদের যাপিত জীবনের জটিলতা থেকে সৃস্ট বিষন্নতা নিয়ে লিখবো, করোনা নিয়ে পাঠকের মনে আর বিষন্নতা সৃষ্টি করা উচিৎ নয়। বিষন্নতার বিষয় থেকে আসলো, স্মৃতি, স্বপ্ন, রোমান্টিসিজম এবং মনোবিজ্ঞান। আমি আসলে চিন্তা, স্মৃতি নিয়ে যা কিছু বলেছি সবকিছু কিন্তু মনোবিজ্ঞানেরই বিষয়। মনোবিজ্ঞান আমার খুব প্রিয় বিষয়, পাঠ্য-অপাঠ্য হিসাবে ভালো লাগার কারণে আমাকে মনোবিজ্ঞানের কিছু বিষয় পড়তে হয়েছে। মনোবিজ্ঞান থেকে বিষন্নতা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কোনভাবেই করোনাকালকে পাশ কাটাতে পারিনি। এভাবেই আজকের লেখার চিন্তা সুত্র অগ্রসর হয়েছে।
আমাদের দেশে আমরা দেহের ব্যপারে যতোটুকু যতœশীল মনের ব্যপারে আমরা মোটেই ততোটুকু যতœশীল নই। আপনার চারপাশে যারা আছেন, তাদের কথা ভাবেন, সবাই কিন্তু কৃত্রিম,নকল হাসিতে মনের বিষন্নতাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কথা বলেন আন্তরিকভাবে, তার মনের গভীরে প্রবেশ করেন, দেখবেন বাইরের হাসি খুশি মানুষটির সাথে ভেতরের সেই মানুষটির অনেক অমিল। মানুষ সারাটি জীবন নিজেকে আড়াল করে রেখে জীবনটা কাটিয়ে দেয়।
প্রতিটি মানুষের মনের গহীনে অজস্র গল্প আছে। আপনি প্রতিদিন যার পাশে বসে সহকর্মী হিসাবে আপনার কর্মস্থলে কাজ করে যাচ্ছেন, তাকে কি আপনি চিনেন? তার মনের ভেতরের, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনাকে কি আপনি অনুভব করেন? কিংবা আপনার ভেতরের মানুষটিকে কি তাঁকে দেখতে দেন? আসলে সময় যতো এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের মনোজগত ও ভয়ঙ্কর রকম জটিল হয়ে উঠছে। মানুষ অনেক কথা বলেনা, কিংবা নিজের কথা গুলো লুকিয়ে রাখে, প্রাইভেসি বা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় এ অজুহাতে। প্রাইভেসি রক্ষা করতে করতে কিছু মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কারো কাছে নিজেকে প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকে, মানসিক যন্ত্রণায় অন্তর্মুখী বা ইনট্রোভার্ট মানুষ কোন এক সময় আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নেয়।
জীবন যখন এতো জটিল ছিলোনা। জীবনে যখন এতো প্রতিযোগিতা ছিলোনা, মানুষ কিন্তু তার সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা কারোনা কারো কাছে প্রকাশ করতো। আবাহমান বাংলায় মানুষ বট গাছের নীচে, গ্রামের খোলা মাঠে, নানা উৎসব পার্বনে নিজেদের নিত্যদিনের সুখ দুখের বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। মানুষের বিষন্নতার কথা, কিংবা মানিসিক ভাবে জটিলতার কথা তখন খুব কম শোনা যেত।
মনোবিজ্ঞানীরা ক্রান্তিকালে, বিষন্নতার সংবাদ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে বলেছেন। দুটি কারণে, একটি হলো, ধারাবাহিকভাবে বিষন্নতার সংবাদ আপনাকে বিষণœতার রোগে আক্রান্ত করতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো, বিষন্ন হলে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে, আপনি এই মহামারিতে, অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হলে, সেই রোগের সাথে অসম লড়াইয়ে আপনার পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
করোনাক্রান্ত মানুষের দুর্দশা যদি আপনাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে, আপনি অবশ্যই করোনা নিয়ে প্রচারিত সংবাদ, প্রতিবেদন থেকে দূরে থাকবেন। জীবনকে আনন্দময় করে তোলার জন্য আপনার প্রিয় বিষয় নিয়ে প্রিয় মানুষদের সাথে কথা বলেন। সৃষ্টিশীল কাজ, যেগুলো করে আপনি আনন্দ পান, সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্য এ’ গুলোর চর্চা করে দিন যাপন করেন। মোদ্দা কথা হলো, আপনার অবচেতন মন ভয়ার্ত হয়ে যায় সেরকম কাজ থেকে দূরে থাকবেন। আপনি যদি পরিবারের অভিবাবক হন তাহলে পরিবারের সকল সদস্যদের যাপিত জীবন যাতে আনন্দময় হয় সে দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি এ সময়ে চাকরিচ্যুত হতে পারেন, আপনার প্রাপ্ত বেতন অর্ধেক হয়ে যেতে পারে, আপনার বহুদিনের জীবন মান, অর্থাৎ আপনার আবাস, আপনার ভোগ্যপণ্য, আপনার পোষাকের মান হয়তো বজায় রাখা সম্ভব না ও হতে পারে। মনে রাখতে হবে কোন কিছুই জীবনের সমতুল্য নয়। জীবনকে সতেজ, সবল রাখতে না পারলে, ক্রান্তিকালে আপনি আলোর রেখা দেখতে পাবেন না। আমাদের সবাইকে এখন মানসিকভাবে সবল হতে হবে, যে সবলতা শুধু আপনার মঙ্কে নয় আপনার দেহকেও প্রানশক্তি যোগাবে, আপনি যে কোন বিপর্যয় আপনার থেকে সবল হতে পারবেনা। সতেজভাবে বাঁচার জন্য সবাইকে তাই জীবনের আনন্দ যজ্ঞে আমন্ত্রণ জানান।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT