'/> SylheterDak.com.bd
উপ সম্পাদকীয়

করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ

মুহাম্মদ ইমদাদুল হক ফয়েজী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৭-২০২০ ইং ০৩:১৬:৩৮ | সংবাদটি ৮৪ বার পঠিত
Image

আমাদের চারপাশে রয়েছেন অসংখ্য অসহায়, নিঃস্ব, বাস্তুহীন, অভাবগ্রস্থ এবং খেটে-খাওয়া মানুষ। চার মাসেরও অধিক সময় ধরে মহামারী করোনা ভাইরাস সকলের সামগ্রিক জীবন যাত্রা আরোও কঠিন ও বেদনাদায়ক করে তুলেছে। গোটা বিশ্ববাসীর মতো আমরা এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও অনেকটা বিপর্যস্ত। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা বানের পানিতে ভাসছে। কোথাও কোথাও দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বারের মতো বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।কঠিন এ ক্রান্তিকালে এসব জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটা থমকে গেছে, দুর্বিষহ হয়ে ওঠেছে। অপরদিকে কর্মহীনতা আর বেকারত্বে নিম্নবিত্তদের মতো মধ্যবিত্তরাও চরম কষ্ট আর দুর্ভোগে সময় পার করছেন। এদের কেউ মুখ খুলে কারও কাছে বলছেন, আবার কেউ লজ্জাবোধ করে তাদের দুরবস্থার কথা কারও কাছে প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছেন। কঠিন এ পরিস্থিতিতে আমাদের পারস্পরিক সহানুভূতিশীল হওয়ার কোনোও বিকল্প নেই।সমাজের বিত্তবানরা বন্যাদুর্গতসহ সকল প্রকার অসহায়দের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত অভাবগ্রস্থদের প্রতি কল্যাণের হাত প্রসারিত করাও এখন সময়ের দাবি। আমাদের সকলকে নিজ নিজ সাধ্যের আলোকে পারস্পরিক দয়াপরবশ হতে হবে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, নিঃস্ব, দুর্বল, অনাথদের প্রতি এগিয়ে আসতে হবে। তাদের কল্যাণার্থে উদ্যোগী হতে হবে এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মানবতার প্রেম, ভালবাসা দিয়ে দুঃখ, কষ্ট, দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠতে হবে। বস্তুত, মানবসভ্যতায় সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, ভালবাসা আছে বলেই পৃথিবীটা এতো সুন্দর, আকর্ষণীয়, উপভোগ্য এবং ছন্দময়। ইসলাম মানবতার ধর্ম। দুর্বল, দুঃখীজনের প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি ও আদর্শ।স্মর্তব্য যে, পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ ও সহানুভূতিশীল জীবনাচার ইসলামি সমাজনীতির অন্যতম দর্শন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, সৎকাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না...। (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২) আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেন, আর আত্মীয়স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্থ ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপচয় কর না। (সুরা ইসরা, আয়াত : ২৬) আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন,তাদের (ধনীদের) সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার।; (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ১৯)। রাসুল (সা.) বলেন, ওই ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (আদাবুল মুফরাদ)সময় এখন পারস্পরিক কল্যাণকামীতা, সহানুভূতি ও সহযোগিতার। একদিকে করোনা, আরেক দিকে বন্যা, আবার সমাগত মহিমান্বিত উৎসব- ঈদুল আযহা। ঈদে দুঃখীদের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজন, তাদের মুখাবয়বে একটুকরো হাসি ফুটানো, খুব বেশি প্রয়োজন। পারবো তো- পারস্পরিক সুখ-দুঃখ, হাসি-খুশি ভাগাভাগি করতে? বিভিন্ন দাতব্য ও সামাজিক সংস্থা তুলনামূলক দরিদ্র, অবহেলিত, আর্তপীড়িত ও বন্যাদুর্গত জেলাগুলোতে অধিকহারে পশু কোরবানি বা গোশত সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করবেন- একান্তভাবে কামনা ও প্রত্যাশা।রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কল্যাণকামীতাই দ্বীন। (মুসলিম) কোনোপ্রকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে বিষয়টির গুরুত্ব দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইসলাম কল্যাণকামীতাকে শুধু দ্বীনের সাথে সম্পৃক্তই করেনি বরং কল্যাণকামীতাকে দ্বীন (ধর্ম) আখ্যায়িত করেছে। অর্থাৎ, অপরের মঙ্গল ও কল্যাণকামীতাই দ্বীন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক লোক রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করল, ইসলামের উত্তম কাজ কোনটি? রাসুল (সা.) বললেন, কারও মুখে আহার তুলে দেওয়া...। (বুখারি) রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হবে, মহান আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের পার্থিব কষ্ট বা বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তার কষ্ট বা বিপদ দূর করে দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম) আবার কঠিন হৃদয়ের লোকদের সতর্ক করে রাসুল (সা.) বলেন,যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না। (বুখারি ও মুসলিম)রাসুল (সা.) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পরোপকারী, দানশীল, কল্যাণকামী ও মহান হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন সকলের একান্ত আপনজন। কারোও কষ্ট দেখলে তিনি ব্যথিত, অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়তেন। রাসুল (সা.) কোনোদিন কোনও সওয়ালকারীকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি। শুধু মুসলিম নয়, অমুসলিম দুর্বলদের প্রতিও তাঁর দান-অনুগ্রহ বিস্তৃত ছিল। অসহায়-দুঃখীজনের মুখে হাসি ফোটানো ছিল তাঁর নির্মল চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট। অভাবগ্রস্থদের প্রতি সর্বদা তাঁর অনুগ্রহ, সহযোগিতার হাত প্রসারিত থাকতো। অন্যের কষ্ট লাঘবে তিনি পাগলপারা হয়ে যেতেন। তিনি ছিলেন সম্বলহীনের সর্বোচ্চ নিবেদিতপ্রাণ সহযোগী। আনাস (রা.) বলেন- আমি রাসুল (সা.) এর চেয়ে অধিক দয়ালু লোক দেখিনি। (মুসলিম) আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এর দানের হাত এতোটা প্রসারিত ছিল যে, আমার মনে হয়, সকাল বেলা যদি তাঁর কাছে ওহুদ পরিমাণ সম্পদ রাখা হয়, তবে সন্ধ্যার আগেই তিনি সব দান করে দেবেন। (বুখারি ও মুসসিম)বৈশ্বিক মহামারী কভিড-'১৯ থেকে পরিত্রাণ লাভ করা এখন গোটা বিশ্ববাসীর একান্ত প্রার্থনা এবং প্রাণের দাবী। করোনা ও বন্যার এ কঠিন দুঃসময় কাটিয়ে ওঠতে আমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর এবং ফলপ্রসূ পন্থা হচ্ছে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহায্য, সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও দান-সদকার প্রতি আরোও মনোযোগী হওয়া। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর তবে তা ভাল; আর যদি গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্থকে দাও তা তোমাদের জন্য আরও ভাল; এবং এতে তিনি তোমাদের জন্য কিছু পাপমোচন করবেন।' (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭১) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,যারা নিজেদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে তাদের প্রতিদান তাদের রব-এর নিকট রয়েছে। আর তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৪) রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন,বান্দা যতক্ষণ তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করে আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্য-সহযোগিতা করেন। (মুসলিম)অন্যান্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, দান-সদকা বিপদ-বিপর্যয় দূরীভূত করে, জীবনে সমৃদ্ধি এনে দেয়, পাপমোচন করে, ক্ষমা লাভের মাধ্যম হয়, আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচিয়ে রাখে, অসুখ-বিসুখ থেকে সুস্থতা পাওয়া যায়।আসুন, আমরা একটু সচেষ্ট হই। প্রেম-মমতায়, আমাদের মহানুভবতার হাত বিস্তৃতভাবে প্রসারিত করি। আমাদের উদ্যোগ, প্রচেষ্টায় হয়তো অসহায়-ক্লিষ্টদের দুঃখ যন্ত্রণার অবসান হবে না; তবে আমাদের এ প্রেম, এ মানবতাবোধ একটি বারের জন্যে হলেও, তাদের বিষন্ন মুখে ফুটিয়ে তুলবে প্রাণখোলা হাসি। আমরা প্রিয় বস্তু লাভ করার মাধ্যমে যেভাবে আনন্দ-খুশির জোয়ারে নেচে ওঠি, তারা আমাদের ওই একটু ভালবাসায় আনন্দ-সুখে এর থেকেও বেশি তৃপ্তি, প্রশান্তি অনুভব করতে পারে। কবির মতো আমাদেরও উপলব্ধি হোক- সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • কোরবানী : ঈমানের পরীক্ষা
  • বন্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ভূমিকা
  • শিক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে
  • বিসিএস এবং অন্যান্য আলোচনা
  • হজ্ব বাতিলের ইতিহাস
  • মহামারী করোনা ও সেবার মানসিকতা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT