⬇ PDF VERSION

একটা রিকশাওয়ালাকে আপনি যুক্তি দিয়ে কোন কথা বোঝালে সে অনেক সহজেই তাতে সায় দেবে। মাথা নেড়ে বলবে "হ, আপনি ঠিকই কইছেন।" কিন্তু একটা শিক্ষিত ডিগ্রিওয়ালা লোককে আপনি তার চেয়ে শক্তিশালী যুক্তি দেখালেও তার মেনে নিতে অনেক কষ্ট হবে, যদি সেটা তার মতের বিরুদ্ধে যায়। কেন?

এর কারণ রিকশাওয়ালাটি স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় তার মাথা ফিলোসফি আর নানা তত্ত্বকথার বাহুল্যে পরিপূর্ণ হয়ে যায়নি। নতুন আগত বিষয়কে সে খুব সহজেই মাথায় বসাতে পারে। কিন্তু সেক্যুলার শিক্ষিত লোকটি তার সারাজীবনের ধ্যানধারনা, আদর্শ আর থিওরি দিয়ে মগজটা ভরিয়ে রেখেছেন, নতুন কোন থিওরি বা যুক্তিকে জায়গা দেওয়াটা তার মস্তিষ্কের পক্ষে কঠিন। আরবের সাধারন লোকগুলো ইসলামের বেসিক প্রিন্সিপাল যত সহজে আয়ত্ত করেছিল আজকের শিক্ষিত সমাজ তত সহজে তা গ্রহণ করতে পারে না। এর মূলেও একই ব্যাপার।

তাওহীদের বাণীটা খুবই সহজ-সরল। কিন্তু এই সহজ সরল বাণীটা ধারন করতে হলে বাকি সব কঠিন কঠিন আদর্শ, ফিলোসফিকে বিসর্জন দিতে হয়। এক আল্লাহ্‌র দাসত্ব মেনে নিলে অন্যসব তত্ত্ব আর প্রবৃত্তির দাসত্ব ছুঁড়ে ফেলতে হয়। একটা অসুস্থ মানুষের কাছে মুখরোচক খাবার ভালো লাগে না। সেটাকে ভালো লাগানোর জন্য রোগটাকে তাড়ানোর দরকার হয়।

রোগ যদি প্রাকৃতিকভাবে হয়ে থাকে তবে তা প্রাকৃতিকভাবেই সেরে যায়। হয়তো কিছু চিকিৎসা দরকার হয়, ওষুধের জন্য কয়টা টাকা খসে। তবু যায়। তবে যে রোগ ইনজেকশন দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তা থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। রোগী রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, জানতেও পারে না। পয়সনিং এর এফেক্ট রাতারাতি ধরা পড়ে না, তবে যখন পড়ে তখন অলরেডি সেভিয়ার কেস।

এমন এক ইনজেকশনের বিষ নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিষের নাম জাতীয়তাবাদ।

অনেকে জাতীয়তাবাদকে দেশপ্রেমের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। দুটো দুই জিনিস। দেশপ্রেম মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। শুধু মানুষ কেন, প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে তা বর্তমান। একটা কুকুরকে বাড়ি দিয়ে তাড়িয়ে দিলে সে আবার ফিরে আসে। ফিরে আসে মনিবের টানে, ঐ জায়গাটার টানে। এটা দেশপ্রেমের সাথে তুল্য। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ এক মানসিক রোগ, যা মানুষের মনকে সংকীর্ণ করে দেয়, সত্যের আলো টেনে নেওয়ার পথটাকে রুদ্ধ করে দেয়।

'দেশপ্রেম' বুঝতে গেলে 'দেশ' কী সেটা বোঝা দরকার। আসুন আমরা 'দেশ'কে ডিফাইন করার চেষ্টা করি।

আমি আপাদমস্তক শহুরে মানুষ। জন্মেছি ঢাকায়, বেড়ে ওঠাও এখানেই। ইট-পাথর-কংক্রিটের সাথে আজীবনের সখ্য। যেখানে আমার জন্ম, এখনো সে জায়গায় গেলে পুরনো দিনের কত স্মৃতি এসে ভীড় জমায়, কত না বলা কথা বাষ্প হয়ে আবার বুকে আসে, মিলিয়ে যায়। শিশুকালের কত ঘটনা, কত রোমাঞ্চ মিশে আছে জায়গাটাতে। সেখানকার প্রতি আমার অন্যরকম একটা ফিলিংস কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক। যে গ্রামে জন্মেছে তার নিজ গ্রামের আলো-বাতাস আর মাটির গন্ধ তাকে যে স্বাদ দেয়, যে অনুভূতি দেয় তা আর কোন কিছুতেই সে পাবে না। জন্মস্থানের সাথে, বেড়ে ওঠার মাটির সাথে এ এক অনন্য সখ্য প্রত্যেকের। এই সহজাত ভালোলাগা-ভালোবাসার ব্যাপারটিই দেশপ্রেম, যা হৃদয় থেকে উঠে আসে, একে বানিয়ে নিতে হয় না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিযরতের পর মুহাজির সাহাবাদের কেউ কেউ মক্কা নিয়ে কবিতা লিখতেন। রাসূল তাঁদের নিষেধ করেন নি, কারণ তিনি জানেন জন্মভূমির প্রতি এই ভালোবাসা প্রত্যেকের মজ্জাগত। তাঁর নিজেরও মক্কার প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। মদীনার জীবন এই সাহাবাদের কাছে প্রবাস জীবনের মতই মনে হয়েছিল। কেননা মক্কা তাঁদের জন্মস্থান, মদীনা তো দূরদেশ।

আজকে 'সৌদি আরব' নামে বিশ্বে একটা দেশ আছে। মক্কা আর মদীনা দেশটির দুই শহর। আজকে মক্কার লোক মদীনায় থাকাকে প্রবাস জ্ঞান করবে না। কারণ উভয় জায়গা ই সৌদি আরবের 'সীমানা'র মধ্যে। উভয়ই একই 'দেশ'। মানে 'দেশ' কোনটা আর 'প্রবাস' কোনটা সেটা নির্ধারণ করছে জন্ম নয়, বরং বেঁধে দেওয়া এক সীমানা। অদ্ভুত ব্যাপার।

আরো সহজ করে বলি। সাতচল্লিশের আগে কলকাতা আমাদের 'দেশ' ছিল। তখনো পাকিস্তান হয়নি। পাকিস্তান হবার পর কলকাতা হয়ে গেল 'বিদেশ', অথচ কলকাতার চেয়ে বহুদূরের করাচি হয়ে গেল 'দেশ'!! একাত্তরের পর আবার কলকাতাও বিদেশ, করাচিও বিদেশ। আজকে সিলেট-চট্টগ্রাম আমাদের 'দেশ', কে বলতে পারে, হয়তো পঞ্চাশ বছর পর এগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তখন সিলেটবাসীকে বলব 'বিদেশী।' আবার উল্টোটাও হতে পারে। হয়তো ভারত-পাকিস্তান ইউনিফাইড হয়ে গেল। দুদিন আগে যারা ছিল 'বিদেশী', তারা হয়ে যাবে 'দেশী', তারা হয়ে যাবে ভাই!!

কাজেই সীমানা দিয়ে 'দেশ', 'বিদেশ' নির্ধারণের প্রক্রিয়াটা উদ্ভট এবং হাস্যকর। আপনি নিজের জন্মস্থান পাল্টাতে পারবেন না, ওটা স্থায়ী। ওটাই আপনার জন্মভূমি, ওটাই আপনার 'দেশ।' এর বাইরে যা কিছু আছে তার সবই এক, তাদের মধ্যে পৃথিকীকরণের গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড আপনি পাবেন না।

আরেকটা এক্সাম্পল দিয়ে ফ্যালাসিটা তুলে ধরি। আমরা সবাই বইয়ে পড়ি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। বটে?? 'দেশ' তো তখনো ছিল পাকিস্তান !! বাংলাদেশের তো জন্মই হয় নি !! তাহলে 'দেশপ্রেম' মানে পাকিস্তানপ্রেম হওয়ার কথা, বাংলাদেশপ্রেম হয় কীভাবে??

এ কথা উঠলে আবার বলা হবে সীমানা অনুযায়ী 'দেশ' পাকিস্তান হলেও আমাদের 'বাঙ্গালিদের' 'দেশ' ছিল পূর্ব বাংলা। সেক্ষেত্রে আবার প্রশ্ন ওঠে, বাঙ্গালিরা তো পশ্চিমবঙ্গেও আছে, সেটা তবে 'বিদেশ' হয় কীভাবে?? তখন বলা হবে, মানে এ অঞ্চলের বাঙ্গালিদের 'জন্মভূমি' ছিল পূর্ব বাংলা। তারা জন্মভূমির হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন।

ওই তো। শেষ পর্যন্ত জন্মভূমিতেই ফিরে যাওয়া লাগবে। দেশীয় সীমানা, ভাষাগত ঐক্য, কোনকিছুই 'দেশ' কে ডিফাইন করতে পারেনা। কেন পারেনা, সেটাই এতক্ষণ আলোচনার চেষ্টা করেছি। আশা করি বোঝাতে পেরেছি।

আমি ঢাকায় জন্মেছি, ঢাকা আমার জন্মভুমি। এখানে আমার নাড়ি পোঁতা। সিলেট আমার জন্মভূমি না। আমি সিলেট-কলকাতার পার্থক্য করি না। বৃটিশদের বেঁধে দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমি মানুষের পার্থক্য করি না। আমার আত্মমর্যাদায় লাগে।

জাতীয়তাবাদ কী?

জাতীয়তাবাদ মানে মানবতাকে কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ করে ফেলা। জাতীয়তাবাদ মানে সীমানার এপারের মাটি 'সোনা', আর ওপারের মাটি কেবলই মাটি। জাতীয়তাবাদ মানে বৃটিশদের তৈরি করে দেওয়া সীমানা নিয়ে গৌরব করা।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে একটা মন্দির ভাঙ্গা হলে আমাদের কীবোর্ডে ঝড় উঠে যাবে। সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ বর্ডারের ওপারে মায়ানমারে মুসলিমদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তাদের রক্ত দিয়ে স্নান করছে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, আরাকানে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চলছে, কাশ্মীরে পুলিশ গুলি করে মারছে মুসলিমদের, পাকিস্তানে আমেরিকা ড্রোন হামলা করে নিরীহ নারী-শিশুদের মারছে, এসব ক্ষেত্রে আমাদের মুখে ফেভিকলের কুলুপ। কারণ নির্যাতিতরা 'বার্মিজ', 'ভারতীয়', 'পাকিস্তানী।' আমার মানবতা বর্ডারের এপারের জন্য, ওপারের লোককে মানুষ হিসেবে কাউন্ট করিনা। এটাই জাতীয়তাবাদ।

জাতীয়তাবাদ মানে স্বজাতির প্রতি পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। নিজের জাতি অন্যায় করলেও তা না দেখার ভান করা। সে আমার 'দেশী' বলে। জাতীয়তাবাদ মানে সত্যের ওপর সীমানার সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া।

ফেলানী নামের একটা মেয়ে সীমান্তে নিহত হল। তাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেল। কয়েকবছর পর ২০১৩ তে হত্যার বিচার বসল। প্রহসনের রায়ে হত্যাকারী ভারতীয় সেনা বেকসুর খালাস পেল। আমরা নিন্দা জানালাম। আর ভারতীয়রা বলল ন্যায়বিচার হয়েছে।

এটাই জাতীয়তাবাদ। ভারতীয়রা ভারতের সেনার দোষ দেখবে না। সে ভারতীয়?? অতএব সাতখুন মাফ। ভারতের জায়গায় আমরা থাকলে একই কাজ করতাম। মনে আছে, ২০১১ সালে সৌদি আরবে খুনের দায়ে ৮ বাংলাদেশীর শিরচ্ছেদ হল?? সে কী ঝড় এদেশে!! স্পষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া নিয়ে সৌদি আরবের মুণ্ডুপাত করা হল। এমনকি আসামীদের কাজকে জাস্টিফাই করতেও কত লেখালেখি হয়েছে। কেন ?? কারণ আসামীরা বাংলাদেশী। তারা খুন করুক আর যা ই করুক, অন্যদেশ তাদের বিচার করতে পারবে না- এই মনোভাবটাই জাতীয়তাবাদ।

আরো সহজ উদাহরণ দিই। কদিন আগে সাকিব আল হাসান গ্যালারিতে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেছিল। প্রথমে সমালোচনার ঝড় উঠল। সে নিষিদ্ধ হল। এরপর আমরাই আবার "লঘুপাপে গুরুদণ্ড হয়েছে" বলে মাতম তুললাম। "সাকিবকে ফিরিয়ে আনো" বলে কত হাহাকার, কত ইভেন্ট খোলা। সাকিবের কাছাকাছি কোন আচরণ যদি বিরাট কোহলি বা শহীদ আফ্রিদি করত তাহলে আমরা কি এ কথা বলতাম?? গালি দিয়ে তাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতাম না?? আজীবন নিষিদ্ধের দাবি তুলতাম না?? ভারতীয় বা পাকিস্তানী ফ্যানদের পচানোর জন্য আজীবনের উপকরণ পেয়ে যেতাম না?? অথচ সাকিবের ব্যাপারে আমরা কত সহনশীল। কারণ সে আমার 'দেশী।' এটাই জাতীয়তাবাদ।

এবার আরো গুরুতর প্রসঙ্গে যাচ্ছি। অনেকের বুকে চোট লাগতে পারে। তিক্ত সত্য হজম করার ক্ষমতা সবার নেই। তবু আমাকে বলতেই হবে।

একাত্তরে পাকিস্তানী আর্মি যে গণহত্যা আর নির্যাতন চালিয়েছে তাকে জাস্টিফাই করার কোন উপায় নেই। তবে অপরাধ যে কেবল একপাক্ষিক ছিল তা নয়। কুতুবউদ্দীন আজীজের "Blood and Tears" কিংবা শর্মিলা বসুর "Dead Reckoning" [i] জাতীয় বইগুলোতে আমরা ইতিহাসের উল্টোপিঠটাও পাই। মুক্তিযোদ্ধাদের দল বিহারীদের ওপর যে হত্যা আর ধর্ষণ চালিয়েছিল তা আমরা প্রচলিত ইতিহাসের কোন বইয়ে খুঁজে পাব না। যুদ্ধের পরে অস্ত্র থাকা যোদ্ধাদের অনেকে যে অস্ত্র জমা না দিয়ে ডাকাতিসহ বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হয়েছিল তা আমরা এক জেনারেশন আগের মানুষের কাছে শুনি, কিন্তু কোন বইয়ে দেখিনা। কেন?? কারণ ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা। বাঙ্গালিদের লেখা বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিষ্পাপ হিসেবে তুলে ধরা হবে এটাই জাতীয়তাবাদের দাবি। এটা ঠিক যে এদেশের কৃষক-শ্রমিকসহ অসংখ্য গরিব মানুষ শোষণ থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু যোদ্ধাদের সবাই স্বার্থহীনভাবে কাজ করেছেন এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু জাতীয়তাবাদ আমাদের এমনটা ভাবতে বাধ্য করে।

জাতীয়তাবাদ একপাক্ষিক না। পাকিস্তানের ইতিহাস বইগুলোতে ওদের আর্মিকে বীর হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাদের দোষকে, গণহত্যাকে উপেক্ষা করা হয়। বাঙ্গালিদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এদেশের লোককে "বিদ্রোহী", "দেশদ্রোহী" হিসেবে তুলে ধরা হয়। আমরা বড় হই পাকিস্তানীদের ঘৃণার চোখে দেখে, ওরা বড় হয় আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। আমরা পাকিস্তানকে 'Fuckistan' বলতে পেরে সুখলাভ করি, ওরাও আমাদের গালি দিয়ে পরম আনন্দ লাভ করে। এটাই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ।

একাত্তরের যুদ্ধকে আমরা দেখি স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে, পাকিস্তানীরা দেখে দেশদ্রোহীদের দমনে সেনাবাহিনীর অভিযান হিসেবে, আর ভারতীয়রা দেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয় হিসেবে। জাতীয়াবাদ আমাদের ন্যায়, চিন্তাশক্তি আর বিবেককে ধ্বংস করে দেয়। পক্ষপাত আর ঘৃণাই হল জাতীয়াতাবাদের আউটপুট। এ সেই পচন ধরা মতবাদ যা প্রত্যেককে ভাবতে শেখায়-তার নিজের দেশ, নিজের জাতিই শ্রেষ্ঠ। তার জাতির ইতিহাস সবচেয়ে গৌরবান্বিত, সবচেয়ে নিষ্কলঙ্ক। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা বিচারের ভার বিবেক থেকে এমনিতেই চলে যায় জাতীয়তাবাদের হাতে।

এই সেই জাতীয়তাবাদ যার কারণে মানুষ নিজেকে কেবল বিশেষ জাতিতে জন্ম বলে দম্ভ করতে শেখায়। এক ব্যক্তি এশিয়ার অধিবাসী বলে ইউরোপ বা আমেরিকাবাসীদের নিকট ঘৃণিত, অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত ও অধিকার বঞ্চিত হতে একান্তভাবে বাধ্য। এক ব্যক্তি শুধু কৃষ্ণাঙ্গ হওয়াই শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির দৃষ্টিতে তার ঘৃণিত হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। সাদা-কালোর প্রভেদের মূলে এই জাত্যাভিমান, জাতীয়তার দম্ভ। নিগ্রোদেরকে জীবন্ত দগ্ধীভূত করা আমেরিকার সভ্য নাগরিকদের পক্ষে কিছুমাত্র অপরাধের কাজ নয়, কারণ তারা নিগ্রো। জার্মান জাতি এবং ফরাসী জাতি পরস্পরকে ঘৃণা করতে পারে কারণ তারা দুটি স্বতন্ত্র জাতিতে বিভক্ত। এদের একজনের গুণাবলী অন্যের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ দোষ ও ত্রুটি বলে নিরূপিত হয়। সীমান্তের স্বাধীন আফগানীদের আফগানী হওয়া এবং দামেশকের অধিবাসীদের আরব জাতির অন্তর্ভূক্ত হওয়া এমন একটা অপরাধ যে, কেবল এ কারণেই তাদের মাথার উপর বোমারু বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা এবং সে দেশের জনগণকে পাইকারীহারে হত্যা করা ইংরেজ ও ফরাসীদের পক্ষে একেবারে ন্যায়সংগত। কিন্তু ইউরোপের সুসভ্য (?) অধিবাসীদের উপর এরূপ বোমা নিক্ষেপ করাকে বর্বরতামূলক কাজ বলে তারা মনে করে।

হিটালার-মুসোলিনিরা জাতীয়তাবাদের গর্বে অন্ধ হয়ে মানুষহত্যাকে জায়েয করেছিল। আমাদের দুশো বছরের প্রভুরা নীলচাষীদের পেটে লাথি মেরে হত্যাকে বৈধ ভাবত কারণ নীলচাষীরা 'নিচুজাতি', আর বৃটিশরা 'উঁচু জাতি।' এই জাতীয়তাবাদ এনেছে যুদ্ধ, এনেছে অনর্থ, কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ, বয়ে এনেছে দাম্ভিকতা, ঘৃণা আর মজলুমের কান্না।

এই নোংরা বিষাক্ত বস্তুকে না ছাড়তে পারলে আত্মার মৃত্যু সুনিশ্চিত।

ইসলাম জাতীয়তাবাদের মত নোংরা মতবাদকে সমূলে প্রত্যাখ্যান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন--

“সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর (জাতীয়তাবাদ) দিকে ডাক দেয়, বা আসাবিয়্যাহর কারণে লড়াই করে কিংবা আসাবিয়্যাহর কারণে মৃত্যুবরণ করে” [আবু দাউদ-৫১২১]

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল, "আসাবিয়্যাহ কী?" তিনি উত্তরে বললেন, "আসাবিয়্যাহ হলো অন্যায়-অবিচার ও জুলুমের ক্ষেত্রে তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সহযোগিতা করবে।" [আবু দাউদ-৫১১৯]

এখানে উল্লেখ্য, স্বহস্তে সহযোগিতা না করে সমর্থন দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত, যেমনটা আমরা পূর্বের অনুচ্ছেদে আলোচনা করেছি। অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন--

''যে জাতীয়তাবাদ তথা আসোবিয়্যাহর জাহেলী আহবানের দিকে মানুষকে ডাকে সে যেন তার পিতার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরে পড়ে আছে (তাকে ছাড়তে চাইছে না)।" এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, "এবং একথাটি লুকিয়ে রেখো না (অর্থাৎ বলার ক্ষেত্রে কোনো লজ্জা বা অস্বস্তিবোধ করোনা)।" [মুসনাদে আহমাদ - ২১২৩৬]

একটু চিন্তা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কথার মাধুর্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য শ্রোতাদের মোহিত করে ফেলত, যা শুনে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এই মানুষটি কোনদিন কাউকে গালি দেবেন বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করবেন, চিন্তা করা যায়?? অথচ তিনি এখানে তুলনা দিলেন "পিতার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরা"র সাথে। এটুকুতেই স্পষ্ট, কতবড় নোংরা জিনিস এই জাতীয়তাবাদ, যার তুলনা দিতে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো শব্দ খুঁজে পান নি!!

ইসলাম কেন জাতীয়বাদকে প্রত্যাখ্যান করে?? কয়েকটি দিক আলোচনা করছি।

প্রথমত, জাতীয়তাবাদের কারণে ইসলামের একটি মূলনীতি "আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ" [ii] সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। "আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ" অর্থ আল্লাহ্‌র জন্যই ভালোবাসা আর আল্লাহ্‌র জন্যই ঘৃণা। একজন মুসলিমের প্রতি আরেকজন মুসলিমের ভালোবাসা থাকতে হবে আল্লাহ্‌র জন্যই। কোন পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়। যে কালিমা পড়েছে, সে মুসলিম, সে আমার ভাই, পৃথিবীর যে প্রান্তেরই হোক না কেন। আমার ওপর তার হক্ব আছে। আর যারা ইসলামের সাথে দুশমনি করে, তারা যত কাছের লোকই হোক না কেন, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। এটাই আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ। অর্থাৎ ভালোবাসা ও শত্রুতা-কেবল আল্লাহরই জন্য। কিন্তু জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের এই সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল গড়ে দেয়। ভিনদেশের মুসলিমকে তখন আপন ভাবা যায়না, আবার নিজদেশের আল্লাহদ্রোহীর প্রতিও সহানুভূতি চলে আসে।

রাসূল (সা) আরবের লোক ছিলেন, তাঁর ভাষা ছিল আরবী। ওয়াল্লাহি, জাতীয়তাবাদ থেকে মুক্ত না হতে পারলে আপনি কখনোই রাসূল (স) কে সেভাবে ভালোবাসতে পারবেন না, যেভাবে ভালোবাসা উচিত। অথচ রাসূল (সা) কে নিজের সম্পদ, পরিবার এমনকি জীবন থেকেও বেশি প্রিয় না হলে আপনি পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবেন না। জাতীয়তাবাদ এমনি আপনার আর ঈমানের মাঝে বাধা হয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, মুসলিম উম্মাহর Universal Brotherhood ধ্বংস করে জাতীয়তাবাদ। রাসূল (সা) বলেছেন--

"সমগ্র উম্মাহ একটি দেহের মত। যদি দেহের এক অংশে ব্যাথা অনুভূত হয়, তাহলে দেহের অন্যান্য অংশ তাতে আক্রান্ত হয়” [মুসলিম]

অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে একজন মুসলিমের কষ্টে সমস্ত মুসলিমের ব্যথা লাগবে। এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। অথচ জাতীয়তাবাদ আমাদের সেই অনুভূতি নষ্ট করে দিয়েছে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে একবার খবর এল সিন্ধু প্রদেশে একজন মুসলিম নারী অপমানিত হয়েছেন। সাথে সাথে তিনি মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে সেনাবাহিনীসহ পাঠালেন সিন্ধু জয় করতে। এতটাই প্রবল ছিল উম্মাহর প্রতি ফিলিংস। বিশ্বের কোন একপ্রান্তে একজন মুসলিমের কান্নার আওয়াজ আমীরুল মু'মিনিনের রাতের ঘুম হারাম করে দিত। আর আজ লক্ষ মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত ওবামার সাথে হাত মেলায় মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান। টাকার কাছে, জাতীয়তাবাদের কাছে আমাদের সব মানবতা, সব দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি।

একজন মুসলিম, সে বিশ্বের যে প্রান্তেরই হোক, আমার ভাই। একজন বাংলাদেশি আমার ভাই, তদ্রুপ একজন পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, সিরিয়ান, আরব বা আমেরিকান মুসলিমও আমার ভাই। কিন্তু জাতীয়তাবাদ এই ভাতৃত্বকে অস্বীকার করে। সে শেখায় পাকিস্তানী সৈন্য আমাদের অত্যাচার করেছে, অতএব পাকিস্তানের সব মানুষ আমাদের শত্রু। তাদের ঘৃণা করতে হবে। অথচ বৃটিশরা দুশো বছর অত্যাচার করলেও তাদের গোলামি করতে আমাদের বাধেনা। তাদের পোশাক, ভাষা ইউজ করলে ভাবি জাতে উঠে গেছি। জাতীয়তাবাদ এমনই অন্ধ, এমনই বিকৃত।

আজকে আফিয়া-ফাতিমারা কুফফারদের কারাগারে রক্ত দিয়ে চিঠি লেখে, মুসলিম বিশ্বে মজলুমের হাহাকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, লক্ষ লক্ষ শিশু জবাই হচ্ছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, ভাইদের গুলি করে বুক ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে, কে তাদের চিৎকার শুনবে?? কে হবে খালিদ, কে হবে তারিক, কে হবে আব্দুর রহমান, কে হবে সালাউদ্দীন আয়্যুবী?? মুসলিম যুবকেরা আজ ব্যস্ত মেসি-মেইমার আর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে, মা-বোনদের চিৎকার শোনার সময় তাদের হয়না। সিরিয়ায় হামলা হয়েছে, আমি তো বাংলাদেশি ! বার্মায় হত্যাযজ্ঞ চলছে, আরে আমি তো বাংলাদেশি!! আমার কী এসে যায়?? এটাই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ।

রাসূল (সা) বলেছেন সে ব্যক্তি মুসলিমদের দলভুক্ত নয় যে রাতে ঘুমাতে যায় অথচ উম্মাহর কথা চিন্তা করেনা। আজকে একটু চিন্তা করলেই দেখি, কত মুসলিমের কান্নার দায় আমরা বহন করছি। আমরা সাক্ষী হয়েছি বসনিয়ার গণহত্যায় নিহত হাজার হাজার মুসলিমের, ধর্ষিতা মা-বোনের। আমরা সাক্ষী হয়েছি গুজরাটের গণহত্যায় নিহত তিন হাজার মুসলিমের লাশের। আমরা সাক্ষী আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া আর মিশরের লক্ষ মুসলিমের কান্না আর লক্ষ শিশুর আর্তনাদের। আমরা সাক্ষী হয়েছি পাকিস্তানের ড্রোন হামলায় বিধ্বস্ত মুসলিম জনপদের। কী ভাবছেন? তাদের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসিত হব না? তাদের জন্য আমরা কী করেছি, এটা আমাদের জবাব দিতে হবে না? আমরা কী জবাব দেব সেদিন যখন আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে সেব্রেনিকায় ধর্ষিতা হয়ে মারা যাওয়া একটি বোন? কী জবাব দেব যখন আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে ইরাকের একটি শিশু? সে যদি এই কাপুরুষ মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে, আমাদের কোন উপায় থাকবে কি?

না থাকবে না। জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে সেদিন রেহাই পাওয়া যাবে না। "ও তো ভিনদেশের লোক" বলে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে সেদিন নিস্তার নেই।

তৃতীয়ত, জাতীয়তাবাদ নিজের জাতিকে অন্য জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন--

"লোকেদের উচিত হল তারা যেন তাদের জাতি নিয়ে গর্ব করা ত্যাগ করে, কারণ তা জাহান্নামের আগুনের কয়লাগুলোর মধ্যে একটি কয়লা। যদি তারা তা পরিত্যাগ না করে তবে আল্লাহ্‌ তাদেরকে সেই নিচু কীটগুলো থেকেও নীচ করে দেবেন যারা মল-বর্জ্যের মধ্যে নিজেরাই নিজেদের ঠেলে দেয়।" [আবু দাঊদ, তিরমিযী]

ইসলামে জাত্যাভিমান বা বংশমর্যাদার গৌরব চরম নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এই ব্যাপারগুলোকে জাহেলী যুগের কর্ম বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলামে মানুষের সম্মানের মানদন্ড তার তাকওয়ায়, এখানে গায়ের রঙ, বংশ, জাতি, ভাষা-এসবই মূল্যহীন। নিগ্রো কৃতদাস বিলাল (রা) এর সম্মান কত বেশি সে কথা আমরা জানি। তাঁর জাতি ছিল সমাজে একেবারেই ঘৃণিত। আবার তৎকালীন আরবের উচ্চবংশ বলে পরিচিত কুরাইশ বংশের আবু জাহেল, আবু লাহাবরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তাদের জাতি তাদের মর্যাদা দিতে পারেনি।

"হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।" [হুজুরাতঃ ১৩]

অর্থাৎ আল্লাহ্‌র কাছে সম্মানের মাপকাঠি কোন জাতীয়তা নয়, বরং তাকওয়া এবং সৎকর্ম। কে কোথায় জন্মেছে সেটার কোন দাম নেই এখানে। পুরো পৃথিবী আল্লাহ্‌ তা'আলার সৃষ্টি। কোন মাটিকে ঘৃণা করার অবকাশ নেই। আমি জন্মেছি বলে সে মাটি পাক, আর আমার শত্রু জন্মেছে সে মাটি নাপাক, এমনটা মনে করার কোন অবকাশ ইসলাম দেয় নি।

রাসূল (সা) বিদায় হাজ্জের ভাষণে বলেছেন, আরবের ওপর অনারবের কিংবা অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এই একটা বাক্য দিয়েই জাতীয়তাবাদের গর্বকে ধুলিস্মাৎ করে ফেলা হল। অথচ আমাদের মাথায় ছেলেবেলা থেকে গেঁথে দেওয়া হয়, নিজের ভূমি, নিজের দেশ, নিজের ভাষা আর নিজের জাতি পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। জর্জ বার্নার্ড শ ব্যাপারটিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন এভাবেঃ

"দেশপ্রেম হল এমন একটা বিশ্বাস বা ধারনা যে তোমার দেশ পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, কারণ তুমি সেখানে জন্মেছ।"

এখানে 'দেশপ্রেম' বলতে তিনি জাতীয়তাবাদকেই বুঝিয়েছেন। কথাটির যথার্থতা সহজেই বোঝা যায়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত এমনভাবে লেখা হয় যেন সে দেশটিই জগতের সেরা। আমরা যেমন আমাদের দেশকে "সকল দেশের রাণী" ভাবতে শিখি। অথচ এদেশের সাথে আমার সম্পর্ক এতটুকুই যে আমি এখানে জন্মেছি। আমি মিশরে জন্মালে মিশরকে সকল দেশের সেরা বলতাম, আমেরিকায় জন্মালে সেটা হত সেরা দেশ, ফিলিপাইনে জন্মালে বলতাম এটাই সকল দেশের রাণী।

চতুর্থত, জাতীয়তাবাদ সত্যকে অস্বীকার করতে শেখায়।

রাসূল (সা) যখন নিজেকে আল্লাহ্‌র প্রেরিত পুরুষ বলে দাবি করলেন, কুরাইশদের গোত্রগুলোর মধ্যে বিভেদ লেগে গেল। কেননা যদি তিনি সত্য নবী হয়ে থাকেন তবে যে গোত্রে তাঁর জন্ম তার সম্মান অনেক বেড়ে যাবে। অথচ রাসূল (সা) এসেছেন সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য। তিনি আমাদের সবার গর্ব। কুরাইশরা জাতীয়তাবাদের কারণে তর্কে লিপ্ত হল। এরপর তারা বলতে লাগল তিনি সত্য নবী হতে পারেন না, কেননা কুরাইশদের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের রেখে আল্লাহ্‌ কেন একজন সাধারন যুবকের ওপর কুরআন নাযিল করবেন ! আল্লাহ্‌ ব্যাপারটিকে বর্ণনা করেন এভাবেঃ

"তারা বলে, কোরআন কেন দুই জনপদের কোন প্রধান ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হল না?" [যুখরুফঃ ৩১]

একই ভুল করেছিল ইহুদি আর খ্রিস্টানরা। মূসা (আ) মুহাম্মাদ (সা) এর ভবিষ্যতবানী তাঁর উম্মাতকে শুনিয়েছিলেন, যেটা ছিল তাওরাত কিতাবে। তাই ইহুদিরা রাসূল (সা) এর আগমনের অপেক্ষা করছিল। অথচ যখন তিনি সত্যিই এলেন, তারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। কারণ তাদের ধারনা ছিল রাসূল (সা) হবেন বনী ইসরাঈলের একজন, অথচ তিনি ইসমাঈল (আ) এর বংশধারার রাসূল। শুধুমাত্র জাতিগত দাম্ভিকতা ইহুদিদের সত্য থেকে বিরত রাখল।

একই কথা খৃস্টানদের জন্য প্রযোজ্য। বাইবেলে আছে মূসা বলেন, "He (Muhammad) will be from our brothers." এখানে তিনি "Brother" বলতে বুঝিয়েছেন বনী ইসমাঈলকে, কারণ বনী ইসরাঈলের ভাই হচ্ছে বনী ইসমাঈল। অথচ পাদ্রীরা বাইবেলের এ কথাটিকে পরিবর্তন করে লিখেছে "From our 'own' brothers" এই 'own' কথাটা তারা নিজেরা ঢুকিয়েছে, যেন মনে হয় একই বংশ থেকে শেষ নবী আসবে, আর এজন্য খৃস্টানরা ধরে নিয়েছে মুহাম্মাদ (সা) আসবেন বনী ইসরাঈল থেকেই। পরবর্তীতে তাঁকে সত্য নবী মেনে নিতে এই জাতিগত বিদ্বেষ তাদের বাধা দিয়েছে।

এইভাবে যুগে যুগে সত্যকে স্বীকার করে নিতে জাতীয়াতাবাদ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পঞ্চমত, জাতীয়তাবাদ ন্যায়-অন্যায় বোধকে নষ্ট করে দেয়। আদলকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার চুরির অপরাধে একবার এক কুরাইশ মহিলার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। মহিলাটি রাসূলের বংশের হওয়ায় তার শাস্তি লঘু করার সুপারিশ এল। ক্রোধে লাল হয়ে রাসূল (স) বললেন,

"আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তারও হাত কেটে দিতাম। এই ন্যায়বিচারের অভাবেই পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।"

জাতীয়তাবাদের দাবি ছিল রাসূল নিজের জাতিকে ন্যায়বিচারের উপরে স্থান দেবেন। আর ইসলামের দাবি হচ্ছে অপরাধ যে ই করুক, এমনকি নিজের ভাই বা সন্তান হোক, তার শাস্তি পেতে হবে। আলী (রা) যখন খলিফা তখন এক ইহুদির কাছে মামলা হেরে যান, কেবলমাত্র সাক্ষীর অভাবে। তিনি তা নির্দ্বিধায় মেনে নেন। অর্ধজাহানের শাহানশাহ মামলা হারলেন এক সাধারণ ইহুদির কাছে, এই দৃষ্টান্ত একমাত্র ইসলামী বিচারে সম্ভব। জাতীয়তাবাদ এই ন্যায়বোধের শিকড়ে পদাঘাত করে।

একাত্তরে যারা পাকিস্তানি আর্মিকে অপকর্মে সাহায্য করেছিল তারাও জাতীয়তাবাদের বশেই করেছিল। জাতীয়তাবাদের দাবিই হল নিজের স্বজাতিকে সাহায্য করে, যদি সে অন্যায় করে তবুও। আজকে যারা যুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানি লোকটিকে ঘৃণা করছি শুধুমাত্র সে "পাকিস্তানি" বলে, তারাও জাতীয়তাবাদে আক্রান্ত। আমরা রাজাকারের বিচার চাই সেক্যুলারদের কাছে। আমি আজকে সেসব লোককে বলতে চাই, যদি দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকত তবে একাত্তরে না হলেও বাহাত্তরেই যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়ে যেত। একদিন এরা বুঝতে পারবে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দাবি করে কতবড় ভুল করেছিল। জাতীয়তাবাদী ভণ্ডের দলের কাছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চেয়ে কতবড় বোকামি করেছে। ভণ্ডের দল কোন ভণ্ডামির বিচার করবে বলতে পারেন?

স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, অন্যায়, দুর্নীতি, অন্ধত্ব সব এই জাতীয়তাবাদের হাত ধরে আসে। এই বিষাক্ত বৃক্ষের মূল উপড়ে ফেলতে হবে।

শেষ কথাঃ আমরা মুসলিম, এটাই আমাদের প্রধান পরিচয়। হ্যাঁ, আমরা একইসাথে বাঙালি, বাংলাদেশী, সেসব আমাদের অবস্থান, ভাষা ইত্যাদি নির্দেশ করে, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের মানবতা, আমাদের হৃদয়ের আবেগ কোন কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ নয়। পৃথিবীর সব মুসলিম আমাদের ভাই, আমাদের প্রাণ কাঁদে তাদের কষ্টে। জাতীয়তাবাদ এক বিষাক্ত মতবাদ, যা মানুষের রক্তের চেয়ে একটা কাগজের পতাকাকে বেশি মূল্যবান করে তোলে। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা ইনজেকশনের মত এই বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে মানুষের শরীরে, অন্তরে, মগজে। সেই জাতীয়তাবাদ যা একটা পাথরের স্তম্ভতে ফুল নিবেদনকে পুণ্য জ্ঞান করায়, অথচ দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী চুক্তি হলে দেখেও না দেখার ভান করে পলিটিকাল ভিউ I hate politics লিখে মুড়ি চিবোতে শেখায়। সেই জাতীয়তাবাদ, যা হৃদয়কে করে সংকীর্ণ, চোখকে করে অন্ধ, কানকে করে স্তব্ধ। সেই জাতীয়তাবাদ যা মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে সীমানার পরিচয়কে বড় ভাবতে শেখায়।

আমরা জন্মেছি মুসলিম পরিচয়ে, মৃত্যু হবে (ইনশাআল্লাহ্‌) এই পরিচয়ে, হাশরের ময়দানে উঠতে হবে এই পরিচয়ে। সেখানে অন্য কোন পরিচয় কাজে আসবে না, রাসূলের উম্মাত বলে নিজেকে পরিচয় দিতে না পারলে। জাতীয়তাবাদী সঙ্কীর্ণতা সেদিন ধূলিস্মাত হয়ে যাবে, অগ্নির গহ্বরে কোথায় মিলিয়ে যাবে।

এখনও কি সময় আসেনি এই বিষকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার??

টিকাঃ

i) Blood and Tears, Dead Reckoning

ii) ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ র অর্থ:

ওয়ালা অর্থ : হৃদ্যতা, বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতা। বারা অর্থ: ঘৃণা, শত্রুতা, দূরত্ব। মূলত: ওয়ালা এবং বারা হচ্ছে মনের বিষয়। ওয়ালা বা বন্ধুত্ব আল্লাহ তা'আলা, তার রাসুল সা. এবং মুুমিনদের জন্য হয়ে থাকে— সেক্ষেত্রে সূরা মায়িদার ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন , “নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু হল আল্লাহ, তার রাসুল এবং যারা ঈমানদার”। “আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ্‌” এর ভিত্তিতে পুরো মানবজাতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

- যাদেরকে খালেসভাবে ভালোবাসতে হবে:

এরা হলেন নবী-রাসূল, সিদ্দীকিন, সালেহীন এবং শুহাদা তাঁদের ঈমানের কোন ত্রুটি নাই। এর সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছেন মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা) যাকে দুনিয়ার সব কিছু থেকে বেশী ভালোবাসতে হবে।

- যাদের সাথে খালেস দুশমনি ও শত্রুতা রাখতে হবে:

খাঁটি কাফের, মুনাফিক, মুশরিক, মুরতাদ, নাস্তিক এবং অনুরূপ লোক। যাদের সাথে দুশমনি করার কোন বিকল্প নাই।

- যাদের ঈমানের কারণে মুহাব্বাত করতে হবে এবং গুনাহের কারণে ঘৃণা করতে হবে:

এসব লোক হল তারা যারা ঈমান এনেছে, আবার পাপকাজেও লিপ্ত। গুনাহগার মুসলিমরা। তাদের ঈমানের কারণে তাদের প্রতি ভালোবাসা থাকবে আর গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারনে থাকবে ঘৃণা। এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা শত্রুতা যেমন চিরন্তন, এদের বেলায় কিন্তু তা এরকম নয়। এদের প্রতি বিদ্বেষ হলো তাদের গুনাহের কারণে।

উল্লেখ্য, কাফেরদের মধ্যে যারা মুমিনদের কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে, কাফেরদের সাথী হয়ে যুদ্ধ করে না, এই ধরনের কাফেরদের সাথে সদাচরণ এবং ইনসাফভিত্তিক আচরণ করতে হবে। তবে কোনভাবেই তাদের প্রতি ভালোবাসা থাকতে পারবে না।

উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৮-২০২০ ইং ০১:৪৮:০২ | সংবাদটি ১৫৯ বার পঠিত
Image

১.বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের বোঝাকে বলা যায় প্রধান সমস্যা। বলা হচ্ছে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের একটি বিরাট অংশ দেশের বাইরে চলে গেছে যা হয়তো আদায় করা বেশ কঠিন হবে। এই দিকে আবার বেসরকারিখাতে ঋণের প্রবাহ কেবল কমছে। বিনিয়োগে পড়েছে ভাটা। আবার যাদের ঋণ দরকার তারা ঋণ পাচ্ছেননা। ঋণ সুদের হার বেশি হওয়ায় অনেকে আবার ঋণ নিচ্ছেননা। আবার যারা ঋণ নিয়েছেন তাদের অনেকেই উচ্চ সুদ হারের জন্য ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন বা করতে পারছেন না।
এই রকম পরিস্থিতিকে অর্থনীতির জন্য সংকটজনক মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সমস্যা সমাধানের জন্য একটি উপায় মনে করা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে সুদের হার কমানো। এটি করতে গিয়ে সুদের হারের একটা বাধ্যতামূলক সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সব ব্যাংক গুলোকে এই সিলিং মানতে হবে। সেটি হচ্ছে এখন থেকে আমানতের বিপরীতে সুদের হার ৬ শতাংশের বেশি দেওয়া যাবেনা আর ঋণের বিপরীতে সুদের হার ৯ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়া যাবেনা। এই বছরের ১ লা এপ্রিল থেকে সুদের এই হার সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়েছে। এর সাথে এর ফলে ব্যাংকিং খাতে কি প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও হচ্ছে বিস্তর আলোচনা। খুব জটিল বিশ্লেষণ বা আলোচনায় না গিয়ে বিষয়টি নিয়ে খুব সাধারণভাবে কিছু কথা বলি। আমরা জানি যে আমাদের দেশের ঋণের সিংহভাগই দেয়া হয় ব্যাংক থেকে। অর্থাৎ ব্যাংক ব্যতীত বাংলাদেশে ঋণ মোটাদাগে আর কোথাও থেকে পাওয়া যায় না। আর ব্যাংক মূলত এই ঋণ দেয় আমানতের অর্থ থেকে। আমানতের সেই অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলো কে সুদ দিতে হয় আমানতকারীদের। কাজেই ব্যাংকঋণের সুদ কমাতে হলে আমানতের সুদও কমাতে হবে। আর এই কারণে নয় শতাংশ সুদ হারে ঋণ দেয়ার জন্য আমানতের সুদের হার করা হয়েছে ছয় শতাংশ।
এই আমানতকারী কারা। এই আমানতকারী হচ্ছেন মূলত সাধারণ জনগণ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এই আমানতকারীদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষ। আরো আছেন অবসরপ্রাপ্ত অনেক মানুষ। এই আমানতকারীদের মধ্যে আবার অনেকেই আছেন যারা আমানতের বিপরীতে প্রাপ্ত সুদ হতে প্রাপ্ত মুনাফার উপর জীবন ও জীবিকার জন্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। যারা এইরকম নির্ভরশীল তারা ব্যাংক থেকে সুদ কমে গেলে ব্যাংকে আমানত রাখতে কি চাইবেন?
তারা বিকল্প হিসাবে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন, যেখানে সুদের হার ৬ শতাংশের বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো সরকার গত ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ওপর কিছু কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ কমে গেছে অনেকের জন্য। আরেকটি বিকল্প আছে ডাকঘর স্কিম। সেটার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
ফলে সঞ্চয়কারীরা হয়তো অন্য বিকল্প খুঁজবেন। অন্য বিকল্প কি? বিকল্প হচ্ছে পুঁজিবাজার। সেখানে আবার ঝুঁকি অনেক বেশি। পুঁজিবাজার বিনিয়োগের একটি আদর্শ ক্ষেত্র বলে বিশ্বব্যাপী বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বারবার এখানে বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাই সাধারণ এবং বিশেষ করে ছোট সঞ্চয়কারীদের জন্য এটা বাস্তব বিকল্প নয়। তাহলে এই সঞ্চয়কারীরা যাবেন কোথায়?
এইবার ব্যাংকের কথায় আসি। উচ্চ খেলাপী ঋণের সাথে সাথে আছে কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি এবং তহবিল ঘাটতি সহ আরো অনেক সমস্যা। সরকারি ব্যাংকগুলোতে হুকুম দিলেই চলে। লাভ-লোকসানের ধার তারা ধারে না। তাদের মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকার বারবার জাতীয় রাজস্ব থেকে ভর্তুকি দেয়। আর সেটা জনগণের করের টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে চলতে হয় নিজে নিজে। সরকারের সাহায্য ছাড়া। ব্যাংকগুলো আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। লোকসান দিয়ে তো তারা ব্যবসা করবে না। এই ব্যাংকগুলোতে মূলত ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত সুদের হার থেকে আয়ের সিংহভাগ আসে। যা থেকে ব্যাংক তার পরিচলন ব্যয়, কর্পোরেট কর , বিধিবদ্ধ রিজার্ভ এবং প্রভিশনিং এসব বাদ দিয়ে যা থাকে তা থেকে মুনাফা নেয়।
ব্যাংকগুলো মূলত ঋণ দেয় আমানত হতে প্রাপ্ত তহবিল থেকে। কিন্তু যদি ব্যাংকগুলোর আমানত কমতে থাকে তাহলে ঋণ দিবে কোথা থেকে। সরকার বলছে সরকারি তহবিলের পঞ্চাশ শতাংশ রাখা হবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে। এবং সেটা তারা রাখবে ছয় শতাংশ হারে। কিন্তু ইদানীংকালে শোনা যায় এইসব আমানত আনতে গেলে ব্যাংকগুলোকে ভালো সুদের হারের পাশাপাশি আরো অনেক ধরনের খরচ করতে হয়।
২. যা-ই হোক, এই বেধে দেয়া সুদ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার তিনমাস অতিক্রান্ত হয়েছে। আর এর সাথে ব্যাংকিং খাতে মড়ার উপর খাড়ার ঘার মত এসে যোগ হয়েছে করোনা মহামারি। এই মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আর বেধে দেয়া সুদের হার নিয়ে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা কি তাতে একটু আলোকপাত করি।
প্রথমে সাম্প্রতিক আমানত পরিস্থিতির দিকে একটু নজর দেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানতের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৬ কোটি। ঐ বছরের ডিসেম্বর শেষে তা এসে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকায়। সবশেষ চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানত বেড়ে দাড়িয়েছে ১১ লাখ ৮১ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুন থেকে ডিসেম্বও পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছে ৭২ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। আর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে আমানত বেড়েছে ৪৪ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ জুন থেকে ডিসেম্বরে যেভাবে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে অর্থাৎ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে সেভাবে আমানত বাড়েনি।
করোনা ভাইরাসের এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আমানত আরও কমতে পারে। কারণ, প্রথমত করোনার কারণে মানুষের আয় কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সঞ্চয়ও কমবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা এখন আর ব্যাংকমুখী হবেন না। ফলে আরও কমতে পারে আমানতের প্রবৃদ্ধি। আর সেই সাথে আমানতের সুদ ৬ শতাংশে নামিয়ে আনাও আরেকটা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমানত কমার।
আমরা জানি যে, গত ডিসেম্বরের আগে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের জন্য নবায়ন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এর ফলে খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকায় নামে। গত মার্চ প্রান্তিকে তা সামান্য বেড়ে হয় ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর অন্যতম কারণ হলো, গত জানুয়ারি থেকে কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ঋণখেলাপি করা যাবে না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ সুযোগ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। এ কারণে মার্চ জুন প্রান্তিকের মতো ও আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেও খেলাপি ঋণের হিসাবে তেমন হেরফের হবে না। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে যেটুকুও খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে এর মধ্যে মন্দ ঋণই প্রায় ৯০ শতাংশ। গত মার্চ শেষে ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণ প্রায় ৮১ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের হিসাবের বাইরেও আরো খেলাপি ঋণ রয়েছে আলাদা হিসাবে। যেমন, অবলোপন করা ঋণ আছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার। কোনো খেলাপি ঋণ তিন বছরের বেশি আদায় না হলে ওই ঋণ অবলোপন করা হয় এবং তা ব্যাংকের আলাদা হিসাবে রাখা হয়। ওই ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংক মামলা মোকদ্দমা করে থাকে। আর এর বাইরে আরও প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ যা উচ্চ আদালতে রিট করা আছে। কোনো খেলাপি ঋণ এর উপর উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেয়া হলে ওই ঋণ আর খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখানো যায় না। তাই বোঝাই যাচ্ছে নানাভাবে খেলাপি ঋণের বাইরেও মন্দ ঋণ ব্যাংকের হিসাবে আছে।
এবার আসি ব্যাংকগুলোর মুনাফার প্রসঙ্গে। সুদহার কমে যাওয়ার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদহার কমে গিয়েছে। এরপর আবার করোনার নেতিবাচক প্রভাবে কমেছে ব্যাংকের মুনাফা। করোনার সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। পুরাতন ঋণ আদায়ও হয়নি। আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য কম হওয়ায় এ থেকে প্রাপ্ত কমিশন থেকেও ব্যাংকগুলো বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে ঝুঁকিভাতাসহ সুরক্ষা সামগ্রী কিনতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়েছে। ফলে ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাস শেষে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোর মুনাফা অনেক ও কমে গেছে বিগত বছরগুলোর তুলনায়।
৩. বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বলা যায় মন্দ ঋণই হলো ব্যাংকিং খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ। কারণ, ব্যাংকগুলো একটি নির্ধারিত হারে আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করে। ওই অর্থ আবার উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এখন ওই ঋণ যদি আদায়ই না হয় আর সেটা যদি মন্দ মানের ঋণ হয় তাহলে ব্যাংকগুলো বছর শেষে আমানতকারীদের অর্থ কিভাবে ফেরত দেবে। ব্যাংকগুলো হয়ত এখনো নতুন আমানত নিয়ে পুরনো আমানত ফেরত দিচ্ছে, তাই আপাতত সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু দায়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে আর কাংখিত হারে আমানত পাওয়া না গেলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া অনেক কঠিন হবে।
আমরা কিছুদিন আগে দেখেছি, নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় পরিচলনা পর্ষদ ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটিকে রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে সরকারি হস্তক্ষেপে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই গ্রাহকদে আস্থায় আনা যাচ্ছে না ব্যাংকটিকে।
তাই ব্যাংকিং খাতের এই অবস্থা উত্তরণের জন্য মন্দ ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যারা ঋণ নিয়ে ব্যাংকের অর্থ বছরের পর বছর ফেরত দিচ্ছে না তাদেও বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এইখানে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছাই যথেষ্ট। সরকার যেরকম ক্যাসিনো, চাল চুরি আর করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দূর্নীতির বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে, ঐরকম মন্দ ঋণ আদায়ে আন্তরিক হলে হয়তো একমাত্র এই ব্যাংকিং খাতের জন্য এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। আর সুদের হারের এই আদিষ্ট নীতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি আর বর্তমান আমানত হারের নিম্নমুখী প্রবনতা ব্যাংকগুলোর জন্য বিভিন্ন রকম সংকট এবং আর্থিক খাতের প্রসার এবং স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। বিষয়টি অবশ্যই এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আর এজন্য প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত সুদের হারের পরিবর্তে একটি উপযুক্ত বাজার চালিত সুদের হার নীতি গ্রহণ করাই হবে সময়োপযোগী।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT