উপ সম্পাদকীয়

মানুষ কেন নিমর্ম হয়

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৮-২০২০ ইং ০৩:১৭:৪৬ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত
Image

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, ‘মানুষ কেন মানুষ মারে? এই শিরোনামে বিখ্যাত কবি ও শিক্ষাবিদ আলী আহসানের একটি লেখা ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। লেখাটা পড়ে আমি আমার ইংল্যান্ড প্রবাসী বন্ধু গোলাম মোস্তফাকে ফোন করি। টেলিফোনে এ নিয়ে আমাদের মধ্যে বিস্তারিত আলাপ হয়। আলী আহসানের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই নিবন্ধের অবতারণা। তবে এখানে কিছু কিছু বিষয়ের সূত্র গোলাম মোস্তফার কাছ থেকে পাওয়া আর তাই তাঁর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেখাটা শুরু করছি। দার্শনিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলী আহসান যথার্থই প্রশ্নটা তুলেছেন। লেখাটা পড়ে তাৎক্ষণিক আমার মনে হয়েছে, হঠাৎ আলী আহসানের মনে এই পুরনো প্রশ্নটা নতুন করে কেন জেগে উঠল, আর উঠলই যখন, তখন তিনি কেন বিষয়টির আরও গভীরে গেলেন না।
আলী আহসান সংক্ষেপে যা লিখেছিলেন তার মর্মার্থ দাঁড়ায় এরকম, অন্য প্রজাতির জন্তু-জানোয়াররা নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও তারা একজন আরেকজনকে কখনও প্রাণে মারে না বা খুন করে না। আমরা জানি, কাকের মাংস কাকে খায় না, বাঘ বাঘকে খুন করে না, হরিণ হরিণের মাংস মুখে দেয় না, এমনকী একটা পিঁপড়াও আরেকটা পিঁপড়াকে বধ করে না। আহার নিয়ে ক্ষুধার্ত দুই কুকুর কাড়াকাড়ি করে, কামড়াকামড়িও করে, অবশেষে যার গায়ে জোর বেশি সেই খাবারের দখল নেয়, দুর্বল কুকুর লেজ গুটিয়ে পালায়। এখানেই তাদের মধ্যেকার সংঘাতের স্থায়ী মীমাংসা হয়ে যায়, একটা আরেকটাকে হত্যা করে না, করার প্রয়োজন হয় না। এছাড়া বিপরীত লিঙ্গের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও পশুকুলে অহরহ ঝগড়াঝাটি হতে দেখা যায়, কিন্তু কোনও সময়ই তা খুনখারাবি পর্যন্ত গড়ায় না। এখানেও দৈহিক শক্তিবলে একটা জিতে, অন্যটা হেরে জঙ্গলে পালায়। ওই প্রবন্ধে লেখক আরও বলেছিলেন, একই ধরনের দ্বন্দ্বে পুরুষ মানুষ পশুর চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র হতে পারে। ধর্মীয় পুস্তকাদি থেকে আলী আহসান মানবজীবনের সূচনালগ্নে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের উদাহরণ টেনে এনেছিলেন। কে না জানে, হাবিল-কাবিলের কথা ইসলামেও আছে।
এবার আলী আহসানের বক্তব্যের পরিধিকে বাড়িয়ে বিষয়টির আরেকটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক কী আছে। পেটের খিদে ও যৌন প্রতিযোগিতায় প্রাণিকুলে স্বজাতির মধ্যে ঝগড়াঝাটি হয়, সংঘাত বাঁধে, কিন্তু মানুষের মতো একটা আরেকটাকে হত্যা করে না। এর দুটো কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, যে বিষয়ে ঝগড়া হোক না কেন, এক পশুর প্রতি স্বজাতির আরেক পশুর একটা ন্যূনতম মমত্ববোধ বা দরদ থাকে, যার জন্য তাদের মারামারিতে একটা প্রাকৃতিক সীমারেখা টানা হয়ে যায় এবং তারা সচেতনভাবে কোনও সময়ই সে রেখা অতিক্রম করে না। এটা যদি ঠিক হয়, তা হলে পশুকুল অবচেতন বা অবুঝ নয়। আর তা যদি না হয়, তা হলে দ্বিতীয়টি ঠিক, অর্থাৎ তারা স্বভাবজাতভাবেই মানুষের চেয়ে কম হিংস্র, কারণ তাদের লড়াইয়ের শেষ পরিণতি কখনও মানুষের মতো বীভৎস, মারাত্মক, এত ধ্বংসাত্মক এবং আত্মঘাতী হয় ন্ াযেভাবেই দেখি না কেন, বিষয়টি সভ্য মানবকুলের জন্য যে সম্মানসূচক নয় তা বলাই বাহুল্য।
এ মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াইর ক্ষেত্রটা পশুকুলের চেয়ে আরও অনেক বেশী বিস্তৃত, অনেক প্রসারিত। মানুষে মানুষে সংঘাত শুধু বিত্ত-বৈভব ও নারীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই হয় না, হয় আরও অনেক কারণে। যেমন, সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে চলছে মানুষের নিরন্তর লড়াই এবং এ লড়াইয়ে অনেক সময় একজন আরকেজনকে বধ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস রাজনীতি, আর তাই রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ঘটে অনেক ষড়যন্ত্র এবং খুনখারাবি। এছাড়াও, মানুষ যদি মনে করে কারও কারণে তার মান-সম্মান অথবা সুনাম বর্তমানে নষ্ট হচ্ছে কিংবা ভবিষ্যতে হতে পারে, তবে সে তাকেও হত্যা করতে উদ্যত হতে পারে। মানুষের মধ্যে ভাড়াটে খুনিও থাকে। টাকার বিনিময়ে একজনের নির্দেশে ওই জাতীয় খুনিরা সহজেই আরেকজনকে খতম করে ফেলতে পারে। তবে এরও চূড়ান্ত লক্ষ্যের মধ্যে অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা, মানসম্মান ও নারীই প্রধান। মানুষ স্রেফ রাগের বশবর্তী হয়েও মানুষকে মেরে ফেলতে প্রবৃত্ত হয়। তবে রাগেরও মূল কারণ হতে পারে টাকাপয়সা, জমিজমা, নারী কিংবা এ জাতীয় অনুষঙ্গ। অনেক সময় মানুষ মদ-গাঁজা খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে সামান্য কারণে প্রতিপক্ষের প্রাণ হরণ করতে পারে। অনিচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনাবশত মানুষের হাতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। মিল-কারখানা ও রাস্তাঘাটে যন্ত্রযান চালাতে গিয়েও একজন আরেকজনকে মেরে ফেলতে পারে। আরেকটি ঘটনা ঘটতে পারে মনুষ্যকুলে, পশুকুলে যার কোনও আশঙ্কা নেই। কিছু কিছু মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক উদ্দেশ্যহীনভাবে স্রেফ পাশবিক উল্লাসে অকারণেও মানুষ মারতে পারে।
পশুর সঙ্গে পশুর লড়াইর মীমাংসা হয় কেবলমাত্র দৈহিক শক্তির ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যে দুর্বল, সে সবলের কাছে হেরে পালিয়ে যায়, নতুন করে লড়াইর জন্য ফের ঘুরে দাঁড়ায় না, কিন্তু মানুষের মধ্যেকার সংঘাতে জয়-পরাজয়ের ফয়সালা শুধু গায়ের জোরেই হয় না। এখানে আরও বিবেচ্য বিষয় আছে। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। সে শরীরে দুর্বল হলে পালিয়ে যাওয়ার পরও নতুন বুদ্ধি এঁটে সবলকে হারাবার জন্য নতুন উদ্যমে নতুন ফন্দি নিয়ে আবার আক্রমণ রচনা করতে পারে। পশুর বেলা বুদ্ধিবৃত্তিক পুনরাক্রমণের কোনও অবকাশ থাকে না। এখানে আরেকটি ব্যাপার থাকতে পারে। মানুষের স্মৃতিশক্তি অনেক তীক্ষè, তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী। শক্তিমান প্রতিপক্ষের কাছে দুর্বল মানুষটা প্রথমবার হেরে গিয়ে পশুর মতো পালিয়ে গেলেও কিন্তু সে পরাজয়ের কথা, বেদনার কথা, অপমানের কথা সমাজ ভোলে না। আর ভোলে না বলেই সে নতুন করে লড়াইর পরিকল্পনা নিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। যেহেতু দুর্বল এ কাজ করতে পারে, তাই সবল তাকে আগেই খতম করারও চেষ্টা করে এবং অনেক সময় সফলও হয়।
আরেকটা ব্যাপার আছে, কুরআন এবং বাইবেলে যার যোগসূত্র পাওয়া যায়। মানুষের পেছনে ক্রমাগত কাজ করে যায় শয়তান বা ইবলিস। শয়তানের ধর্মই হচ্ছে মানুষকে খারাপ কাজে কুমন্ত্রণা দেওয়া ও ভাল কাজ থেকে দূরে রাখা। খুনখারাবি একটি জঘন্য অপরাধ। এটা শয়তানের খুব প্রিয় কাজ। সে এমন কাজে সর্বদা মানুষকে উস্কানি দিতে থাকে, কোনও কোনও সময় সফলও হয়। শয়তান যখন বেহেশ্ত থেকে বিতাড়িত হয়ে গিয়েছে, যাতে সে সবসময় আদম সন্তানদের খারাপ কাজে কুমন্ত্রণা দিতে পারে, প্রভাবিত করতে পারে। জন্তু-জানোয়ারের পেছনে লাগার জন্য শয়তান এমন বড় অধিকার আল্লাহর কাছে চায়ওনি, পায়ওনি। পশুর পাশবিকতার সঙ্গে মানুষের হিংস্রতার আরেকটা বড় পার্থক্য আছে। মনুষ্য সন্তান পশুকুলের চেয়ে অনেক বেশি সমাজবদ্ধ জীবনযাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে। যেহেতু মানুষ বৈষয়িক ও স্বার্থপর, তাই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যখন-তখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিতে পারে। কোনও কোনও সময় এ নিয়ে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে বিধক্ষংসী যুদ্ধ স্ব স্ব দেশের সীমানা রক্ষা করা যার যার সেনাবাহিনীর পবিত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এ জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক দেশের সেনাবাহিনী আরেক দেশের সৈন্যদের, এমনকি অসামরিক জনগণকেও হত্যা করতে পারে। এতে দেখা যায়, মানুষ যেমন বদ মতলবে মানুষ মারতে পারে তেমনই আবার সৎ ও মহৎ কারণেও স্বজাতির প্রাণ সংহার করতে কসুর করে না। পশুদের মধ্যে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
পরিতাপের বিষয় আজকাল দেখা যাচ্ছে সভ্য বলে বিবেচিত মানুষ আজ প্রতিপক্ষকে শুধু ঘায়েল নয় খুন করতে বিন্দুমাত্র তার বুক কাপেনা। দেখা যায় অত্যন্ত ঠান্ডা মস্তিষ্কে মানুষ মানুষকে খুন করছে, ভাই-ভাইকে-বোনকে, বন্ধু-বন্ধুকে, ছেলে মা-বাবাকে আবার বাবা ছেলে-মেয়েদেরকে। কেন তা করছে তাতো করছে প্রভাবের জন্য, স্বার্থের জন্য, অর্থের জন্য বা সম্পদের জন্য। কিন্তু এ সম্পদ বা অর্থইতো সব নয়-প্রেম, ভালোবাসা, মায়া-মমতা আজ গেল কোথায়? আল্লাহর প্রতি মানুষের ভয় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা বা নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য । এতসব খুন খারাবি হচ্ছে। এক জাতি আরেক জাতিকে কব্জা করার জন্য, এক দেশ আরেক দেশকে জব্ধ করে রাখার জন্য, প্রভাব বিস্তারের জন্য বা পরোক্ষভাবে স্বীয় ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য এসব করে যাচ্ছে। আমার মতে একমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললেনই মানুষ মানুষকে খুন করতে পারবেনা। ধৈর্য্য হারিয়ে খুন খারাবিতে শরিক হতে পারবেনা। পৃথিবীতে আছে নানা ধর্ম, নানা জাতের মানুষ, কোন ধর্মেই মানুষকে খুন করার জন্য বলা হয়নি। তারপরও হচ্ছে মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।
পবিত্র কুরআনের সূত্র ধরে আরেকটি কথা বলা যায়। আল্লাহ পশুকে এমন স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, তারা সবসময়ই পশুর মতো আচরণ করে। পক্ষান্তরে, মানুষকে তিনি বানিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ অবয়বে, কিন্তু সময় সময় সে আবার পশুর মতো হয়ে যেতে পারে, আবার কখনও বা পশুর চেয়েও অধম হতে পারে তার আচার-ব্যবহার আর এসব বাস্তবের মধ্যেই উত্তর পাওয়া যেতে পারে কবি শিক্ষাবিদ আলী আহসানের উত্থাপিত এ কঠিন ও জটিল প্রশ্নের।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT