উপ সম্পাদকীয়

করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৮-২০২০ ইং ০৩:১৮:৫৭ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত
Image

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আমদানি-রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় বিদ্যমান অনেক শিল্প কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়েছে। অর্থনীতির সব খাতই আজ মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি। করোনার কারণে বহুমাত্রিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসা। বিশেষ করে ফেরিওয়ালা, হকার, ভ্যানে পণ্য বিক্রেতা, চা-পান সিগারেট, খুদে দোকান, মুদি দোকান, ক্ষুদ্র হোটেল, রেস্তোরাঁ, মাঝারি পাইকারী ব্যবসা। সারা দেশে এ ধরণের ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৮৬ লাখের ওপরে। তাদের ওপর নির্ভরশীল ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা আজ থমকে গেছে। যারা চাকরি করত, অনেকের চাকরি চলে গেছে। অনেকের চাকরি আছে, বেতন পায় না। অনেকে পুরো বেতন পাচ্ছে না। করোনার কারণে সব পেশার মানুষই জীবন জীবিকা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। যে মানুষটা আগে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার কেনাবেচা করত, তার বিক্রি এখন ঠেকেছে ২০০-৩০০ টাকায়। এই টাকায় কোনো লাভই হচ্ছে না। অনেকের সংসারে তাই টান পড়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবসা মন্দা থাকায় পেটের ভাত জোটানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে। অনেকে অন্য কাজের জন্য যে সঞ্চয় করেছিলেন, সেখানে হাত দিয়েছেন। এখন যা হচ্ছে তাতে দোকানের পুঁজি শেষ হওয়ার পথে। করোনা দুর্যোগে পিষ্ট হয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের নাভিশ্বাস উঠছে। নি¤œবিত্তরা হাত পাতছেন অন্যের কাছে। আর ব্যবসায়ীরা না পারছেন হাত পাততে, না পাচ্ছেন সরকারের দেয়া সুবিধা। করোনায় ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে। এভাবে আরো কিছুদিন চললে অনেক দোকানদার তাদের কর্মচারীদের ছাঁটাই দিতে বাধ্য হবেন। এই করোনার কারণে স্থানীয় উৎপাদনে যেমন আঘাত এসেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক উৎপাদনেও আঘাত এসেছে। আমাদের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে- রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। তারাও আজ চরম বেকায়দায় রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অনেক শ্রমিক খালি হাতে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের অগনিত মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমনিষ্ঠ কাজে জড়িত সেই শত শত বছর আগে থেকেই। তারাও আজ বেকার হয়ে দেশে ফিরতে শুরু করেছে। কী বীভৎস পরিস্থিতি! এক হৃদয়বিদারক অবস্থা।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে কাজ হারানোর পর এখন বাসস্থানও হারানো শুরু করেছে মানুষ। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত ধরে মানবিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে করোনাভাইরাস। অনিশ্চিত জীবন নিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন শত শত মানুষ। ভাড়ার আয় বন্ধ হওয়ায় বিপাকে আছেন অনেক বাড়িওয়ালা। তবে এই বিপদ শুধু ভাড়াটিয়া আর বাড়ির মালিকেরই নয়; বরং গোটা অর্থনীতির। শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে এখন হাজার হাজার মানুষ। আর এই শহর ছাড়ার পথ ধরেই দীর্ঘস্থায়ী হবে বেকার সমস্যা। কারণ অনেক মানুষ আছে যারা বাসা ছেড়েছেন। আবার তাদের যাবারও জায়গা নেই। গ্রামে বাবার ভিটায় ফিরে গেলেও কাজ পাবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার অনেকের তো বাবার ভিটেবাড়িও নেই।
ঢাকার ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। থাকত ভাড়া বাসায়। তাদের অনেকেই এখন ঢাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে ঢাকার আবাসিক এলাকার দেয়ালগুলো ঢেকে গেছে টু-লেট বিজ্ঞপ্তিতে। এর মাত্রা বাড়ছে প্রতিদিনই। জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে টিকতে না পেরে ভাড়া বাসা ছাড়ার দিন গুনছেন নতুন অনেকেই। ভাড়াটিয়া পরিষদ বলছে, কাজ হারিয়ে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। তাদের প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ অবদানে ভর করেই দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ।
করোনাভাইরাসের তা-বে বাংলাদেশের মানুষের আয় কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় উল্টো আরও বেড়েছে। কেননা স্বাস্থ্য পরিচর্যা আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে বাস ভাড়া, রিকশা ভাড়াসহ প্রায় সব ধরণের যাতায়াত খরচ বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। একইভাবে জরুরি ঔষধ, ভোগ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরণের জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই মাস আগে গরীবের ডাল ভাতের সঙ্গী মোটা মসুর ডাল ছিল ৬০ টাকা কেজি। এখন সেটা ৮০ টাকা। আর এ সময় মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত। এমনকি হাত ধোয়ার লিকুইড সাবান ও কাপড় বিভিন্ন স্যানিটাইজারের দামও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ জীবন ও জীবিকার হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। খোদ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস বলছে, করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাতে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। করোনার এই মহা সংকটে সবাই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মানুষ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে জীবন ও জীবিকা নিয়ে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। সামনে নতুন করে অন্তত ২ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে এমন তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক। এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) গত ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ১৬০ কোটি মানুষ চাকুরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে; যা মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্ধেক। বাংলাদেশেও রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে।
কোভিড-১৯ একটা বৈশ্বিক মহামারী। এর প্রভাবে সারা বিশ্বই এখন দিশেহারা। করোনার তা-বে গোটা বিশ্বের অর্থ ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আমাদের বাংলাদেশে এর প্রভাবটা হবে চতুর্মুখী। একদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী শহর থেকে, আবাসস্থল থেকে, কর্মস্থল থেকে ড্রপআউট হয়ে যাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা অতি প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT