সাহিত্য

হারং-হুরং কিংবা শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত

রণদীপম বসু প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৬ ইং ০৩:৫৭:৩২ | সংবাদটি ২৫১ বার পঠিত

বিভিন্ন কিংবদন্তী থেকে যখন ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ করতে হয় এবং সেই কিংবদন্তীর মূলে যদি থাকে পৌরাণিক উপাখ্যান আর অলৌকিক আধ্যাত্মিকতার আবেগী প্রভাব, তাহলে সে ইতিহাসে একধরনের যাদুবাস্তবতার মিশেল থাকে। শ্রীহট্ট তথা সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব অস্পষ্ট নয়। তবু তা থেকেই আমাদেরকে নিজের মতো করে প্রকৃত ধারণাটা নিতে হয়। এই ধারণা খুব স্পষ্ট বা নির্ভুল না হলেও প্রাচীন পটচিত্রের মতোই অর্থবহ তো বটেই। আর ইতিহাসের বাস্তব উপকরণ হিসেবে কোন প্রাচীন ঐতিহ্যের উপস্থিতি সেই ধারণার একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেয় বৈকি। কিংবদন্তীর হুরং-হারং হয়তো শ্রীহট্টের ইতিহাসের জন্য তেমনই এক চমৎকার নমুনা হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়।
হারং-হুরং শব্দের অর্থ কোন অভিধানে থাকার কথা নয়। কেননা শব্দ দুটি নিঃসন্দেহে সিলেটী প্রাচীন আঞ্চলিক কিছু একটা হবে, এটা বুঝা যায়। সিলেটবাসী যাকেই এর সম্পূর্ণ অর্থ জিজ্ঞেস করা হয়েছে, নিশ্চয় করে তা কেউ বলতে পারলেন না। হতে পারে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেনি বলেই এই অস্পষ্টতা। তবে নিজস্ব অভিজ্ঞতায় বলে, হুরং হলো সুড়ঙ্গ শব্দের সিলেটী অপভ্রংশ, এক্ষেত্রে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। আর আমার নিজ জেলা সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যতটুকু মনে পড়ে, সাঁকো অর্থেই হারং শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সাঁকো বলতে যদি প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে কোন আড়াআড়ি বা বিকল্প পথ বোঝানো হয়, তাহলে হারং-হুরং অর্থ হবে কোথাও যাবার বিকল্প সুড়ঙ্গ পথ। ইতিহাসের সাক্ষ্য মানলে অন্তত ছয়শ বছর পূর্বের তৈরি এই হারং-হুরং-এর সার্বিক প্রয়োজন পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই অর্থটা হয়তো অমূলক হবে না। কিন্তু এই সার্বিক পরিস্থিতি উপলব্ধির জন্য সিলেটের কিংবদন্তী-প্রধান ইতিহাসের পরিক্রমা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা থাকাটা বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা না হয় ইতিহাসের মধ্য দিয়েই হারং-হুরং-এ প্রবেশের চেষ্টা করি।
কিংবদন্তীর খোঁজে : সিলেট নামটি নিলেই যেমন অনিবার্যভাবে এসে যায় আউলিয়া পুরুষ হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর কথা, তেমনি ইতিহাসের সংযুক্তি হিসেবে এসে যায় রাজা গৌড়গোবিন্দের কথাও। সিলেটকে শ্রীভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করা বেশ পুরনো রেওয়াজ। প্রকৃত অর্থেই সিলেট অঞ্চল জল-জঙ্গল-টিলা-পর্বত-হাওর-নদী-লতা-বৃক্ষ-বাগান তথা প্রকৃতির বিচিত্র লীলাভূমি বলেই যে সিলেটকে শ্রীভূমি বলা হয় তা যেমন সত্যি, তেমনি সূফি-দরবেশ-দেব-দেবী তথা প্রাচীন পৌরাণিক বিশ্বাসের অমলীন স্পর্শধোয়া ভূমির পবিত্রতার প্রতীক হিসেবেও সিলেটকে শ্রীভূমি বলা হয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বর্তমান সিলেটের পূর্বনাম ছিলো শ্রীহট্ট। পুরনো কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজে সিলেটকে শ্রীহট্ট হিসেবেই উদ্ধৃত করা আছে। এমনকি পুরনো স্থাপনাগুলোর নামফলকে এখনো শ্রীহট্ট উদ্ধৃতিই লক্ষ্য করা যায়। সিলেটের ইতিহাস বিষয়ক অন্যতম পুরনো প্রকাশনা হিসেবে ১৯১০ সালে প্রকাশিত অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি’র ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটির ঢাউস সাইজের খ- দুটোতে (পূর্বাংশ ও উত্তরাংশ) শ্রীহট্ট ছাড়া সিলেট শব্দটি চোখে পড়েনি কোথাও। এখানে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসে, শ্রীহট্ট থেকে এই সিলেট নামের বিবর্তনটা কীভাবে হলো?
এ বিষয়ে সেই ছাত্রকালে শোনা কিংবদন্তীতুল্য একটা কাহিনী হচ্ছে, হযরত শাহজালাল (রহ.) যখন শ্রীহট্টের দিকে আগমন করেন তখন তৎকালীন হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দ তাঁর আগমন থামাতে শ্রীহট্ট সীমান্তে তাঁর কথিত জাদু ক্ষমতার দ্বারা পাথরের দেয়াল বা পাহাড়ের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। হয়রত শাহজালালও তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে ‘শিল হট্’ বলতেই সেই শিল বা পাথরের প্রতিন্ধক হটে যায় বা অপসারিত হয়। এ থেকেই এই ভূমির অন্য নাম হয়েছে শিল-হট থেকে সিলেট। তবে ব্যক্তিগতভাবে এ কাহিনী আমার কাছে যুক্তিহীন কল্পনাপ্রসূত বলেই মনে হয়। বরং বৃটিশ আমলেই এই সিলেট শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করি। কেননা পুরনো কাগজপত্রে বাংলায় শ্রীহট্ট হিসেবে লেখা হলেও ভারতের সরকারি নথিপত্রে যেমন আসাম গেজেটিয়ারে (অংংধস উরংঃৎরপঃ এধুবঃঃববৎং) বা অন্যত্র শ্রীহট্টকে ইংরেজিতেই প্রথম ‘সিলহেট’ (ঝুষযবঃ) হিসেবে উদ্ধৃত হতে দেখা যায়। তৎকালীন ভারতবর্ষে শাসক হিসেবে আধিপত্যকারী বৃটিশদের নিজস্ব ইংরেজি উচ্চারণে অন্য অনেক বাংলা যুক্তশব্দের বিবর্তন প্রক্রিয়ার মতোই ‘শ্রীহট্ট’ শব্দটিও যে ভিন্নমাত্রিক ‘সিলহেট’ শব্দে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান ‘সিলেট’-এ রূপান্তরিত হয়েছে, এই ব্যাখ্যাই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়।
 আর শ্রীহট্ট নামের উৎস নিয়েও রয়েছে ব্যাপক অস্পষ্টতা। এর সাথে হিন্দু পৌরাণিক মিথের প্রভাব জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী শ্রী শ্রী হাটকেশ্বর হচ্ছে মহাদেব শিবের বহু নামের অন্যতম। তৎকালীন গৌড় (শ্রীহট্ট) রাজাদের কর্তৃক পুজিত শ্রী হাটকেশ্বরই শ্রীহট্ট নামের উৎস বলে অনেকে মনে করেন। এই হাটকেশ্বর নামে প্রসিদ্ধ শিবের প্রতিষ্ঠায় গৌরবান্বিত ছিলো শ্রীহট্ট, যাঁর মহিমা প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রেও কীর্তিত আছে। যেমন প্রাচীন মহালিঙ্গেশ্বর তন্ত্রে বর্ণিত আছে-
‘নকুলেশঃ কালীপীঠে শ্রীহট্টে হাটকেশ্বরঃ।’- (মহালিঙ্গেশ্বর তন্ত্র)।
শ্রীহট্টে এককালে যে প্রচুর সাধু-সন্ন্যাসীর আনাগোনা ছিলো এই ধারণাও অমূলক নয়। কেননা হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী গোটা ভারতবর্ষে পবিত্র তীর্থ হিসেবে যে একান্নটি মহাপীঠস্থান রয়েছে, বর্তমান বাংলাদেশে এর সাতটির মধ্যে দুটির অবস্থানই শ্রীহট্টে। পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী- মানব জাতির প্রথম সভ্যতার যুগে (সত্য যুগে) রাজা দক্ষ প্রজাপতি এক যজ্ঞ করেন। সেই যজ্ঞে সকল দেবতারা আহুত হন। কিন্তু দক্ষপ্রজাপতি মহাদেবকে নিমন্ত্রণ না করে তাঁর নিন্দাবাদ করেছিলেন। দক্ষতনয়া সতী পিতার মুখে পতি নিন্দা শুনে দুঃখে অপমানে দেহত্যাগ করেন। সতী দেহত্যাগ করলে মহাদেব সতীদেহ স্কন্ধে নিয়ে যজ্ঞস্থান তছনছ করে দিয়ে উন্মত্তের মতো ভারতের বিবিধ অংশে প্রলয়নৃত্যে ভ্রমণ করতে লাগলেন। মহাপ্রলয়ের অধিপতি মহাদেবের এই প্রলয়ঙ্করী অবস্থায় স্বর্গমর্ত্যরে আসন্ন প্রলয় আশঙ্কায় দেবতারা জগতের স্থিতির অধিপতি ভগবান বিষ্ণুর আরাধনায় বসেন। ভগবান বিষ্ণু তখন তাঁর প্রবল ধর্মচক্র দিয়ে সতীর দেহ খ- খ- করে বিভিন্ন স্থানে পতিত করে মহাদেবকে শান্ত করেন। যে যে স্থানে সতীর ছেদিত অঙ্গ পতিত হয়, সেই সেই স্থান এক একটি তীর্থে পরিণত হয় যা মহাপীঠ নামে খ্যাত হয়েছে। যে স্থানে সতীর অঙ্গাংশ বা অলঙ্কার পতিত হয় তার নাম উপপীঠ। প্রত্যেক পীঠের অধিষ্ঠাত্রি এক এক ভৈরবী ও তাঁহার রক্ষক এক এক ভৈরব (শিব) আছেন।
শ্রীহট্টে এরকম দুটি মহাপীঠ রয়েছে। একটি হলো সিলেট নগরী হতে ৩৮ মাইল উত্তরপূর্বে জয়ন্তীয়ার বাউরভাগ (বাম+উরু+ভাগ)-এর বামজঙ্ঘা পীঠ, যা সাধারণত ‘ফালজোরের কালীবাড়ী’ নামে পরিচিত। পীঠাধিষ্ঠাত্রী জয়ন্তী দেবীর নামেই সে অঞ্চল জয়ন্তীয়া বা জৈন্তা নামে খ্যাত। এখানকার ভৈরবের নাম ক্রমদীশ্বর। আর শ্রীহট্টের অন্য মহাপীঠটি হচ্ছে সিলেট শহরের নিকটস্থ দেড় মাইল দক্ষিণে বর্তমান দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে মহালক্ষ্মী ভৈরবী গ্রীবাপীঠ, যা গোটাটিকরের ভৈরব (শিব) বাড়ি নামে পরিচিত। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী এই গ্রীবাপীঠে সতীর গ্রীবা পতিত হয়েছিলো।
এখানকার ভৈরবীর নাম মহালক্ষ্মী ও ভৈরব সর্ব্বানন্দ। প্রচলিত পঞ্জিকার তীর্থ পরিচয়ে এবং পুরনো সরকারি নথিপত্রে (অংংধস উরংঃৎরপঃ এধুবঃঃববৎং াড়ষ.২ পযধঢ়.৩ ঢ়-৮৬) এই গ্রীবাপীঠ তীর্থস্থান হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে এককালে এরকম প্রচুর দেবালয় ও মন্দির ছিলো বলে জানা যায়। কালের বিবর্তনে সেসব স্মৃতি এখন ম্লান হয়ে এসেছে।
তবে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে এই মহালক্ষ্মী গ্রীবাপীঠের পাশেই বর্তমানে এলজিইডি কর্তৃক সংস্কারকৃত একটি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাকাল উৎকীর্ণ আছে ১৭৮৬ ইং হিসেবে। স্কুলটির নাম ‘মহালক্ষ্মী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। আমাদের দেশে এমন প্রাচীন বিদ্যাপীঠ বা প্রতিষ্ঠান আর কোথায় কয়টি আছে তা জানা নেই।
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত : এককালে শ্রীহট্ট কয়েকটি খ- রাজ্য ছিলো। পার্শ্ববর্তী ত্রৈপুর রাজবংশের অধ্যুষিত অঞ্চল ছিলো ত্রিপুরা রাজ্য। এই ত্রৈপুর রাজবংশের অধিকার এক সময় বরবক্র অর্থাৎ বরাক নদীর সমস্ত বাম তীর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিলো। বরাকের অপর তীর থেকে শ্রীহট্ট গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তীয়া নামে তিনটি প্রধান খ-ে বিভক্ত ছিলো এবং এই তিন ভাগ তিন পৃথক নৃপতি কর্তৃক শাসিত হতো বলে ‘ঐঁহঃবৎ’ং ঝঃধঃরংঃরপধষ অপপড়ঁহঃং ড়ভ অংংধস াড়ষ.২ (ঝুষযবঃ)- এ উল্লেখ রয়েছে। এই রাজ্য তিনটির অবস্থান ছিলো-
গৌড় : বর্তমান সিলেট শহর সহ উত্তর সিলেট এবং পূর্ব ও দক্ষিণে অনেক দূর ব্যাপ্ত ছিলো গৌড় রাজ্যের সীমা। গৌড়ের রাজা প্রায়শই শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হতেন।
লাউড় : গৌড়ের পশ্চিমে অর্থাৎ সিলেট জেলার পশ্চিমাংশ ব্যাপ্ত লাউড় রাজ্য ছিলো। একসময় লাউড় রাজ্য ময়মনসিংহ জেলার কিয়ৎ-অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। বর্তমানে হবিগঞ্জের কিছু অংশ এবং সুনামগঞ্জের প্রায় পুরোটাই এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
জয়ন্তীয়া : সিলেটের উত্তর ও পূর্বাংশে বিস্তৃত ছিলো জয়ন্তীয়া রাজ্য। দক্ষিণে সুরমা নদী এ রাজ্যের সীমা রক্ষা করতো। আর দক্ষিণ-পূর্বাংশে ত্রিপুরা রাজ্য পর্যন্ত এর সীমা বিস্তৃত ছিলো। এই সমতল ভূমি ছাড়াও বৃটিশ আমলের প্রায় সমগ্র পার্বত্য জয়ন্তীয়া জিলা এ রাজ্যের অন্তর্গত ছিলো।
এই তিনটি রাজ্য ছাড়া তরফ নামে আরেকটি অঞ্চল ছিলো যা প্রাচীনকাল থেকেই পৃথকভাবে শাসিত হতো। অধিকাংশ সময় এটি ত্রিপুরার আধিপত্য স্বীকার করলেও, গৌড় রাজ্যের অংশ বিশেষ বলে সাধারণত বিবেচিত হতো। এবং চতুর্দশ শতকে মুসলিম বিজয়ের পর তা গৌড়ের অংশরূপে গণ্য নয়। তরফের ন্যায় ইটা ও প্রতাপগড় রাজ্যও মুসলিম বিজয়ের পর থেকে গৌড়ের অংশ বলে পরিগণিত হয়েছিলো।
রাজা গৌড়গোবিন্দ : শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্য মুসলিম বিজয়ের আগ পর্যন্ত প্রসিদ্ধনামা গোবিন্দের শাসনাধীনে ছিলো। কারো কারো মতে মধ্য ভারতের ভোজ বা বিক্রমাদিত্য নাম-পদবীতে একাধিক রাজার মতোই গোবিন্দ কোন নির্দিষ্ট রাজার নাম ছিলো না। শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যের রাজগণ ‘গোবিন্দ’ এই বিশেষ উপাধিতে পরিচিত হতেন। গৌড় রাজ্যের অধিপতি হিসেবে গোবিন্দ সাধারণত ‘গৌড়-গোবিন্দ’ নামে কথিত হতেন। গোবিন্দের পিতার নাম কী ছিলো তা জানা যায় না। কিংবদন্তী মতে তিনি সমুদ্রের তনয়-
‘সমুদ্র তনয় গৌড় গোবিন্দ নামেতে।
শ্রীহট্ট দেশের রাজা ছিলেন পর্ব্বতে।।’- (ভবানী প্রসাদ দত্তের লিপি)।
কথিত আছে, পূর্বকালে ত্রৈপুর রাজবংশীয় কোন রাজার শত শত মহিষী ছিলেন। সমুদ্রদেব (বরুনদেব) তার মধ্যে কোন এক মহিষীর সাথে মানুষের রূপ ধরে মিলিত হন এবং তাঁর কৃপাতেই রাণী গর্ভধারণ করেন। এই গর্ভের কথা প্রকাশিত হলে রাজা সেই রাণীকে নির্বাসিত করেন। সে অবস্থায় রাণী এক সুলক্ষণান্বিত পুত্র প্রসব করেন। সমুদ্র তখন আবির্ভুত হয়ে রাণীকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, তাঁর অভিপ্রায়ে সমুদ্রের জল সরে যতদূর চড়া পড়বে, নবজাত শিশু ততদূর পর্যন্ত রাজ্যাধিকার করতে পারবে। এই নির্বাসিতা মহিষীপুত্রই গোবিন্দ।
এই কিংবদন্তী থেকে ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে ধারণা করা হয়, একসময় শ্রীহট্টের অনেকাংশ সমুদ্রের (হ্রদের) কুক্ষিগত ছিলো, সমুদ্র সরে গিয়ে বা ভরাট হওয়ায় অনেক স্থান প্রাচীন গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো। গোবিন্দ কোন নির্বাসিতা ত্রৈপুর-রাজমহিষীর সন্তান। নয়তো গোবিন্দ শ্রীহট্টের কোন হাওরের অপরাপর হতে গৌড়ে এসে ভাগ্যবশে রাজ্যাধিকারী হয়েছিলেন। এর বাইরে গোবিন্দের পরিচয় সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না।
খ্রীস্টিয় চতুর্দশ শতকে যিনি রাজত্ব করতেন, শ্রীহট্টের সেই শেষ হিন্দু নৃপতি গৌড়গোবিন্দ বীরপুরুষ বলে খ্যাত ছিলেন। তাঁর নানাবিধ অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো এবং তিনি দূর হতে শব্দ শুনেই অন্তরাল থেকে লক্ষভেদ করতে পারতেন বলে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। এজন্য বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিতে তাঁকে যাদুবিদ্যা বিশারদ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি কুসংস্কার বর্জিত ছিলেন না বলে রাজ্যের পক্ষে তা অশুভজনক হয়েছিলো। ‘দত্তবংশাবলী’ নামক পুঁথিতে রাজা গৌড়গোবিন্দ সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র সংবলিত কিংবদন্তী বর্ণিত রয়েছে-
‘জানিহ শ্রীহট্ট নামে আছে পূর্ব্ব দেশ।
ব্রহ্মপত্রের পূর্ব্ব স্থান আছে সবিশেষ।
গৌড় গোবিন্দ নাম তাহার নৃপতি।
শব্দভেদী বাণ যাঁর আছিল অধীতি ইত্যাদি’- (দত্তবংশাবলী)।
ছোট-বড় পাহাড়-টিলায় আকীর্ণ সিলেট শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া যায়, যা গৌড়গোবিন্দ রাজার বাড়ি, দেবালয় বা দূর্গ ছিলো বলে কথিত হয়ে থাকে। উচ্চ স্তম্ভকে মিনার বলা হয়। সিলেট শহরে মিনারের টিলা বলে পরিচিত, যাকে সাধারণ লোকজন মনারায়ের টিলা বলে থাকেন, এই টিলাতেও রাজার একটি বাড়ি ছিলো বলে কথিত। ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর এই টিলায় শ্রীহট্টের জজ সাহেবের জন্য বাংলো নির্মিত হয়। এর পার্শ্ববর্তী বর্তমান কাজিটোলা ও দরগা মহল্লায়ও গৌড়গোবিন্দ রাজার বাড়ি ও দেবালয় ছিলো বলে কথিত আছে। সিলেট শহরের উত্তরাংশে ‘গড়দুয়ার’ মহল্লা নামে একটি স্থান ছিলো যেখানে প্রাচীন স্থাপনা তথা রাজবাটিকার ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায়। এই গড়দুয়ার মহল্লায় গৌড়গোবিন্দ রাজার ‘গড়’ অর্থাৎ দুর্গ ছিলো বলে কিংবদন্তী রয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবনবৃত্ত হিসেবে প্রাচীন পারস্য গ্রন্থ ‘সুহেল-ই-এমন’-এর বঙ্গানুসৃতি গ্রন্থ ‘তোয়ারিখে জলালি’-তে বর্ণিত আছে-
‘গড় দুয়ারে গোবিন্দের ছিলো যে থাকান।
কেল্লা এক ছিল তাতে পর্ব্বত প্রমাণ।’ -(তোয়ারিখে জলালি)।
তৎকালীন জয়ন্তীয়াবাসী অসভ্য পাহাড়ি জাতিদের আক্রমণ রোধার্থে সিলেট শহরের উত্তরে টিলাগড়ে আরেকটি গড় বা দুর্গ ছিলো, যা এখন ভগ্নাবশেষে পরিণত হয়েছে। টিলার উপরে দুর্গ থাকায় এই স্থান টীলাগড় নামে খ্যাত। এই টীলাগড়ে অবস্থিত বর্তমান এম.সি. অর্থাৎ মুরারী চাঁদ কলেজের পেছনভাগে উঁচু একটি টিলায় জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় সম্ভাব্য এরকম একটি দুর্গের ভগ্নাবশেষ এখনো কালের সাক্ষি হয়ে আছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT