উপ সম্পাদকীয়

পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ

মো. জেদান আল মুসা প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০২০ ইং ০৪:১০:০০ | সংবাদটি ৩৫৬ বার পঠিত
Image

একবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মানবজাতি যখন সভ্যতার চরম শিখরে ঠিক তখনই এ মানবজাতি তার পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে চরম বিপর্যয়ের দিকে। মানুষ তার প্রয়োজনে একদিকে যেমন পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করছে অপরদিকে পরিবেশকে করে তুলেছে বিষাক্ত। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং পরিবেশের ভারসাম্য দ্রুত বিনষ্ট হচ্ছে। এ বিশ^ আমাদেরই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত হতে বাচাঁতে এখনই আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সবাই সচেতন হলে সাম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলা অনেক সহজ হয়ে যাবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনেক কমে আসবে। আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই কৌশলগতভাবে অগ্রসর হতে হবে। যাতে পরিবেশ বিপর্যয়ের দীর্ঘকালীন প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করা যায়।
পরিবেশের বিপর্যয়ের ফলে ইতিমধ্যে পৃথিবী হতে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তাই এখন হতেই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন না করলে অনেক প্রজাতির অস্তিত্ব পৃথিবী হতে বিলীন হবে। ধ্বংসের পথে চলে যাবে আমাদের জীববৈচিত্র্য। কাজেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দরকার কার্যকরী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা। আমাদের অসচেতনতার কারণে ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বুক থেকে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। আর বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে আছে হাজার হাজার প্রজাতি। এখনই সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে এগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পৃথিবীর বুক থেকে একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে আর তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এখনো সকল জীব প্রজাতির উপকারি দিক আমাদের জানা সম্ভব হয়নি, হয়তো দেখা যাবে আজকের এ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিটি হতেই ভবিষ্যতে আমার কোনো বংশধরের জীবন রক্ষাকারী ঔষুধ আবিষ্কৃত হবে। বিলুপ্তপ্রায় কোনো জীব প্রজাতির মধ্যে এমন একটি ‘জিন’ থাকতে পারে যাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের কৃষি ও চিকিৎসা বিজ্ঞান বহুদুর এগিয়ে যেতে পারবে, ঘটাতে পারবে কৃষি বিপ্লব বা শিল্প বিপ্লব। পৃথিবীর বুক থেকে একটি জীব প্রজাতি আর যেন হারিয়ে না যায় সেই ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করতে হবে।
বিশ^কে মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। বিশ^ব্যাপী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা নিয়ে এগিয়ে এসেছে, শুরু হয়েছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষনের কাজ। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোই হটস্পট নামে পরিচিত। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষন তথা কনজারভেশন বলতে বোঝায় বর্তমান জীবকুলের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষন এবং পরিমিত ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাবহার, যাতে করে একদিকে বর্তমান প্রজন্ম তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জীববৈচিত্র্য ব্যবহার করতে পারবে এবং অপরদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন এমনিভাবে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জীববৈচিত্র্য ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা সমুন্নত থাকবে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পদ্ধতিসমূহ : জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য সরকারি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে। সব অভয়ারণ্য, ন্যাশনাল পার্ক, সাফারি পার্ক, ইকোপার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা এবং ট্রাডিশনাল হেরিটেজ অঞ্চল ‘সংরক্ষিত অঞ্চলের’ অন্তর্ভূক্ত। ইহা ছাড়া সীড ব্যাংক, জিন ব্যাংক এবং ডিএনএ সংরক্ষণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। সীড ব্যাংকের মাধ্যমে অল্প জায়গায় অল্প পরিশ্রমে ও অল্প খরচে অধিক প্রজাতি ধরে রাখা যায়। সীড ব্যাংকে এমন অনেক উদ্ভিদ প্রজতির বীজ সংরক্ষিত আছে যা বাস্তবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। উদ্ভিদের জিন তত্ত্বের সম্পদগুলোকে সংরক্ষণে এবং পৃথিবীর বিশাল শস্য প্রকরণ এবং তাদের বর্ণ প্রজাতিগুলো সংরক্ষণে ও উৎপাদনে জিন ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব : ধীরগতিতে জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি ও ধ্বংস একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার। কিন্তু গত এক শতাব্দী যাবৎ ধ্বংসের হার সৃষ্টির চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এর মূল কারণ মানুষের কার্মকান্ড। বন ধ্বংস ও জলাশয় ভরাট করে কৃষি জমি সম্প্রসারণ, অধিক ফলনের জন্য রাসায়নিক সার, আগাছা নাশক, কীটপতঙ্গ নাশক, ছত্রাক নাশক প্রভৃতি রাসায়নিক দ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য অধিক হারে বনাঞ্চল ধ্বংস ও মাত্রাতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ ইত্যাদি কারণে প্রাকৃতিক বন ভূমি ও জলাভূমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। প্রাণীকূল তার খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য সরাসরি উদ্ভিদকূলের উপর নির্ভরশীল থাকায় বন ভূমি ও জলাভূমি হ্রাসের সাথে সাথে বহু প্রাণী প্রজাতিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে অথবা বিপন্ন অবস্থায় আছে। এক সময় আমাদের পত্রঝরা বনে ময়ূর ছিল বলে জানা যায়। আজ থেকে মাত্র ৫০ বছর আগেও শালবনে বাঘ ছিল, বানরের জন্য বনের ধারে বাড়িতে একা থাকা যেত না। এখন ময়ূর নেই, বাঘও নেই, বানরও প্রায় নেই বললেই চলে। জীব প্রজাতির দ্রুত হ্রাসের ফলে বৈশি^ক উষ্ণতা দেখা দিয়েছে এবং দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ু। ঝড়, টর্নেডু, হ্যারিকেন, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এসব প্রাকৃতিক দূযোর্গ বেড়েই চলেছে। এসব কারণে মানুষের অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে। কাজেই মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই পৃথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এসেছে।
নিজ দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহের উপর নির্ভর করার চেয়ে নিজেদেরই সচেতন হতে হবে এবং অন্যদেরকে সচেতন করতে হবে। জনগণকে জীববৈচিত্র্যর গুরুত্ব বুঝাতে পারলে সহজেই আমাদের এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই প্রসঙ্গে ভারতের হিমালয় অঞ্চলে ‘চিপকো’ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা যায়। চিপকো স্থানীয় আদিবাসী শব্দ যার অর্থ হলো লেপ্টে থাকা। কোন বৃক্ষ কাটতে এলে ঐ আন্দোলনের কর্মীরা গাছের সাথে লেপ্টে থাকে, ফলে ঐ গাছটি কাটার হাত থেকে রক্ষা পায়। স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য আমাদেরও অবস্থা অনুযায়ী কোন উপায় আবিষ্কার করতে হবে।
কোন দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূ-ভাগের শতকরা ২৫ভাগ বনভূমির প্রয়োজন থাকলেও বাংলাদেশে রয়েছে শুধুমাত্র ১৭.০৮ শতাংশ বনভূমি। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় আধার সুন্দরবন-একই সঙ্গে আমাদের জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সুরক্ষাও। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে আমাদের সামনের দিনে সুন্দরবন রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। সিডর এ যাবৎকালের বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচন্ডভাবে আঘাত করে এবং পৃথিবীর অন্যতম চিরহরিৎ অরণ্য সুন্দরবনের প্রায় এক চতুর্থাংশ প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। গবেষকদের মতে সিডর এর আঘাতে সুন্দরবনের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে উঠতে প্রায় ৪০ বছর লেগে যেতে পারে। তাছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের গতি ৭০ কিলোমিটার কমিয়েছে সুন্দরবন। এর জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাও ৩ থেকে ৪ ফুট কমিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটি। ঝড়টি ঘণ্টায় ১৫৫ থেকে ১৬৫ কিলোমিটার গতিবেগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করে। আর এটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় আঘাত করে ঘণ্টায় ১৫১ কিলোমিটার গতিবেগে। কিন্তু তার আগেই সুন্দরবন এর শক্তি কমিয়ে দেয়। ফলে এই ঝড়ে যে পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে আরও অনেক বেশি ক্ষতির হাত থেকে উপকূলের মানুষ ও সম্পদ রক্ষা পেয়েছে। এই সময়ে আবারও সুন্দরবন প্রমাণ করল এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্রের সবচেয়ে বড় আধারই শুধু না, তা আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচও। ১৬ জুলাই, ২০২০ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সারাদেশে এক কোটি বৃক্ষ রোপণের শুভ সূচনা করেন। ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে আপনার সুদূর প্রসারী কার্যক্রমের জন্য। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের বড় রক্ষাকবচ হলো বৃক্ষ। প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা, জীববৈচিত্রের সমৃদ্ধি, পশু-পাখির আবাসস্থল এবং ফলজ ও বনজ সম্পদ বৃদ্ধিতে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। আসুন প্রত্যেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক কোটি কৃক্ষ রোপণ কর্মসূচীর মহতী উদ্যোগের অংশীদার হই। আসুন সবাই বেশি বেশি বৃক্ষরোপন করি ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলি।
লেখক : পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি এর কার্যালয়, সিলেট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT