উপ সম্পাদকীয়

একটি খেরোখাতার বয়ান

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০২০ ইং ০৪:২৯:০৭ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত
Image

আমাদের দেশে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। শোনা যাচ্ছে দেশটি অচিরেই আধুনিক পর্যায়ের রাষ্ট্রসমুহের সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হবে। বেসরকারি পর্যায়েও অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে, সেটিও দৃশ্যমান। এ সকল কর্মোদ্যোগ অবশ্যই দেশ ও জাতিকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন দায়িত্বশীলরা। আশা করবো সকল আশাবাদই একদিন বাস্তবে রূপলাভ করবে।
বর্তমানে আমাদের দেশটি ভয়াবহ করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। কোন একজন করোনা রোগী শনাক্ত হলেই গোষ্ঠিসুদ্ধ কোয়ারেন্টাইন নামক স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহণ করতে হচ্ছে। একটি পরিবার যখন করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে নিজেদেরকে একটি গন্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলে অবশ্যই অনেকটি কর্মী হাত অলস হয়ে পড়ে থাকে চৌদ্দ দিন নিদেন পক্ষে। ঘরে যদি প্রয়োজনীয় সকল কিছুর সংস্থান থাকে তাহলে বাঁচোয়া, নাহলে নির¤ু^ উপবাস থাকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ এই দেশের বেশীর ভাগই দিন আনে দিন খায় পর্যায়ের। কাপড় চোপড় আর চলন বলন দেখেই যদি আমরা সবাইকে একেবারে বিত্তশালী বা স্বাবলম্বী ভাবতে শুরু করি তাহলে তো সারা জাতিই আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বলতে হবে। সত্যিকার অবস্থাটা হলো নিজ প্রয়োজন মেটাতে সবাইকে বেরুতে হবে এবং অবশ্যই ভদ্রস্থ হয়ে। তাই দেখা যায় সকলেরই প্রায় ভদ্রগোছের পোশাক পরিচ্ছদ অংগে জড়ানো আছে। কিন্তু বেশীরভাগই যে পকেটটি গড়ের মাঠ বানিয়ে রেখেছেন সেদিকে কার নজর যায়। এই সকল ভদ্র লেবাসধারী সন্তানরা বাসা ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে আবার গ্রামমুখী হচ্ছেন, সেটির সচিত্র প্রতিবেদন হরহামেশা আমরা সংবাদপত্র পাঠে জানতে পারছি।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হবে এমনতরো। যে বর্তমান সরকার গ্রামীন অর্থনীতিকে শক্তিশালী আর বেগবান করতে জোরদার চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন অর্থাৎ যারা গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন তাদের জন্য রুটি রুজির সংস্থান এখানেই করা আছে। নিজেদের কর্মী হাতগুলিকে একটু কাজে লাগালেই কেল্লা ফতে। আমাদের মনে রাখতে হবে বেশ কিছুদিন আগে বলা হয়েছিল আমাদের দেশটিতে আর গ্রাম পর্যায়ের কোন ভিত্তিভূমিই থাকবেনা সবকিছুই শহরাঞ্চলে রূপায়িত হয়ে যাবে। অজপাড়া গাঁয়ে শহরের সুযোগ সুবিধা সম্বলিত জীবন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। কারিগরী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি শ্রেণী গড়ে তুলতে হবে আগে ভাগে যারা আপন গ্রামটিকে শহরের সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এলাকা হিসাবে পরিবর্তন আর পরিবর্ধন করতে সক্ষম হবেন। এ জাতিয় অনেক কিছুই নিশ্চিত করতে হবে আগেভাগে। পর্যায়ক্রমে গ্রাম এর জনগোষ্ঠিকে আপন যোগ্যতায় কর্মী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
আলো ঝলমল শহুরে জীবন কেউই চায়না যতক্ষণ পর্যন্ত আপন রুজিতে আহরিত অন্নে উদরপূর্তি না ঘটে। বর্তমানে অসংখ্য মানুষ নানা অর্থনৈতিক দূর্বিপাকের ফলশ্রুতিতে গ্রামমুখী হয়েছেন অর্থাৎ আপন ভিটায় আশ্রয় নেয়ার জন্য তারা কিন্তু আরো অনেক সমস্যাও বোচকাবন্দী করে নিয়ে চলেছেন। এ সকল লোকের সন্তান সন্ততিরা শহরের নানা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো, তারা হঠাৎ করে সেই আবহ থেকে বিচ্যুত হয়ে কোথায় কিভাবে আর কোন উপায়ে আপন শিক্ষালাভে ব্রতী হবে সেটা ভাবলে মাথা চক্কর খেয়ে উঠে। এই নতুন প্রজন্মটিকে নিয়ে যে ভাবনার জাল বিস্তার করা হয়েছিল সেটি আজ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়েছে। শংকা জাগে পুরো একটি প্রজন্ম যদি মানসিকভাবে বেড়ে উঠার প্রাক্কালে হঠাৎ মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে সেটা হবে অবশ্যই ভয়ংকর একটি বিপর্যয়। পুরো একটি শ্রেণীই হয়ে পড়বে দিকনির্দেশনাবিহীন অবস্থায়। অবশ্যই ভাবনায় আনতে হবে এই প্রজন্মটিকে। পল্লী অঞ্চলের বিদ্যালয় সমূহে এদেরকে সংকুলান করে যাইহোক ধরণের একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালানোর উদ্যোগ নিতে হবে অতি সত্ত্বর।
আমাদের দেশে এখন ডিজিটাল যুগ চলছে। অনেক ধরণের সেবাই আমরা এখন ঘরে বসে পাচ্ছি ডিজিট্যালাইজেশন এর কল্যাণে। সেই হিসাবে গ্রামেগঞ্জের উল্লেখযোগ্য হাটবাজার বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যাংক, বীমা, শেয়ার ব্যবসার প্রতিষ্ঠান গুলি তাদের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। এ সকল সম্প্রসারিত সেবাদাতারা আকৃষ্ঠ করছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠিকে। অনেকেই ‘নেই কাজ তো খৈ ভাজ’ জাাতিয় কাজ হিসাবে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত শেয়ার বাজার এর কার্যালয় সমুহে বসে আপন সঞ্চয় বা কষ্টার্জিত অর্থ সমূহ বিনিয়োগ মারফত কিছু একটা লাভ করতে চেয়েছিল। এ জাতিয় ব্যবসায় সব সময় লাভই হবে সেটা যেমন ভাবনায় আনা যায় না তেমনি নিজ বিনিয়োগকৃত অর্থ পুরোটা লোপাট হয়ে যাবে সেটাও ভাবনায় আনেননি কেউই। মোদ্দাকথাটি হলো গ্রামীণ জীবনে যে সকল উদ্যমী ব্যক্তিরা কিছু একটা করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার প্রয়াস পেয়েছিলো তারাই শেষপর্যন্ত মাজাভাংগা অবস্থায় শহরে এসেছিল কিছু একটা আয় রোজগারের ধান্ধায়। এরাই আবার গ্রামে ফিরছে লকডাউন আর বাসা ভাড়া বকেয়া সহ নানা ধরণের ব্যয়ের বোঝা বহনে ব্যর্থ হয়ে। লোপাট হওয়া অর্থরাশি শেয়ার মার্কেটে আবার ভেসে উঠবে এই আশায় বসে থেকে তারা বাকিটুকু সম্বল যা ছিলো সেটিও খুইয়ে বসেন। তদন্ত হবে, বিচার হবে এসব কিছু শোনার পর তারা আশায় বুক বাধলো। পরবর্তীতে দায়িত্বশীল মহলের শীর্ষ ব্যক্তিত্বের ভাষায় এ সকল শেয়ার বাজার লুটেরারা নাকি ছিলো দুষ্টু। তাই সেটা করেছে। এ জাতিয় মন্তব্য যেমন জনবান্ধব নয়, তেমনি কখনো সরকারি দায়িত্বশীল মহল থেকে আসতে পারেনা কোনোভাবেই। যখন শেয়ার বাজার ডুবে গেল সরকারি তরফ থেকে প্রণোদনা জুগিয়ে সেটিকে চাংগা করার উদ্যোগ নেয়া হলো। সেই প্রণোদনার অর্থটুকু কোন জায়গায় যে ছাইচাপা পড়েছে কেউ ঠাহর করতে পারে নাই আজ পর্যন্ত।
আমাদের দেশে অনেকগুলি ব্যাংক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সেগুলি জাতীয় অর্থখাতে ভালো অবদান রাখছে বলেই মনে হয়। হঠাৎ করে অনেকগুলি ব্যাংকের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা হলো। গন্যমান্য হোমরাচোমরারা নিছক খায়েশ করেছেন বলেই নতুন ব্যাংক খোলার ব্যাপারে অনুমোদন দেয়া হয়। এ সকল ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালুর পরপরই অর্থমন্ত্রণালয় এর শীর্ষস্থান থেকে বলা হলো আমাদের দেশের অর্থনীতির আকার অনুসারে ব্যাংক এর সংখ্যা অধিক হয়ে গেছে। যারা এই সকল ব্যাংক স্থাপনে অনুমতি দিয়েছিলেন তারাই সেটা বলতে শুরু করলেন অর্থাৎ চাচা আপন প্রাণ বাঁচা ধরণের নীতি আকড়ে ধরার মতো। নতুবা আমি কিছু জানিনা বলে পিঠটান দেওয়া। আর সব কিছু জনগণের ঘাড়ের উপর ফেলে দেয়ার নীতি। সেটাই কিন্তু ঘটেছে। নতুন চালু হওয়া ব্যাংকগুলির অবস্থা যে খুব ভালো তেমনটি যেমন বলা যাবেনা ঠিক সেইভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে কতোটুকু অবদান সেগুলি রাখছে সেটাও ঠাহর করা যাচ্ছে না। একটি ব্যাংকতো পুরো খালি করে দেয়া হলো। সবকিছু লুটেপুটে নিয়ে প্রধান ব্যক্তিটি শান্তি স্বস্তি আর নিরাপত্তার বাতাবরণে অবস্থান গ্রহণ করলেন। দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বলা হলো ব্যাংকটিকে খোকলা করার প্রধান নায়কটিকে ধরা তো যাবেই না এমনকি কোনকিছু বলতে গেলেও অসুবিধা হবে। গুঞ্জন থামানোর জন্য গুজবের সৃষ্টি করা হলো। বলা হলো যার যত বড় আমানতই খোয়া যাক না কেন তাকে হকদার হতে হবে মাত্র একলক্ষ টাকার। আতংকিত আমানতদারদের ভীতচকিত চেহারা আর হাঁসফাঁস অবস্থা দেখে সকল মহলেই ত্রাহি ত্রাহি ভাব এর সৃষ্টি হলো। কে কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকেইবা ভরসা করবে।
লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেলো কেউ পাত্তাই পেলোনা। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সম্বলিত কোষাগার থেকে টাকা বেরিয়ে বিদেশে জুয়ার আসরে পৌঁছল কেউ জানলো না কেউ বুঝলো না। লুটেরারা আজ দূর্মর, দূর্জয়।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT