উপ সম্পাদকীয়

কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ

রায়হান আহমেদ তপাদার প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০২০ ইং ০২:২৭:৫৬ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত
Image

প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে গত পাঁচ মাসে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সময়ের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু চরম অপ্রস্তুত এক মুহূর্ত এটা। পরিস্থিতি সামলাতে ‘কপি-পেস্ট’ করার মতো কোন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক মডেল ছিল না ইতিহাসে। কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞাই সম্বল। গত ১০০ বছরে দেশে-দেশে রাজনীতিবিদেরা এত তীব্র পরীক্ষায় পড়েননি আর। সব শাসক ও তাঁদের উপদেষ্টারা সর্বাত্মক গণনজরদারিতে এখন। মানুষ দেখছে কোন নেতা কীভাবে সংকট সামলাচ্ছেন। বিরোধী দলকেও মনোযোগ দিয়ে দেখা হচ্ছে।জনস্বার্থে তাঁরা কে কী করছেন, হিসাব হচ্ছে তারও। একযোগে শরীর আর রাষ্ট্র দুটো নিয়েই ভাবছে শত শত কোটি মানুষ। ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক মুহূর্ত এটা। জনতা প্রথমে দেখেছে কোন সরকার কীভাবে তাদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিল। আমলাতন্ত্রকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী এই ‘পরীক্ষা’ শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেক নেতৃত্ব পরিস্থিতির গভীরতা তখনো বুঝতে পারেনি। কেউ কেউ বুঝতে চাননি। আরেক দল প্রযুক্তি, বিজ্ঞান আর সুশাসনকে সমন্বিত করেছে। কারখানা আর ল্যাবকে বিপুল হারে মাস্ক ও কিট তৈরিতে নামিয়েছে। তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্ব তাই অভিনন্দনে ভাসছে এখন। কোভিড এই শাসকদের রাজনৈতিক আয়ু বাড়িয়ে দিতে চলেছে। এই দৃশ্য এখন সবার জানা, জার্মানি যখন সপ্তাহে এক লাখ মানুষকে পরীক্ষা করছিল, যুক্তরাষ্ট্র তখনো পাঁচ হাজার পরীক্ষা সমাধা করেনি।
অথচ তার হাতেই বেশি সম্পদ। আঙ্গেলা ম্যার্কেল শুরুতেই শরীরী দূরত্ব এবং ‘টেস্ট’কে সমন্বিত করেন। জুন নাগাদ জার্মানরা তাই অনেকখানি আতঙ্কমুক্ত। দৈনিক মৃত্যুর হার দশের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতেই চীন থেকে মানুষ আসা বন্ধ করেন। মাত্র ১০২টি ‘পজিটিভ কেস’ থাকার সময় লকডাউন করে দিয়েছিলেন। মে নাগাদ পরিস্থিতি তাঁদের জন্য স্বস্তিকর হয়ে গেছে। পুরো মাসে ২-৩ জন মাত্র মারা গেছে। ঠিক উল্টো অবস্থা ছিল ব্রাজিলে। প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর দিক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাগাদা ছিল কম। তিনি একে ‘লিটল ফ্লু’ বা সামান্য সর্দি-জ্বর বলতেন। ফল হয়েছে সংক্রমণে দ্বিতীয় স্থানে তাঁরা এখন। দৈনিক মৃত্যু পাঁচ শতাধিক! অথচ পূর্ববর্তী সমাজবাদী সরকারগুলোর গড়া একটা ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছিল দেশটিতে। ভুল নেতৃত্বের কারণে কাঠামোটি কাজে লাগাতে পারেনি দেশটি। ট্রাম্পের মতোই বলসোনারো এখন জনগণের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। তাঁর সিদ্ধান্তে বহুজনের জীবন-মরণের ব্যবধান কমে যাচ্ছে। মেক্সিকোতে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল লোপেজ গত মার্চেও দলবল নিয়ে রাজনৈতিক মিছিল করেছেন। নিজ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথাও শোনেননি। ইন্দোনেশিয়ায় অনেক মন্ত্রী বলছিলেন, ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে প্রার্থনাই যথেষ্ট। দেশে-দেশে এমন সব নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্তের ওপর এভাবে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ভর করবে আগামী দিনেও। একই ঘটনা ঘটে ১৯১৮-এর স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ও। সেই মহামারির বিষয়ে খ্যাতনামা গবেষক জন বাররি আল-জাজিরায় বলেছেন, ‘এবারও কিছু দেশে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম-বেশি হতে পারত।’ এই আফসোস থেকে গণচীনকেও বাদ দেওয়া যায় না।
উহানে কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রথম সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিলে হয়তো আজ বিশ্বকে এত ভয়াবহ মারণযুদ্ধে পড়তে হতো না। জন বাররির ভাষায়, ১৯১৮-এর ফ্লুর বড় শিক্ষা: যেকোনো অবস্থায় সত্যটা জানাতে হবে। জার্মানির আঙ্গেলা ম্যার্কেল বা সিঙ্গাপুরের লি সিয়েনরা তা-ই করেছিলেন। করোনায় সবাই আক্রান্ত হলেও সব দেশের হাতে সমান সম্পদ নেই। এর মধ্যে সীমিত সম্পদের দেশগুলোতে অনেক নেতা অগ্রাধিকার নির্ধারণেও ব্যর্থ। পরিস্থিতির পূর্বাপর বিশ্লেষণ শেষে ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষণ এটা। অনেক জায়গায় সেটা হয়নি। নীতিগত অদক্ষতা সেখানে তৈরি করেছে সামাজিক হতাশা। মাত্র পাঁচ মাসে অনেক দেশ ইতিমধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতায় পড়েছে। তাদের কেউ কেউ নাগরিক স্বাধীনতা কমিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছে। যেমন হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান। ভাইরাস ভীতিকে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এমন আইন করে নিয়েছেন, যাতে জনতার মতপ্রকাশের সুযোগ কমে। অথচ এই সময়ে দরকার জনতার সঙ্গে নেতৃত্বের জীবন্ত যোগাযোগ। সংকট মোকাবিলায় জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপার ছিল। দরকার ছিল কমিউনিটির শক্তিকে জাগ্রত করার। অনেক কারিগরি জ্ঞান নেতৃত্বের আহ্বানে সামাজিক চর্চায় পরিণত হয়, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হুকুমে তা হয় না। এর মধ্যে জাস্টিন ট্রুডোর ‘টিম-কানাডা’ স্লোগান ভালো নজির ছিল। কোনো কোনো শাসক আবার সংকট থেকে জনতার মনযোগ সরাতে জাতীয়তাবাদী উপাদান যুক্ত করছেন শাসনে। এই সূত্রেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডাযুদ্ধ হঠাৎ গরম হয়ে গেল।
অনেক শাসক ক্ষমতার ভিত শক্ত রাখতে মূলত করপোরেট-বান্ধব পদক্ষেপের ওপর ভরসা করছেন। যদিও যাঁরা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বাদ দিয়ে নির্মোহভাবে বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন, সেই নেতৃত্বই অভিনন্দিত হচ্ছে। যেসব শাসক পুরোনো পথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতো ভাইরাসকেও গুরুত্ব না দিয়ে সিদ্ধান্তহীন ছিলেন, তাঁরা নাগরিকদের মতো নিজেদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। ভাইরাসে রাজনৈতিক সংকট বাড়াতে পারে বিশ্বের হাতে এখনো কোভিড-১৯ নিয়ে যথেষ্ট তথ্য নেই। ওষুধও নেই। এ রকম অবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বুদ্ধিমত্তা এবং কর্মদক্ষতাই মানুষের জানমাল রক্ষা করতে পারে কেবল। পরিস্থিতির উন্নতি-অবনতি প্রায় পুরোটা নির্ভর করছে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ম্যানেজারের ওপর। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, মার্চেও অনেক দেশের নেতৃত্ব অনুমান করতে পারেননি মে মাসে স্বাস্থ্য খাতে কী ঘটবে। আবার তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, কিউবাÍএসব দেশের নেতারা এত বেশি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন যে তাঁদের স্বাস্থ্য সরঞ্জাম এখন উপহার হিসেবে অপর দেশকে দেওয়া হচ্ছে। এসব খবরের পাশাপাশি এও দেখা গেছে, লকডাউনের ফলে কোটি কেটি মানুষ কীভাবে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরবে, সেটাও খেয়াল করা হয়নি অনেক স্থানে। আমলে নেওয়া হয়নি সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের বিষয়। এতে এশিয়া-আফ্রিকার বহু দেশে অবর্ণনীয় বিপদে পড়ছে মানুষ। এই ভাইরাসজনিত সংকটে অনেক শাসকের জন্য ‘রাজনৈতিক সংকট’ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সেটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট। যে নেতাদের দূরদর্শিতা ভাইরাসটির আগে ছুটবে,সেখানে মানুষ ততটাই সুরক্ষা পাবে। যেখানে নেতৃত্ব ভাইরাসের ফলাফল দেখে দেখে চলছে, সেখানে ভোগান্তি বাড়বে সবার।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানেই অধিক অসহায়ত্ব। সম্মিলিত অনিশ্চয়তায় সেটা অসহনীয় হয়ে যায়। এ রকম সময় নাগরিকেরা নেতৃত্বের দিকেই তাকায়। আশ্বাস খোঁজে। কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সংকটগ্রস্ত জনতা দিকনির্দেশনা এবং ভরসা দুটোই পেতে চাইছে রাজনীতিবিদদের কাছে। নেতৃত্বের জন্য এটা নৈতিক শক্তি ও গৌরবের দিক। তাঁদের কাছে একই সঙ্গে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের মুহূর্ত এটা। দক্ষ ও আন্তরিক নেতৃত্ব সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। তবে কেবল মুখস্থ বাচনিক ক্ষমতা দিয়ে এই চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। সময়টি জনতুষ্টির নয়। দরকার পড়েছে অনিশ্চয়তার মাঝে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতার। কোটি কোটি মানুষকে রক্ষার কর্তব্য নেতাদের সামনে।দুর্ভাগ্যের কথা, রাশিয়া-আমেরিকার মতো দেশে শাসকেরা সংকটের শুরুতে জনতুষ্টিবাদে ভুগছেন। দ্বিতীয় আরেক দল ‘অপেক্ষা করা এবং দেখা’র নীতি নেয়। মানুষের চেয়ে অর্থনীতি নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়েছে কিছু দেশ। এসবই শেষবিচারে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তবে কেউ কেউ আকাশে ধোঁয়া দেখে মাটির পরিস্থিতি আঁচ করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর করোনাভাইরাস মহামারি-ই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি করেছে। চলতি বছরের ৩১ মার্চ এ কথা বলেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।এসময় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও বলেছেন, করোনা বিশ্বজুড়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস। এই রোগ বিশ্বে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি করবে এবং এটি সম্ভবত অর্থনীতির ওপর এতটাই মারাত্মক প্রভাব ফেলবে সুদূর অতীতে যার তুলনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আমাদের বিশ্বাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পর আমরা যেসব সঙ্কট মোকাবেলা করেছি তাদের মধ্যে করোনাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝুঁকি ও অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। জাতিসংঘ মহাসচিব মনে করেন, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই সঙ্কটের সুরাহা করা সম্ভব। তবে এই ব্যবস্থাটি তখনই নেয়া সম্ভব যদি সবাই একত্রিত হই, আমরা যদি রাজনৈতিক খেলাগুলি ভুলে যাই এবং এটি উপলব্ধি করতে পারি যে, এর ফলে মানবজাতি ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। করোনার কারণে বেকারত্ব, ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল ব্যক্তিদের পতনের দিকে ইঙ্গিত করে গুতেরেস বলেন, আমরা এই রোগের কারণে বিশ্বের উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য একটি বৈশ্বিক প্যাকেজ তৈরি করা থেকে এখনও অনেক দূরে অবস্থান করছি। করোনা মহামারির কথা মাথায় রেখে এবারের প্রতিযোগিতায় চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেগুলি হল-লোকাল রেসপন্স অ্যান্ড সল্যুউশন, ইমপ্যাক্ট অব কোভিড-১৯ অন দ্য আর্থ সিস্টেম/আর্থ সিস্টেম রেসপন্স, লার্নিং অ্যাবাউট দ্য ভাইরাস অ্যান্ড ইটস স্প্রেড ইউজিং স্পেস-বেইজড ডাটা এবং ইকোনমিক অপরচুনিটি ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড রিকোভারি ডিউরিং অ্যান্ড ফলোয়িং কোভিড-১৯।নাসা জানিয়েছে অনলাইন এই প্রতিযোগিতায় একদিকে আমেরিকান,ইউরোপীয় ও জাপানি মহাকাশ এজেন্সির তথ্য দিয়ে যেমন সাহায্য করা হবে, অন্যদিকে প্রতিযোগীরাও খুঁজে বের করতে পারেন করোনার মূল কারণ এবং এটি কিভাবে ছাড়াচ্ছে, করোনায় বিশ্বে যে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা থেকে বাঁচার উপায় কি। তার পথ খোঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক : কলামিস্ট।
কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে গত পাঁচ মাসে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সময়ের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু চরম অপ্রস্তুত এক মুহূর্ত এটা। পরিস্থিতি সামলাতে ‘কপি-পেস্ট’ করার মতো কোন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক মডেল ছিল না ইতিহাসে। কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞাই সম্বল। গত ১০০ বছরে দেশে-দেশে রাজনীতিবিদেরা এত তীব্র পরীক্ষায় পড়েননি আর। সব শাসক ও তাঁদের উপদেষ্টারা সর্বাত্মক গণনজরদারিতে এখন। মানুষ দেখছে কোন নেতা কীভাবে সংকট সামলাচ্ছেন। বিরোধী দলকেও মনোযোগ দিয়ে দেখা হচ্ছে।জনস্বার্থে তাঁরা কে কী করছেন, হিসাব হচ্ছে তারও। একযোগে শরীর আর রাষ্ট্র দুটো নিয়েই ভাবছে শত শত কোটি মানুষ। ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক মুহূর্ত এটা। জনতা প্রথমে দেখেছে কোন সরকার কীভাবে তাদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিল। আমলাতন্ত্রকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী এই ‘পরীক্ষা’ শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেক নেতৃত্ব পরিস্থিতির গভীরতা তখনো বুঝতে পারেনি। কেউ কেউ বুঝতে চাননি। আরেক দল প্রযুক্তি, বিজ্ঞান আর সুশাসনকে সমন্বিত করেছে। কারখানা আর ল্যাবকে বিপুল হারে মাস্ক ও কিট তৈরিতে নামিয়েছে। তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্ব তাই অভিনন্দনে ভাসছে এখন। কোভিড এই শাসকদের রাজনৈতিক আয়ু বাড়িয়ে দিতে চলেছে। এই দৃশ্য এখন সবার জানা, জার্মানি যখন সপ্তাহে এক লাখ মানুষকে পরীক্ষা করছিল, যুক্তরাষ্ট্র তখনো পাঁচ হাজার পরীক্ষা সমাধা করেনি।
অথচ তার হাতেই বেশি সম্পদ। আঙ্গেলা ম্যার্কেল শুরুতেই শরীরী দূরত্ব এবং ‘টেস্ট’কে সমন্বিত করেন। জুন নাগাদ জার্মানরা তাই অনেকখানি আতঙ্কমুক্ত। দৈনিক মৃত্যুর হার দশের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতেই চীন থেকে মানুষ আসা বন্ধ করেন। মাত্র ১০২টি ‘পজিটিভ কেস’ থাকার সময় লকডাউন করে দিয়েছিলেন। মে নাগাদ পরিস্থিতি তাঁদের জন্য স্বস্তিকর হয়ে গেছে। পুরো মাসে ২-৩ জন মাত্র মারা গেছে। ঠিক উল্টো অবস্থা ছিল ব্রাজিলে। প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর দিক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাগাদা ছিল কম। তিনি একে ‘লিটল ফ্লু’ বা সামান্য সর্দি-জ্বর বলতেন। ফল হয়েছে সংক্রমণে দ্বিতীয় স্থানে তাঁরা এখন। দৈনিক মৃত্যু পাঁচ শতাধিক! অথচ পূর্ববর্তী সমাজবাদী সরকারগুলোর গড়া একটা ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছিল দেশটিতে। ভুল নেতৃত্বের কারণে কাঠামোটি কাজে লাগাতে পারেনি দেশটি। ট্রাম্পের মতোই বলসোনারো এখন জনগণের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। তাঁর সিদ্ধান্তে বহুজনের জীবন-মরণের ব্যবধান কমে যাচ্ছে। মেক্সিকোতে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল লোপেজ গত মার্চেও দলবল নিয়ে রাজনৈতিক মিছিল করেছেন। নিজ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথাও শোনেননি। ইন্দোনেশিয়ায় অনেক মন্ত্রী বলছিলেন, ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে প্রার্থনাই যথেষ্ট। দেশে-দেশে এমন সব নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্তের ওপর এভাবে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ভর করবে আগামী দিনেও। একই ঘটনা ঘটে ১৯১৮-এর স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ও। সেই মহামারির বিষয়ে খ্যাতনামা গবেষক জন বাররি আল-জাজিরায় বলেছেন, ‘এবারও কিছু দেশে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম-বেশি হতে পারত।’ এই আফসোস থেকে গণচীনকেও বাদ দেওয়া যায় না।
উহানে কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রথম সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিলে হয়তো আজ বিশ্বকে এত ভয়াবহ মারণযুদ্ধে পড়তে হতো না। জন বাররির ভাষায়, ১৯১৮-এর ফ্লুর বড় শিক্ষা: যেকোনো অবস্থায় সত্যটা জানাতে হবে। জার্মানির আঙ্গেলা ম্যার্কেল বা সিঙ্গাপুরের লি সিয়েনরা তা-ই করেছিলেন। করোনায় সবাই আক্রান্ত হলেও সব দেশের হাতে সমান সম্পদ নেই। এর মধ্যে সীমিত সম্পদের দেশগুলোতে অনেক নেতা অগ্রাধিকার নির্ধারণেও ব্যর্থ। পরিস্থিতির পূর্বাপর বিশ্লেষণ শেষে ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষণ এটা। অনেক জায়গায় সেটা হয়নি। নীতিগত অদক্ষতা সেখানে তৈরি করেছে সামাজিক হতাশা। মাত্র পাঁচ মাসে অনেক দেশ ইতিমধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতায় পড়েছে। তাদের কেউ কেউ নাগরিক স্বাধীনতা কমিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছে। যেমন হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান। ভাইরাস ভীতিকে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এমন আইন করে নিয়েছেন, যাতে জনতার মতপ্রকাশের সুযোগ কমে। অথচ এই সময়ে দরকার জনতার সঙ্গে নেতৃত্বের জীবন্ত যোগাযোগ। সংকট মোকাবিলায় জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপার ছিল। দরকার ছিল কমিউনিটির শক্তিকে জাগ্রত করার। অনেক কারিগরি জ্ঞান নেতৃত্বের আহ্বানে সামাজিক চর্চায় পরিণত হয়, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হুকুমে তা হয় না। এর মধ্যে জাস্টিন ট্রুডোর ‘টিম-কানাডা’ স্লোগান ভালো নজির ছিল। কোনো কোনো শাসক আবার সংকট থেকে জনতার মনযোগ সরাতে জাতীয়তাবাদী উপাদান যুক্ত করছেন শাসনে। এই সূত্রেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডাযুদ্ধ হঠাৎ গরম হয়ে গেল।
অনেক শাসক ক্ষমতার ভিত শক্ত রাখতে মূলত করপোরেট-বান্ধব পদক্ষেপের ওপর ভরসা করছেন। যদিও যাঁরা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বাদ দিয়ে নির্মোহভাবে বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন, সেই নেতৃত্বই অভিনন্দিত হচ্ছে। যেসব শাসক পুর

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT