উপ সম্পাদকীয়

চামড়া শিল্প কি ধ্বংস হয়ে যাবে!

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৮-২০২০ ইং ০৪:০৬:৩৯ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত
Image

ফের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে। সিন্ডিকেটের কারসাজি, ঘোষিত মূল্য বাস্তবায়নে মনিটরিংয়ের অভাব, শেষ মুহূর্তে রফতানি অনুমতির ঘোষণা এবং সমন্বয়হীনতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। চামড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে আগামী দিনের কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য নিশ্চিত করেছে ওই সিন্ডিকেট। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ন্যূনতম দাম না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে অনেকে বিক্রি না করে চামড়া ফেলেও দিয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা হল- এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় নিচ্ছে না কেউ।
সরকার বলছে চামড়া হচ্ছে বেসরকারি বাণিজ্য। এতে খুব বেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। অপরদিকে ট্যানারি মালিকদের চিরাচরিত একই সুর, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না বুঝে ব্যবসা করছেন। সরকার প্রতি বছরই কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ দেয় কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া ক্রয়বিক্রয় হয় না।
চামড়াশিল্পে বিপর্যয় ঠেকাতে এ বছরও কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু সেখানে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। কুরবানির পর সরাসরি চামড়া বিক্রির দাম এবং পোস্তার পাইকারদের বিক্রির দাম কত হবে- তা সুনির্দিষ্ট করা নেই। এ সুযোগে পোস্তার পাইকার এবং ট্যানারি মালিকদের নিজস্ব ক্রয় প্রতিনিধি অস্বাভাবিক দামে চামড়া ক্রয় করে। সিন্ডিকেটের ‘সবুজ সংকেত’ নিয়েই তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে কম দামে চামড়া কিনে নেয়। এবার গরিব ও এতিমদের হক চামড়ার দাম নিয়ে বিগত সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়। গত বছরও একই কারসাজিতে সব রেকর্ড অতিক্রম করেছিল।
সরকার ঈদের সপ্তাহখানেক আগে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করেছে ঢাকায় ৩৫-৪০ টাকা, ঢাকার বাইরে ২৮-৩২ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩-১৫ টাকা। সাধারণত একটি বড় আকারের গরুর চামড়া গড়ে ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া গড়ে ২৫-৩০ বর্গফুট এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া গড়ে ১৫-২০ বর্গফুট হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ীই বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম পড়ার কথা ১২শ থেকে ১৬শ টাকা, মাঝারি গুরুর চামড়ার দাম ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা এবং ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। সরকার নির্ধারিত উক্ত মূল্যে সারা দেশে একখানা চামড়াও ক্রয়বিক্রয় হয়নি।
রাজধানীতে গরুর চামড়া আকার ভেদে প্রতিটি ১০০ থেকে ৫০০ টাকা, ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২ থেকে ১০ টাকা। শুধু ঢাকায় ১৫ হাজার পিস চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। রাজশাহীর কোথাও চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে আবার কোথায় দাম না পেয়ে নদীর পানিতে ফেরে দেয়া হয়েছে হাজার হাজার চামড়া। অনেকেই মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন শত শত চামড়া। রাজশাহীতে খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ১০ টাকায় এবং বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। চামড়ার দাম না পেয়ে চট্টগ্রামে ৭০ হাজার চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে, ১২শত চামড়া নদীতে ফেলা হয়েছে। এখানে খাসির চামড়া কেউ কিনেন নি। এখানকার ৯০ ভাগ খাসির চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। সিলেট শহরে বড় আকারের গরুর চামড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খাসির চামড়া পাইকারদেরকে ফ্রি দেয়া হয়েছে। অনেক কুরবানি দাতা ক্রেতা না পেয়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে রেখেছেন আবার অনেকে নদীর পানিতে ফেলে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সারাদেশের অবস্থা একই। কেউই সঠিক দামে চামড়া বিক্রি করতে পারেনি।
করোনা মহামারীর কারণে এবছর পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হয়েছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। তাছাড়া দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যা কবলিত। মানুষের ঘরবাড়ি বন্যার পানির নিচে। খাবার নেই, শোয়া-বসার জায়গা নেই। গবাদি পশু ভেসে যাচ্ছে। হাঁস-মুরগির খামারিদের মাথায় হাত। বানভাসি মানুষের আর্তনাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্রকম্পিত। এরই মধ্যে পবিত্র ঈদুল আজহা। দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের জায়গা নেই স্থানে। অনেক জায়গায় মানুষকে নৌকায় দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। শিশুদের মুখে হাসি নেই। মায়েরা খালি উনুনের সামনে। বাড়ির মালিক ছুটছে ত্রাণের খোঁজে- কোথাও যদি কিছু ত্রাণ পাওয়া যায়। বোঝাই যাচ্ছে, এবারের কুরবানির ঈদ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলেও এর আনন্দের দিক ছিল ম্লান। এরপরও সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানি করেছেন অনেকেই। তবে স্বভাবতই এবারে কুরবানির সংখ্যা ছিল কম। সে ক্ষেত্রে কুরবানির পশুর চামড়ার চাহিদা বেশি হলে তার দামও বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
এবারে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ‘পানির দরে’। প্রতি বছর কুরবানির ঈদের দিন কুরবানি করার আগেই ফড়িয়া ক্রেতারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়ার দাম ঠিক করে কেনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। কুরবানি দাতাগণ গরিব-মিসকিনদের বেশি দান করতে পারবেন এই আশায় যিনি বেশি দাম দিতেন, তার কাছেই চামড়া বিক্রি করতেন। কিন্তু গত বছরের মত এবারও কেউ চামড়া কিনতে আসেনি। ফলে কেউ চামড়া বিক্রি করেছেন পানির দরে, কেউ পুঁতে রেখেছেন মাটিতে, কেউ ফেলে দিয়েছেন নদীতে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং চামড়াশিল্পের জন্য মহাবিপদ।
চামড়া আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ খাতে ব্যবসার বিপর্যয়ের অর্থ হল হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে টানাটানি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া শিল্পে বিপর্যয় সৃষ্টি করা মোটেই কাম্য নয়। চামড়া খাতে সিন্ডিকেট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সরকারের মহান দায়িত্ব। আমাদের জাতীয় সম্পদ চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে আগামী বছরগুলোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করবেনÑ সরকারের কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT