উপ সম্পাদকীয়

সমকালীন কথকতা

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৮-২০২০ ইং ০৭:৪৪:৩৮ | সংবাদটি ১৪১ বার পঠিত
Image

দেহ আর মন ছাড়া পৃথিবীতে আপন কেহ নেই- করোনাভাইরাসে অনেকটা তাই প্রমাণিত হয়েছে। করোনা আক্রান্ত স্বামীকে ছেড়ে স্ত্রী পালিয়েছে। পুত্র-কন্যাও পালিয়েছে। হাসপাতালের গেটে মা-কে রেখে ছেলে পালিয়েছে। এমন বহু নজির আমরা এই করোনাকালে পেয়েছি এবং পাচ্ছি। ভয়, আতংক, বিপদ এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়-আশয় ঘটলেই মানুষ মুহূর্তেই আপন থেকে পর হয়ে যায়। মূলত আপন আপন যারে বলি সেও কিন্তু আপন নয়, যখন বিপদ-আপদ, ভয় বা স্বার্থ কাছে রয়। মনে হয় মানুষই একমাত্র জীব, যার জীবনে হঠাৎই এমন বিপর্যয় আসতে পারে। হোক না সে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, পিতা-কন্যা, বন্ধু-বান্ধব বা যে কেউ! এছাড়া সামান্য কথা কাটাকাটিতেও চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে মানুষ। কেন? আসলে মানুষ নিজেকেই খুব ভালোবাসে। এ জগতে খুব কম মানুষই আছে যে নিজ স্বার্থকে বলি দেয়। স্বার্থ ত্যাগ করা মানুষও শতভাগ ত্যাগী হতে পারে না কখনও। একটু হলেও স্বার্থ ছাড়া কোনো কাজ করে না মানুষ। বিপর্যয়ের কারণ কি তাহলে এখানেই?
আদম-হাওয়া সৃষ্টি করে সৃষ্টিকর্তা ওই গাছের নীচে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু নিষেধ কি মানা হলো? নিষেধ মানা হলো না। আদম এবং হাওয়া দেখলেন তাদের অনেক স্বার্থ রয়েছে ওই গাছে। তাই সৃষ্টিকর্তার আদেশ অমান্য হলো। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ তার নিজ স্বার্থ বলি দিতে চায়নি। আজও আমরা স্বার্থ ছাড়া কিছুই করি না, কিছুই বুঝি না! করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে তাই মানুষ স্বেচ্ছায় সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং হচ্ছে।
মহামারী করোনা আমাদের বেশ কিছু উপলব্ধি শিখিয়েছে। যেমন: হাত ধোয়ার বিষয়টা এখন আমাদের ক্লিয়ার হয়েছে। বাহির থেকে এসেই অন্তত ২০ সেকেন্ড ভালো করে হাত ধুতে হবে। কোনো অফিসে প্রবেশের আগেও সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে নেই। বাইরে অযথা সময় নষ্ট না করে ঘরে থাকো। আপনজনদের সময় দাও। নিজেকে শুদ্ধ করে নাও। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার প্রাকটিস করো- তা না হলে বাইরের প্রকৃতি তুমি বিনাশ করে দিচ্ছ। ফলে প্রকৃতিও তোমার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হচ্ছে!
করোনাকালে একটা ভুল কথা প্রচার হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। শারীরিক দূরত্ব না বলে সামাজিক দূরত্ব বলাটা একটা ভুল কথা। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া কি মানুষ চলতে পারে? একে অন্যের সহযোগিতা ছাড়া মানুষ কখনোই চলতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। শারীরিক দূরত্বে থাকার একটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কথা বলার সময় অনেকের মুখ থেকে থু থু বা ড্রপলেট নিঃসৃত হয়। সেই ড্রপলেটে সংক্রামক রোগ থাকতে পারে। সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য শারীরিক দূরত্বে থাকার পরামর্শ যথাযথ এবং সময়োপযোগী। হ্যান্ডশেখ না করারও একটা নির্দেশ আছে এই করোনাকালে। এটাও যথার্থ। ময়লা হাতে অনেকের ঘামও থাকে। ঘাম এবং ময়লার মিশ্রণে জীবাণু থাকতেই পারে। হাত মেলানোর সময় টিসু বা রুমাল দিয়ে মুছে নিলে হয়। কিন্তু সে অভ্যাস আমাদের নেই। এখন শুধু টিসু বা রুমাল নয়, রীতিমত স্যানিটাইজার স্প্রে করা হয় হাতে, তবুও হাত বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না হ্যান্ডশেক করতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে বলা হয়, হ্যান্ডশেক পারস্পরিক হৃদ্যতা বাড়ায়। কিন্তু আমাদের পরিচ্ছন্নতার প্রাকটিস না হওয়া পর্যন্ত হ্যান্ডশেক স্থগিত থাকাই উত্তম বলে আমরা মনে করি।
বাতাসের সাথে ধুলোবালির প্রচুর সংক্রমণ উড়ে বেড়ায়। কিন্তু করোনাভাইরাস বাতাসে উড়ে বেড়ায় না। ধুলোবালির সংক্রমণ থেকে, সর্দি-কাশি-হাঁচির উপসর্গ হতে পারে। আর এই উপসর্গে করোনা সহজেই উপগত হয় বিধায় উপসর্গ ঠেকাতে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ এসেছে। মাস্ক ব্যবহারে সাময়িক সময় গরম অনুভূত হলেও ধুলোবালির সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। অতএব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটাও ইতিবাচক। তবে প্রকৃতি থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পেতে কিংবা প্রকৃতির গন্ধ পেতে মাস্ক দায়ী হতে পারে।
মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় কমপক্ষে ৩ ফুট দূরত্বে প্রার্থনা করাও একটা ইতিবাচক দিক। করোনাকালের আগে গা ঘেষাঘেষি করে নামাজে দাঁড়ালে প্রায়ই ঘামের উৎকট গন্ধ অথবা বিড়ি-সিগারেটের বিশ্রি ঝাঁজ এসে নাকে ঠেকতো যা রীতিমত বিব্রত অবস্থায় আচ্ছন্ন করে রাখত। কত তাড়াতাড়ি জামাত শেষ হয় করুনাময়ের দরবারে যেন নীরব প্রার্থনাই ছিল। পরম করুনাময় আমাদের নীরব প্রার্থনা কবুল করেছেন। আমরা দীর্ঘ ৫ মাস ধরে মসজিদে নামাজ পড়ি ওই ৩ ফুট দূরত্বে, ফাঁক ফাঁক হয়ে। কিন্তু এভাবে কতদিন? মনে হয়, যতদিন না আমরা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় মনোযোগী হবো, যতদিন না আমরা মহা পবিত্রতম প্রভুর প্রার্থনায় পবিত্র থাকার তাগিদ অনুভব করবো, ততদিন আলগা হয়েই নামাজ পড়তে হবে, তাই না?
বাজে বলার দিন এখন শেষ। এটাও করোনার শিক্ষা। বাংলাদেশে করোনা ধরা পড়ে ৮ মার্চ ২০২০ রবিবার। ইতালি থেকে আগত ব্যক্তির মাধ্যমে এদেশে করোনা প্রবেশ করে। কিছুদিন পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপিত হবে, এরকম একটা প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আমাদের বিচক্ষণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সংক্রমণ রোধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। মন্ত্রী মহোদয়গণ বেপরোয়া কথা চালাচালি করলেও তিনি দমে যাননি। কিছু মন্ত্রী মহোদয় ফ্ল্যাটারী করতে একটুখানি জায়গাও খালি রাখেননি! নাম বলার দরকার নেই, এক মন্ত্রী বলেছিলেন- ‘করোনাভাইরাসের চেয়েও আমরা শক্তিশালী। আরেক মন্ত্রী বলেন- এটা তেমন কিছুই না, সাধারণ জ্বর-কাশির মতোই একটা রোগ। আরেকজন বলে বসলেন শেখ হাসিনা থাকতে আমাদের দেশে করোনাভাইরাস ঢুকতেই পারে না।
কিন্তু করোনা ঢুকলো। মুজিব শতবার্ষিকী সীমিত আকারে পালিত হলো। স্বাধীনতা দিবস নামকাওয়াস্তে পালিত হলো। ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো। পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে সরকারি ছুটি বাড়িয়ে সারা দেশকে লকডাউন করে রাখা হলো। এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলো। আমাদের সিলেটের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র বদর উদ্দিন কামরানকেও করোনা উঠিয়ে নিয়ে গেল! আমরা তাঁর এবং দেশের সকল করোনা শহীদদের পরকালীন জীবনের কল্যাণ কামনা করি।
লকডাউনে সারাদেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো। বিশেষ করে দিন আনে দিন খায় মানুষদের অবস্থা আরো বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অনেক ছোট এবং বড় কোম্পানী অনেক শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করল। বৈশ্বিক মহামারীর কারণে দেশের রপ্তানী আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এল। এর মাঝে বন্যাও দেখা দিল। সব মিলিয়ে যখন জীবন জীবিকা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় আবারও বলিষ্ট হাতে হাল ধরেন। লকডাউন এখন প্রায় শিথিল। আদালত প্রাঙ্গণ সহ সব সেক্টরই এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভিপ্রায়ে লকডাউন মুক্ত।
কর্মেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আমাদের। কর্মছাড়া সাফল্যের সরল পথ কখনোই খোলা থাকে না। সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে থেকে নিজেকে শুদ্ধ করার একটা বিস্তর সুযোগ ছিল। যারা এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছেন তারা সত্যিকার অর্থেই আজ গেইনার। আর যারা কাজে লাগান নি তারা ব্যর্থ, কারণ এখনও তারা অসৎ পথে রোজগার করছেন! এই যেমন: বাস মালিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই গাড়ি চালাবেন বলে সরকার বাস ভাড়া দ্বিগুণ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে এরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন না। বাস ভর্তি মাস্কবিহিন মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি কোথায়? অথচ বাস ভাড়া কিন্তু দ্বিগুণই রয়ে গেছে!
সর্বশেষ কথাটি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে শুধু জীবন-জীবিকার পথ উন্মোচন করে দিলেই হবে না। একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে আমাদের। টেলিভিশনে ভার্চুয়াল শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতার বিকাশ হবে না। শারীরিক ও মানসিক উন্নয়ন ছাড়া একটা জাতির পুরো মেরুদ-ই ভেঙ্গে পড়বে। তাই আমরা মনে করি, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিসহ সকল শিক্ষাঙ্গন খুলে দেয়া দরকার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাঙ্গণ খুলে দিতে বাধা কোথায়? ভয়-আতঙ্কের কিছু নেই। তবে সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে। এখন প্রয়োজন শুধু সিস্টেম এপ্লাই করার। প্রতি ক্লাসে এক সাথে ক্লাস করার দরকার নেই। আজ ফিফটি পারসেন্ট তো কাল ফিফটি পারসেন্ট শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেই চলবে। অথবা বেজোড় রোল নাম্বার একদিন, জোড় রোল নাম্বার পরের দিন ক্লাস করবে। স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে ক্লাস করানো গেলে অলস সময় কাটানো শিক্ষার্থীদের অনলাইন আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তা না হলে অনলাইনের কানা গলিতে প্রবলভাবে আসক্ত হয়ে পড়লে করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়াবহ ভার্চুয়াল ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে জাতির এই উঠতি মেরুদন্ড।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আত্মীয়তা-আত্তীকরণ দুটোকেই না বলুন
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • Image

    Developed by:Sparkle IT