প্রথম পাতা ভার্চুয়াল সাক্ষাতকারে অনুজীব বিজ্ঞানী ড. জাহাঙ্গীর আলম

করোনা রোধে ভ্যাকসিনের চেয়েও বেশী উপকার দিতে পারে মাস্ক

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৮-২০২০ ইং ০৭:২১:৩৬ | সংবাদটি ৭৩৬ বার পঠিত
Image

প্রখ্যাত অনুজীব বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাক্সাসের ইউনিভার্সিটি অফ হিউস্টোন এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক সিলেটের কৃতিসন্তান ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ভ্যাকসিনের চেয়েও বেশী উপকার দিতে পারে মাস্ক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ পুরো বিশ্বে শীতকালে করোনার মারাত্মক প্রকোপ বাড়তে পারে-এমন আশংকা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সবচাইতে বেশী জরুরী। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলে এদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের আশংকা উড়িয়ে দিয়ে দুই বছরে না হলেও ৫ বছরের মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে তার ধারণা।
সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সাথে ভার্চুয়াল সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন প্রখ্যাত এ অনুজীব বিজ্ঞানী। ড. জাহাঙ্গীর আলমের ৪০-৫০টি গবেষণা প্রতিবেদন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৮৮ সালে আইসিডিডিআরবিতে কাজ করার সময়ই তার গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হয়। এছাড়া, তিনি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কাজ করে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাদৃত হয়েছেন। কলেরার মতোই ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী ঈষড়ংঃৎরফরঁস উরভভরপষব জীবাণু নিয়েও গবেষণা করছেন। ইতিমধ্যে তার এই গবেষণা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন। সাক্ষাতকারে তিনি মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাখা, বাংলাদেশে করোনার নমুনা পরীক্ষা, শীতকালে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির আশংকা সর্বোপরি করোনার বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনা ভাইরাসের সোর্স হচ্ছে মানুষ। কোন জীবজন্তু কিংবা প্রাণী-এই ভাইরাসের উৎস না। এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষ যাতে ট্রান্সমিট(সংক্রমণ) না হয়-এ জন্য সবারই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত এবং ডিসট্যান্স মেইনটেইন (দূরত্ব বজায়) করা, ক্রাউডে(জনসমাগমে) না যাওয়া উচিত। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ ভ্যাকসিনের চেয়েও বেশী উপকার পেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ মাস্ক ব্যবহার না করলে-এই মহামারি সহজে চলে যাবে না। করোনা রোধ করতে মাস্কের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, এমনকি সংক্রমণ রোধের জন্য আইসোলেশনেও যেতে হবে। তা হলে এ ভাইরাস এমনি এমনি চলে যাবে। মাস্কের ব্যাপক ব্যবহার ও প্রতিরোধক ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে হয়তো বা এ ভাইরাস ৫ বছর পর্যন্ত থেকে যাবে। আর মেইনটেইন করলে হয় তো দুই বছরে চলে যাবে। করোনার সাথে বিলিয়নস অব ডলারের মামলা জড়িত, জীবন মরণের মামলা জড়িত এবং অনেক সাফারিংয়ের (দুর্ভোগ) ব্যাপার আছে-এই সবকিছু থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে। আর মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমেই আমরা এটা তাড়াতাড়ি বিদায় করতে পারবো।

ড. জাহাঙ্গীর। তিনি জানান,শীতে করোনাভাইরাস মারাত্মক রুপ নিতে পারে। মারাত্মক রুপ নেবার সম্ভাবনা শতকরা ৯০ ভাগ, আর না হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ১০ ভাগ। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, শীতকালে আমাদের আচরণগত অনেক পরিবর্তন আসে। মানুষের ঘরে বেশীক্ষণ থাকার প্রবণতার কারণে রিস্ক(ঝুঁকি) ফ্যাক্টর আরো বেড়ে যায়। তিনি বলেন, শীতকালে অন্যান্য সিজন্যাল ফ্লুর কারণে মানুষের শরীর এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময়ে এই ভাইরাস আক্রমণ করলে মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো কমে যেতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর এবং চীনের মতো জনবহুল দেশ সাফল্যের সাথে এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করেছে। তারা মহামারি পিক (উচ্চ পর্যায়) থেকে বটমে(নিচে) নিয়ে এসেছে। নিয়মকানুন মানলে আমরা এক্ষেত্রে তাদের মতো সফল হবো। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে হয়তো সহজে বটমে আসবে না , কারণ মানুষ মাস্ক ইউজ করছে না, প্রতিনিয়ত একজন থেকে আরেকজনে ট্রান্সমিট করছে, প্রিভেনটিভ ব্যবস্থাও নেই। হয়তো অনেক দিন ভাইরাসের জীবানু বহন করতে হবে মানুষ। তবে, সোস্যাল মেডিসিন (যেমন মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব) মানলে আমরা মহামারি থেকে সহজে রক্ষা পাবো। তা না হলে অনেক দিন বাংলাদেশে এ ভাইরাস থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এতে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হবে, অনেক মানুষ মারা যাবে এবং মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে।
বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে এ বিজ্ঞানী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখের অধিক মানুষের করোনার টেস্ট হয়েছে-এটা সংখ্যার হিসেবে কিছু না। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে-এদেশে করোনা আছে, কিন্তু, ট্রেন্ড (প্রবণতা) বোঝার নেই, ভাইরাসটি কোথায় কোথায় ছড়াচ্ছে তাও বোঝার উপায় নেই। বাংলাদেশে যতটুকু সম্ভব টেস্ট বাড়ানো উচিত। কেননা, ভাইরাসটি এরই মধ্যে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেছে। এখন টেস্টিংয়ের মাধ্যমে আইসোলেশন করে কনটেইন করা ডিফিকাল্ট। যেটা করতে হবে মানুষজনকে বোঝাতে হবে, দূর করতে হলে ক্লোজ কন্টাক্টে আসা যাবে না। করোনার ক্ষেত্রে শতকরা ফিফটি পার্সেন্টের উপসর্গ নেই, ৯৯ পার্সেন্ট মাইল্ড ডিজিজ(রোগ)-কিন্তু দীর্ঘদিন ডিজিজ মেইনটেইন করলে এটা জাতির জন্য-জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য বিরাট হুমকি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্কুল কলেজ এই মুহূর্তে হয়তো বা খোলা রাখা যাবে না। কারণ-এই ভাইরাস হঠাৎ করে স্কুল কলেজে বেশী ছড়াতে পারে। কারণ বাচ্চারা যেভাবে ইন্টারেকশন (পরস্পরের কাছাকাছি আসে) করে বড়রা এভাবে ছড়াতে পারে না। স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে এখন এটাকে অনেকটা কন্ট্রোলে (নিয়ন্ত্রণে) রাখা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু, স্কুল-কলেজ খুলে দিয়ে এটা হয়তো আউট অব কন্ট্রোল (নিয়ন্ত্রণের বাইরে) চলে যাবে। এগুলোকে কন্ট্রোলে আনতে গেলে জনস্বাস্থ্যের প্রিভেনটিভ ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। ন্যাচারালি না চলে গেলে বিরাট সমস্যায় থেকে যাব আমরা। বহুভাবে সাফার করবো। আমেরিকাতেও আমরা সাফার করছি।
ভাইরাসটা রুপ বদলাচ্ছে-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের চিন্তা করা উচিত। এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তা না করাই ভালো। বিষয়টি বিজ্ঞানীরাও এখনো বুঝে উঠতে পারছে না। বিজ্ঞানীরা রোগ-শোকের পরিমাণ কোন কিছুর সাথে এটাকে সঠিকভাবে সমপৃক্ত করতে পারছেন না।
এই ভাইরাস মিউটেশন(পরিব্যক্তি) হচ্ছে। রোগ-শোকের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আনছে না। বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছে। পরিবর্তন এলে ভ্যাকসিনটাকে মডিফাই করতে পারে।
পৃথিবী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে নাও আসতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস-এই মন্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন বিজ্ঞানী জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, দুই বছর না হলেও পাঁচ বছরের মধ্যে পৃথিবী স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসবে। আমরা যদি, ইনফেকটাস ডিজিজের(সংক্রামক ব্যাধি) হিস্ট্রি দেখি, প্রতিবারই মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত এসেছে। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটবে না-এটা আমার বিশ্বাস। এটার কোন গ্যারান্টেড প্রমাণ নেই-বাট হিস্ট্রি দেখে এটা বলতে পারি-সময়ের ব্যবধানে পৃথিবী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। ২০২২-২৩ আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এ বিজ্ঞানী।
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের বাঁচা মরার সত্যিকারের লড়াই চলছে। আমাদের নিজেদেরকেই নিজেকে বাঁচাতে হবে। নিজেরা সচেতন না হলে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না।
করোনাভাইরাস ঢেউয়ের মতো উঠানামা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভাইরাসটি ক্রমশ বিবর্তিত হচ্ছে। এ ভাইরাসের গতি প্রকৃতি বোঝার জন্য পুরো এক বছর সময় দরকার।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে ড. জাহাঙ্গীর আলমের জন্ম। তাঁর সহধর্মিণী প্রখ্যাত জিন বিজ্ঞানী ড. খুরশিদা বেগমও ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টোনে কর্মরত।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

প্রথম পাতা এর আরো সংবাদ
  • এই দিন দিন না, সামনে আরো দিন আছে : রিজভী
  • আজও বর্ষণ অব্যাহত থাকবে
  • কার্যকর প্রতিষেধক আসলেও মাস্ক পরতেই হবে
  • প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন আজ
  • সুনামগঞ্জে বাড়ছে নদ-নদীর পানি
  • দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদারে অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ
  • শীতে করোনার ঝুঁকি বেশী সচেতনতার দৃশ্যতঃ প্রস্তুতি নেই
  • পাইকারির চেয়ে খুচরা বাজারে পেঁয়াজ কেজিতে ১০ টাকা বেশি!
  • ভিসা থাকলে ছুটিতে আসা সবাই সৌদি আরবে যেতে পারবেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
  • অবৈধপথে ক্ষমতায় আসতে চোরা গলি খুঁজছে বিএনপি : সেতুমন্ত্রী
  • ক্রেডিট কার্ডে ২০ শতাংশের বেশি সুদ নয়
  • ২০৩০ সালের মধ্যে সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় হবে ডিজিটাল
  • ১ অক্টোবর থেকে সৌদিগামী সব ফ্লাইট চালু হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
  • কক্সবাজারের ৩৪ পুলিশ পরিদর্শক বদলি
  • গোটা দেশটাকে কারাগারে পরিণত করেছে সরকার : মির্জা ফখরুল
  • ভ্যাকসিন আসছে ভেবে অনেকের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব : ওবায়দুল কাদের
  • ‘অটো প্রমোশন’ নয় মূল্যায়ন করেই নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে শিক্ষার্থীরা
  • সিলেট বিভাগে আক্রান্তের চেয়ে সুস্থতা দ্বিগুণ
  • প্রচণ্ড গরমের পর জেঁকে বসেছে বৃষ্টি
  • ছাতক সিমেন্ট কারখানার আধুনিকায়ন ২০২১ সালে সম্পন্ন হবে : উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপি
  • Image

    Developed by:Sparkle IT