উপ সম্পাদকীয়

আমাদের রাজনীতির কবি ও জাতীয় কবি

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৮-২০২০ ইং ০৮:৩৯:২৭ | সংবাদটি ৩০০ বার পঠিত
Image

বিশ্ব সাহিত্যে ঝর্নাধারার মতো স্বতঃস্ফুর্তভাবে প্রবাহিত মৌলিক কবিতার সংখ্যা খুব কম। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার সেরকম বিরল কবিতার মধ্যে একটি। কোন কোন কবিতা কবিকে লিখতে হয় আর কোন কোন কবিতা কবির দ্বারা লেখা হয়ে যায়। এরকম লেখা হয়ে যায় শ্রেণীর কবিতার মধ্যে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা’ও একটি। রোমান্টিক যুগের কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার এই সংজ্ঞাটি আমার খুব প্রিয়। ‘কবিতা হচ্ছে গভীর অনুভূতির স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ’ বা ‘পোয়েট্রি ইজ দ্য স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অব পাওয়ারফুল ফিলিংস’। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ওয়ার্ডসওয়ার্থের সংজ্ঞার হুবহু অনুরণন বলা যায়। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটি এতোই তেজস্বী, সমসাময়িককালে এরকম উচ্চারণের, এরকম ধারার কবিতা বিরল হওয়ার কারণে তার এই ধারাই তাঁকে বিদ্রোহী কবির তকমা পরিয়ে দেয়। আবার তিনি যখন ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল’ এ ধরনের অজ¯্র সঙ্গীত রচনা করেন তখন তিনি প্রেমের কবি হিসাবে আখ্যায়িত হয়ে যান। যখন তিনি অভুতপূর্ব শ্যামা সংগীত রচনা করে শ্যামাকালী প্রার্থনাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যান, তখন তাঁকে শ্যামা ভক্ত কবি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। আবার তার অসাধারণ হামদ, নাত ও ইসলামী সঙ্গীত তাকে ইসলামী জাগরণ কিংবা ইসলাম প্রিয় কবি হিসাবে পরিচিতি দেয়। কিন্তু নজরুল নিজেকে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করে বলেন, ‘আমি সুন্দরের সাধক আমি হিন্দুর কবি নই, মুসলমানের কবি নই আমি মানুষের কবি’।
নজরুল সাম্যবাদের অভ্যন্তরে পরিভ্রমণ করেছেন, প্রতিটি ধর্মের মূল বাণীকে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করেছেন, শুদ্ধ প্রেমের ধারার অভ্যন্তরের সৌন্দর্যকে উপভোগ করেছেন, সেই সময়ের সকল অযাচিত, মানবতা বিরোধী প্রথাকে অবলোকন করেছেন। এতো বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন যাপন করেছেন যেন মহা বিশ্বকে অনুসন্ধান করে তার রূপ, রঙ, বর্ণকে অভ্যন্তর থেকে দেখে, হৃদয়ের কথা তুলে ধরার দায় যেন ছিলো তাঁর। নজরুলের রচনা বহুমাত্রিকতা, তার রচনার উচ্চমান সম্পন্ন বাণী আমাদের ক্ষুদ্র হৃদয়ে অনেক সময় ধারন করা সম্ভব হয়নি বলে আমরা কখনো তাকে সাম্যবাদী, কখনো তাকে ধর্মের বাণীবাহক, কখনো শুধু প্রেমিক কবি হিসাবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছি। সামগ্রিক নজরুলকে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা গবেষকদের হৃদয়ের দীনতার কারণে এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নির্মোহ নজরুল গবেষণা গবেষকদের ধারণ করা মতামত দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে সবসময়।
নজরুল যেরকম ধূমকেতুর মতো আবির্ভুত হয়ে বাঙালি হৃদয়ে অবস্থান করেন ঠিক একই রকম ভাবে আর একজন মানুষ, উঠে আসেন বাংলার নিভৃত একটি গ্রাম থেকে, তিনিও বাঙালি হৃদয়ে গভীর মমতা ও শ্রদ্ধায় অবস্থান করেন। নজরুল উঠে আসেন পশ্চিম বঙ্গের চুরুলিয়া গ্রাম থেকে আর একজন উঠে আসেন বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুরের টুঙ্গীপাড়া গ্রাম থেকে। টুঙ্গী পাড়া থেকে যিনি উঠে আসেন তিনি অবিভক্ত ভারতের মহান নেতাদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন। ঊনিশ শত বিশ সালে জন্ম নেয়া এই মহাপুরুষ হলেন বাঙালির রাজনৈতিক আকাশের ধূমকেতু। নজরুল যে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নানাভাবে লড়ে গেছেন, টুঙ্গীপাড়ার সেই রাজনৈতিক কবি সে শাসন থেকে প্রথম বারের মতো বাঙালিকে হাজার বছর পর মুক্তি এনে দিতে সক্ষম হন। আমাদের রাজনৈতিক কবির নাম, শেখ মুজিবর রহমান। যিনি তাঁর ত্যাগ, ভালোবাসা, ধৈর্য, কৌশল, সাহস, সততা, সর্বোপরি অসামান্য দেশ প্রেম দিয়ে প্রথমে সবার প্রিয় শেখ মুজিব, তারপর মুজিব ভাই, শেখ সাহেব হয়ে একসময় বাঙালির সবচেয়ে ভালোবাসার বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতি পেতে সমর্থ হন।
শেখ মুজিবের বঙ্গবন্ধু হওয়ার পরিভ্রমণ কিন্তু এতো সহজ ছিলোনা। সেই সময় অবিভক্ত ভারতে অসাধারণ কিছু নেতা তাদের নিবেদন ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে সমগ্র ভারত ও বাংলায় সমাদৃত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন ১৮, শেরে বাংলা এ, কে ফজলুল হক তখন বাংলার প্রধান মন্ত্রী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একই মন্ত্রী সভার শ্রমমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর সাথে এই দুই নেতার প্রথম পরিচয় এই সময়েই যখন এই দু’জন নেতা একত্রে গোপালগঞ্জ সফরে আসেন এবং গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল পরিদর্শন করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ স্কুলের স্বেচ্ছ্বাসেবক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর কার্যক্রম দেখে এতোই আকৃষ্ট হন যে এরপর থেকে তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে রাজনৈতিক গুরু হিসাবে শ্রদ্ধা করে তার নেতৃত্বে কাজ করে গেছেন। আবার শেরে বাংলার প্রতি তার আনুগত্য ও ভক্তি ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। শেরে বাংলা মুসলিম লীগ ত্যাগ করে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করলেও শেখ মুজিব তাকে কখনো অশ্রদ্ধা করেননি বরঞ্চ বাংলার কৃষক, শ্রমিক সাধারণ মানুষের শেরে বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি তাকে বিমোহিত করতো।
শেখ মুজিব যেমন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক একজন নেতা ছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনা অবিভক্ত ভারতে প্রশ্নাতীত ছিলো। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সময় মুজিব হোসেন শহীদ সোহরাওর্দীর সাথে সারা কোলকাতায় অসীম সাহস নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যান। মহাত্মা গান্ধী, সোহরাওর্দী এবং শেখ মুজিব দাঙ্গা থামাতে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে এক সাথে কাজ করেছেন সে সময়। পরবর্তীতে ১৯৬৪সালে পাকিস্তান সরকারের মদদে ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা করে, বঙ্গবন্ধু তখন নিজে সেই দাঙ্গা প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়েন। অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতাবোধ, বাংলার মাটি, মানুষ, আলো, বাতাসের প্রতি ভালোবাসার জন্য তাঁরা দুজনই ছিলেন প্রবাদপ্রতীম। কাজী নজরুলকে এই উপমহাদেশে অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করা যায়। তাঁর জীবন ও সাহিত্যে পাতায় পাতায় তার এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল আলো আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়েছে। শেখ মুজিব যে কয়জন মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল তাদের মধ্যে অন্যতম।
শেখ মুজিব ও নজরুলের প্রথম সাক্ষাত হয় ১৯৪১ সালে। শেখ মুজিবের কাজী নজরুলের প্রতি অপার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিলো। ১৯৪১ সালে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে, ইংরেজ সরকারের নানা বাধা বিপত্তির মধ্যে ও তিনি কাজী নজরুলকে সম্মেলনে উপস্থিত করতে সক্ষম হন। এই প্রথম শেখ মুজিব, নজরুলের গান তাঁর সামনে বসে শোনার সৌভাগ্য লাভ করেন। শেখ মুজিবের শ্রদ্ধা ভালোবাসার প্রমাণ আমরা পাই স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে। শেখ মুজিব ১৯৭২সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পন করেন। তার পদার্পনের মাত্র মাত্র চার মাস চৌদ্দ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৪ মে তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে তার ভালোবাসার কবিকে ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। নেতা শেখ মুজিবের, কবি নজরুলের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা এরকম বিশেষ উদ্যোগ থেকেই আমরা বুঝতে পারি। কাজী নজরুল ইসলামের এই আগমন তাঁকে আমাদের জাতীয় কবি হিসাবে স্বীকৃতি দানের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।
বঙ্গবন্ধুকে অনেকেই রাজনীতির কবি বা পোয়েট অব পলিটিক্স হিসাবে আখ্যা দান করেন। সাহিত্যিক আহমদ ছফা বলেন ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা হচ্ছে, ‘আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না’। অর্থাৎ সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা, বাঙালিদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি কিংবা মানুষকে স্বাধীনতার জন্য জাগিয়ে তুলার জন্য’ই বিশ্ব স্বীকৃত নয়। এর স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থাপনা, শব্দ নির্বাচন, আবেগ, ভালোবাসার বহিপ্রকাশ, সব মিলিয়ে সাতই মার্চের ভাষণটি একটি কাব্যিক দ্যুতনা সৃষ্টি করে। অলেখা একটি ভাষণ কখনো এতো গোছালো হতে পারে না। অলেখা একটি ভাষণের জন্য কোন নেতাকে বিরামহীনভাবে তার বার্তা জনগণকে পৌঁছে দিতে আর কখনো দেখা যায়নি। এই বক্তৃতায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি হৃদয়ের কাছে নিয়ে “তুমি” বলে সম্বোধন করেছেন। ভালোবেসে জনগণকে ‘তুমি’ সম্বোধন করতে এর আগে কোন বাঙালি নেতাকে আর দেখা যায়নি। নেতা ও পিতা কতোটুকু অখ- হলে এরকম আপন হয়ে ওঠেন বিশ্ব ইতিহাসে এরকম নজির আছে কিনা আমাদের জানা নেই।
বঙ্গবন্ধু যেমন বাঙালি চরিত্রের শাশ্বত প্রতিমুর্তি কাজী নজরুল হলেন সে প্রতিমুর্তি গড়ার অন্যতম কারিগর। হাজার বছর ধরে বাঙালি তার স্বপ্নের স্বাধীন ভূমির কথা ভেবেই এসেছিলো, সেই স্বপ্নকে বিরামহীন লড়াই করে বাস্তবে পরিণত করেছেন বঙ্গবন্ধু। সেই স্বপ্নের জাল বুনেছেন যে সমস্ত মানবতাবাদী বাঙালি কবি তাদের মধ্যে কাজী নজরুল হচ্ছেন সামনের সারির যোদ্ধা। পলি মাটি বিধৌত এই সুবর্ণ ভূমিতে আজ আশ্চর্যভাবে দু’জন মানুষই ঘুমিয়ে আছেন। তাদের ত্যগের ঋণ শোধ করার সময় এসেছে আজ এই প্রজন্মের কিংবা তার ও পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালিদের। অপেক্ষায় আছি আমরা নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবোধে পরিপূর্ণ সোনার বাংলাদেশ দেখার জন্য। আমাদের বিশ্বাস, শাশ্বত বাঙালির প্রত্যাশা শতভাগ পূর্ণ হবে অচিরেই।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT