উপ সম্পাদকীয়

ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ

ফকির ইলিয়াস প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০২০ ইং ০১:৪৩:২৩ | সংবাদটি ৬৯ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সিলেটে আমরা যারা পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছিলাম, তারা একে অপরের খোঁজ নিতে শুরু করেছি। আমার পিতা তখন লন্ডনে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টায়। আমার মা ও মামারা একে অপরের বাড়িতে গিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে চাইছেন। নির্ণয় করতে চাইছেন, ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ।
বলা যায়, তা ছিল সেই সময়ের একটি দরকারি রুটিন ওয়ার্ক। সেই কুশল বিনিময়ের কাজেই আমাদের মা-মামাদের একটি বিশাল বহর একদিন গিয়ে হাজির হই আমাদের আরেক মামা’র বাড়িতে। আমার মা’য়ের কাজিন তিনি। মোহাম্মদ মুসলিম মিয়া। ম. আ. মুক্তাদিরের পিতা।
মনে পড়ছে, সেখানে গিয়েই দেয়ালে একটি বিশাল বড় ছবি দেখতে পাই। একজন তরুণের দীর্ঘ চুল-গোঁফ-দাঁড়িওয়ালা ছবি। ছবিটি যে আমাদের মুক্তাদির ভাইয়ের তা চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। একজন চে গুয়েভারা’র ছবি যেন! যুদ্ধকালীন সময়ে রেখে দেয়া দাঁড়ি-চুলের ছবিটি তিনি তুলেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেই।
মোহাম্মদ আব্দুল মুক্তাদির ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সিলেট বিভাগের যে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বীরত্বের সাথে যৌবনে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তিনি তাঁদেরই একজন।
ম. আ. মুক্তাদির ছিলেন আজীবন সাম্যবাদী মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন, এই দেশে মানুষ তার অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই দেশে কোনো লুটেরা, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাকারবারী, মুনাফাখোর, মজুতদার থাকবে না। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। আমাদের যৌবনে আমরা যারা শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা আর মানবতার সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে গিয়েছিলাম, ম. আ. মুক্তাদির ছিলেন আমাদের নেতা। মনে পড়ছে, আমাদের কলেজ জীবনে তিনি ছিলেন আমাদের ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার আইকন।
জাসদ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার সাইরেন বাজে। জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে সামরিক জান্তারা দাপিয়ে বসে। এই অবস্থায় তিনি তাঁর আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। আমাদের সহযোদ্ধারা অনেকেই একসময় হতাশ হয়ে পড়েন। এই সময়ে সিলেট বিভাগ থেকে হাজার হাজার ছাত্র মাত্র একটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দেশত্যাগ করা শুরু করেন। ম. আ. মুক্তাদিরের উপর খড়গ নেমে আসে সামরিক যাঁতাকলের। তিনি সংসারী হন। কিন্তু তাঁর বিপ্লব আর সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন থেমে থাকে না। বাংলাদেশের সামরিক বিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ বিরোধী আন্দোলোনে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক।
১৯৮৬ সালের এক দুপুরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েই, সামরিক শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। বলেন, ফিরে আসবো। যে সংগ্রামী চেতনায় বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেই চেতনায় গড়বো বাংলাদেশ!
১৯৯২ সালে আমি আমেরিকা থেকে যখন ইংল্যান্ডে যাই, তখন তাঁর সাথে আমার দেখা হয় দীর্ঘদিন পর। তিনি আমার কাছে ছিলেন অগ্রজ কমরেডের মতো। আবার আলাপে-আলোচনায় তিনি মুখর করে তুলেন সেইসব স্মৃতি! জানতে চাই, বাংলাদেশে ফিরবেন না! তিনি উচ্চকন্ঠে বলেন, বাংলাদেশই তো আমার দেশ, সেখানেই ফিরবো আমি। বলেন, এই বিলাতে অনেক কাজ করতে চাই। বাংলাদেশী বাঙালীদের সমস্যা অনেক। লন্ডনের ব্রিকলেনকে ‘বাংলা টাউন’ করার অন্দোলন করছি।
ইংল্যান্ডে অনেক কাজের সাথেই জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। মূল কাজই ছিল মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম করতে করতেই একটি সভায় তিনি ম্যাসিভহার্ট এ্যাটাক করেন। হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ইংল্যান্ডের ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লন্ডনে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে। তিনি বাংলাদেশে ফিরেছিলেন ঠিকই, তবে কফিনে বন্দি হয়ে।
ম. আ. মুক্তাদির মহান মুক্তিযুদ্ধে দীক্ষা নিয়েছিলেন হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ.ফ.ম. মাহাবুবুল হক এর মতো বিপ্লবীদের কাছ থেকে। ট্রেনিং শেষ করে তিনি ৪নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদীর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করছিলেন।
তিনি সব সময় যে কথাটি বলতেন, তা হলো একজন বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ, তা শেষ হয় না। একজন নির্লোভ, নিরহংকারী সমাজ পরিবর্তক ছিলেন তিনি। যা আজকের সমাজে খুবই বিরল। সামরিক জান্তারা তাঁকে নানা প্রলোভন দেখিয়েছিল। তিনি এক বাক্যে বলেছিলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা। জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছি। মাথা বিক্রি আমি তো করতে পারি না!
বিপ্লবী ম. আ. মুক্তাদির আজ নেই। কিন্তু তাঁর চেতনা আজও আছে। ২০১৬ সালে তাঁরই আরেকজন সতীর্থ কমরেড শাহাব উদ্দীনের সার্বিক প্রচেষ্টায় ম. আ. মুক্তাদির স্মৃতি কল্যাণ ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে। এই ট্রাস্ট একযোগে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ থেকে কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে এগুচ্ছে। ট্রাস্টের উদ্যোগে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কদমতলীতে তাঁর সমাধি ফলক স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য আরও কিছু কাজ অব্যাহত রয়েছে ট্রাস্টের উদ্যোগে।
এখানে একটি জরুরী বিষয় না লিখলেই নয়। তাহলো, বীর মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মুক্তাদিরের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৯৮-৯৯ সালে তৎকালীন নৌ ও পরিবহন মন্ত্রী আ. স. ম. আব্দুর রবের নির্দেশে কদমতলী এলাকার ফেরিঘাট সড়ক থেকে জকিগঞ্জ সড়ক পর্যন্ত যে রাস্তাটি বিদ্যমান, সেই রাস্তাটি মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাদিরের নামে সরকারিভাবে নামকরণের আদেশ দেয়া হয়।
এ বিষয়টি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-৩ এর আওতায় রাস্তার কাজের টেন্ডার ইস্যু করা হয়। তখন থেকে এ সড়কটি মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাদিরের নামে সরকারি কাগজপত্রে বলবৎ হয়। কিন্তু পরিতাপের কথা, বাস্তবে রাস্তার কোথাও মুক্তাদিরের নামের অস্তিত্ব নেই। এলাকার মানুষের মতে, গ্রাম্য রাজনীতির হীন আক্রোশের শিকার হয়ে সেই সড়কটি মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাদির সড়কের নামকরণ পায়নি।
বর্তমানে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবী মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মুক্তাদিরের নামে কদমতলী পয়েন্টে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা চত্ত্বরটি ‘মুক্তাদির চত্বর’ নামে নামকরণ করা হোক। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দেখানোর মধ্যদিয়ে নিজের দেশ ও জাতির প্রতিই সম্মান দেখানো হয়। তাহলে মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাদিরের প্রতি সম্মান দেখাতে আজ আমরা কেন ব্যর্থ! বিষয়টি সড়ক বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভাগ দেখবেন বলেই আমি আশা করছি।
ম. আ. মুক্তাদির যে প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন, তা আজও দেখেন এই বাংলাদেশের কোটি তরুণ। তাই একজন অগ্রজের চেতনাকে শাণিত করে এগিয়ে নিতে এই তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু মানবিক-সামাজিক মুক্তি আমরা পাইনি। দুর্নীতি আজ গ্রাস করেছে আমাদের লাল সবুজ পতাকা। এই পতাকাকে সমুন্নত রাখতে প্রজন্মকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে একজন নির্ভিক মুক্তাদিরের মতোই। ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। স্যালুট, হে কমরেড!
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT