উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০২০ ইং ০৩:০৯:০৮ | সংবাদটি ৮৪ বার পঠিত
Image

আমাদের দেশের অনেকেই শিক্ষা নিয়ে মেতে উঠেছেন। তাঁদের সকলের মতেই শিক্ষা সমাজের অগ্রগতির মূল। শিক্ষাই সমাজের মেরুদন্ড গঠন করে। কিন্তু মেরুদন্ড থাকলে হবে না, সেটা কীভাবে আছে দেখতে হবে। জীবজগৎকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, উদ্ভিদ ও প্রাণী। আবার প্রাণীদেরকেও দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে-মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী। অমেরুদন্ডী অপেক্ষা মেরুদন্ডী প্রাণীর জ্ঞান ও বুদ্ধি অধিক। আবার মহাযোগীরা সমীক্ষা করে দেখেছেন যে মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে যাদের মেরুদন্ড অনুভূমিক তাদের থেকে উলম্ব অবস্থায় থাকা মেরুদন্ডী প্রাণীর জ্ঞান-বুদ্ধি বেশি। নিদ্রিত অবস্থা ছাড়া সর্বক্ষণই মানুষের মেরুদন্ড উলম্ব অবস্থায় থাকে। তাই প্রাণীদের মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধিরও দিক দিয়ে মানুষই শ্রেষ্ঠ। কুকুর, ভাল্লুক, বানর, হাতি ইত্যাদির মেরুদন্ড অনুভূমিক থাকলেও প্রায়ই উলম্ব অবস্থা প্রাপ্ত হয়। তাই এদের বুদ্ধি গরু, ভেড়া, মোষ ইত্যাদি থেকে অধিক। জ্ঞানীরা বলেছেন যে, দেশবাসীর মেরুদন্ড এখনও সোজা (উলম্ব) হয়নি। যতদিন পর্যন্ত না বড়লোক তোষণ বন্ধ হবে, ততদিন পর্যন্ত সোজা হবে না। উদাহরণ স্বরূপ, বিশু নামক এক পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের জন্য তার বাবা-মা পাড়ার রাজুকে গৃহশিক্ষক হিসাবে ঠিক করলেন। রাজু খুবই সৎ, শিক্ষিত ও নম্র ছেলে। চাকুরি না-পেয়ে প্রাইভেট টিউশনি করে কোনো মতে পরিবার প্রতিপালন করছে। বিশুর বাবা-মা রাজুকে শিক্ষক হিসাবে মর্যাদা দেন ও প্রতিদিন চা-বিস্কুট ইত্যাদি দিয়ে সমাদরও করেন। কিন্তু একদিন ওখানকার বিধায়ক তাঁর সঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বিশুদের বাড়িতে আসায় বিশুর বাবা রাজুকে বিদায় করে দিয়ে অতিথিদের জন্য মূল্যবান খাদ্যসামগ্রী এনে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বিশু তার পিতার নিকট কী শিক্ষা পেল? সে শিখল যে পড়াশুনা শিখে শিক্ষিত ভদ্র হওয়ার চেয়ে মন্ত্রী-বিধায়ক হয়ে বাড়ি-গাড়ির মালিক হলেই সমাজে সম্মান বেশি। তার চাণক্য শ্লোকটি আর শেখা হল না। শ্লোকটি হল, ‘রাজার বৈভব আর বিদ্যা মহাধন, এই দুই সমতুল নহে কদাচন। রাজার আদর শুধু আপনার দেশে, বিদ্বানের মান কিন্তু সর্বদেশে।
আমাদের পাঠ্য ব্যবস্থায় নৈতিক চরিত্র গঠনের কোনো বিষয় বর্তমানে প্রায় নেই। আছে শুধু বই এর ছড়াছড়ি। ছাত্ররা এতগুলো ভাষা আয়ত্ত করবে, না অঙ্ক, বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞানে জ্ঞান বাড়বে? তা ছাড়া কোনো ছাত্রের নৈতিক চরিত্র ঠিক না-করে শিক্ষাদান সমাজের অমঙ্গল ডেকে আনা। পঞ্চম শ্রেণির বিশুর কথাই ধরা যাক, সে একদিন তার সহপাঠীর কলম চুরি করে নিয়ে এসেছে। বাবা-মা সেদিকে খেয়াল না-করে তাকে অত্যধিক চাপের মধ্যে রেখে উচ্চশিক্ষিত করে তুললেন। সে এখন একজন অফিসার এবং প্রতিদিন কলম দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা নয়ছয় করছে। পঞ্চম শ্রেণিতে কলম চুরি করেছিল এবং এখন করছে প্রতিদিন কলম দিয়ে চুরি। চরিত্র গঠন না করতে পারলে তাকে পঞ্চম শ্রেণিতেই পড়াশুনা বন্ধ করানো উচিত ছিল। তাহলে এত বড় চোর হতে পারত না, ছিঁচকে চোর হতো। উচ্চপদে না-থেকে অন্য কোনো কাজ করত এবং মাঝে-মাধ্যে কারো বাড়ি ঢুকে বাসন-বর্তন, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি সামান্য মূল্যের দ্রব্যাদি হয়তো চুরি করত। তাও প্রতিদিন করতে পারত না। তাই বলা যায়, নৈতিক চরিত্র ঠিক না-করে শিক্ষাদান আমাদের দেশের সর্বনাশের মূল কারণ আর নৈতিক চরিত্র ঠিক করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন যার প্রয়োজনীয়তা নীতি নির্ধারকরা খুব কমই অনুধাবন করছেন বলে মনে হচ্ছে। দেখছেন না, প্রায় প্রতিটি সরকারি অফিসেই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলছে শুধু গণিত চর্চা। আর মন্ত্রীরা বলছেন, ‘হেন করব, তেন করব।’ না কি, কচু করবেন। ছুরি আবিস্কার হয়েছে মানুষকে বাঁচানোর জন্য, শল্যচিকিৎসার দ্বারা। কিন্তু মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে তা দিয়ে অধিক হারে মানুষ খুন করছে। তাছাড়া আমাদের দেশে তো বর্তমানে নরক। রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছুরই ঠিক নেই। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে ১১২ স্থানে দুর্নীতির দিক দিয়ে।
আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে দুর্নীতি ঢোকানো হচ্ছে। শৈশবে বাবা-মা তাদের শেখাচ্ছেণ-‘বিড়াল ওড়ায় ঘুড়ি ওরে বিড়াল ওড়ায় ঘুড়ি, নীল আকাশে রঙিন ঘুড়ি চলছে উড়ি উড়ি।’ ছড়ার বইটিতে লাটাই নিয়ে বিড়ালের ঘুড়ি ওড়ানোর ছবিও আছে। আবার, ‘খোকন খোকন করে মায় খোকন গেছে কাদের নায়, সাতটা কাকে দাঁড় বায় খোকনরে তুই ঘরে আয়।’ ছড়াটির ছবিতে কাক ঠোঁট দিয়ে দাঁড় বাইছে। এগুলো শেখাতে গিয়ে মায়েরা খুব আনন্দ পেলেও শিশুরা কিন্তু প্রকৃত ভেবেই শিখছে। শিশুটি পরিণত হলে বুঝতে পারছে যে, বিড়াল ঘুড়ি ওড়াতে পারে না, কাক দাঁড় বাইতে পারে না এবং গরুও পারে না গাছে চড়তে। বাবা-মা যা শিখিয়েছেন সবই যখন মিথ্যে বলছে, তখন সেটা অর্থাৎ মিথ্যে বলাটা নিশ্চয়ই অন্যায়ের কিছু নয়। মনে হয় এভাবেই আমাদের শিশুদের মধ্যে মিথ্যের বীজ বপন করা হচ্ছে। তাছাড়া, অনেক বাবা-মা সন্তানকে মিধ্যে বলতে বারণ করছেন এবং পর মুহূর্তে ফোন কল এলে তাকে বলছেন, বলে দে বাড়ি নেই।’
আমাদের বেশির ভাগই যেন শিশুতুল্য। একটি শিশুর কাছে দুটো তেল ভর্তি বোতল ধরা হল। একটি বোতল কারুকার্য করা ও রং বেরং-এর সুন্দর ডিজাইন করা এবং অপরটি সাদা-মাটা অর্থাৎ সাধারণ। মিশুটি সুন্দর ডিজাইন করা এবং অপরটি সাদা-মাটা অর্থাৎ সাধারণ। শিশুটি সুন্দর বোতলটিই নিতে চাইবে। কিন্তু একজন রাঁধুনী বোতলের ছিপি খুলে তেল পরীক্ষা করে বোতল নির্ধারণ করবেন। এখন সকলকে প্রশ্ন করা হল যে কোনটার প্রয়োজন, তেলের না বোতলের? অনেকেই বলে উঠবেন যে তেলের প্রয়োজন। কিন্তু না, প্রয়োজন দুটোরই। কেন না, বোতল ছাড়া আমরা তেল রাখব কোথায়? তবে তেলের অধিক প্রয়োজন এবং তেলই মুখ্য। তেল থাকা অবস্থায় বোতলে ছিদ্র হলে তা বন্ধ করার জন্য সকলে মরিয়া হয়ে উঠবেন, কিন্তু তেল ফুরিয়ে গেলে বোতলের আর প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ সবাই বোতলের চিন্তাই করছেন, তেল শুদ্ধির চিন্তা করো নেই। তেলে যে অহরহ আবর্জনা বেড়েই চলেছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আবর্জনাগুলো হল ছয়টি রিপু-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এছাড়াও মিথ্যে বলা, হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা নামক ময়লাও জমছে। সেগুলো পরিষ্কারের চিন্তা ক’জনের আছে?
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাই হল ছেলে-মেয়েদের কাঁধে সাধ্যাথীত পুঁথিগত বিদ্যার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি। মায়েদের ছোটাছুটি। পরীক্ষা নামক প্রতিযোগিতায় উত্তম ফল প্রাপ্তি। পরবর্তীতে অধিক অর্থোপার্জন হয় এমন লাইনে পড়াশুনা করে উপযুক্ত কর্মস্থলে চাকরি প্রাপ্তি। দেশের ও দশের অর্থ আত্মসাৎ। নিজের নামে প্রাসাদ, প্রমাণ অট্টালিকা ও গোটা কয়েক বাড়ি। অধিকাংশ অভিভাবকের ধারণা এটাই ছেলে-মেয়ের উন্নতি। কিন্তু ক’জন ভাবেন যে ছেলের বাড়ি-গাড়ি ক’দিন পর হয়ে যাবে নাতির। বাড়ি-গাড়িসহ সকল বস্তুই এ জগতে রেখে আমাদের সকলকেই পরপারে দিতে হবে পাড়ি। তাই পরপারে গিয়ে যাতে শান্তিতে থাকা যায়, তার চিন্তাও সে ব্যাপারে তৎপর হওয়াটাই আমার মতে সবচেয়ে বেশি জরুরী।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT