উপ সম্পাদকীয়

ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী

মোহাম্মদ আবু তাহের প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০২০ ইং ০৩:১০:৩৭ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত
Image

দেশের খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী এক বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সোমবার সিঙ্গাপুর সময় সকাল ১০টা ৫৯ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় সকাল ৮ টায় সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৌলভীবাজারবাসী সহ দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তাঁর সামগ্রিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক নেতা সৈয়দ মহসীন আলীর ব্যক্তিত্ব ও মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অবদান তুলে ধরা আমার মত একজন সাধারণ লেখকের দুঃসাহস ছাড়া আর কিছু নয়। তবুও এ লেখার সাহস পেয়েছি শুধুমাত্র প্রয়াত নেতাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। সৈয়দ মহসীন আলী জীবনের শেষ বেলায়ও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জয়গান গেয়েছেন। তিনি মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের রাজনীতি করে গেছেন। এখন আর কোন মাননীয় মন্ত্রী মঞ্চে বক্তৃতা করতে করতে দেশাত্মবোধক গান ও “মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য” গাইবেন না। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ সৈয়দ মহসীন আলী ছিলেন আজীবন সংগ্রামী মানুষ। তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের দিলখোলা মানুষ। যাকে যা বলার প্রকাশ্যেই বলতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা সহ্য করতে পারতেন না। প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতেন। রাজনীতির সুবাদে মৌলভীবাজারের অলিগলি চষে বেড়াতেন সৈয়দ মহসীন আলী। তিনি ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের শেষ ভরসাস্থল। সৈয়দ মহসীন আলী মৌলভীবাজারের এক ঐতিহ্যবাহী বনেদি পরিবারের সন্তান হলেও তাঁর মধ্যে কোন অহংবোধ দেখা যেত না। সর্ব শ্রেণি, মত ও পেশার মানুষের সাথে তিনি মিশতেন। তাঁর বাসভবনে যে কোন মানুষ গিয়ে তাঁর কাছে বসতে পারতো এবং নিজের সমস্যার কথা নিঃসংকোচে বলতে পারতো। এজন্যই তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ, মহৎ মানুষ।
এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। মৃত্যুর প্রায় এক বছর পূর্বে একদিন সকালে প্রাতঃভ্রমণ শেষে মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করার জন্য তাঁর বাসভবনে গিয়ে তাঁর পাশের চেয়ারে একজন বৃদ্ধ মহিলাকে বসা দেখলাম, যাকে দেখলেই মনে হবে তিনি একজন সুবিধা বঞ্চিত কোনো পরিবারের মহিলা হবেন। তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে তার কথাগুলো বলতে লাগলেন। মন্ত্রী মহোদয় আমার চেয়েও বেশি ঐ মহিলাকে মনোযোগ দিলেন। এ দৃশ্যইতো সৈয়দ মহসীন আলীকে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা থেকে আলাদা করে দেয়। এ দৃশ্যই তাঁর মহানুভবতার বড় প্রমাণ বলে আমি মনে করি। তিনি শুধু রাজনীতিই করতেন না। তিনি ছিলেন সমাজ সেবায় নিবেদিত এক খ্যাতিমান মানুষ। তিনি অনেক সমাজসেবা মূলক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি গ্রেটার সিলেট ডেভলাপমেন্ট এন্ড ওয়েল ফেয়ার কাউন্সিল ইউ.কে এর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। মন্ত্রী হওয়ার কিছুদিন পরে এ পদ তিনি ছেড়ে দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। এ সংগঠনের আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে আমি তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
সৈয়দ মহসীন আলী এমনি একজন মানুষ ছিলেন যিনি মন্ত্রী হওয়ার পরও প্রায় প্রতি সপ্তাহে মৌলভীবাজারে চলে আসতেন। মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষকে তিনি যে ভালবাসতেন এটি একটি বড় প্রমাণ। সৈয়দ মহসীন আলী যে কোন পর্যায়ের মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একজন এম,পি হিসেবে, মন্ত্রী হিসেবে, পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে আমি তাঁকে দেখেছি। তাঁর সাথে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমাবেশে যোগ দিয়েছি। তিনি আমার লেখা বই ‘নির্বাচিত রচনা সংকলন’ এর মোড়ক উন্মোচনে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে আমাকে সম্মানিত করেছেন। তাঁর বাড়িতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রয়োজনে গিয়েছি। আমার কাছে সব সময় দৃশ্যমান হয়েছে সৌজন্য, সহানুভূতি ও মানুষের মতামতের উপর গুরুত্ব দেয়ার এক সহজাত প্রবণতা তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল। কোনো ধরনের অহংকার বা অহমিকা তাঁর মাঝে দেখিনি। তিনি শুধুমাত্র আওয়ামীলীগের নেতা হিসেবে নয়, যে কোন দলের বা মতের মানুষের নেতা হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণ থাকার কারণেই এটি সম্ভব ছিল। তিনি বিপদে-আপদে অকাতরে মানুষকে সাহায্য করতেন।
মানুষ মরণশীল, মানুষের জীবন ফুরিয়ে যাবে, দেহ মিশে যাবে মাটির সাথে কিন্তু যে মানুষের কর্মজীবন মানুষের জন্য নিবেদিত থাকে। তিনি চিরস্মরণীয় অমর হয়ে থাকেন। মহৎপ্রাণ মানুষের মৃত্যু ঘটে না, তাঁর কর্ম ও সৃষ্টিশীলতা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল। “কোনো কোনো মৃত্যু হাঁসের পালকের মতো তুচ্ছ আর কোনো কোনো মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী।” সৈয়দ মহসীন আলীর মৃত্যুও পাহাড়ের মতো ভারীই দৃশ্যমান হয়েছে মানুষের কাছে। যার প্রমাণ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বুধবার মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর নামাজে জানাযায় দলমত নির্বিশেষে লাখো মানুষের ঢল।
আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT